শিরোনাম

ভুয়া সংবাদ পরিবেশন প্রতিহত করতে হবে কর্তৃপক্ষকে

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০৫:১২, এপ্রিল ১১, ২০১৯

সত্য কথনকে আড়ালে আবডালে রেখে যদি অসত্য ভাষণকে তুলে ধরা হয়, তবে তাতে বাস্তবতা হয় বিবর্জিত। আর সমাজ জীবনে নিয়েও আসতে পারে অশান্তির অপছায়া। গণমাধ্যমে যদি অসত্য ভাষ্য পায় প্রচার, তবে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া ঘটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। বাস্তব অবস্থাকে বিকৃত করা কিংবা বানোয়াট তথ্য উত্থাপন করে সত্যকে ধামাচাপা দেয়ার প্রবণতা নতুন নয়। বরং এর প্রচার ও প্রসার ক্রমশ বেড়ে যাচ্ছে। ভুয়া খবর প্রচার সমাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। ভুয়া খবর আর ঘৃণামূলক বক্তব্য স্বাভাবিকতাকে বিনষ্ট করে। ভুয়া খবর প্রচারের মাসুল দেশবাসীকে দিতে হয়েছে। ১৯৯০ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত স্বাধীনতা ও মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধে জড়িতদের সম্পাদনা ও মালিকানায় প্রকাশিত সামপ্রদায়িক ধারার দৈনিক পত্রিকায় ভারতের বাবরী মসজিদ ভাঙার ঘটনাকে কেন্দ্র করে অসত্য সংবাদ প্রতিবেদন ছাপা হয়। আর এই বানোয়াট খবরের তোড়ে সারাদেশে হিন্দু সমপ্রদায়ের ওপর ব্যাপক হামলা চালানো হয়। ধর্ষণ, অগ্নিকাণ্ড, লুটপাটের ঘটনাও ঘটে। সমাজকে অস্থিতিশীল করার জন্য ওই সব ভুয়া সংবাদ ছাপার মধ্য দিয়ে এক ধরনের জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়েছিলো। দেশে যখন যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছিলো, সেই বিচার প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য দেশে ও বিদেশে অনেক ভুয়া খবর ছড়ানো হয়েছিলো, ভুয়া খবর দেশে নতুন কোনো ধারণা নয়। ভুয়া খবর সমাজে সামপ্রদায়িক ও রাজনৈতিক সহিংসতা ছড়িয়ে দিতে পারে। খবর ও ভুয়া খবর অনেকটা সত্য ও অসত্যের মতোই সমান্তরালভাবে যুগ যুগ ধরে প্রচারিত ও প্রকাশিত হয়ে আসছে। মহান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী প্রচুর ভুয়া খবর পরিবেশন করত। বাঙালি যোদ্ধাদের মনোবল সুদৃঢ় ছিলো বলেই সেসব ভুয়া খবর কোনো রেখাপাত করতে পারেনি। পাকিস্তানিরা ঘৃণার বিষবাষ্প ছড়াতে চেয়েছিলো ভুয়া খবরের মাধ্যমে। কিন্তু বাঙালি সে সব ঘৃণ্য কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়তে পেরেছিলো সাহসের সঙ্গেই। আর স্বাধীন বাংলাদেশে কতিপয় সংবাদপত্র মিথ্যাচারে মেতেছিলো। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ গড়ার কাজে যাতে বাঙালি আত্মনিয়োগ করতে না পারে, সেজন্য নানা ভুয়া খবর পরিবেশন করা হতো। স্বাধীনতাবিরোধী গোষ্ঠীর অপপ্রচারের মাত্রা ছিলো তীব্র। মহান মুক্তিযুদ্ধ, বীর মুক্তিযোদ্ধাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার জন্য নানাবিধ গুজব, অসত্য তথ্য প্রকাশ করে আসছিলো। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর ঘাতক দল ও তাদের দোসরদের মিথ্যাচার আর ভুয়া বনোয়াট তথ্য দেশব্যাপী ছড়িয়ে দেয়া হয়েছিলো। মিথ্যাচারকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য সেসব ভুয়া খবর জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করেছিলো। ভুয়া খবর চর্চার নানাবিধ উদ্দেশ্য অবশ্যই রয়েছে। এর মধ্যে প্রধানত রয়েছে সামপ্রদায়িক গুজব ছড়ানো, উগ্র রাজনৈতিক ও ধর্মীয় মিথ্যাচার প্রচার, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করা, জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করা, অবৈজ্ঞানিক জল্পনা কল্পনার প্রচার। ফেসবুক, টুইটার, ইউটিউব প্রভৃতি সাংবাদিকতা বহির্ভূত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমকে ভুয়া খবর প্রচারের বড় প্ল্যাটফরমে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব প্ল্যাটফর্ম থেকে মিথ্যা ও ভিত্তিহীন তথ্য অতি দ্রুতগতিতে সংবাদ মাধ্যমগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে। ভুয়া সংবাদ ক্ষতিকর আধেয় এবং ভুল তথ্য সামাল দিতে ফেসবুক এবং বড় প্রযুক্তির প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক কোনো নীতিমালা নেই। এটা বাস্তব যে, সরকারের একার পক্ষে ভুয়া সংবাদ এবং ঘৃণামূলক বক্তব্য ঠেকানো সম্ভব নয়। ভুয়া খবর প্রচার ও প্রকাশ বন্ধে সরকারের পাশাপাশি মূল ধারার সংবাদ মাধ্যমগুলো নিতে পারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। দেশের বর্তমান বাস্তবতায় দেখা যাচ্ছে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম তথা ডিজিটাল মিডিয়ার অপব্যবহার হচ্ছে। সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি বিনাশের অপচেষ্টা চালানো হয়েছে এবং হচ্ছে। নারীর ওপর ধারাবাহিকভাবে নির্যাতন চলছে। তাদের সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে ডিজিটাল মাধ্যম। জঙ্গিবাদের প্রসারে মাধ্যমটির ব্যাপকভাবে অপব্যবহার হওয়ারও নজির রয়েছে। ব্যক্তির বিরুদ্ধে কুৎসা রটনার কাজেও বিপুলভাবে ব্যবহূত হচ্ছে মাধ্যমটি। দেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটানোর এই মাধ্যমটির অপব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে। প্রযুক্তির নেতিবাচক ব্যবহার রোধই এখন বড় চ্যালেঞ্জ। এটা সর্বজনবিধিত যে, মানুষের সত্য জানার পথ যেখানে বন্ধ হয়ে যায়, ভুয়া সংবাদের পথ চলা সেখান থেকেই শুরু হয়। একটি ভুয়া সংবাদের কারণে অনেক অঘটন ঘটে, ঘটে যায়। এসব রোধে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণের বিকল্প নেই। শুধু আইন নয়, জনসচেতনতাও বাড়াতে হবে। দেশবাসী সঠিক তথ্য পেতে চায় এবং তা পছন্দ করে। তাই সর্বাগ্রে ভুয়া সংবাদ প্রতিহত করার জন্য কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত