শিরোনাম

চাই সুপেয় পানি- দূর হোক পরিবেশ দূষণ

প্রিন্ট সংস্করণ॥আখতার-উজ-জামান  |  ০৫:৫৬, এপ্রিল ১২, ২০১৯

সুজলা, সুফলা, শস্য শ্যামলা আমাদের এই বাংলাদেশ। আর এ দেশে পানযোগ্য পানির প্রধান উৎস নদী-খাল- বিল, হাওর- বাঁওড়, পুকুর ও জলাশয়। এক সময় আমাদের দেশে ১ হাজারের বেশি নদী থাকলেও সেগুলোর বেশিরভাগই এখন মরে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের সর্বশেষ হিসাবে বর্তমানে দেশে নদীর সংখ্যা ৩১০ এ নেমে এসেছে। পানির ওপর নাম জীবন। কথাটি চিরাচরিত হলেও সুপেয় পানি না হলে তৃষ্ণা নিবারণ পুরোপুরি মেটায় না। অথচ সুপেয় পানির জন্য এক সময় আমাদের দেশের নদী- নালা আর খাল- বিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে ব্যবহার হতো। ১৯৯৩ সালে রাষ্ট্রসংঘের সাধারণ সভায় ২২ মার্চ তারিখটিকে বিশ্ব জল দিবস বা বিশ্ব পানি দিবস (World Day for Water or World Water Day) হিসেবে ঘোষণা করে। এ বছর ২০১৯ দিবসটির প্রতিপাদ্য ছিলো ‘পানি সবার অধিকার- বাদ যাবেনা কেউ আর’। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বাংলাদেশ ২২ মার্চ দিবসটি পালন করতে না পারায় ১১ এপ্রিল বিশ্ব পানি দিবস পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। এ কারণে গতকাল ১১ এপ্রিল বৃহস্পতিবার দেশব্যাপী দিবসটি পালিত হয়। ১৯৯২ সালে ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরোতে জাতিসংঘ পরিবেশ ও উন্নয়ন সম্মেলনের -ইউএনসিইডি এজেন্ডা ২১-এ প্রথম বিশ্ব জল দিবস পালনের আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবটি উত্থাপিত হয়। ১৯৯৩ সালে প্রথম বিশ্ব জল দিবস পালিত হয় এবং তার পর থেকে এই দিবস পালনের গুরুত্ব ক্রমশ বৃদ্ধি পেতে থাকে। রাষ্ট্রসংঘের সদস্য দেশগুলো এই দিনটিকে নিজ নিজ রাষ্ট্রসীমার মধ্যে রাষ্ট্রসংঘের জলসম্পদ সংক্রান্ত সুপারিশ ও উন্নয়ন প্রস্তাবগুলোর প্রতি মনোনিবেশের দিন হিসেবে উৎসর্গ করেন। প্রতি বছর বিশ্ব জল দিবস উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রসংঘের বিভিন্ন সংস্থার যে কোনো একটি বিশেষ কর্মসূচি পালন করে থাকে। ২০০৩ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে রাষ্ট্রসংঘ- বিশ্ব জল দিবসের থিম, বার্তা ও প্রধান সংস্থা নির্বাচনের দায়িত্বে রয়েছে। রাষ্ট্রসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলোর পাশা-পাশি বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও পরিচ্ছন্ন জল ও জলসম্পদ রক্ষা সম্পর্কে জনসচেতনা গড়ে তোলার জন্য এই দিন বিশেষ কর্মসূচির আয়োজন করে। ২০০৩, ২০০৬ ও ২০০৯ সালে রাষ্ট্রসংঘ বিশ্ব জল উন্নয়ন প্রতিবেদন বিশ্ব জল দিবসেই প্রকাশ করা হয়েছে। ২০১৫ সালের পানি দিবসের প্রতিপাদ্য ছিলো- পানির সহজ প্রাপ্তি, টেকসই উন্নয়নের ভিত্তি, পানি ও টেকসই উন্নয়ন এই প্রতিপাদ্যকে ধারণ করে বিশ্ব পানি দিবস পালিত হয়। আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে সারা বিশ্বে বিশুদ্ধ পানি, স্যানিটেশন, নিরাপদ খাদ্য এবং স্বাস্থ্যবিধি নিশ্চিত করতে জাতিসংঘ কাজ করছে এবং এই কাজ করতে অন্যদেরও উৎসাহিত করা হচ্ছে। বাংলাদেশে পানি ও শক্তির প্রতিপাদ্য বাস্তবায়নে কতটুকু সফল হবে এ নিয়ে শঙ্কায় রয়েছে পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা। পানি সম্পদের পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও যথাযথ নিরাপদ পানি সরবরাহ ব্যবস্থা দারিদ্র্য বিমোচন, অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও পরিবেশগত স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণের অন্যতম নিয়ামক। প্রকৃতি, কৃষি, শিল্প, খাদ্য, বিদ্যুৎ, স্বাস্থ্য, নগরায়ণ ও নারীর সমতায়নে পানি অপরিহার্য। অপরিকল্পিত নগরায়ণের ফলে ঢাকা শহরের অনেক অঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ৭০ মিটার নেমে গেছে। শিল্প কারখানা একদিকে বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার করছে, অন্যদিকে অপরিশোধিতভাবে শিল্প বর্জ্য ফেলে ভয়াবহ পরিবেশ দূষণ ঘটাচ্ছে। একটি জরিপে দেখা যায় যে, গত দশকে পানির ক্ষেত্রে কিছু অগ্রগতি হওয়ার সত্ত্বেও বিশ্বে ৭৪ কোটি ৮০ লাখ মানুষ বিশুদ্ধ পানি থেকে বঞ্চিত। ২৪৮ কোটি মানুষ সঠিক পয়ঃনিস্কাশন ব্যবস্থার আওতায় নেই বললেই চলে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পরামর্শ, বেশির ভাগ পরিস্থিতিতে বেশিরভাগ লোকের দৈনিক চাহিদা মেটানোর জন্য প্রয়োজন ৭ দশমিক ৫ লিটার পানি। মৌলিক চাহিদা ও ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য চাহিদা ও বিশুদ্ধ খাদ্য পানীয়ের জন্য প্রতিজনে ২০ লিটারের মতো পানি প্রয়োজন হতে পারে। পৃথিবীর শতকরা ৭১% পানি হিসেবে থাকলেও এর মাত্র ৩% খাবার যোগ্য যার বিরাট অংশই এন্টার্কটিকা ও গ্রিনল্যান্ডে বরফ হিসেবে জমা আছে অথবা মাটির নিচে। হিসেব করলে দেখা যায় যে, পৃথিবীর মোট পানির মাত্র ০.০১ শতাংশ মানুষের ব্যবহারোপযোগী। তাও আবার পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের নাগালের বাইরে। আধুনিক বিশ্বে যখন বিজ্ঞানের জয় জয়কার সেখানে প্রায় ১৫০ কোটিরও বেশী মানুষের জন্য নাই নিরপদ পানির ব্যবস্থা, আর প্রতি বছর শুধু পানি বাহিত রোগে ভুগে মারা যাচ্ছে প্রায় সাড়ে তিন কোটি মানুষ। পানি আমাদের ন্যায্য অধিকার। সকলের জন্য পানি নিশ্চিত করা সরকারের দায়িত্ব। পানি সঙ্কট মোকাবিলা ও পানির যোগান নিশ্চিত করতে সকল প্রকার পানির উৎস নদী- নালা, খাল- বিল, পুকুর ও জলাশয়ের দূষণ প্রতিরোধ ও ভরাট বন্ধের উদ্যোগ গ্রহণ প্রয়োজন। ভরাট ও দূষণের কারণে ভূ-উপরিস্থ পানি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। নির্ভরতা বেড়েছে ভূ-গর্ভস্থ পানির ওপর। বর্তমানে দেশের ৯৮ ভাগ খাবার ও শুকনো মৌসুমে সেচ কাজে ৮০ ভাগ পানি ভূ-গর্ভস্থ থেকে সরবরাহ করা হয়। অনিয়ন্ত্রিত ভূ-গর্ভস্থ পানি উত্তোলন প্রকৃতি দূর্যোগ বয়ে আনবে। পানির উৎসসমূহ সংরক্ষণ ও পরিকল্পনার মাধ্যমে সেগুলোর যথাযথ ব্যবহারই ভূ-গর্ভস্থ পানি ব্যবহার হ্রাস করতে পারে। আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের পানি প্রাপ্যতা নিশ্চিত করতে এর উৎসগুলো ভরাট ও দূষণমুক্ত করে সংরক্ষণ করা অত্যান্ত জরুরি। জারে ভর্তি মিনারেল ওয়াটারের নামে খাওয়ানো হচ্ছে দূষিত পানি। রাজধানী ঢাকা ও তার আশ-পাশে বৈধ ও অবৈধভাবে গড়ে ওঠা প্রায় তিনশত কারখানায়ই উৎপাদন হচ্ছে দূষিত খাবার পানি। দু-একটি বাদে অধিকাংশ মিনারেল ওয়াটারের কারখানা স্থাপন করা হয়েছে অপরিচ্ছন্ন স্থানে। রাজধানীর অনেক এলাকাতেই বর্তমানে পানির সংকট চলছে। অনেক এলাকায় পানি পাওয়া গেলেও তাদে দূর্গন্ধ ও ময়লা। সরাসরি ওয়াসার সাপ্লাই পানি পান করলে পেটের পীড়াসহ নানা অসুখ-বিসুখে ভুগতে হয়। আর এসবক কারণেই সামর্থ্যবান মানুষ এখন বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য বেসরকারি খাতের মিনারেল ওয়াটারের ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবীর সকল প্রাণেরই উৎস পানি এবং সকলেই পানির ওপর নির্ভরশীল। পৃথিবীর ৭০০ কোটি মানুষ কোটি মানুষ আজ খাদ্য ও জ্বালানির মতো মৌলিক বিষয়ের পাশাপাশি যে বিরাট চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তা হচ্ছে সবার জন্য বিশুদ্ধ ও পর্যাপ্ত নিরাপদ খাবার পানি। আর যেসব অঞ্চলে পানি স্বল্পতা সেসব অঞ্চলে সৃষ্টি হচ্ছে পানি যুদ্ধের সম্ভাবনা। যেমন লেবানন- ইসরায়েল এর মধ্যে হাসবানি নদীর পানি নিয়ে বিরোধ, তেমনি তুরস্ক- সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যে ইউফেটিস নিয়ে, সিরিয়া ও ইসরায়েলের মধ্যে গ্যালিলি সাগর নিয়ে। ইসরায়েল- ফিলিস্তান ও জর্দানের মধ্যে জর্দান নদী নিয়ে সুদান, মিশর, ইথিওপিয়া ও আরো কিছু দেশের মধ্যে নীলনদ নিয়ে, সেনেগাল ও মৌরিতানিয়ার মধ্যে সেনেগাল নদী নিয়ে, ইরান ও আফগানিস্তানের মধ্যে হেলম্যান্ড নদী নিয়ে আর বাংলাদেশ- ভারতের মধ্যে বিবাদতো আছেই। তাই পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে আমাদের নুতন করে ভাবতে হবে। আমাদেরকে অবশ্যই পানির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও গবেষক
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত