নিয়ম ভাঙা এক জেলা জজের উপাখ্যান

প্রিন্ট সংস্করণ॥অ্যাড. মো. রোকনুজ্জামান খান  |  ০৬:৫৯, জুন ২৩, ২০১৯

‘পুরনো সব নিয়ম ভাঙে অনিয়মের ঝড়, ঝড়ো হাওয়া ভেঙে দেয় মিথ্যে তাসের ঘর’। বাংলার স্বাধীন সূর্য্যাস্ত হয় ১৭৫৭ সালে। ৪০ জন ফটকাবাজ ইংরেজ গঠন করেছিলেন ইস্ট-ইন্ডিয়া কোম্পানি।

তারা নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে পরাজিত করে দখল করলো ভারত বর্ষের মসনদ। এদেশীয় নাগরিকদের দমন পীড়ন করার জন্য জেলায় জেলায় কোর্ট কাচারী খুলে বসলেন। নন জুডিশিয়াল ইউরোপিয়ান বিচারকদের মাধ্যমে গোড়াপত্তন করলেন প্রহসনের এক বিচার ব্যবস্থার।

কয়েদিদের রাখার জন্য তৈরি করলেন প্রধান কারাগার, কেন্দ্রীয় কারাগার, জেলা কারাগার ও মহকুমা কারাগার। কিন্তু কয়েদিদের খাবার কি হবে? লর্ড ক্লাইভ ফরমান দিলেন সকালের খাবার হবে ২টি পোড়া রুটি আর এক চিমটি গুড়।

দুপুরে এক বাটি ভাত ও এক চামুচ সবজি ও এক পিস মাছ এবং রাতে আবার সেই দুটি পোড়া রুটির সাথে এক আংগুলে ওঠা এক চিমটি গুড়। ইহা ছিলো নন- অফিসিয়াল জেল কোড। এ দেশীয় রাজ-বন্দিদের মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের জন্যই নাকি কারা অভ্যন্তরে এই ধরনের খাবারের মেন্যু চালু হয়েছিলো।

তারপর ধীরে ধীরে ঞযব ঢ়ৎরংড়হবৎং ধপঃ এবং ঞযব লধরষ পড়ফব এ অনুরুপ খাবারের মেন্যু রীতিমতো আইনসিদ্ধ করা হয়। মহামতি মুঘলদের শেষ সম্রাট দ্বিতীয় বাহাদুর শাহ থেকে শুরু করে মহাত্মা গান্ধী, বিপ্লবী ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, ইন্দিরা গান্ধী হয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পর্যন্ত ২৬২ বছর যাবৎ সকালের নাশতায় কারাগারে তাদের ভাগ্যে জুটেছে সেই দুই রুটি আর এক চিমটি গুড়। ২০১৭ সালের মে মাসের ১৭ তারিখের ঘটনা।

নিয়ম ভাঙা সেই মাগুরার জেলা ও দায়রা জজ জনাব শেখ মফিজুর রহমান যান মাগুরার জেলখানা পরিদর্শন করতে যান। তিনি প্রায় শতাধিক কয়েদি ও হাজতীদের জবানবন্দি গ্রহণ করলেন। তিনি বুঝতে পারলেন সবচেয়ে বড় অমানবিক হচ্ছে কয়েদীদের সকালের নাশতা।

এ ছাড়াও যেদিন মামলার ধার্য্য তারিখ থাকে ওইদিন দুপুরের প্রডাকশনে আনা আসামিদের কোনো খাবার দেয়া হয়না। তিনি জেলারকে নির্দেশ দিলেন মামলার ধার্য্য তারিখে প্রতিদিনকার দুপুরের খাবার যেন পুলিশের গাড়িতে করে কোর্টে পাঠানো হয়।

প্রতিফলিত হলো তার নির্দেশনা। যদিও তিনি নিয়ম ভাঙলেন তথাপি ইহা ছিলো শতভাগ মানবিক এবং আইনসিদ্ধ। তিনি কারাগার থেকে ফিরে এসে কয়েদিদের সকালের নাশতা ২টি রুটি আর এক চিমটে গুড়ের পরিবর্তে খিচুড়ি পরিবেশনের জন্য মহামান্য হাইকোর্টের মাধ্যমে স্বরাস্ট্র সচিবকে প্রস্তাব প্রেরণ করলেন। স্বরাস্ট্র মন্ত্রণালয়

সেই প্রস্তাব যৌক্তিক বিবেচনায় এবং তা বাস্তবায়নের জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করেন এবং গত ১৯ মে ২০১৯ তারিখে উক্ত মন্ত্রণালয় তা চূড়ান্ত অনুমোদন করলে রাষ্ট্রীয় ভাবে গত ১৬ জুন দেশের কেন্দ্রীয় কারাগার কেরানীগঞ্জ থেকে আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু করা হয় নিয়ম ভাঙা সেই জেলা জজ জনাব শেখ মফিজুর রহমান সাহেবের প্রস্তাব।

সারাদেশের কারাগারে কয়েদিদের জন্য চালু হলো ২ পোড়া রুটি আর এক চিমটি গুড়ের পরিবর্তে খিচুড়ি অথবা রুটি হালুয়া কিংবা সবজি। ২৬২ বছরের পুরনো রেকর্ড ভাঙ্গার এই কৃতিত্ব সাতক্ষীরার জেলা ও দায়রা জজ জনাব শেখ মফিজুর রহমানের।

মাগুরার জেলা ও দায়রা জজ থাকাকালে জনাব শেখ মফিজুর রহমান লিগ্যাল এইডের কাজ করার জন্য জুডিশিয়াল অফিসারদের জন্য প্রদেয় প্রটোকলের নিয়ম ভেঙে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তিনি অসহায় ও বিত্তহীন বিচার প্রার্থীদের বিনা পয়সায় বিচার পাওয়ার ক্ষেত্রে যে ভূমিকা রেখেছিলেন তা সার্কভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে ছিলো বিরল।

মাগুরা জেলার প্রতিটি ইউনিয়নের পাড়া মহল্লায় লিগ্যাল এইডের সুফল পৌছে দেয়ার জন্য তিনি যে ব্যাপক কর্মযজ্ঞ সম্পন্ন করেছিলেন বাংলাদেশের ইতিহাসে তার কোনো নজির নেই। এ দেশের বিচার ব্যবস্থার ইতিহাসে কোনো দিন কোনো দায়রা জজকে ঝড়-ঝঞ্জা উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষের সেবায় এবং গরীব দুঃখী সাধারণ মানুষের পাশে অনুরূপভাবে দাঁড়াতে আর কোনো বিচারককে দেখা যায়নি। এখানেও তিনি প্রচলিত নিয়ম ভঙ্গ করেছিলেন। তিনি আরো নিয়ম ভেঙেছিলেন।

মাগুরা জজ আদালতের আঙিনায় বিশাল জায়গাটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকায় ময়লা আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছিলো। তিনি সেই জায়গায় ছাঁয়াবীথি নামকরণে একটি সুশোভিত ফুলের বাগান এবং বিচার প্রার্থী জনগণের বসার জন্য পাকা পোস্তা বেঞ্চ করে দেন।

জায়গাটি এখন কী দৃস্টি নন্দন! এখানেও তিনি নিয়ম ভেঙে ছিলেন। ২০১৮ সালে বেসরকারি ভাবে পরিচালিত একটা জরিপে সার্কভুক্ত দেশ সমূহের মধ্যে তাকে শ্রেষ্ঠ জেলা জজ নির্বাচিত করা হয়। জনাব শেখ মফিজুর রহমান এ দেশের বিচার ব্যবস্থার এক উজ্জ্বল নক্ষত্র।

তিনি রাস্ট্রের সম্পত্তি। আজ বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থার যে নান্দনিক ঐতিহ্য দেদীপ্যমান তা একদিনে বা একজন ব্যক্তির দ্বারা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। রোম শহর যেমন একদিনে তৈরি হয়নি, বাংলাদেশের বিচার ব্যবস্থাও তেমনি একদিনে প্রতিষ্ঠা পায়নি।

হাজার বছর ধরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিরাদ, কিষাদ, আলপাইন, ককেশিয়, মঙ্গোলীয়, ইউরোপিয়াড, দ্রাবিড়-অদ্রাবিড়, আর্য অনার্যদের রক্তের কৌমজ স্রোতধারায় স্বজাতি আর বি-জাতির বিরহ মিলনের ফলশ্রুতিতে উপমহাদেশে বসতি স্থাপন করা এই বিরাট জনগোষ্ঠীর জীবনে চরম চড়াই-উৎরাই পার করে বিচারের এই মহা গৌরবের অধ্যায় রচিত হয়েছে কাল-কালান্তরে।

এই উপমহাদেশের পাঁচ হাজার বছরের ইতিহাস আছে। এখানকার বিচার ব্যবস্থার ক্রমবর্ধমান বিকাশের ক্ষেত্রে ৪টি স্তরে বিভাজন করা হয়, যথাক্রমে হিন্দু শাসন আমল, মুসলিম শাসন আমল, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তথা ব্রিটিশ শাসনকাল এবং স্বাধীনতা পরবর্তী পর্যায়। এই সব আমলেই বিচারকদেরকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করা হয়েছে। চরম এক অনিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ থেকে তাদেরকে বিচারিক কাজ করতে হয়েছে।

ফলে বিজ্ঞ বিচারকরা তাদের স্বাধীন মতামত তুলে ধরতে পারেন নাই। আজ এ দেশের নাগরিকরা স্বাধীনতার সুফল ভোগ করতে শুরু করেছেন। মাজদার হোসেন মামলার রায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ হয়েছে এক যুগ আগে।

বিচার বিভাগকে নিয়ে জাতির অনেক আশা-আকাঙ্খা প্রতিফলিত হয় যেন অনিয়মের শৃঙ্খল ভঙ্গ করা জনাব শেখ মফিজুর রহমানদের মত দেশপ্রেমিক সূর্য সন্তানদের সাহসী পদক্ষেপের মাধ্যমে। দেশ গঠনে ও জনকল্যাণে এ কথা আজ শতভাগ ঠিক যে, পুরনো সব নিয়ম ভেঙে যাক অনিয়মের ঝড়ে। ঝড়ো হাওয়া ভেঙে দিক মিথ্যে তাসের ঘর।

লেখক : বিশ্লেষক- কলামিস্ট ও আইনজীবী