শিরোনাম

বাসচাপায় শিক্ষার্থীর মৃত্যু শৃঙ্খলা ফেরাতে হবে পরিবহনে

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০২:০২, মার্চ ২১, ২০১৯

আবারও সড়ক হত্যার শিকার হলো বিশ্ববিদ্যায়ের শিক্ষার্থী আবরার। তাও নিরাপদ সড়কের লক্ষ্যে চলমান ট্রাফিক শৃঙ্খলা সপ্তাহের মধ্যে। রেষারেষি-ঘেঁষাঘেঁষিতে জীবন দিতে হলো বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস-বিইউপির আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের মেধাবি ছাত্রের। সু-প্রভাত পরিবহনের যন্ত্রদানব বাসটি গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে আটটায় পিষে মারে তাকে। এটিকে খুন না বলে দুর্ঘটনা বললে সত্যের খেলাপ করা হয়। আবরার পড়াশোনা, খেলাধুলা, বিতর্ক, আচার-আচরণে মনে রাখার মতো ছেলে বলে মন্তব্য করেছেন তার শিক্ষকরা। ক্লাশে যাওয়ার উদ্দেশ্যে সকাল সাড়ে ৭টার দিকে রাজধানীর নর্দ্দায় যমুনা ফিউচার পার্কের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বিইউপির বাসে ওঠার সময় ঘাতক বাসটি চাপা দেয় তাকে। দুর্ঘটনার পর যমুনা ফিউচার পার্কের সামনের রাস্তা অবরোধ করে আবরারের সহপাঠী, বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থী ও এলাকাবাসী। দোষী বাস চালকের শাস্তি ও নিরাপদ সড়কের দাবিতে স্লোগান দেয় তারা।‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ স্লোগানে ওই এলাকা প্রকম্পিত করে তুলে তারা। যেমন নানা নিত্য-নতুন স্লোগানে মুখর হয়েছিলো গত বছর নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলনে। আবরার আহমেদ চৌধুরী অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আরিফের বড় ছেলে। রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে রয়েছে পুলিশের দৃশ্যমান ব্যাপক প্রচেষ্টা। কিন্তু শৃঙ্খলার দশা- বড়ই করুণ। ট্রাফিক শৃঙ্খলা সপ্তাহ চলার মধ্যেই যত্রতত্র রাস্তা পারাপার, যাত্রী ওঠানো, বাসের দরজা বন্ধ না করা, গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোনে চালকের কথা বলাসহ আইন না মানার চিরচেনা সব বিশৃঙ্খলাই চলছে। শুধু সচেতনতামূলক কার্যক্রমে সড়কের নৈরাজ্য বন্ধ হবে না বলে অনেকের ধারণা। গত বছরের ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে বাসচাপায় দুই কলেজ শিক্ষার্থী নিহতের জেরে সেদিন থেকে নিরাপদ সড়কের দাবিতে রাস্তায় নামে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা। সারা দেশে তৈরি হয় এক ভিন্নতর পরিস্থিতি। কোমলমতি শিক্ষার্থীরা আকর্ষণীয় নানা স্লোগান ও পদক্ষেপে শিক্ষামূলক নতুন এক তাড়না তৈরি করেই ঘরে ফেরে। তাদেরই একজন ছিলেন আবরার। আবরারের ফেসবুক প্রোফাইলে রয়ে গেছে সেই আন্দোলনের স্বাক্ষর। তার প্রোফাইলে দেখা যায়, নিরাপদ সড়ক চাই আন্দোলন চলাকালে তিনি তার ফেসবুক প্রোফাইল পিকচার পাল্টান। গত বছরের ২ আগস্ট পোস্ট দেয়া ছবির নিচে লেখা ‘নিরাপদ সড়ক চাই’। ২০১৮-র নিরাপদ সড়ক আন্দোলন বাংলাদেশে কার্যকর সড়ক নিরাপত্তার দাবিতে গত বছরের ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত সংঘটিত একটি আন্দোলন বা গণবিক্ষোভ। অথচ রাস্ট্র ও পুলিশের জবাবদিহি না থাকায় প্রভাব পড়ে গাড়ি চালকের ওপর। একসময় শ্রমিকনেতারা হয়ে যান মালিক। বর্তমানে অদক্ষতা ও নৈরাজ্য জায়গা করে নিয়েছে সবখানে। গত বছরে শিক্ষার্থীদের ওই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অনেক বাস্তবতা উন্মোচিত হয়েছিলো। ছেলেমেয়েরা নিঃস্বার্থভাবে পথে নেমেছিলো। তাদের মুনাফার কোনো বিষয় ছিলো না। তারা দেখিয়েছে, মানুষের মধ্যে অনেক শক্তি আছে, তারা অনেক কিছু করতে পারে। দেশের মানুষের এই শক্তিকে সব সময় চাপা দিয়ে বা দমিয়ে রাখা যায় না। সড়কে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা সম্ভব, সেটাও তারা দেখিয়েছিলো। কিন্তু রাস্ট্রের নীতিনির্ধারকরা পরিস্থিতিকে অবনতির দিকে নিতে সহায়তা করেছেন। তাদের কেউ কেউ বলেছিলেন, গাড়িচালকদের লেখাপড়া জানার দরকার নেই। চালকরা সড়কের পাশের ছবি, সংকেত বুঝতে পারলেই চলবে। ড্রাইভারদের গরু-ছাগল চিনলেই চলবে-এমন মন্তব্যও ছোঁড়া হয়েছিলো। অনেকের দাবি সরকারের সঙ্গে পরিবহন শ্রমিক ও মালিকপক্ষের বোঝাপড়া চমৎকার। আর মালিকের আশকারা আর উস্কানিতে চালকরা বেপরোয়া হয়ে ওঠে। সরকারের সদিচ্ছা আর জবাবদিহিতাই পারে সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে। গত বছরের ৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মন্ত্রিসভা একটি খসড়া ট্রাফিক আইন অনুমোদন করে, যে আইনে ইচ্ছাকৃতভাবে গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যায় মৃত্যদণ্ড এবং বেপরোয়াভাবে চালিয়ে কারো মৃত্যু ঘটালে সর্বোচ্চ ৫ বছর কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়; যদিও আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বেপরোয়া চালনায় মৃত্যদণ্ড দাবি করেছিলো। তখন অবশ্য রাজধানীসহ বিভিন্ন শহরের পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও সড়ক শৃঙ্খলা স্বাভাবিক হয়নি আজও। শিক্ষার্থীদের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের প্রেক্ষিতে ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সড়কে শৃঙ্খলা ফেরাতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে একটি কমিটি করা হয়। কমিটি গত বছরের ৩০ আগস্ট ৩০টি নির্দেশনা জারি করে। এর মধ্যে সাতটি নির্দেশনা ছিল দ্রুত কার্যকর করার মতো। পুলিশের ঘোষিত শৃঙ্খলা পক্ষের কার্যক্রমের সঙ্গে স্বল্পমেয়াদি নির্দেশনাগুলোর মিল রয়েছে।চলমান ট্রাফিক শৃঙ্খলা সপ্তাহেও নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাগুলো আজও রয়ে গেছে অকার্যকর। আমরা নিরাপদ সড়কের নিশ্চিয়তা প্রত্যাশা করি। নিরাপদ হোক মানুষের পথচলা।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত