শিরোনাম

সৌদি আরবে লাগাতার হামলা, হুতিদের উত্থানে কার কি লাভ?

সুলাইমান সাদী  |  ১৮:১৪, জুন ১৩, ২০১৯

সৌদি আরবে লাগাতার হামলা, হুতিদের উত্থানে কার কি লাভ?
ইরান আমেরিকা বাণিজ্যযুদদ্ধের ডাক আসার পর থেকেই সৌদি আরবে ইয়েমেনের হুতিদের আক্রমণের মাত্রা বেড়েছে। গতকাল সৌদি আরবের একটি বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় অন্তত ২৬ জন আহত হয়েছে। গত দুদিন আগেও হুতিদের দুটি ড্রোন ভূপাতিত করেছে সৌদি প্রতিরক্ষাবাহিনী। বেশ কয়েকদিন পরপরই হুতিরা এভাবে সৌদি আরবের জেদ্দা, রিয়াদ ও মক্কাসহ বিভিন্ন শহরকে কেন্দ্র করে এসব অভিযান পরিচালনা করছে।

সৌদি প্রতিরক্ষাবাহিনী হুতিদের একের পর এক আক্রমণ রুখে দিতে সমর্থ হলেও গতকালের আক্রমণের মাধ্যমে তারা সফল হতে শুরু করেছে। বিশ্বব্যাপী মুসলিমদের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ তীর্থভূমি সৌদির মক্কা-মদিনাসহ আরবের নিদর্শণপূর্ণ জায়গাগুলোতে শিয়া হুতিদের এ আক্রমণ অব্যাহতভাবে চলতে থাকলে মুসলিম বিশ্বে প্রচণ্ড ধাক্কা আসতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে গরিব দেশ ইয়েমেন। দেশটির মোট জনসংখ্যার ৭০ ভাগই সুন্নী মুসলিম এবং ৩০ ভাগ শিয়া। কিন্তু শিয়া বিদ্রোহীদের লাগাতার আক্রমণে দেশটিতে গৃহযুদ্ধ লেগে আছে দীর্ঘ কয়েক বছর ধরে। গৃহযুদ্ধের ফলে দেশটিতে মারাত্মক দুর্ভিক্ষও দেখা দিয়েছে। অপুষ্টিতে ভুগছে দেশটির প্রায় সব শিশু ও নারী।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল ষড়যন্ত্র ও সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র মৈত্রী ইয়েমেনকে আরো বেশি সংকটের দিকে ঠেলে দিয়েছে। অপরদিকে শিয়া ধর্মাবলম্বী দেশ ইরানের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ সহযোগিতা ইয়েমেনি শিয়াদের বরাবর উত্তেজিত রাখছে। শিয়া হুতিদের চেয়ে দেশটির সুন্নী মুসলিমরা যেমন সবচেয়ে বেশি ক্ষতি ও ধ্বংসযজ্ঞের সম্মুখীন হয়েছে, তেমনি আরবদের অবিচক্ষণতায় যুক্তরাষ্ট্র, ইসরাইল ও ইরান মাঝখান থেকে বিপুল ফায়দা লুটছে।

মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পুরো বিশ্বব্যাপী শক্তিগুলোর নজর শুরু থেকেই। এখানে মুসলমানদের একক কর্তৃত্ব কেউ সহজে মেনে নিতে পারছে না। অঞ্চলগুলো খনিজ সম্পদের প্রতি যেমন সবার লোভাতুর দৃষ্টি, তেমনি বাণিজ্য ও সাংস্কৃতিক বাজারের ব্যাপারেও সবাই সমান আগ্রহী। সম্প্রতি সৌদি আরব একচেটিয়াভাবে পশ্চিমের সঙ্গে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক সমঝোতায় চলে আসার পর ইরানের মাথাব্যথা আরো বেড়ে গেছে। মধ্যপ্রাচ্যের শিয়া সম্প্রদায়গুলোকে সঙ্গে নিয়ে তাদের স্বার্থ উদ্ধারের প্রচেষ্টাও জারি রাখছে অনবরত।

শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর গ্যাঁড়াকলে পড়ে পিষ্ট হচ্ছে ইয়েমেন ও ফিলিস্তিন। ওইদিকে ইসরাইলের সহায়তায় ফিলিস্তিনকে জব্দ করেছে যুক্তরাষ্ট্র, এইদিকে সৌদি আরবকে দিয়ে ইয়েমেনকে ধুলিস্যাৎ করার পরিকল্পণায়ও এগিয়ে যাচ্ছে। মাঝপথে ইরানও ধর্মীয় সহানুভূতির নামে দুর্ভিক্ষ কবল দেশটিকে আরো বিপর্যস্ত করে তোলার খেলায় মেতে আছে।

হুতি বিদ্রোহের উত্থান

ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহটি সাদাহ যুদ্ধ, সাদাহ সংঘাত ইত্যাদি নামে পরিচিত। এ আন্দোলনটির অফিসিয়াল নাম নাসরুল্লাহ। ইয়েমেনের শিয়াপন্থী জাইদি সম্প্রদায়ের একটি দল হুতিরা। অবশ্য সুন্নীদের একটি অংশও এ আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছে দেশটির স্বাধীনতা স্বার্বভৌমত্বের প্রশ্নে।

২০০৪ সালে জাইদি ধর্মীয় নেতা হুসাইন বদরুদ্দীন আল হুতির বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হলে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে। এ ঘটনার মধ্য দিয়েই গোষ্ঠীটি তাদের নেতার নামের অনুকরণে হুতি নামে পরিচিতি লাভ করে বিশ্ব মিডিয়ায়। হুতিদের একজন জাইদি ধর্মীয় নেতা ও একজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে ৫০ হাজার ডলারের দুনীতির অভিযোগ তোলে সরকার। এরপর থেকেই শুরু হয় তাদের আন্দোলন।

ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকা সাদাহে প্রথম হুতিরা বিদ্রোহ শুরু করে সরকারের বিরুদ্ধে। অবশ্য পার্শ্ববর্তী এলাকা হাজ্জাহ, আমরান, আল জাওফ এবং জিযানের সৌদি শাসিত অঞ্চলেও তাদের আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে ধীরে ধীরে।

২০১৪ সালে হুতিরা দখলদারিত্ব শুরুর পর আন্দোলনের চরিত্র বদলাতে থাকে। ২০১৫ সালে ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন বড় রকমের হস্তক্ষেপের পর শুরু হয় মারাত্মক গৃহযুদ্ধ।

অবশেষে ২০১৫ সালের ২০ জানুয়ারিতে হুতিরা সানাকে নিজেদের দখলে নিতে সক্ষম হয়। তারা ইয়েমেনের রাজধানী সানার প্রেসিডেন্ট ভবনে ঢুকে পড়লে প্রেসিডেন্ট আবেদ রাব্বো মানসুর হাদী প্রায় আধাঘন্টা হুতিদের গোলাবৃষ্টির মুখে ভবনে লুকিয়ে থাকেন। তবে তিনি ও তথ্যমন্ত্রী নাদিয়া সাককাফ রক্ষীদের প্রচেষ্টায় কোনো রকম প্রাণ বাঁচান। রক্ষীরা হুতিদের কাছে প্রেসিডেন্ট ভবন ছেড়ে চলে যায়। পরে ২২ জানুয়ারি তিনি ও তার প্রধানমন্ত্রী খালেদ বাহাহ পদত্যাগ পত্র জমা দেন পার্লামেন্টে।

হুতিরা ২০১৫ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ইয়েমেনের সরকার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়। ওই বছরের  মার্চ মাসে সানার আল বদর ও আল হাশুশ মসজিদের আত্মঘাতী বোমা হামলা হয়। তাৎক্ষণিকভাবে ইরাকের আইএস গোষ্ঠী ওই হামলার দায় স্বীকার করে। এ হামলা ১৪২ হুতি নিহত হয় এবং ৩৫১ জন আহত হয়।

২২ মার্চ হুতি নেতা আবদুল মালিক আল হুতি এ ঘটনাকে সন্ত্রাসী আক্রমণ আখ্যা দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের ওপর এর দায় চাপান। তিনি আরব লীগকে ইয়েমেনে সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে অর্থনৈতিকভাবে লালনের জন্য দোষী সাব্যস্ত করেন।

২৭ মার্চ হুতিরা ইয়েমেনে ছোঁড়া সৌদি আরব, বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, আমিরাত, মিশর, জর্ডান, মরক্কো ও সুদানের নেতৃত্বাধীন আরব জোটের একটি বিমান হামলার জন্যে প্রচণ্ড সমালোচনা ও হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে। আরব লীগের সামরিক ওই জোটের বিমান হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পণা ও সহযোগিতা ছিল এবং তাদের নীতিগত সমর্থন ও গোয়েন্দা সহযোগিতাও ছিল।

এর পর থেকে ইরান ও ইরাকের বিদ্রোহী গ্রুপ হিজবুল্লাহর সহযোগিতায় সৌদি আরবে একের পর এক হামলা চালাতে থাকে হুতিরা। তারা মক্কা, রিয়াদ ও জেদ্দাসহ বিভিন্ন পয়েন্টকে লক্ষ করে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। সৌদি প্রতিরক্ষাবাহিনী সেগুলো ব্যর্থ করতে সক্ষম হলেও গতকালের আক্রমণটি আঘাত হানার পর ভয় বাড়তে শুরু করেছে। এ আক্রমণের জের ধরে মধ্যপ্রাচ্য সংকট আরো বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ইতোমধ্যে।

এসএস

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত