শিরোনাম
সৌরবিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা

দেশেই নবায়নযোগ্য বিদ্যুতের বিকাশ ঘটুক

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০৩:৪৬, মে ০৯, ২০১৯

সবচেয়ে ও বেশি সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনকারী দেশ বাংলাদেশ। বাংলাদেশের নবায়ণযোগ্য জ্বালানির উল্লেখযোগ্য অংশই আসে সৌরশক্তি থেকে। এতে দেশের প্রায় সোয়া কোটি মানুষ উপকৃত হচ্ছে। প্রত্যন্ত অঞ্চলে দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক নিরাপত্তার পাশাপাশি শিক্ষা ক্ষেত্রেও অবদান রাখছে এ সৌরশক্তি। এর বিস্তারে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে বেসরকারি খাত। বাংলাদেশে বছরে গড়ে প্রায় ৩০০ দিন পর্যাপ্ত সূর্যালোক থাকে।

সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ কিলোওয়াট ঘণ্টা সৌরশক্তি এ দেশের প্রতি বর্গমিটার জমিতে আলো দেয়। এর ১ শতাংশ শক্তিতে রূপান্তর করা গেলে বাংলাদেশের বিদ্যুতের সিংহভাগ চাহিদা পূরণ সম্ভব। তাই সৌরবিদ্যুতে প্রণোদনা এখন সময়ের দাবি। সোলার প্যানেল বসানোর সরঞ্জাম ও স্থাপনা ব্যয় এখনো সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। এ খাতে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের জন্যও বিজ্ঞানীদের উৎসাহী করে তোলা চাই। কিন্তু সরকার সৌরবিদ্যুতের বড় প্রকল্প হাতে নেয়ার চেয়ে আমদানির ওপর জোর দিচ্ছে বেশি।

সংশ্লিষ্ট এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ খাতে নবায়ণযোগ্য জ্বালানির ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ানোর লক্ষ্য পূরণে ভারত থেকে সৌরবিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা করছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এরইমধ্যে গত বছর ভারত সফরকালে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি বিষয়ক উপদেষ্টা গুজরাট আর রাজস্থান থেকে সৌরবিদ্যুৎ আমদানির পরিকল্পনা ঘোষণা করে এসেছেন। এমন চুক্তিতে ভারত থেকে বিদ্যুৎ হয়তো পাওয়া যাবে, কিন্তু সৌরবিদ্যুৎ ঘিরে নিজস্ব উদ্ভাবন, গবেষণার প্রসার আর শিল্পোন্নয়নের যে সুযোগ সৃষ্টি হওয়ার কথা, তা স্তিমিত হয়ে পড়বে। নবায়ণযোগ্য সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে সরকারের পরিকল্পনা ধীরগতিতে বাস্তবায়ন হচ্ছে।

মূলত অধিকাংশ প্রকল্প পরিকল্পনা পর্যায়েই আটকে আছে। বাংলাদেশে নবায়ণযোগ্য জ্বালানি নীতিমালা ঘোষিত হয় ২০০৮ সালে। ওই নীতিমালা অনুসারে ২০১৫ সালের মধ্যেই মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৫ শতাংশ নবায়ণযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে এসেও ঘোষিত লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেকও অর্জন করা যায়নি।

কাজেই চলতে থাকা অচলাবস্থার পরিবর্তন না ঘটলে মনোযোগের বাইরে থাকা এ বিদ্যুৎ উৎপাদন খাত থেকে ভবিষ্যৎ লক্ষ্যমাত্রাও যে অর্জন হবে না, তা বলে দেয়াই যায়। বাংলাদেশের পাওয়ার সেক্টর মাস্টার প্ল্যান (পিএসএমপি-২০১৬) অনুসারে ২০৪১ সালের মধ্যে নবায়ণযোগ্য জ্বালানি ও আমদানি করা বিদ্যুৎ মিলিয়ে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা মোট উৎপাদনের মাত্র ১৫ শতাংশ।

এ লক্ষ্য অর্জনেই সরকার বিদ্যুৎ আমদানিতে ঝুঁকছে। বিপরীতে কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা যথাক্রমে ৩৫ ও ১০ শতাংশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক দলের প্রকাশিত গবেষণা প্রবন্ধ থেকে জানা যায়, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদা নবায়ণযোগ্য জ্বালানি থেকেই মেটানো সম্ভব।

কিন্তু এই সুলভ বিদ্যুৎ উৎপাদন নিশ্চিত করতে প্রয়োজন সর্বব্যাপী উদ্যোগ আর রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ। কিন্তু সরকার পরিবেশ সুরক্ষামূলক প্রকল্প গ্রহণের চেয়ে অপেক্ষাকৃত ক্ষতিকর কয়লা ও পারমাণবিক বিদ্যুৎ প্রকল্প গ্রহণে বেশি আগ্রহী। বিশ্ব যেখানে এসব ক্ষতিকর পরিবেশ বিধ্বংসী প্রকল্প থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিচ্ছে, সেখানে আমাদের এ পথে পা বাড়ানো যৌক্তিক হবে কিনা, তা বিবেচনার দাবি রাখে।

সৌর, বায়ু ও বর্জ্য দিয়ে দূষিত কয়লানির্ভর বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নতুন করে ঢেলে সাজানোর কাজটি ভারতে এখন বেশ জোরেশোরেই এগোচ্ছে। প্রতি ইউনিট সৌর ও বায়ুবিদ্যুৎ ভারতে এখন সাড়ে ৩ টাকারও কম খরচে উৎপাদন হচ্ছে। তেল ও কয়লার দ্বিগুণেরও বেশি ক্ষমতার সৌর, বায়ু ও বর্জ্যভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সেখানে চালু হয়েছে গত দুই বছরে। ভারত যখন ২০২৭ সালের মধ্যেই ৫৭ শতাংশ বিদ্যুৎ নবায়ণযোগ্য জ্বালানি থেকে উৎপাদন করার বিশাল কর্মযজ্ঞ শুরু করেছে, তখন তার উৎপাদনক্ষমতা থেকে বাংলাদেশকে বিদ্যুৎ দিতে সমস্যা হওয়ার কথা নয়।

প্রশ্ন হলো নিজস্ব সক্ষমতা ও দক্ষতা বৃদ্ধির। এখন পর্যন্ত দেশে যে পরিমাণ সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে, তার সব যন্ত্রাংশই আমদানি করা হয়। তবে দেশীয়ভাবে তৈরি ব্যাটারি এ কাজে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু ব্যাটারির দামও অনেক বেশি হওয়ায় সৌরবিদ্যুতের দাম সেভাবে কমছে না। সরকার সোলার প্যানেল থেকে সব ধরনের শুল্ক প্রত্যাহার করে নিয়েছে।

ফলে সোলার প্যানেলের দাম কিছুটা কমলেও সার্বিক বিদ্যুৎ উৎপাদন খরচে বড় ধরনের কোনো পরিবর্তন হয়নি। কিন্তু নিজ দেশে সস্তা বিদ্যুৎ উৎপাদনের পথে না হেঁটে হাজার কিলোমিটার দূর থেকে সঞ্চালন লাইন টেনে বিদ্যুৎ নিয়ে আসা কতটা টেকসই সমাধান, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়। সোলার প্যানেল আমদানির বিকল্প হিসেবে স্থানীয় বাজারে এর আনুষঙ্গিক যন্ত্রপাতি তৈরির মাধ্যমেই উৎপাদন খরচ কমানো সম্ভব। এজন্য চাই রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। প্রয়োজনে ভর্তুকি দিতে হবে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত