শিরোনাম

পথে-পরিবহনে নির্মম মৃত্যু ও ধর্ষণ : উত্তরণের রাস্তা

প্রিন্ট সংস্করণ॥শান্তা ফারজানা  |  ১০:১৫, জুন ১২, ২০১৯

 

বাংলাদেশে মানুষের জীবনের মূল্য এখন কোন পর্যায়ে তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করার সময় এসেছে। দেশে এখন এমনই এক পরিস্থিতি বিরাজ করছে যে সামান্য ভাড়া নিয়ে তর্ক-বিতর্কের জের ধরে মানুষ হত্যা করছে মানুষকে।

সেই স্কুল জীবন থেকে একজন সচেতন মানুষ হিসেবে বাংলাদেশের মাটি ও মানুষের ছোট্ট ছোট্ট বিষয় থেকে শুরু করে অনেক গভীর বিষয় পর্যন্ত পর্যবেক্ষণ করেছি, লিখেছি, মানুষকে সচেতন করেছি। এখনও করছি। কেননা, নতুনপ্রজন্মের প্রতিনিধি আমি-আমরা।

টেকনাফ থেকে তেতুলিয়া, রুপসা থেকে পাথুরিয়া আমাদের রাজনীতি-অর্থনীতি- শিক্ষা-সাহিত্য- সংস্কৃতি-সমাজ-সভ্যতাসহ বহুমুখী চেষ্টা চলছে মানুষের কল্যাণের জন্য।

আর তাই যখন দেখি- ‘গাজীপুর সদর উপজেলার ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের বাঘের বাজারে বাসের ভাড়া নিয়ে বাকবিতন্ডার জেরে এক যাত্রীকে চাপা দিয়েছে বাসের চালক’।

তখন ব্যথিত হই, জর্জরিত হই বেদনায়। আমরা কি এমন বাংলাদেশ চেয়েছিলাম! না, তাহলে কেন- এ ঘটনায় বাসটি আটক করা হলেও চালক ও সহযোগিকে আটক করা যায়নি। যতদূর জেনেছি, নিহত যাত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ (৩৫) ঢাকার আলুবাজারের মৃত শাহাব উদ্দিনের ছেলে।

তিনি গাজীপুর সদর উপজেলার বাঘের বাজার এলাকার আতাউর রহমান মেম্বারের বাড়িতে স্ত্রীকে নিয়ে বসবাস করতেন। তিনি তার স্ত্রীকে নিয়ে গাজীপুর সদর উপজেলার বাঘের বাজারের বাড়িতে ফিরতে ময়মনসিংহ থেকে ‘আলম এশিয়া’ বাসে ওঠেন।

পথে বাসের ভাড়া নিয়ে স্বামীর সঙ্গে হেলপারের বাগবিতন্ডা হয়। একপর্যায়ে বাসের ভেতরেই স্বামী সালাহ উদ্দিনকে মারধর করেন বাসের হেলপার। মারধরের ঘটনাটি মুঠোফোনে বাঘের বাজার এলাকার স্বজনদের অবহিত করেন সালাহ উদ্দিন।

বাসটি বাঘের বাজারে পৌঁছালে সালাহ উদ্দিন নেমে বাসের গতিরোধের চেষ্টা করেন। এ সময় সালাহ উদ্দিনকে চাপা দিয়ে চালক দ্রুতগতিতে বাসটি নিয়ে ঢাকার দিকে চলতে থাকে। পরে ঘটনাস্থল থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে হোতাপাড়া ফু-ওয়াং কারখানার সামনে নিয়ে বাসের গতি কমিয়ে নিহতের স্ত্রী পারুলকেও চলন্ত বাস থেকে ফেলে দেয় হেলপার। হায়রে বাংলাদেশ!

শেষ হবে না এই দুর্ভোগ-মৃত্যু উপত্যকার রাজনীতি! যদি শেষ না হয়, আমরা হারাবো বেদনার অতল গহ্বরে এভাবেই যেভাবে হারিয়েছে নিহতের স্ত্রী পারুল। গণমাধ্যম বলছে- ঈদের সময় আগে ও পরে সড়ক, রেল, নৌপথে অনাকাঙ্ক্ষিত হারে বেড়ে যায় ভাড়া। প্রতিবছর ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়া এবং ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফেরার সময় যাত্রীসাধারণকে অতিরিক্ত বাসভাড়া গুনতে হয়।

চাহিদা বেড়ে গেলে দামও বাড়ে বাজারের এই সাধারণ নিয়মে ঈদের ছুটিতে বাসভাড়া বেড়ে থাকে। কিন্তু যে মাত্রায় ভাড়া বাড়ে তার কোনো যৌক্তিকতা বা ন্যায্যতা খুঁজে পাওয়া যায় না; বলা চলে, বাসভাড়া নিয়ন্ত্রণহীন ও খেয়ালখুশিমতো বাড়ানো হয়। সেভ দ্য রোড এর মহাসচিব হিসেবে বাংলাদেশের রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলা শহরের হাজার হাজার সাধারণ মানুষের সাথে কোনো না কোনোভাবে কথা হয়, হয় আলোচনা।

আর সেই আলোকে বলতে পারি- যাত্রীসাধারণ এই ভাড়া বাড়ানোকে বলে জুলুম। এই জুলুম চলে অবাধে। কারণ, সরকারি কোনো কর্তৃপক্ষ এ ক্ষেত্রে ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার কার্যকর চেষ্টা করে না; বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) ব্যর্থতার কারণে বাসভাড়া আদায়ের ক্ষেত্রে একধরনের নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় বলে আমি মনে করি।

আমাদের সড়ক পরিবহনের সংস্কৃতি বলছে- ঈদের সপ্তাহ দুই আগে থেকেই দূরপাল্লার বাসের অগ্রিম টিকিট বিক্রি শুরু হয়, স্বাভাবিকভাবেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে লোকজনকে টিকিট কিনতে হয় অতিরিক্ত টাকা খরচ করে।

অথচ, সারা দেশের জন্য সরকার কিলোমিটার প্রতি বাসভাড়া নির্ধারণ করে দিয়েছে, কিন্তু সেই নির্ধারিত হারের বেশি ভাড়া যেন কেউ আদায় করতে না পারে, এ রকম কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলে বাসভাড়া বাড়ে পরিবহন মালিকদের ইচ্ছেমতো এবং প্রতিবছর ঈদের সময়ে এটা একটা অলিখিত নিয়মে পরিণত হয়। কিন্তু এই অবস্থা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

এই ক্ষেত্রে সেভ দ্য রোড মনে করে, শৃঙ্খলা আনা বিআরটিএর জরুরি কর্তব্য। শুধু এখানেই শেষ নয়, আর যেন কোথাও কোনোভাবে প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়া এই ভাড়া কাউকে দিতে না হয়, সে ব্যাপারে পদক্ষেপ নেয়া হয়।

তবে এভাবে ভাড়া যদি বাড়াতেই হয়, তবে বৃদ্ধির হার যেন যুক্তিসংগত হয় এবং বর্ধিত হার একবার নির্ধারিত হয়ে গেলে যেন সেই হারের চেয়ে একটি টাকাও বেশি দিয়ে কাউকে টিকিট কিনতে না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে। কাজটি বিআরটিএকে করতে হবে এবং এ ক্ষেত্রে বাসমালিক ও শ্রমিকদের সংগঠনগুলোর আন্তরিক সহযোগিতার প্রয়োজন।

