শিরোনাম

বাংলা ভাষার সংকটে ব্রিটেন প্রবাসীরা

প্রিন্ট সংস্করণ॥রায়হান আহমেদ তপাদার  |  ০৯:২২, জুন ১৬, ২০১৯

বাংলাদেশ, বাংলা ভাষা, বাংলা সংস্কৃতি কত প্রিয় কত মধুর। যারা দেশের বাইরে না এসেছেন তারা কি বুঝতে পারেন ভাষার চাহিদা কতো ব্যাপক প্রবাসে। বহির্বিশ্ব অসংগঠিত বাঙালি জাতিকে এই বাংলা ভাষাই করেছে সংগঠিত। এই বাংলা ভাষায় ভাব প্রকাশের জন্য কত ছট ফট প্রবাসীদের। এই টানেই আজ দেশে দেশে গড়ে উঠছে বাংলা মার্কেট, বাংলা বাজার, বাংলা স্কুল, বাংলা মসজিদ, বাংলা রাস্তা ঘাট সড়ক কতো কিছু। ভারতের অনেক অঞ্চলে বাংলা ভাষা প্রধান ভাষা, আবার ঝাড়খন্ডের দ্বিতীয় ভাষাও বাংলা।

ভারত বর্ষের বাইরে সিয়েরা লিওনের দ্বিতীয় ভাষাও বাংলা। মালয়েশিয়ায় ১৯২০ সাল থেকে বাঙালিরা সংগঠিত হতে থাকে। ১৯৪০ সালে এদেশে প্রথম বাঙালি সংগঠন প্রতিষ্ঠা পায়। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের বছরেই ‘মালয়েশিয়া বেঙ্গলি এসোসিয়েশন’ নামে সরকারের নথিভুক্ত হয় সংগঠনটি। তখন মূলত বাঙালি ছিলো নেগরি সেম্বিলানের মালাক্কা, পেরাক, সেলাঙ্গর রাজ্যে। চিকিৎসক থেকে প্লান্টেশন শ্রমিক পর্যন্ত সর্বত্রই ছিলো তাদের পেশা।

পোর্ট ডিকসন এলাকায় এ সংগঠনটির বিশাল জমি ও কার্যালয়ও আছে। প্রতিবছর দুর্গাপূজা, রবীন্দ্র-নজরুল জন্মজয়ন্তী পালনসহ বিভিন্ন উৎসব পার্বনে বাংলা সংস্কৃতিকে ধরে রেখেছে। মূলত: ১৯৯০ সাল থেকেই মালয়েশিয়ার লোভনীয় শ্রমবাজারে ঝুঁকতে থাকে বাংলাদেশিরা। অনেকেই জানেন না, ব্রিটিশ যুগে একদিন আজকের এই মালয়েশিয়ায়ও ছিলো বাংলা ভাষার প্রচলন। আজ মালয়েশিয়ায় কুয়ালালামপুরের কোতারায়া এলাকাটি সবাই বাংলা পাসার বা বাংলা মার্কেট নামেই জানে।

এমন বাংলা মার্কেট রয়েছে দেশের বিভিন্ন স্থানেও। শুধু মালয়েশিয়াই নয় বাংলার মানুষ যেদেশেই গেছেন সেদেশের কোনো না কোনো স্থানকেই একটা মিনি বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তুলতে দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন। যেমন- সিঙ্গাপুরে মোস্তফা প্লাজার সামনে, লন্ডন শহরের বাংলাটাউন বলে খ্যাত ব্রিকলেন, ওলন্ডহ্যাম, বার্মিংহাম, আমেরিকার নিউইয়র্ক, কানাডার টরন্টো, সৌদি আরবের জেদ্দা শহরের মুছনা, গুলিল, পবিত্র মক্কা-মদীনা, দুবাই, বাহরাইন, উমান, কাতার, ইতালীর রোম, স্পেনের মাদ্রিদ, বার্সেলোনা, জার্মানির বার্লিন, গ্রিসের এথেন্স, জাপানের টোকিও, দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউন, জোহানেসবার্গসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ও বড় বড় শহরের এক বা একাধিক এলাকায় বাঙালিপাড়া বাংলাবাজার বা বাঙালিদের মিলনক্ষেত্র গড়ে তুলতে সাফল্যর স্বাক্ষর রেখেছেন। এসব স্থানে গেলে মনে হয় ভিনদেশে যেন একচিলতে বাংলাদেশ। এসব স্থানে গড়ে উঠে বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সাংস্কৃতিক ও সাহিত্য সংগঠন।

রাজনৈতিক সংগঠনের শাখা প্রশাখা ডাল পালা পত্র পল্লবের প্রতিযোগিতাতো আছেই। সেসব স্থানে অনেকেই বাংলা সাহিত্য সংস্কৃতি চর্চা, সাহিত্য সভা, সাহিত্য আড্ডা, সমাবেশ, সেমিনার করে যাচ্ছেন হরদম। কর্মব্যস্ততার ফাঁকে লেখালেখিও চালিয়ে যাচ্ছেন বিরামহীনভাবে।

প্রকাশ করে যাচ্ছেন প্রিন্ট ও অনলাইন পত্র পত্রিকা, ম্যাগাজিন বইপত্র সংকলন ইত্যাদি। অত্যাধুনিক তথ্য প্রযুক্তির সুবাদে আমাদের দেশ থেকে প্রকাশিত পত্র পত্রিকায় নিয়মিত লিখে ও সংবাদ প্রেরণ করে প্রবাসে থেকেও জানান দিচ্ছেন সাংবাদিকতা ও সাহিত্য চর্চায় তাদের সরব পদচারণার। বিলেতকে অনেকে বলে তৃতীয় বাংলা, কারণ বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গের পর সর্বোচ্চ সংখ্যক বাংলাভাষীর বাস এখানেই। কঠিন হলেও সত্য, এ দেশে জন্ম নেয়া প্রজন্ম বাংলা বলতে পারলেও লিখতে বা পড়তে পারে না।

ব্রিটেনে বাংলাভাষী পরিবারগুলোয় মাতৃভাষার চর্চা কমবেশি থাকলেও সেটি শুধু মৌখিক বা কথ্য ভাষায় আছে। একটা সময় ছিলো, অভিভাবকরা বাংলাদেশ থেকে আসা শিক্ষিত ছেলে-মেয়েদের গৃহশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সন্তানদের বাংলা অক্ষরজ্ঞান দেয়ার চেষ্টা করতেন। অতীতে সেকশন লেভেল ফান্ডিং প্রজেক্ট-এর মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে শিক্ষক নিয়ে আসা হয়েছিলো। সেই প্রকল্প বন্ধ হয়ে গেছে।

আট বছর আগে শুরু হয় এ লেভেল’ ও ‘জি সি এসি ইভিনিং স্কুলে ছয় বছর থেকে শুরু করে ১৫ বছরের শিশুদের কাউন্সিলের অর্থায়নে মাতৃভাষা শেখানো। সেখানে আফটার স্কুল কার্যক্রমের আওতায় বাংলা শিক্ষা দেয়া হতো। সমপ্রতি কাউন্সিল সেই অর্থায়ন বন্ধ করার ঘোষণা দিয়েছে।

আগামী দুই বছরে অর্থায়ন কমিয়ে পুরোপুরি বন্ধ করে দেয়া হবে। মাতৃভাষার এই প্রকল্পে বাংলাসহ ১০টি সংখ্যালঘু জাতিগোষ্ঠীর ভাষা শিক্ষা দেয়া হয়ে আসছিলো। নতুন নিয়মে, ভাষা শিক্ষার ক্ষেত্রে শিশুদের অভিভাবকদের নিজেদের অর্থ পরিশোধ করতে হবে। টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে যেহেতু বাংলাদেশিদের আধিক্য, সে ক্ষেত্রে বাংলা ভাষা শিক্ষা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে। স্থানীয় মসজিদ ও উদীচীর মতো সংগঠনসহ ৪২ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যম এই ভাষা শিক্ষা প্রকল্প পরিচালিত হতো। সোমালিয়ান ছেলে বাংলা ভাষা শিখেছে, এমন উদাহরণও আছে।

এই প্রকল্পে বর্তমানে এক হাজার ৬০০ ছাত্র-ছাত্রীর ৭০ শতাংশই বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। তাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা। ২০ বছর ধরে চলে আসা এই বাংলা শিক্ষা কার্যক্রম যখন চালু হয়েছিলো, তখন টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলে বাঙালি কাউন্সিলর ছিলেন মাত্র দুই থেকে তিনজন। বর্তমানে এই সংখ্যা প্রায় ২৫। প্রকল্পে বাজেট বরাদ্দ বন্ধ হয়ে গেলে টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের প্রায় অর্ধশতাধিক আফটার স্কুলের বাংলা শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাবে।

১৯৮২ সালে একটি প্রাইমারি স্কুলের নামকরণ করা হয়েছিলো ওসমানী প্রাইমারি স্কুল, বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সেনাপতি বঙ্গবীর এম এ জি ওসমানীর নামে। দুই বছর আগে হঠাৎ স্কুল কর্তৃপক্ষ ওসমানীর নাম বদল করে ভ্যালেন্স প্রাইমারি স্কুল করার সিদ্ধান্ত নেয়। কারণ হিসেবে বলা হয়, মুসলিম নাম থাকায় এখানে অন্যান্য এথনিক কমিউনিটির শিক্ষার্থীরা কম ভর্তি হচ্ছে এবং স্কুলে ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে না। এমন প্রস্তাবের চিঠি অভিভাবকদের কাছে পাঠানো হলে তারা ক্যাম্পেইনে নামেন।

পরে স্কুল কর্তৃপক্ষ ভোটাভোটির প্রস্তাব দিলে ওসমানী নামের পক্ষে বেশি মত আসে এবং নাম বহাল থাকে। স্কুলটিতে অধ্যয়নরত মোট ৪১০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ৩৫৭ জনই বাঙালি বংশোদ্ভূত। অভিভাবকদের আশঙ্কা, ভাষা প্রকল্পটি বন্ধ হওয়ার মধ্য দিয়ে ব্রিটেনে বাংলা শিক্ষা ও চর্চার কবর রচিত হবে। কারণ নতুন প্রজন্ম বাংলা শিক্ষার ব্যাপারে খুব একটা আগ্রহী নয়।

অভিভাবকরাও পকেটের পাউন্ড খরচ করে বাংলা শেখাতে আগ্রহী হবেন না। দ্বিতীয়ত, ধর্মীয় শিক্ষার প্রতি অভিভাবকদের বিশেষ আগ্রহ থাকায় এবং নানা পৃষ্ঠপোষকতার কারণে এ শিক্ষার প্রতি আগ্রহী হয়ে উঠেছে নতুন প্রজন্ম। বিগত এক দশকে ধর্মীয় শিক্ষার প্রসারের কারণে এখানে বাংলার চেয়ে আরবি সংস্কৃতি ধারণ ও চর্চা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। আশির দশকে বেড়ে ওঠা প্রজন্ম এবং বাংলাদেশ থেকে বিভিন্ন সময়ে আসা মানুষের মধ্যেই এখনো বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চা বিদ্যমান।

তাদের সঙ্গে নতুন প্রজন্মকে খুব একটা সংশ্লিষ্ট করা সম্ভব হচ্ছে না। বিগত এক দশকেই ১০ থেকে ১২টি বাংলা কাগজের মধ্যে বন্ধ হতে হতে পাঁচটি কোনোভাবে টিকে আছে। বাংলা টেলিভিশন চ্যানেল এরই মধ্যে দুটি বন্ধ হয়ে গেছে। পাঁচটি চ্যানেল যদিও এখনো টিকে আছে, ভবিষ্যতে কতটুকু টিকে থাকবে এই ভাবনা রয়ে গেছে। ভাষা বহমান নদীর মতো। এর জোয়ার-ভাটা যেমন আছে, পরিবর্তনও আছে। ব্রিটেনে বাংলা গণমাধ্যম হয়তো টিকে থাকবে না।

কিন্তু বাংলা ভাষাটা ভাঙাচোরাভাবে থেকে যাবে। খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে আরো কয়েক প্রজন্ম চলে যাবে। তিনি প্রশ্ন করেন, ‘ব্রিটেনের নতুন প্রজন্ম বাংলা ভাষাটা শিখবে কেন? যে ভাষা তার ব্যবহারিক জীবনে কোনো কাজে আসবে না তা শেখার প্রতি আগ্রহ থাকার কথা না।

যেহেতু বাংলাভাষী বৃহৎ জনগোষ্ঠী এখানে আছে এবং বাংলাদেশের সাথে তাদের একটা যোগাযোগ আছে, এই কারণে মুখের ভাষা হিসেবে, বাংলা কোনোভাবে টিকে থাকবে হয়তো। বিলেতের বাংলা ভাষা অভিভাবকদেরই টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব নিতে হবে।

উল্লেখ্য ব্রিটেনের পার্লামেন্টে নির্বাচিত বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত তিনজন এমপির মাঝে একজন সরাসরি বাংলাদেশি মানুষের নিজস্ব এলাকার। সে হিসেবে মূলধারার রাজনীতিতে বাঙালি অভিবাসীদের অবস্থান মোটেই হেলাফেলার নয়।

বাঙালিদের নিজস্ব দাবি-দাওয়া নিয়ে সোচ্চার হওয়া কিংবা যৌক্তিক কিছু দাবি-দাওয়া আদায় করে নেয়া খুব একটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরে এখন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত জনপ্রতিনিধিদের সংখ্যাও কম নয়।

লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস তো বাঙালিদের নিজস্ব এলাকা হিসেবেই পরিচিত। টাওয়ার হ্যামলেটস, নিউহাম, ওয়েস্টমিনিস্টার ম্যানচেস্টার, ওল্ডহ্যাম, বার্মিংহামসহ ব্রিটেনে এখন অন্তত দেড় শতাধিক নির্বাচিত কাউন্সিলর।

এমনিতেই গোটা ইউরোপ কিংবা পশ্চিমের শহরগুলো হলো স্ট্যাচুর শহর। যেখানেই যে শহরে আমরা যাই না কেন, স্ট্যাচুগুলোই যেন কথা কয়। ইতিহাস ফুটে ওঠে এই স্ট্যাচুগুলোর মধ্য দিয়ে। স্বাভাবিকভাবে তাই পর্যটকদের আকৃষ্ট করার একটা জায়গা হলো এই শহীদ মিনার, যেখানে বাংলাদেশ ফুটে উঠেছে। স্পষ্ট হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের সংগ্রাম আর বীরত্বের কথা।

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা হিসেবে বাংলা ভাষাকে বিশ্বময় ছড়িয়ে দিতে কিংবা বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত প্রজন্মের মধ্যে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজনে বাংলাদেশের ভূমিকা রাখার প্রয়োজন আছে। বিদেশে বাংলাদেশি দূতাবাসের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতিচর্চার পৃষ্ঠপোষকতার মাধ্যমে বাংলাকে বাঁচিয়ে রাখা প্রয়োজন।

একটা দেশের ভাষা আন্দোলন যখন তার ভৌগোলিক সীমানা ছাড়িয়ে অন্য দেশে, এমনকি এশিয়া ছেড়ে সুদূর মহাদেশে ব্যাপ্ত হয় তখন বুঝতে হবে এই হাজার বছরের প্রাচীন ভাষার ভিত্তি শক্ত এবং এই শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ানো জাতিসত্তা হাজারো সংকটের মুখেও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে জানে। বাংলাদেশের মানুষ এই সত্যটি যেমন নিজের দেশে, তেমনি বহির্বিশ্বেও প্রমাণ করেছে। আজ তারা শুধু দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া, মধ্যপ্রাচ্যে নয়, ইউরোপ, আমেরিকায়, এমনকি সুদূর আফ্রিকাতেও ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে।

বহু দেশেই তারা এখন সঙ্ঘবদ্ধ কম্যুনিটি। কিন্তু নিজেদের ভাষা ও সংস্কৃতিকে তারা আগলে রেখেছে। অন্য অনেক জাতিগোষ্ঠীর মতো ইউরোপে বা আমেরিকায় অভিবাসী হয়ে নিজেদের অস্তিত্ব হারায়নি। এখানেই বাঙালি বা বাংলাদেশি কম্যুনিটির শ্রেষ্ঠত্ব ও স্বাতন্ত্র।

লেখক : কলামিস্ট

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত