বেপরোয়া রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বাড়াতে হবে নজরদারি

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০৩:৩৩, মে ২২, ২০১৯

স্বদেশ থেকে বিতাড়িত ভাগ্যবিড়ম্বিত শরণার্থীরা পৃথিবীর সর্বত্রই এক প্রধান সমস্যা। মধ্যপ্রাচ্য বিশেষ করে ইরাক, সিরিয়া, লিবিয়া ও অন্যত্র গৃহযুদ্ধ এবং সংঘাত-সংঘর্ষ-হানাহানি ছড়িয়ে পড়লে লাখ লাখ শরণার্থী বাস্তুচ্যুত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

স্বীকার করতে হবে যে, এর একটা মানবিক ও মর্মস্পর্শী দিক থাকলেও দীর্ঘদিন বসবাসে যে কোনো দেশে শরণার্থীরা অভ্যন্তরীণ আইন-শৃঙ্খলাসহ নানা বিরূপ পরিবেশ ও সঙ্কট তৈরি করে।

এরই একপর্যায়ে সৃষ্টি হয়েছিলো কুখ্যাত আইএস, যা রীতিমতো জঙ্গি সন্ত্রাসী হামলার নামে আতঙ্ক তৈরি করে বিশ্বব্যাপী। আপাতত আইএস দমনের কথা বলা হলেও তারাও এখন ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে।

সর্বশেষ শ্রীলঙ্কায় একাধিক গির্জা ও হোটেলে সন্ত্রাসী হামলায় আইএস-এর জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। বাংলাদেশ-ভারতেও তারা ষড়যন্ত্রের জাল ছড়ানোর চেষ্টা করছে বলে খবর আছে।

টেকনাফ-কক্সবাজার উপকূলবর্তী বাংলাদেশে দীর্ঘদিন থেকে আশ্রিত রোহিঙ্গা শরণার্থীরাও নানা অপকর্মে জড়িয়ে পড়ছে বলে প্রমাণ মিলেছে। প্রথমত, রোহিঙ্গা শিবিরগুলো প্রাচীরবেষ্টিত ও সুরক্ষিত নয় বলে সীমিত পুলিশী নজরদারির সুবাদে তারা ছড়িয়ে পড়ছে দেশের সর্বত্র। শিশুচুরি, ইয়াবা পাচারসহ জড়িয়ে পড়ছে নানা অপরাধে।

বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে অথবা জাল করে পাড়ি জমাচ্ছে বিদেশে। সেখানেও জড়িয়ে পড়ছে নানা অপকর্মে। সর্বশেষ, অবৈধ সাগরপথে মালয়েশিয়ায় যাওয়ার চেষ্টায় টেকনাফ ও পেকুয়ায় নারী-শিশুসহ ৮৯ রোহিঙ্গা ধরা পড়েছে পুলিশের হাতে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে চলতে থাকলে রোহিঙ্গা বিশেষ করে তরুণদের জঙ্গি ও সন্ত্রাসী তৎপরতায় জড়িয়ে পড়ার প্রবল সম্ভাবনা। সে অবস্থায় রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনে আরও জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক সমপ্রদায়কে।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সর্বশেষ জাতিসংঘের সদর দফতরে মহাসচিব এ্যান্তোনিও গুতেরেসের উপস্থিতিতে শরণার্থী বিষয়ক বৈশ্বিক প্রভাব শীর্ষক উচ্চপর্যায়ের এক বৈঠকে যোগদান করেন।

সেখানে তিনি কয়েক বছর ধরে চলা রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা-সঙ্কট সমাধানে তিন দফা প্রস্তাব বা সুপারিশ উপস্থাপন করেন। উল্লেখ্য, ইতোপূর্বে বাংলাদেশ পাঁচ দফা প্রস্তাব উত্থাপন করেছিলো। প্রথমত, মিয়ানমারকে অবশ্যই বৈষম্যমূলক আইন ও নীতি বিলোপ এবং রোহিঙ্গাদের প্রতি নিষ্ঠুরতা বন্ধ করে সে দেশ থেকে বাস্তুচ্যুত করার প্রকৃত কারণ খুঁজে বের করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সব রোহিঙ্গাকে নাগরিকত্ব দেয়ার সঠিক উপায়, নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তৃতীয়ত, রোহিঙ্গাদের প্রতি নৈরাজ্য রোধে সংশ্লিষ্ট অপরাধীদের জবাবদিহি, বিশেষ করে জাতিসংঘের তথ্যানুসন্ধানী মিশনের সুপারিশের আলোকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করাতে হবে। আর তাহলেই কেবল সব রোহিঙ্গার নিরাপদে প্রত্যাবাসন ও পুনর্বাসন নিশ্চিত হবে মিয়ানমারে।

ইতোপূর্বে রোহিঙ্গাদের পূর্ণ নাগরিকত্ব প্রদান, আন্তর্জাতিক ত্রাণকর্মীদের মিয়ানমারে প্রবেশ ও কাজ করার সুযোগ সর্বোপরি রোহিঙ্গাদের সুরক্ষা প্রদান নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে সর্বসম্মত প্রস্তাব পাস হয়েছে জাতিসংঘে।

ব্যাপক মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ দমন-পীড়নের অভিযোগ এবং তাতে সমর্থন দেয়ার সুনির্দিষ্ট কারণে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী প্রধান এবং রাষ্ট্রীয় উপদেষ্টা শান্তিতে নোবেলপ্রাপ্ত অং সান সু চির বিরুদ্ধেও আনা হয়েছে নিন্দা প্রস্তাব।

অতঃপর যত দ্রুত তা বাস্তবায়িত এবং রোহিঙ্গারা সেদেশে পুনর্বাসিত হয় ততই মঙ্গল। এর পাশাপাশি বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে প্রয়োজনে কাঁটাতারের বেড়া দেয়াসহ নজরদারি বাড়াতে হবে।