আমাদেরকে মনে রাখতে হবে, আরেকটি মহামারী হচ্ছে সড়ক পথ দুর্ঘটনা। বিশেষ করে ঈদের সময় সড়ক পথ দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। মহাসড়কে যেন শুরু হয় মৃত্যুর মিছিল। অনেক আনন্দের ঈদযাত্রা শেষ পর্যন্ত শোকযাত্রায় পরিণত হয়। আর এটা প্রতিবছর বাড়ছে। ২০১৮ সালে ২৭৭টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৩৩৯ জন নিহত এবং ১ হাজার ২৬৫ জন আহত হয়।

কিন্তু গত ঈদুল ফিতরের দিনই সাত জেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় ২০ জন নিহত হওয়ার খবর দিয়েছে সংবাদ মাধ্যম। এদের মধ্যে ফরিদপুরে ছয়জন, লালমনিরহাটে তিনজন, ঝিনাইদহে দুইজন, ঢাকার সাভারে এক পুলিশ সদস্য, নরসিংদীতে তিনজন, টাঙ্গাইলে দুইজন ও সিরাজগঞ্জে তিনজন নিহত হয়েছেন।

ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের ফরিদপুর সদর উপজেলার ধুলদী রেলগেট এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় ছয়জন নিহত হয়েছেন। এতে আহত হয়েছেন আরও অন্তত ২৩ জন। অন্যদিকে, লালমনিরহাটে পিকআপ নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে উল্টে তিনজন নিহত হয়েছেন।

ঝিনাইদহের মহেশপুরে সড়ক দুর্ঘটনায় মোটরসাইকেলের দুই আরোহী নিহত হয়েছেন। এতে আরও একজন গুরুতর আহত হয়েছেন। ঈদের সকালে সাভারের আশুলিয়ার বলিভদ্র এলাকায় পুলিশবাহী ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার সঙ্গে লিচুবোঝাই ট্রাকের সংঘর্ষে নিহত হয়েছেন পুলিশের কনস্টেবল নাদিম হোসেন। এ ঘটনায় শিল্প পুলিশের আরও তিন সদস্যসহ মোট চারজন আহত হয়েছেন।

নরসিংদীতে পৃথক সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন কমপক্ষে ১০ জন। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের ভগিরথপুর এলাকায় বাস সংঘর্ষে নিহত হন দুইজন, আহত হন কয়েকজন। ঢাকা-টাঙ্গাইল-বঙ্গবন্ধু সেতু মহাসড়কের কালিহাতী উপজেলার সল্লা এলাকায় পিকআপ ভ্যানে বাসের ধাক্কায় দুই যুবক নিহত হয়েছেন।

এতে আহত হয়েছেন আরও সাতজন। সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে পৃথক তিনটি সড়ক দুর্ঘটনায় ট্রাকচালক ও হেলপারসহ তিনজন নিহত হয়েছেন। এ সব ঘটনায় আহত হয়েছেন অন্তত ১৩ জন। শুধু এখনেই শেষ নয়; এই পথে হত্যার পাশাপাশি ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে অহরহ। মনে আছে আমাদের বোন মিতু, তানিয়াসহ আরো অনেককে ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা। তবু বাংলাদেশ ঘুরে দাঁড়ায় না, দাঁড়ানো উচিৎ এখনই।

কেননা, সেভ দ্য রোড এর রিসার্চ সেল এর তথ্য অনুযায়ী, বছরে সারাদেশে যত সড়ক দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি হয় তার ১৪-১৫ শতাংশ হয় দুই ঈদের আগে পরে ১৫ দিনে। এর প্রধান কারণ, এসময় অবৈধ যানবাহন এবং অদক্ষ ও বেআইনি চালক বেড়ে যায়। চাহিদা বাড়ায় ট্রিপ বাড়ে এবং বাড়ে বেপরোয়া গতি। ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ও যাত্রীদের তাড়াহুড়ো করার ফলে বিশৃঙ্খলা বাড়ে, দুর্ঘটনাও বৃদ্ধি পায়; এখন যুক্ত হয়েছে আবার হত্যা-ধর্ষণ। মূলত, ঈদের সময় যানবাহন এবং সড়কের একটা আলাদা ব্যবস্থাপনা চালু করতে হবে।

হাইওয়ে পুলিশকে অনেক বেশি কার্যকর ও তৎপর হতে হবে। এটা করা গেলে ঈদের আগে পরে সড়ক দুর্ঘটনা কমিয়ে আনা যাবে। আমরা মূলত, একটি সুন্দর দেশ চাই। যে দেশে সন্তান মায়ের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে কাজ শেষে আবারো মায়ের কোলেই ফিরে আসবে।

এই প্রত্যাশার পাশাপাশি সেভ দ্য রোড কর্মী হিসেবে, বাংলাদেশের রাজনীতিসহ বিভিন্ন স্তরের রাজপথ কর্মী হিসেবে, বরাবরের মতো সেভ দ্য রোড এর প্রাণের ৭ দফা ৪ পথ নিরাপদ করতে সংশ্লিষ্টদের উদ্দেশ্যে আবারো উপস্থাপন করছি- (১). মিরেরসরাই ট্রাজেডিতে নিহতদের স্মরণে ১১ জুলাইকে ‘নিরাপদ পথ দিবস’ ঘোষণা করতে হবে। (২). ফুটপাত দখলমুক্ত করে যাত্রীদের চলাচলের সুবিধা দিতে হবে। (৩). সড়ক পথে ধর্ষণ-হয়রানি রোধে ফিটনেসবিহীন বাহন নিষিদ্ধ এবং কমপক্ষে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ ও জাতীয় পরিচয়পত্র ব্যতিত চালক-সহযোগি নিয়োগ ও হেলপার দ্বারা পরিবহন চালানো বন্ধে সংশ্লিষ্ট সকলকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। (৪). স্থল-নৌ-রেল ও আকাশ পথ দুর্ঘটনায় নিহতদের কমপক্ষে ১০ লাখ ও আহতদের ৩ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ সরকারিভাবে দিতে হবে। (৫). ‘ট্রান্সপোর্ট ওয়ার্কার্স রুল’ বাস্তবায়নের পাশাপাশি সত্যিকারের সম্মৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষে ‘ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন’ বাস্তবায়ন করতে হবে। (৬). পথ দুর্ঘটনার তদন্ত ও সাজা ত্বরান্বিত করণের মধ্য দিয়ে সতর্কতা তৈরি করতে হবে এবং ট্রান্সপোর্ট পুলিশ ব্যাটালিয়ন গঠনের পূর্ব পর্যন্ত হাইওয়ে পুলিশ, নৌ পুলিশসহ সংশ্লিষ্টদের আন্তরিকতা-সহমর্মিতা-সচেতনতার পাশাপাশি সকল পথের চালক-শ্রমিক ও যাত্রীদের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হতে হবে। সকল পরিবহন চালকের লাইসেন্স করতে হবে। (৭). ইউলুপ বৃদ্ধি, পথ-সেতুসহ সংশ্লিষ্ট সকল মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি প্রতিরোধে সকলকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে।

যাতে ভাঙা পথ, ভাঙা সেতু আর ভাঙা কালভার্টের কারণে নতুন কোনো প্রাণ দিতে না হয়। ভালোবাসি দেশ-মানুষ; সংসার-সন্তান বা বৈষয়িক কোনো কিছু নিয়েই ভাবিনি কখনো। যে কারণে নিরাপদ দেশ-মানুষ সবসময় প্রত্যাশা ছিলো, আজো আছে, থাকবে আজীবন, থাকবে এই দাবি। বরাবরের মতো আবারো সবার প্রতি অনুরোধ দেশ বাঁচাতে, নিজেকে বাঁচাতে আসুন নিরাপদ ৪ পথের জন্য এগিয়ে যাই।

লেখক : মহাসচিব ‘সেভ দ্য রোড’

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত