শিরোনাম

সৃজনশীল পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের স্বাবলম্বী করার পরিবর্তে গাইডাবলম্বী করছে

প্রিন্ট সংস্করণ॥মনজুর রহমান শান্ত  |  ০৫:৩৬, জুন ১৯, ২০১৯

মাধ্যমিক পর্যায়ের ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে সৃজনশীলতা সৃষ্টির লক্ষ্যে ২০১১ সালে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হয়। প্রথম বছর শুধুমাত্র বাংলা ও ধর্ম বিষয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হলেও পরবর্তিতে বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে এবং সবশেষে গণিতেও এই পদ্ধতি চালু হয়।

এই পদ্ধতি চালু হওয়ার পর দেশের প্রতিষ্ঠিত বা নামকরা স্কুলগুলোর স্বল্প সংখ্যক শিক্ষককে সৃজনশীল পদ্ধতি সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়া হলেও সিংহভাগ শিক্ষক এই বিষয়ে কোনো প্রশিক্ষণ পাননি। ফলে সৃজনশীল পদ্ধতি এখনো শিক্ষকদের কাছে দুর্বোধ্যই রয়ে গেছে।

গ্রামাঞ্চলের স্কুলগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিজ্ঞজনদের মুখভর্তি আশার বানী শোনানো সৃজনশীল পদ্ধতি ছাত্র ছাত্রী এবং দেশের সিংহভাগ শিক্ষকের গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে।

অথচ সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর পূর্বে আমরা বহু আশার বানী শুনেছিলাম, এই পদ্ধতি শিক্ষাক্ষেত্রে যুগান্তকারী পরিবর্তন আনবে এবং ছাত্র ছাত্রীদের স্বাবলম্বী করে তলবে।

কিন্তু বাস্তবে হয়েছে উল্টোটা, এই পদ্ধতি ছাত্র ছাত্রীদের স্বাবলম্বী করার পরিবর্তে কোচিং ও গাইডাবলম্বী করে তুলেছে। আমাদের দেশে বহুকাল ধরে একটা সংস্কৃতি চালু আছে।

উর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিগণ কোনো নতুন ফর্মূলা বা কোনো ধরণের উক্তি ফরমায়েশ করলে অধিনস্ত ও ফর্মূলা বাস্তবায়ন এর সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা চতুর্মুখ ফরফর করে তার প্রশংসা করতে থাকে- যেটাকে আমরা গ্রাম্যভাষায় তেল মারা বলে থাকি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার ক্ষেত্রেও এই তেল মারার ঘটনাটাই ঘটেছে।

সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর ঘোষণা দেয়ার সাথে সাথে এর সাথে সংশ্লিষ্ট তেল মারা গোষ্ঠী রমরমা গল্প বানিয়ে কর্তাব্যক্তিদের উৎসাহ দিয়েছে, কিন্তু দেশের সামগ্রিক অবস্থার প্রেক্ষিতে এই পদ্ধতির প্রচলন কতটা যুক্তিযুক্ত হবে সেটা ভেবে দেখার প্রয়োজনবোধ করে নাই। বড় সাহেবদের মনোরঞ্জন করে তাদের আস্থাভাজন হয়ে নিজ স্বার্থ চরিতার্থ করাই তেল মারা গোষ্ঠীর উদ্দেশ্য।

অনেকটা সেই কবিতার মত:- সাহেব কহেন-/ চমৎকার, আহা চমৎকার\ মোসাহেব কহেন-/ চমৎকার তাকে হতেই হবে যে,- হুজুরের মতে, অমত কার? আমাদের দেশে মোসাহেবের সংখ্যাই বেশি।

সৃজনশীল পদ্ধতি চালু হওয়ার সময় দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা জ্ঞানীগুণী, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ কেউই মাঠ- পর্যায়ের কথা ভেবে এর প্রতিবাদ করেননি। বরং সৃজনশীল পদ্ধতি চালুর অগ্রনায়কদের প্রশংসা করেছিলেন। একবারও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের ছাত্র- ছাত্রী ও শিক্ষকদের কথা ভেবে দেখেননি।

একবারও ভাবেননি এই পদ্ধতি দুর্বোধ্য হবে ছাত্র- শিক্ষক সকলের কাছে এবং ছাত্র- শিক্ষক সবাই গাইড নির্ভর হয়ে পড়বে, যা বাস্তবে এখন হচ্ছে।

গাইড ছাড়া শিক্ষক যেমন কোনো প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারেন না, তেমনি কোনো শিক্ষার্থী গাইড ছাড়া সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর তৈরি করতে পারে না।

অথচ এই পদ্ধতি চালুর সময় উদ্যোক্তারা সগর্বে বলেছিলেন, এতে ছাত্র- ছাত্রীদের কোনো গৃহশিক্ষক বা গাইড লাগবে না। অভিভাবকগণ সন্তানদের শিক্ষা ব্যয় কমাতে পারবেন।

আমি শিক্ষার সাথে সংশ্লিষ্ট একজন সাধারণ মানুষ। আজীবন মানুষ গড়ার কাজ করে যাচ্ছি। আমার চারপাশের শিক্ষার অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছি।

মাত্র কয়েকদিন আগে দেখলাম, এলাকার নাম করা একটা স্কুলের অষ্টম শ্রেণির কোচিং ক্লাসের মডেল টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্ন করার জন্য বিভিন্ন বিষয়ের শিক্ষকগণ ছাত্র- ছাত্রীদের কাছ থেকে গাইড চেয়ে নিলেন। একটা নাম করা স্কুলের শিক্ষকদের যদি এই অবস্থা হয়, তাহলে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অবস্থা কি হবে?

আর যেখানে শিক্ষকদের অবস্থাই এমন, সেখানে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা কতটা যুক্তিযুক্ত হয়েছে, তা আরেকবার ভেবে দেখা দরকার।

এ প্রসঙ্গে দেশের খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবীদের কাছে আমার প্রশ্ন, আপনারা নিঃসন্দেহে স্ব স্ব ক্ষেত্রে অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন। আপনারা যথেষ্ট পরিমাণ সৃজনশীলতার অধিকারী।

আপনাদের ঈর্ষণীয় সাফল্যে গোটা জাতি গর্বিত। ছাত্রজীবনে কঠোর অনুশীলন করে নিজেদের তৈরি করেছেন। আপনাদের সময় সৃজনশীল পদ্ধতি যেমন ছিলো না, তেমনি প্রত্যেক বিষয়ের গাইডও আপনারা ব্যবহার করেননি।

আপনারা যদি সাফল্যের স্বর্ণ- শিখরে আরোহণ করতে পারেন, যদি যথেষ্ট পরিমাণ সৃজনশীলতার অধিকারী হতে পারেন, তাহলে আপনাদের সন্তানদের ওপর সৃজনশীল নামক দুর্বোধ্য পদ্ধতি কেন
চাপিয়ে দিচ্ছেন? কেন আপনার সন্তানদের সকল বিষয়ে এমন কী ধর্ম বিষয়েও গাইড কিনে দিচ্ছেন।

সন্তানদের গাইড নির্ভর করে নিজেরাই আবার সৃজনশীলের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরছেন, এই পদ্ধতি ছাত্র- ছাত্রীদের স্বনির্ভর করে তুলবে। এই আমাদের শিক্ষা পদ্ধতির অবস্থা।

সারাদেশের ছাত্র- ছাত্রীরা কোচিং আর গাইড নামক যাঁতাকলে নিষ্পেষিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

প্রত্যেক বিষয়ের শিক্ষকের কাছে কোচিংএ অংশ নেয়া অঘোষিত বাধ্যতামূলক ব্যবস্থা। নিম্ন আয়ের অভিভাবকদের এখন নাভিশ্বাস অবস্থা।

তাছাড়া বছর বছর পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন করে এবছর এমন পাঠ্যপুস্তক প্রবর্তন করা হয়েছে যা পড়ে সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর তৈরি করা মেধাবী ছাত্র- ছাত্রীদের পক্ষেও সম্ভব নয়।

যে কারণে গাইড বা কোচিং এর দ্বারস্থ হওয়া ছাড়া ছাত্র- ছাত্রীদের সামনে বিকল্প কোনো রাস্তা খোলা নেই। আমি নবম শ্রেণির প্রশ্নের একটা উদাহরণ তুলে ধরছি :- সৃজনশীল প্রশ্নের ক নং প্রশ্নে যে কোনো বিষয়ে সংজ্ঞা চাওয়া হয়। যেমন- প্রতিধ্বনি কাকে বলে? তরঙ্গ কাকে বলে? স্পন্দন কাকে বলে? ইত্যাদি।

কিন্তু এসব বিষয়ে সুস্পষ্ট কোনো সংজ্ঞা বর্তমানে প্রচলিত পদার্থ বিজ্ঞান বইতে নাই। বিভিন্ন কথা দিয়ে বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে।

অথচ এসব সংজ্ঞা নিয়মিত পরীক্ষায় আসছে এবং সঠিক সংজ্ঞা না লিখলে শিক্ষকগণ নম্বর দিচ্ছেন না। সঙ্গত কারণেই ছাত্র- ছাত্রীরা গাইডের পেছনে দৌড়াচ্ছে। এরকম অসংখ্য অসঙ্গতি আছে বর্তমানে প্রচলিত বইতে।

সুতরাং সৃজনশীল পদ্ধতি প্রবর্তন ও পাঠ্যপুস্তক পরিবর্তন গাইড ব্যবসাকে অত্যন্ত ফলপ্রসূ ও বেগবান করেছে সন্দেহ নাই।

শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান প্রেক্ষাপট পরিবর্তনের জন্য সর্বাগ্রে ২০১০ সালের পূর্বে প্রচলিত বইগুলো চালু করতে হবে কারণ ঐ সময়ের বইগুলোতে পূর্ণাঙ্গ সংজ্ঞাসহ প্রতিটি বিষয়ে জ্ঞানগর্ভ আলোচনা ছিলো।

সৃজনশীল পদ্ধতি বিষয়ে আরেকবার চিন্তা করতে হবে, কারণ- নয় বছর অতিবাহিত হলেও এই পদ্ধতি ছাত্র- শিক্ষক সকলের কাছে এখনো এখনো দুর্বোধ্য।

লেখক : কলামিস্ট, নাট্যকার ও ঔপন্যাসিক

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত