শিরোনাম

তরুণদের উজ্জীবিত করার আগ্রহ তৈরি করতে হবে

প্রিন্ট সংস্করণ॥ রায়হান আহমেদ তপাদার  |  ০৩:৪৬, মে ১৬, ২০১৯

একটা দেশ কিংবা জাতির উন্নতির কথা চিন্তা করলেই প্রথমে ভাবতে হয় তরুণ প্রজন্মের কথা। কারণ এরাইতো দেশ ও জাতির কর্ণধার। কিন্তু আমাদের দেশের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করলে প্রথমেই যে জিনিসটা আসে সেটা হচ্ছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় কী কী বিষয় তরুণদের জন্য অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে, সেটা অবশ্যই খুব গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা এখনো অনেকটা পিছিয়ে আছে। এখনো এদেশের ছেলেমেয়েরা তাদের বিষয়ভিত্তিক পড়াশোনাকে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়ে থাকে। অন্যদিকে চাকরি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোও একইরকম বিষয় বিবেচনা করে। ব্যবসায় শিক্ষা পড়লে খালি ব্যবসা করতে অথবা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে চাকরি করতে হবে আর সামাজিক বিজ্ঞান পড়লে তা করা যাবে না-এরকম চিন্তাভাবনার আমূল পরিবর্তন দরকার।

চাকরির জন্য দ্বারে দ্বারে না ঘুরে নিজেই উদ্ভাবনী শক্তি দ্বারা নিজের এবং অনেক মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারবে। বিশ্বে বর্তমানে সাড়ে সাতশ কোটির বেশি মানুষের বসবাস। তার মধ্যে প্রায় অর্ধেক জনসংখ্যাই তরুণ, যাদের বয়স পঁচিশ বছরের নিচে। এই পরিসংখ্যান থেকেই বোঝা যায়, ভবিষ্যতের পৃথিবী কাদের হাতে।

চীনদেশের বিখ্যাত ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা প্রধান জ্যাকমা কিছুদিন আগে কানাডাতে এক বক্তৃতায় বলেছেন, তরুণদের ওপর বিশ্বাস রাখা মানে ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস রাখা। তরুণরাই ভবিষ্যত বিনির্মাণের অগ্রপথিক। আজকের তরুণ সমাজ বিজ্ঞানের অনেক যুগান্তকারী আবিষ্কারের সুফল পাচ্ছে। বৈশ্বিক ব্যবসা বাণিজ্যের প্রভাবের কারণে ঘরে বসেই এখন সহজেই সবকিছু হাতের নাগালে পাচ্ছে।

একদিকে তারা যেমন এই পৃথিবী থেকে অনেক আধুনিক যুগের সুবিধা নিচ্ছে তেমনি তাদেরও দেয়ার মতো অনেক দায়বদ্ধতা আছে। বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার একটা বড় অংশ বয়সে তরুণ। সারা দেশে তারুণ্যের প্রভাব সহজেই চোখে পড়ে। রাজনীতি থেকে সমাজ পরিবর্তনে তরুণদের অংশগ্রহণ দিনের পর দিন বেড়েই চলেছে।

কিন্তু সুন্দর ভবিষ্যৎ তৈরি করার ক্ষেত্রে আমাদের দেশের তরুণ সমাজ আসলে কতটা প্রস্তুত? আমরা কি তাদের প্রস্তুত করার জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করতে পেরেছি? কী হওয়া উচিত আমাদের ভবিষ্যৎ দিক-নির্দেশনা? এসব প্রশ্নের উত্তর পেলে হয়তো কিছুটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা যাবে। শিক্ষা যেমন একটি বিনিয়োগ, তেমনি প্রযুক্তিকেন্দ্রিক উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়টি বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। আমাদের প্রচলিত ধারণা থেকে অনেক সময় আমরা বলে থাকি, উদ্যোক্তা হতে গেলে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয়। তখন তরুণরা উদ্যোক্তা হওয়ার যে স্বপ্ন দেখছিলো তা আর থাকে না। কিন্তু যেটা আমরা ভাবি সেটা কোনোভাবেই সঠিক নয়। যে প্রযুক্তিগুলো একসময় আমরা খুব জটিল ভাবতাম, সেগুলো বিদেশ থেকে এনে আমাদের দেশে ব্যবহার করতে গেলে অনেক অর্থ ব্যয় হবে বলে মনে করতাম। কিন্তু এখন ইউটিউব ও ইউডেমিতে অনেক জটিল প্রযুক্তি কীভাবে সহজ করে ব্যবহার করা যায় তার অনেক ভিডিও থাকে।

যেখান থেকে অক্সফোর্ড ও ক্যামব্রিজের তরুণদের মতো বাস্তব ধারণা নিয়ে আমাদের তরুণরা শিল্পোদ্যোক্তা হওয়ার বিষয়টিকে এগিয়ে নিতে পারে। যে তরুণরা পড়াশোনা করেছে, আমাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তাদের উদ্যোক্তা করার মতো কোনো বিষয় আমরা যুক্ত করতে পারিনি। এছাড়া আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সেভাবে গড়ে তোলা হয়নি, যেখানে পড়াশোনা করা অবস্থায় একজন তরুণ উদ্যোক্তায় পরিণত হবে।

উল্লেখ্য, অনেক উন্নত দেশের শিক্ষা পদ্ধতি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি তরুণরা পেশাদার গবেষক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে পারে। ফলে শিক্ষাজীবনের মধ্যে থাকা অবস্থায় শিক্ষার্থীরা নতুন নতুন আইডিয়া প্রয়োগের মাধ্যমে উদ্যোক্তা হিসেবে বের হয়ে আসে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় এ প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোক্তা তৈরির কৌশলটি গুরুত্বসহকারে ভাবা যেতে পারে। আমাদের তরুণরা ২৫ থেকে ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে স্বল্প পরিসরে এ মেটেরিয়াল তৈরি করতে পারে। আমাদের দেশে যেমন এর চাহিদা রয়েছে, বিদেশেও এর চাহিদা রয়েছে।

আবার ছাঁচ তৈরি করে এ ধরনের মেটেরিয়াল দিয়ে অনেক দামি পণ্য ও প্রযুক্তি সহজেই তৈরি করা সম্ভব। এ মেটেরিয়ালের সুবিধা হল এটি হালকা কিন্তু অনেক বেশি শক্তিশালী ও গুণগত মানসম্পন্ন। আমরা বিদেশ থেকে অনেক অর্থ খরচ করে দেশে বিভিন্ন লুব্রিক্যান্ট নিয়ে আসি। কিন্তু আমাদের দেশের তরুণরা মাত্র ত্রিশ হাজার টাকা খরচ করে লুব্রিক্যান্ট বানানোর প্রযুক্তি দেশেই তৈরি করতে পারে। এ প্রযুক্তি ব্যবহার করে তরুণরা পরিবেশবান্ধব বায়ো লুব্রিক্যান্ট তৈরি করে নিজেরাই উদ্যোক্তা হয়ে যেতে পারে। জ্যাক মা নামটি আমরা হয়তো সবাই জানি। কিন্তু তার ব্যর্থতা থেকে সফল হয়ে ওঠার গল্প আমরা ক’জনই বা জানি।

উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, ছোটখাটো গড়নের চীনা মানুষটি এখন প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলার মূল্যমানের কোম্পানি আলিবাবার প্রতিষ্ঠাতা। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান গড়তে খুব বেশি অর্থের প্রয়োজন নেই। এ ধরনের আরেকটি বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান হচ্ছে জেফ বেজসের অ্যামাজন। একজন তরুণ ঘরে বসেই এ ধরনের অনলাইন শপিং খুলে বসে কোনো বিনিয়োগ ছাড়াই প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারে।

এর সঙ্গে আউটসোর্সিংয়ের মতো কাজ করেও তরুণরা তাদের জীবন বদলে ফেলতে পারে। আশার কথা হচ্ছে, আমাদের তরুণরাও এখন এ ধরনের কাজে অনুপ্রাণিত হচ্ছে। ব্লু ইকোনমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে পারলে আগামী এক দশকে দেশের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশে উন্নীত করা সম্ভব হবে বলে মনে করছেন এ খাতের বিশেষজ্ঞরা। প্রতিবেশী রাষ্ট্র মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ মীমাংসার পর তারা দেশের সমুদ্র ও সামুদ্রিক সম্পদনির্ভর ‘ব্লু ইকোনমি’ খাতে এ বিপুল সম্ভাবনা দেখছেন।

সরকার এ খাতে এখন থেকেই তরুণদের যুক্ত করে তাদের কর্মসংস্থানের মাধ্যমে সুযোগ সৃষ্টি করতে পারে। দেশে বর্তমানে বিশেষ শিল্পাঞ্চল ও আইটি পার্ক গঠনের মাধ্যমে তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এটুআইয়ের মাধ্যমে উদ্ভাবনমুখী তরুণদের খোঁজ করা হচ্ছে। সবচেয়ে ভালো হয় যদি তরুণদের এ আইডিয়াগুলোকে বাণিজ্যিক রূপ দিয়ে সেখানে তাদের ও অন্য তরুণদের কাজের ক্ষেত্র তৈরি করা যায়। আশাবাদী তরুণদের একটা কথা জানাতে আমরা ভুলে যাই। অনেক দেশে আমাদের তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদ হিসেবে পাঠাতে পরিনি।

যে তরুণ জনগোষ্ঠীকে দক্ষ করে বিদেশে পাঠানো হবে, তাদের যাতায়াতের খরচ বহন করার জন্য সরকারকে বাজেট রাখতে হবে। কারণ আমরা দেখি, যে তরুণদের আমরা বিদেশে পাঠাচ্ছি, জীবনের শেষ সম্বল বাড়ি-ভিটা বিক্রি করে তাদের বিদেশ যাওয়ার টাকা সংগ্রহ করতে হয়। অনেকে ভাবতে পারেন তরুণদের এ দায় দেশ ও সরকার নেবে কেন? এর কারণ হল বিদেশে যে তরুণদের আমরা কাজের জন্য পাঠাচ্ছি তাদের বিনিয়োগ হিসেবে ভাবতে হবে। যদি তাদের আমরা বিনিয়োগ হিসেবে ভাবতে পারি তবে দেশের প্রতি তাদের আনুগত্য ও আস্থা বাড়বে।

এর সঙ্গে রেমিটেন্সের মাধ্যমে দেশের আয় বাড়বে। এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়-এ মন্ত্রে তরুণদের উজ্জীবিত করে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। তবেই দেশ এগিয়ে যাবে। প্রবৃদ্ধি বাড়ছে, মানুষের ক্রয়ক্ষমতাও বাড়ছে। কিন্তু তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব যে বাড়ছে, তা কীভাবে দূর করা যায় সেটা নিয়ে কি আমরা খুব বেশি ভাবছি? দেখা গেছে দুই হাজার ষোলো থেকে দুই হাজার সতেরো অর্থবছরের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, আমাদের দেশে ১৫ বছরের বেশি কর্মক্ষম মানুষের সংখ্যা ১০ কোটি ৯১ লাখ।

এর মধ্যে ২৬ লাখ ৮০ হাজার শিক্ষিত তরুণ বেকার, যা দুই হাজার পনেরো থেকে দুই হাজার ষোলো অর্থবছরের তুলনায় বেশি। তবে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এ সংক্রান্ত তার প্রতিবেদনে শিক্ষিত অর্ধশিক্ষিত ও অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীকে বিবেচনায় এনে বলছে, ১০ কোটি ৯১ লাখ কর্মক্ষম মানুষের মধ্যে ৬ কোটি ৮ লাখ মানুষ কর্মে নিয়োজিত। কিন্তু এখনও পর্যন্ত ৪ কোটি ৮২ লাখ ৮০ হাজার মানুষ শ্রমশক্তির বাইরে থেকে গেছে। যদি বেকারত্বকে আমরা একটি সমস্যা হিসেবে ভেবে বসে থাকি, তবে আশাবাদী তরুণরা ধীরে ধীরে নৈরাশ্যবাদী হয়ে যেতে পারে।

পরিশেষে বলতে চাই, দেশ থাকলে, মানুষ থাকলে সমস্যা থাকবেই। তবে এটিকে কীভাবে কমিয়ে এনে তরুণদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা যায়, সেই উদ্যোগকে আমাদের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। আমরা কর্মমুখী তরুণ চাই, আশাবাদী তরুণ প্রজন্ম গড়ে তুলতে চাই, যাদের ইতিবাচক চিন্তাভাবনা আমাদের দেশকে যেমন বদলে দেবে, তেমনি আমাদের অর্থনীতিকে গতিশীল করবে।

বেকারত্ব দূর করার হয়তো অনেক ধরনের বিকল্প থাকতে পারে, সেই বিকল্পগুলো নিয়ে যেমন নিবিড়ভাবে কাজ করতে হবে, তেমনি তরুণদের নতুন চাকরির ক্ষেত্র তৈরি করতে হবে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের কাজগুলোও অনেক জটিল হয়ে যাচ্ছে। সেজন্য প্রতিটি কাজে সৃষ্টিশীলতার পরিচয় দিতে হবে। ভবিষ্যতে আমাদের জটিল সমস্যা সমাধানের জন্য সরল উদ্ভাবন অনেক কাজে আসবে। এজন্য তরুণদের এখনই প্রস্তুত করতে হবে। ভবিষ্যতে চাকরি পাওয়ার ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতা হবে অনেক তীব্র। সঠিক মেধা যাচাই বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নতুন নতুন বিষয়কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দেয়া হবে।

এখন হয়ত চাকরির সাক্ষাৎকারে সাধারণ প্রশ্ন করা হয়, কিন্তু নিকট ভবিষ্যতে জটিল সমস্যা সমাধান, সামাজিক সমস্যা নিয়ে কাজ করার অভিজ্ঞতা, উদ্যোক্তা হিসেবে কাজ করার দক্ষতা ইত্যাদি বিষয়গুলো বিবেচনা করেই কর্মী নিয়োগ দেয়া হবে। আজকের তরুণরা অনেক সচেতন, চটপটে এবং জটিল সমস্যা সহজেই সমাধান করার যোগ্যতা রাখে। তবে তাদেরকে আরো প্রাণবন্ত, সৃজনশীল করতে হলে বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা প্রদান করতে হবে।

লেখক : কলামিস্ট

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত