শিরোনাম

গণমৃত্যুর ঘটনা তদন্তে বাংলাদেশ প্রস্তুত নয়

প্রিন্ট সংস্করণ॥ডা. মোজাহেরুল হক  |  ১১:০১, মার্চ ২০, ২০১৯

চকবাজারের দুর্ঘটনা এক কথায় একটি গণমৃত্যু বা মাস ডিজাস্টার। এমন ঘটনা অনেক সময় প্রাকৃতিক হতে পারে, আবার মনুষ্যসৃষ্ট কিংবা দুর্ঘটনাক্রমে ঘটতে পারে। এমনকি এটা অপরাধীরাও ঘটাতে পারে। তাই এ ধরনের দুর্ঘটনা তদন্তের কিছু নিয়ম রয়েছে, যাকে মাস ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ও মাস ডিজাস্টার বা গণমৃত্যু তদন্ত বলে।কোনো ঘটনায় যদি নিহতের সংখ্যা ১০-এর ওপরে হয়, তাহলে তাকে আমরা মাস ডেথ বা গণমৃত্যু বলি। চকবাজারের ঘটনায় নিহতের প্রায় সংখ্যা শতাধিক। তাছাড়া আহতের সংখ্যাও অনেক। তাই একে আমরা মাস ডেথ বলব। আর তা তদন্তের সুনির্দিষ্ট নিয়ম বা পদ্ধতি রয়েছে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ তা অনুসরণ করে। এ ধরনের বড় দুর্ঘটনা তদন্তে কী ধরনের বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণ করা হবে, বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত এটি নির্ণয়ে কোনো নীতিমালা বা পদ্ধতি নেই। যে কারণে এখানে এ ধরনের দুর্ঘটনাগুলোর যথাযথ তদন্ত হয় না। এর আগে ভিন্ন ঘটনায়ও অনেক মানুষ নিহত হয়েছে। এগুলো আমরা অনেক সময় স্রেফ দুর্ঘটনা বলি। তবে এগুলো কিন্তু মনুষ্যসৃষ্ট অবহেলার কারণ। রানা প্লাজা দুর্ঘটনা কিংবা তাজরীন ফ্যাশনসে আগুন লাগাটা প্রাকৃতিক দুর্ঘটনা নয়, চকবাজারের আগে নিমতলীর ঘটনাটিও মানুষের অবহেলার কারণে ঘটেছে। তবে নিমতলী আর চকবাজারের দুর্ঘটনার মধ্যে বেশকিছু সাদৃশ্য রয়েছে। দুটি ঘটনাতেই আমরা কেমিক্যালের সম্পর্ক পাচ্ছি, যা আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার জন্য দায়ী। সেজন্য মৃতের সংখ্যাও বেশি হয়েছে। বেশিসংখ্যক মানুষের মৃত্যুর আরেকটা কারণ পুরান ঢাকা একটি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা, সেখানে শুধু লোক থাকে না, লোকের চলাচলও বেশি। এ ক্ষেত্রে আমরা যদি সঠিকভাবে নগরায়ণ করি, তাহলে দুর্ঘটনা প্রতিরোধ থেকে শুরু করে মৃতের সংখ্যাও কমিয়ে আনতে পারি। যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে আমরা দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে জানতে পারি। জানতে পারি এটিকে এড়িয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল কিনা এবং এজন্য কে দায়ী কিংবা কার বা কাদের অবহেলা দায়ী, তা নির্ণয় করা সম্ভব হয়। আমরা যদি এ ধরনের তদন্তকে গুরুত্বসহকারে গ্রহণ না করি এবং বৈজ্ঞানিকভাবে তদন্ত না করি, সেক্ষেত্রে তার কারণগুলো অনেকটাই অন্ধকারে থেকে যাবে এবং ভবিষ্যতের ঘটনা বা দুর্ঘটনাগুলো এড়াতে পারব না। সেক্ষেত্রে সঠিক পদক্ষেপটি কী, তা নিয়ে প্রশ্ন আসতে পারে। উত্তরটি হলো, এখানে অবশ্যই পুলিশ, ফরেনসিক বিজ্ঞানী, ফায়ার ব্রিগেড, ডাক্তারের ভূমিকা মুখ্য। রেড ক্রসের প্রতিনিধিরাও থাকতে পারেন। উদ্ধারকাজে সাহায্য করে এমন ভলান্টিয়াররাও আসতে পারেন। ময়নাতদন্তের ব্যাপার আছে, তাই সব মিলিয়ে টিমওয়ার্কের প্রয়োজন পড়ে। আলামত সংগ্রহের জন্য ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ ও তদন্তের জন্য সিআইডির সদস্যরা থাকবেন। এটা একটা সমন্বিত ব্যাপার, তাই সবাইকে একটা টিম হিসেবে কাজ করতে হবে। কার কী কাজ, তা নির্দিষ্ট থাকবে এবং তারা নিজ নিজ কাজ যথাযথভাবে সম্পাদন করবেন। এভাবে পুলিশ, সিআইডি ইন্সপেক্টর, ফায়ার ব্রিগেড, ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ, ডাক্তার, বিজ্ঞানী ও অন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি সমন্বিত দল থাকবে এবং তারা সদাপ্রস্তুত থাকবেন। যখন যেখানেই এমন বড় দুর্ঘটনা ঘটবে, ওই দলটি সেখানে কাজ করবে। এতে দুর্ঘটনা পরবর্তী আমাদের একটি পূর্বপ্রস্তুতি থাকবে। কারণ এ ধরনের ঘটনায় বড় ধরনের বৈজ্ঞানিক অ্যাপ্রোচ প্রয়োজন। এখন প্রশ্ন আসতে পারে, এ ধরনের ঘটনায় পুলিশের কাজটা কী? এখানে পুলিশের প্রথম কাজ হচ্ছে পুরো এলাকা বেষ্টনী দ্বারা ঘিরে ফেলা। সেখানে বাইরের কোনো লোককে যেমন প্রবেশ করতে দেয়া যাবে না, তেমনি ভেতরের লোকদের চলাচলের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করতে হবে। ঘটনাস্থলে বিশেষজ্ঞ দলটি যখন পৌঁছবে, তখন পুলিশ পথ তৈরি করে দেয়ার পাশাপাশি যাওয়া-আসার জন্যও নির্দিষ্ট একটি রাস্তা তৈরি করবে। এরপর দুর্ঘটনাস্থলে প্রবেশ ও বের হয়ে আসার জন্য তদন্তকারী দলের সদস্যদের সবাই ওই পথটাই ব্যবহার করবেন। গোটা এলাকাটিকে ভাগ করে নিতে হবে। প্রথমে দেখতে হবে, কোনো জীবিত ব্যক্তি রয়েছেন কিনা। তাদের উদ্ধার করার পাশাপাশি ডাক্তার কর্তৃক দ্রুত চিকিৎসার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। ইমার্জেন্সি হিসেবে এই প্রাথমিক কাজগুলো করতে হবে। দুর্ঘটনাস্থল থেকে আহত, সংকটাপন্ন ও জীবিত ব্যক্তিদের উদ্ধার করা প্রাথমিক কাজ। এরপর উদ্ধারকৃত ব্যক্তিদের প্রাথমিক চিকিৎসা বা প্রয়োজনে হাসপাতালে পাঠাতে হবে। দুর্ঘটনাস্থলেও সাময়িক ভ্রাম্যমাণ হাসপাতাল স্থাপন করতে হবে। যেখানে ডাক্তার, নার্স ও প্যারামেডিক থাকবেন, আক্রান্ত ব্যক্তিকে প্রাথমিক চিকিৎসা সেখানেই প্রদান করা হবে। এরপর প্রয়োজন বা গুরুত্ব অনুযায়ী বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠাতে হবে। কারো ইনজুরির পরিমাণ অধিক হলে তাকে বিশেষায়িত হাসপাতালে পাঠাতে হবে। আবার কাউকে যদি প্রাথমিক চিকিৎসার পর ছেড়ে দেয়া যায়, তাকে ছেড়ে দিতে হবে। তবে সবার নাম-ঠিকানার রেকর্ড রাখতে হবে। কারণ এরা পরবর্তী সময়ে সাক্ষী হিসেবে কাজ করতে পারে। এ কাজগুলো প্রাথমিক। দ্বিতীয় কাজটা হচ্ছে ঝুঁকি নিবারণ। চকবাজারের ঘটনায় যেমন রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে। সেগুলো তাৎক্ষণিক সরাতে হবে আশপাশ থেকে। কিংবা কোথাও একটি ভবন ভেঙে পড়ছে বা পড়তে পারে, এ জায়গাগুলো আগে খেয়াল করতে হবে। এ ধরনের রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো দ্রুত প্রতিরোধের ব্যবস্থা নেয়া জরুরি। এরপর দুর্ঘটনা আক্রান্ত এলাকার আলোকচিত্র ও ভিডিওচিত্র ধারণ করতে হবে। এটি করতে হবে সিস্টেমেটিকভাবে। জায়গাটাকে ভাগ করে অংশের পর অংশ পদ্ধতিতে এগোতে হবে। তথ্য প্রমাণ হিসেবে রাখতে হবে। এলাকাকে নাম্বারিং করার মাধ্যমে ভাগ করে নিতে হবে। এ পর্যায়ে ফরেনসিক ডাক্তারের কাজ হচ্ছে যেখানে সেখানে ছড়িয়ে থাকা মরদেহগুলোর মৃত্যু নিশ্চিত করা। মরদেহগুলোকে একটা প্লাস্টিক ব্যাগে রেখে প্রতিটি মরদেহকে আলাদা নম্বর দিয়ে দুর্ঘটনাস্থল থেকে হাসপাতালের শবাগারে পাঠিয়ে দিতে হবে। রানা প্লাজা দুর্ঘটনার পর সাভারের এনাম মেডিকেল কলেজের পাশে আমরা একটি অস্থায়ী শবাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলাম। অকুস্থলে পর্যাপ্ত জায়গা না-ও থাকতে পারে। তাই দুর্ঘটনাস্থলের পাশে আমরা এমন একটি সাময়িক মর্চুয়ারি প্রতিষ্ঠা করতে পারি। প্রত্যেক শবাগারে মরদেহ রাখার জন্য প্রয়োজনীয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রন যন্ত্র নাও থাকতে পারে। সে অবস্থায় আমাদের দুটি জিনিস করতে হবে। প্রথমত, দ্রুত ময়নাতদন্তের কাজ করতে হবে। আর যেগুলো আত্মীয়-পরিজনদের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব, তা দ্রুত হস্তান্তর করতে হবে। মরদেহ অন্যান্য মেডিকেলেও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে যে ডাক্তাররা ময়নাতদন্ত করবেন, তাদের প্রশিক্ষিত হতে হবে। একজন কিংবা দুজন চিকিৎসকের পক্ষে এটা করা সম্ভব নয়, তাই ডাক্তারদেরও একটা টিম প্রয়োজন। ঢাকা মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকদের পাশাপাশি সলিমুল্লাহ, সোহরাওয়ার্দীসহ প্রাইভেট মেডিকেল কলেজের চিকিৎসকদেরও রাখতে পারি। সংখ্যাটা যত বড় হবে তত ভালো। চিকিৎসকদের দলগুলোকেও আমরা ভাগ করে নিতে পারি। একজন চিকিৎসক কয়টি মরদেহের ময়নাতদন্ত করতে পারেন, তা চিন্তা করতে হবে। একজন চিকিৎসককে তিনটির বেশি এ কাজ না দিলে ভালো হয়। এতে তিনি সময় নিয়ে যথাযথ ও সূক্ষ্মভাবে তার কাজটি করতে পারবেন। আমরা যদি অস্থায়ী একটি শবাগার স্থাপন করে পাঁচ-সাতটি টেবিল রাখতে পারি, সেক্ষেত্রে দ্রুত কাজ এগিয়ে নেয়া যাবে। দুর্ঘটনা-পরবর্তী ময়নাতদন্ত অনেক গুরুত্বপূর্ণ এবং এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজ। দুর্ঘটনার ধরন অনুযায়ী ময়নাতদন্ত হয়। আগুনে পোড়া, ডুবে যাওয়া, ভবন ধস—প্রতিটি ক্ষেত্রে আলাদা পদ্ধতিতে ময়নাতদন্ত করতে হয়। তবে সব ক্ষেত্রে একটা বিষয় দেখতে হয়, তা হলো পরিচয় শনাক্তকরণ ও মৃত্যুর কারণ। আবার মৃত্যুরও বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। চকবাজারের ঘটনায় যেমন সরাসরি কেমিক্যাল বার্ন আবার ফায়ার বার্ন। দুটি কিন্তু আলাদা। আবার আগুন লাগার ফলে কালো ধোঁয়া বা কার্বন মনোক্সাইডের জন্যও মারা যেতে পারে। আবার অনেকে তাৎক্ষণিক শকে মারা যেতে পারে। এমনও হতে পারে, দুর্ঘটনার সময় হত্যার ঘটনা ঘটেছে। আবার হত্যার ঘটনার মধ্য দিয়েও দুর্ঘটনার সূচনা হতে পারে। অনেকে ভবনের ওপর থেকে লাফ দিয়ে পড়তে পারে। তখন হয়তো তার গায়ে আগুন লেগে যেতে পারে। অনেকে ইমারত ধসে বা ভারী কিছু দ্বারা চাপা পড়তে পারে। সুতরাং মৃত্যুর ভিন্ন ভিন্ন কারণ থাকতে পারে। তাই এ ধরনের দুর্ঘটনার পর চিকিৎসকদের জন্য মৃত্যুর কারণগুলো বের করা সবসময় খুব একটা সহজ নয়। আবার মৃত্যুর পর ভবন ধসে চাপাও পড়তে পারে। অনেক ক্ষেত্রে আবার বিভিন্ন কারণে শরীরের কোনো অংশ বা তরল যেমন রক্ত বা প্রস্রাব সংরক্ষণ করতে হয়। এ ছাড়া সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি হচ্ছে, শনাক্তকরণের ক্ষেত্রে অনেক সময় ডিএনএর জন্য নমুনা নিতে হয়। এজন্য প্রশিক্ষিত চিকিৎসকের প্রয়োজন হয়। সে রকম আলামত সংরক্ষণে সিআইডির প্রশিক্ষিত টিম লাগবে, যারা প্রয়োজনীয় যথাযথ আলামত সংগ্রহ করবে। 

চকবাজারের একটি বিস্তীর্ণ এলাকা। এ ধরনের ঘটনায় দুর্ঘটনাস্থলকে সংরক্ষণের বিষয়ও রয়েছে। কারণ ঘটনাটা যেখানে ঘটেছে, তা যদি নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে অনেক তথ্যপ্রমাণ হারিয়ে যাবে। আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, কোনোভাবেই যেন তথ্যপ্রমাণগুলো নষ্ট না হয়। কারণ এগুলো নষ্ট হওয়া মানে ভুল বা ভিন্ন দিকনির্দেশনায় এগোনো।মনে রাখতে হবে, এ ধরনের দুর্ঘটনায় কেউ না কেউ দায়ী। উল্লিখিত বিষয় ও পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করার পর একটি সুনির্দিষ্ট অনুসন্ধানী তদন্ত হওয়া দরকার। সরকার যেমন বিভিন্ন সময় বিভিন্ন বিষয়ে তদন্ত পরিচালনা করে। পরবর্তী সময়ে অনেক সুপারিশও করে। যেমন নিমতলীর ঘটনায় একটা তদন্ত কমিটি করা হয়েছিল। তারা কিছু সুপারিশও করেছে। কিন্তু সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, যেখানে একটা মানবশরীরের সম্পর্ক থাকে, সেখানে সবসময় একজন ফরেনসিক ডাক্তার থাকবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা কোনো দলে একজন ফরেনসিক ডাক্তারকে দেখি না। এখন পর্যন্ত যে তদন্ত কমিটিগুলো হয়েছে, সেখানে কোনো ডাক্তার নেই। কিন্তু এটা অত্যন্ত জরুরি। ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ যারা আছেন, তাদের মধ্যে থেকে সরকার নিতে পারে। এ ছাড়া থাকতে পারেন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও। শুধু সরকারের লোকেরা যদি তদন্ত করতে যায়, তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, জনগণের আস্থা সে তদন্তে থাকে না। তদন্ত কমিটি যে সুপারিশগুলো করেছে, সেগুলো আলোর মুখ অনেক সময় দেখেনি। বাস্তবায়ন তো দূরের কথা। যেমন নিমতলীর ঘটনায় প্রায় ১৭টি সুপারিশ ছিল। এর যদি কিছু সুপারিশও বাস্তবায়ন হতো, তাহলে হয়তো চকবাজারের ঘটনা ঘটত না। আমাদের মনে রাখতে হবে, তদন্তের মাধ্যমে যা-ই বের হয়ে আসুক না কেন, তদন্তের উদ্দেশ্য থাকবে আর এ ধরনের ঘটনা যেন না ঘটে। এ ছাড়া দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে হবে। যেমন চকবাজারের ঘটনায় নানা ধরনের বক্তব্য আমরা শুনছি। কেউ বলছেন কেমিক্যাল আছে, কেউ বলছেন কেমিক্যাল নেই। এতে জনগণ দ্বিধান্বিত হয়ে যাবে। এর মাধ্যমে তদন্তও প্রভাবিত হতে পারে। সুতরাং এ ক্ষেত্রে দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে পরবর্তী সময়ে যেন এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না হয়, সেজন্য কী করণীয় তার একটি নির্দেশিকা প্রদান করতে হবে। নিমতলীর ঘটনার উদাহরণ টেনে আমরা বলতে পারি, যারা এ ধরনের তদন্তকাজে নিয়োজিত, তাদের বেশির ভাগেরই তেমন কোনো অভিজ্ঞতা নেই। তাই এখানে গণশুনানির মতো হওয়া দরকার। এর মাধ্যমে এলাকার লোকদের সাক্ষ্যগ্রহণ করা সম্ভব হয়। এরপর উদ্ধারকাজে সম্পৃক্ত ফারার ব্রিগেড থেকে শুরু করে পুলিশ সদস্য ও ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের সাক্ষ্য নেয়া উচিত। নিমতলীর ঘটনায় সেটা কতটুকু নেয়া হয়েছে, আমি নিশ্চিত নই। তবে আমি জানি, সেভাবে কারো সাক্ষ্য নেয়া হয়নি। সাধারণত একটি নির্দিষ্ট তারিখে গণশুনানির আয়োজন করে উল্লেখ করা থাকবে যে ঘটনার ব্যাপারে শুনানি হবে, আপনারা যারা সাক্ষ্য দিতে চান তারা আসেন। সুনির্দিষ্ট কিছু প্রশ্নতালিকা থাকবে, যে অনুসারে উপস্থিত সবাইকে প্রশ্ন করতে হবে। লিখিত ডকুমেন্ট অনেক সময় হারিয়ে যেতে পারে, তাই উত্তরগুলো অডিও ও ভিডিও রেকর্ড করতে হবে। তাছাড়া লেখার ক্ষেত্রে অনেক কিছু নথিভুক্ত না-ও হতে পারে। নিমতলী ও চকবাজারের ঘটনা দিয়ে আমরা যে শিক্ষাটা নিতে পারি তা হচ্ছে, আবাসিক এলাকা সবসময় আবাসিক থাকবে। আবাসিক এলাকায় কেমিক্যাল থেকে শুরু করে অন্যান্য ফ্যাক্টরির কথা বাদই দিলাম, আমরা এখানে বিভিন্ন হোটেল দেখতে পাই, যা অগ্নিকা্লের ঝুঁকি বহন করে। সুতরাং আবাসিক এলাকায় ঝুঁকিবহুল কোনো কিছু থাকতে পারবে না। অগ্নিকা্লের ঝুঁকিবহুল কিছু থেকে শুরু করে গুদাম এবং কোনো কারখানাও থাকতে পারবে না। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের ব্যবসার অনুমতি দেয়া যায় না।বর্তমানে আমরা অনেক ইন্ডাস্ট্রিয়াল জোন করছি। হাজারীবাগ থেকে যেমন চামড়ার ফ্যাক্টরি সরিয়ে নেয়া হয়েছে, তেমনি পুরান ঢাকায় যেসব ছোট কারখানা রয়েছে, তা সরিয়ে নিতে হবে। এখানে ঘরের কামরার মধ্যে কারখানা রয়েছে, যা রীতিমতো ভয়ংকর। এগুলো একটি জোন তৈরি করে সরিয়ে নেয়া যেতে পারে। নিরাপত্তার মানদ্ল মানার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। পুরান ঢাকা এত বড় একটা এলাকা, সেখানে পানির কোনো উৎস নেই। সেখানের সব পুকুর ভরাট করে ভবন করা হয়েছে। বিশ্বব্যাপী আইন রয়েছে যে কেউ কোনো ধরনের জলাশয় ভরাট করতে পারবে না। কারণ এগুলো প্রাকৃতিক। খননকৃত পুকুর হলে ভিন্ন বিষয়। কিন্তু একটা সময় পুরান ঢাকায় এ ধরনের অনেক প্রাকৃতিক জলাশয় ছিল। জায়গাটি থেকে নদীও কাছে। অথচ আমাদের এমন কোনো ব্যবস্থা নেই যে আমরা প্রাকৃতিক উৎসগুলো থেকে পানি ব্যবহার করতে পারি।কলকাতার মতো জায়গায় এখনো রাস্তার পাশে পানির ব্যবস্থা রয়েছে। গঙ্গা থেকে এ পানিটা আসে। আমাদেরও নদী রয়েছে, সেখান থেকে পানি সরবরাহের একটা ব্যবস্থা আমরা রাখতে পারতাম। তাতে সাধারণ মানুষ সবসময় এ পানি প্রাথমিকভাবে আগুন নেভানোর কাজে লাগাতে পারত। অথচ আমরা এটা করিনি। তবে এখনো কিন্তু সময় আছে এটা করার। রাস্তার মোড়ে পাইপ বসিয়ে আমরা নদী থেকে পানি এনে রাখার ব্যবস্থা করতে পারি। তাছাড়া পুরান ঢাকার মতো ঢাকার অনেক জায়গাতেই সরু গলি রয়েছে, সেখানে ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি ঢুকতে পারে না। চকবাজারের ঘটনায় ৩৭টি ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি গেছে। সংখ্যাটা অনেক বড়। কিন্তু কথা হলো, এগুলো কতটুকু পানি বহন করে নিতে পারে। আবার ফিরে গিয়ে পানি নিয়ে আসাও সময়ক্ষেপণ এবং অনেক জায়গায় গাড়ি ঘোরানোও সম্ভব নয়। তাই আমাদের এ বিষয়গুলো চিন্তা করতে হবে। ফায়ার সার্ভিস যদি রাস্তার মোড়ে মোড়ে নদীর পানির উৎসটা পেত, তাহলে আগুন নেভানোর বিষয়টি অনেক সহজ হয়ে যেত।আমাদের মনে রাখতে হবে, স্বাভাবিক মৃত্যুর ময়নাতদন্ত ও আগুনে পোড়া মরদেহের ময়নাতদন্ত এক নয়। কারণ এ ধরনের মরদেহের ময়নাতদন্ত করতে অনেক সময় ও দক্ষ লোকের প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে ভিন্ন ধরনের অ্যাপ্রোচ নিতে হয়। সংরক্ষণের জন্যও ভিন্ন ধরনের ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। আমাদের দেশের চিকিৎসকরা এখনো সে বিষয়ে যথাযথ অভিজ্ঞ নয় এবং তাদের সে বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্য সরকার এখন পর্যন্ত কোনো সুযোগও সৃষ্টি করেনি। আমাদের দেশের ফরেনসিক ডাক্তারদের উচ্চতর প্রশিক্ষণ দরকার।তাছাড়া দুর্ঘটনাস্থল থেকে মরদেহ শবাগারে আনা পর্যন্তও অনেক বিষয় খেয়াল রাখতে হয়। শরীরের কোনো অংশ ভেঙে বা ছুটে যেতে পারে, মরদেহটি তুলে আনার সময় কোনো অংশ অবশিষ্ট রয়ে যেতে পারে ইত্যাদি। সেজন্যই নির্ভুল ময়নাতদন্ত দরকার। তাহলে আমরা জানতে পারব কোনটা স্থানান্তরের সময় মরদেহের শরীর থেকে বিচ্যুত হয়েছে, কোন অংশটি আগে থেকেই জখম অবস্থায় ছিল।বিদেশে ইন্স্যুরেন্সের জন্য ময়নাতদন্তে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মৃত্যুর কারণগুলো তুলে ধরা হয়। আমাদের দেশে সাধারণত মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হওয়ার জন্য করা হয়। এটাই নিয়ম। তবে আমরা কতটা গুরুত্ব দিয়ে এটা করছি, তা জরুরি। কারণ ময়নাতদন্তের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া সঠিকভাবে তথ্য সংরক্ষণের জন্যও এটা দরকার। কারণ মৃতদের মধ্যে কতজন আগুনে পুড়ে মারা গেছে, তা নির্ণয় করা গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া এ ক্ষেত্রে অপরাধমূলক কর্মকা্লও ঘটতে পারে। এসব কারণে সঠিকভাবে ময়নাতদন্ত করতে হয়। এর মাধ্যমে অন্য কোনো সূত্রও বের হয়ে আসতে পারে। যেমন ওখানে কোনো জঙ্গি ছিল, তাদের বোমা তৈরির সূত্র থেকে আগুন ছড়িয়েছে। এ বিষয়টিও কিন্তু তদন্তকে প্রভাবিত করতে পারে।পরিশেষে বলব, নিমতলী, তাজরীন ফ্যাশনস, রানা প্লাজা, চকবাজারের মতো ঘটনা তদন্তের জন্য বাংলাদেশ প্রস্তুত নয়। পৃথিবীব্যাপী গণমৃত্যু তদন্তের বিষয়টিতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হলেও বাংলাদেশে ভিন্ন। কারণ আমাদের দেশে জীবনের মূল্য কম। পৃথিবীর অন্য কোথাও এ ধরনের ঘটনা ঘটলে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হতো, তিনদিন ধরে শোক পালনের পাশাপাশি জাতীয় পতাকা অর্ধনমিত রাখা হতো। আর আমরা ৭১ জন মানুষের মৃত্যুতে কেবল শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করলাম।আমরা চাই না, দেশে কোনো গণমৃত্যুর ঘটনা ঘটুক। তবে যদি ঘটেই, তার ব্যবস্থাপনা বা তদন্তের জন্য আমাদের প্রস্তুত থাকতে হবে। দেশে রাজধানীসহ অন্যান্য শহরের জন্য গণমৃত্যু তদন্তে টিম (Mass Disaster Investigation Team) গঠন করা এখন আশু সময়োপযোগী প্রয়োজন।

লেখক : ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ

লেখক : ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত