শিরোনাম

কৃষক বাঁচাও দেশ বাঁচাও

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল আউয়াল চৌধুরী মাসুদ  |  ১০:৫৯, মে ২৪, ২০১৯

‘কৃষি, কৃষক আর কৃষি বান্ধব অর্থনীতি’ এই তত্ত্ব হয়ত এখন আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না। অর্থনীতির মার-প্যাঁচ আমি অত শত বুঝি না। তবে এটুক অন্তত বুঝি, আর যাই হোক মাথা পিছু আয় আর জীবন যাত্রার মান বেড়েছে বলেই যে কৃষি পণ্যের দাম কমেছে বা কৃষক তার ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হবে, এটা অন্তত মেনে নেওয়া যায় না।

উন্নত কিংবা উন্নয়নশীল আর অনুন্নত বিশ্ব বা দেশ বলতে কি বুঝায় তা কিছুটা আমি বুঝি বৈকি। আজকে যারা উন্নত, গতকালও তারাই উন্নয়নশীল বা অনুন্নত ছিলো। অঢেল প্রাকৃতিক সম্পদ কিংবা তেল, গ্যাস ও স্বর্ণে প্রাচুর্যতা ছাড়া উন্নত দেশ বলতে যেসব দেশকে আজ আমরা চিনি, যেসকল দেশের আজকের এই উন্নতির পিছনের মূল চালিকাশক্তি তথা ভিত্তি কিন্তু একদিন ছিলো এই কৃষি খাত।

আর সেখানে কিনা আমার দেশের সেই কৃষি এবং কৃষকই সবচেয়ে বেশি উপেক্ষিত, সবচেয়ে বেশি নিগৃহীত। উৎপাদন বাড়ছে, নিত্য নতুন প্রযুক্তির আবির্ভাব হচ্ছে, গ্রামগুলো সব শহর হচ্ছে। নগরায়ণ আর বিশ্বায়ণ পাল্লা দিয়ে বাড়ছে। সবই সত্য, সবই প্রশংসনীয়। কিন্তু বাহ্যিক ঝলমলে লৌকিকতা বাদ দিয়ে একবার একটু দুচোখ বন্ধ করে ভাবুন তো সত্যিকার উন্নয়নের পথে আমরা আসলে কতটুকু হাটছি!

বিশ্বে আজ যত মারামারি, হানাহানি, কাটাকাটি, যুদ্ধ-বিগ্রহ, দখলদারিত্ব তার সবকিছুর মূলে রয়েছে খাদ্য উৎপাদন, বণ্টন, মজুদকরণ এবং এর কৃত্তিম সংকট সৃষ্টি। ভিন্ন পেশার, ভিন্ন পরিচয়ের মানুষদের কাছে কৃষি আজও একটি বক্রচক্ষে দেখার মত বিষয়। অনেক টাকার মালিক আপনি, দামি গাড়িতে চড়েন, নামী-দামী ব্র্যান্ড আর পারফিউম আপনার নিত্য ব্যবহার্য।

সেই আপনিই মনে করেন একদিন গহীন অরণ্যে হারিয়ে গেলেন। একদিন যায়, দুদিন যায়, তিনদিন যায়। আপনার দামী পারফিউমের ঘ্রাণ আপনার নাক পর্যন্তই পৌছায় না। পাকস্থলীর অনশন ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে। হঠাৎ অন্নকষ্টে মৃত্যুভয় জেগে উঠলো। ভেবে দেখুন তো বেঁচে থাকার জন্য কি দরকার আপনার কাছে সবচাইতে বেশি ঠিক ঐ মুহূর্তে? একবার ভাবুন তো, অনেক টাকা ভর্তি মানিব্যাগ আপনার। কোনো এক বে-খেয়ালে একদিন সকালে আপনি বাজার করতে গেলেন মনের আনন্দে বাজারের ব্যাগ হাতে।

কিন্তু এ কী! বাজারে গিয়ে দেখলেন কিছুই নাই বাজারে। কিনে খাওয়ার মত কিছুই খুঁজে পাচ্ছেন না বাজার থেকে বাজারে কোথাও কিছুৃৃ। ওপরের প্রেক্ষাপট দুটি কাল্পনিক বাস্তবতা। হয়ত সে দুর্দিন এখনো আমাদের আসে নি, তাই তা কাল্পনিক। তবে অবস্থাদৃষ্টে এমন পরিস্থিতি কখনো এসে যেতে পারে, হতেও পারে কোনো এক সময়ের বাস্তবতা। এখন বলি এতসব নাটকীয় প্রারম্ভিকতার কারণটুকু কী।

আজকে যখন ঢাকা শহরের সর্ববৃহৎ কাঁচাবাজারের আড়ৎ কারওয়ান বাজারে একদিনের জন্য কোনো কারণে কোনো একটি কৃষি পণ্যের সরবরাহ অপর্যাপ্ত হয়, তখন নিমিষেই সেই পণ্যের দাম সারা শহরের বাকি খুচরা বাজারগুলোতে কেজি প্রতি ৫-১০ টাকা বৃদ্ধি পেতে এক ঘন্টাও দেরি হয় না। সংকট হয়ত এতটা প্রকোপ আকার ধারণ করেনি এখনো, তাই দাম যতই বাড়ুক না কেন সরবরাহ আছে বলে সবাই যে যার সামর্থ্যের মধ্যে কিছু না কিছু হয়ত কিনে বাড়ি ফিরছি এখনো।

কিন্তু ব্যাপারটা কেমন হবে ভাবুন তো, যদি কোনো কৃষি পণ্যেরই সরবরাহ আর না হয় ঢাকা শহরে? সরবরাহ নাই কারণ হচ্ছে উৎপাদন নাই। কৃষক তার কৃষি কাজে ইস্তফা দিয়েছে রাগ করে। কারণ আর কিছুই না, কারণ হলো কৃষক তার উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাচ্ছে না। তাই রাগে, দুঃখে আর ক্ষোভে সে পণ করে ফেলেছে আজ থেকে আর কোনো কৃষি কাজ করবে না। ভাবুন তো একবার সেই অবস্থায় কিভাবে চলবে আমাদের অর্থনীতি। আরে! রাখেন আপনার অর্থনীতি। পেটই চলবে না আবার কী না অর্থনীতি।

হুম! হয়ত অনেকেই ভাবছেন, নো সমস্যা। মেলা ট্যাকা আছে আমার একাউন্ট ভর্তি কেবল টেকাই টেকা। দরকার হয় বিদেশ থিক্কা কিন্না আনমু খাবার। সমুচিত সিদ্ধান্ত। কিন্তু কদিন? তেল-গ্যাস আর স্বর্ণে গড়া যাদের অর্থনীতি, তারাও এসব বিক্রি করে সেই খাদ্য কেনে বেঁচে থাকার জন্য। আর আমরাও যদি শ্রম আর কষ্টে গড়া সেই ডলার বিক্রি করে যদি খাদ্যই আমদানি করে বাঁচি, তবে কিসের জোরে আমরা দেখি উন্নত হওয়ার স্বপ্ন! কৃষি মরবে, কৃষক মরবে তার ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়ে।

সিন্ডিকেটের হাতে থাকবে বাজার, যার কারিগর কৃষক। আর আপনি আমি স্বপ্ন দেখবো উন্নত বিশ্ব হওয়ার! এতই কি সহজ!! যেদেশের কৃষকরা তাদের শ্রমের জন্য সম্মানিত তো হয় না, যত্ন আর মমতায় ফলা ফসলের ন্যূনতম মূল্যটুকুও পায় না। সে দেশের উন্নতির স্বপ্ন নিছক রুপকথার গাল-গপ্প ছাড়া আর কিছুই না। উন্নয়নশীল বিশ্বের এমন অনেক দেশ আছে যারা কেবল মাত্র তাদের দেশের কৃষককে বাঁচিয়ে রাখার জন্য, তাদেরকে কৃষি পেশা থেকে বিমুখ না হওয়ার জন্য নানাবিদ প্রণোদনা দিয়ে থাকে।

দেশি কৃষক যেন কৃষি পেশাতে সম্মানের সাথে থাকতে পারে সেজন্য তারা আমদানি পণ্যের সস্থা মূল্য পাওয়া সত্যেও আমদানি করে না। বাজার ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ ও মধ্যসত্ত্বভোগীদের দৌরাত্ব্য কমানোর জন্য প্রান্তিক কৃষকের উৎপাদিত পণ্য সরাসরি বাজারে এনে বিক্রি করার ব্যবস্থা করে দেয় সরকার। কৃষককে তার উৎপাদন, শ্রম আর লভ্যাংশের প্রাপ্যটুকু বুঝিয়ে দিয়ে তবেই সে পণ্যের বাজার দর নির্ধারণ করে।

একটি দেশের সরকার তার জনগণের আশা ভরসার শেষ আশ্রয়স্থল। কেননা সব কিছুর নিয়ন্ত্রণের সর্বসম ও একচ্ছত্র ক্ষমতা কেবলমাত্র সরকার রাখে। তাই কৃষি ও কৃষক বান্ধব সরকার এবং সেই নির্দেশক অর্থনীতি পারে শুধুমাত্র কৃষকদেরকে তাদের প্রাপ্য অধিকারটুকু নিশ্চিত করতে। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না উপরোক্ত সেই দুটি কাল্পনিক বাস্তবতার কথা। যেখানে কৃষি ও কৃষকের অস্তিত্ব বিলীন মানেই হলো আমাদেরই অস্তিত্ব সংকট।

তাই আসুন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, উকিল মোক্তার, প্রশাসক যে যে পেশারই হই না কেন আমরা কৃষি, কৃষক আর কৃষি পেশাকে দেখি এক অনন্য উচ্চতায়। কেননা এদেশের কৃষি আর কৃষক বাঁচলেই কেবল বেঁচে থাকতে পারবো আমি, আপনি, আমরা সবাই। স্বপ্নে বোনা ফসলের ক্ষেতে, রাগ দুঃখ আর অভিমানে সেই স্বপ্ন নিজের হাতেই জ্বালিয়ে দিয়ে সে কৃষকের আর্তনাদ আমরা আর দেখতে চাই না। নচেৎ এই লজ্জা আমাদের সকলের, এই ব্যর্থতা এ জাতির প্রতিটি সন্তানের।

আর তাই সমকালীন প্রেক্ষাপটে ধানের মূল্য না পাওয়ায় মধ্য দিয়ে কৃষকের মাঝে যে দুরবস্থার সৃষ্টি হয়েছে, সরকার ও যথাযত কর্তৃপক্ষের সুষ্ঠু ও সময়োচিত পদক্ষেপের মাধ্যমে এই অচলাবস্থার আশু সমাধান হবে সেই প্রত্যয় ব্যক্ত করছি। কৃষক তার উৎপাদিত ধানসহ সকল পণ্যের ন্যায্য মূল্য পাবে তবেইতো হবে সোনার বাংলাদেশ।

লেখক : প্রভাষক, কৃষিতত্ত্ব বিভাগ, শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত