শিরোনাম

রাজনীতির মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর জন্মদিন

প্রিন্ট সংস্করণ॥শফিকুজ্জামান  |  ০২:৪৪, মার্চ ১৭, ২০১৯

আজ বাঙালি জাতির সেই মাহেন্দ্রক্ষণ ১৭ই মার্চ। যে মানুষটির জন্ম না হলে আজো বাংলাদেশ স্বাধীন হতো না- বাংলাদেশ আর বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা, স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, সর্বকালের সর্ব শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জন্মদিন। ১৯২০ সালে এই দিনে বঙ্গবন্ধু বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার পাটগাতি ইউনিয়নের টুঙ্গিপাড়া গ্রামে সম্ভ্রান্ত শেখ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম শেখ লুৎফর রহমান ও মাতার নাম সায়েরা খাতুন। পিতা-মাতার চার মেয়ে কন্যা এবং দুই ছেলের মধ্যে তিনি ছিলেন তৃতীয়। শৈশবে বঙ্গবন্ধুকে আদর করে ডাকা হতো ‘খোকা’ বলে। খোকা নামের সেই শিশুটি পরবর্তীতে হয়ে ওঠেন নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালির মুক্তির দিশারী। গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আত্মত্যাগ এবং জনগণের প্রতি মমত্ববোধের কারণে পরিণত বয়সে হয়ে ওঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। বিশ্ব ইতিহাসে ঠাঁই করে নেন স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার হিসাবে। তিনি বাংলাদেশের প্রথম রাস্ট্রপতি ও ভারতীয় উপমহাদেশের একজন অন্যতম প্রভাবশালী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব- যিনি বাঙালির অধিকার রক্ষায় ব্রিটিশ ভারত থেকে ভারত বিভাজন আন্দোলন এবং পরবর্তীতে পূর্ব পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন। প্রাচীন বাঙালি সভ্যতার আধুনিক স্থপতি হিসাবে শেখ মুজিবুর রহমানই বাংলাদেশের জাতির জনক বা জাতির পিতা। তিনি মওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী প্রতিষ্ঠিত আওয়ামী লীগের পর্যায়ক্রমে সভাপতি, বাংলাদেশের প্রথম রাস্ট্রপতি এবং পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। জনসাধারণের কাছে তিনি শেখ মুজিব এবং শেখ সাহেব হিসাবে বেশি পরিচিত এবং তার উপাধি বঙ্গবন্ধু। ১৯৪৭-এ ভারত বিভাগ পরবর্তী পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতির প্রাথমিক পর্যায়ে শেখ মুজিব ছিলেন তরুন ছাত্রনেতা। তিনি সমাজতন্ত্রের পক্ষসমর্থনকারী একজন অধিবক্তা হিসেবে তিনি তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগোষ্ঠীর প্রতি সকল ধরণের বৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন গড়ে তোলেন। আজীবন সংগ্রামী বঙ্গবন্ধুর যখন জন্ম হয় তখন ছিলো ব্রিটিশ রাজত্বের শেষ অধ্যায়। গ্রামের স্কুলে তার লেখাপড়ার হাতেখড়ি। ১৯২৭ সালে শেখ মুজিব গিমাডাঙ্গা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরু করেন। বাল্যকাল থেকেই বঙ্গবন্ধু ছিলেন নির্ভীক, অমিত সাহসী এবং মানবদরদি। স্কুল জীবনেই তার রাজনৈতিক সচেতনতার প্রমাণ পাওয়া যায়। ১৯৩৯ সালে অবিভক্ত বাংলার মুখ্যমন্ত্রী শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী গোপালগঞ্জ মিশনারি স্কুল পরিদর্শনে এলে বঙ্গবন্ধু স্কুলের ছাদ দিয়ে পানি পরা এবং তা মেরামত করার জন্য ও একটি ছাত্রাবাস নির্মাণের দাবি স্কুল ছাত্রদের পক্ষ থেকে তুলে ধরেন। তিনি তার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের সকল আন্দোলন-সংগ্রামে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার অবিসংবাদিত নেতৃত্বে পরাধীনতার শৃঙ্খল ভেঙে স্বাধীন, সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় হয়। কিশোর বয়সেই বঙ্গবন্ধু সক্রিয় রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুলে অষ্টম শ্রেণিতে অধ্যয়নকালে তৎকালীন বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে যোগদানের কারণে বঙ্গবন্ধু প্রথমবারের মতো গ্রেপ্তার হয়ে কারাবরণ করেন। এরপর থেকে শুরু হয় তার বিপ্লবী জীবন। গোপালগঞ্জ মিশন স্কুল থেকে ম্যাট্রিকুলেশন (এসএসসি) পাস করার পর তিনি কলকাতার ইসলামীয়া কলেজে (বর্তমান নাম মাওলানা আজাদ কলেজ) ভর্তি হন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত এই কলেজটি তখন বেশ নাম করা ছিলো। এই কলেজ থেকে সক্রিয়ভাবে তিনি ছাত্র রাজনীতি শুরু করেন। ১৯৪৭ সালে অর্থাৎ দেশবিভাগের বছর এ কলেজ থেকে বিএ ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি সহকর্মীদের নিয়ে ১৯৪৮ সালে গঠন করেন ছাত্রলীগ। পাকিস্তান-ভারত পৃথক হয়ে যাওয়ার পর শেখ মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে ফিরে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগে ভর্তি হন। ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি প্রতিষ্ঠা করেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। যার মাধ্যমে তিনি উক্ত প্রদেশের অন্যতম প্রধান ছাত্রনেতায় পরিণত হন। ১৯৩৮ সালে আঠারো বছর বয়সে বঙ্গবন্ধুর সাথে বেগম ফজিলাতুন্নেসার বিয়ে হয়। এই দম্পতির দুই কন্যা এবং তিন পুত্রের জন্ম হয়। কন্যারা হলেন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী ও টানা তিন বারসহ চার বারের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং শেখ রেহানা। আর পুত্ররা হলেন- শেখ কামাল, শেখ জামাল এবং শেখ রাসেল। তিন ছেলেই ৭৫’র ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুর সাথে নিহত হন। বঙ্গবন্ধু সম্পূর্ণ অসামপ্রদায়িক চেতনায় বিশ্বাসী ছিলেন। কালের পরিক্রমায় কখনো ভাষার জন্য, কখনো স্বাধীকারের জন্য চলতে থাকে তার আন্দোলন। এসবের মধ্য দিয়েই গড়ে উঠে স্বাধীনতার আন্দোলন। ৬৬’র ছয় দফা আন্দোলন, ৬৯’র গণঅভ্যুত্থান পেরিয়ে ১৯৭০ সালের নির্বাচনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বাঙালির অবিসংবাদিত নেতায় পরিণত হন। ৭১’র ৭ই মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) জনসমুদ্রে দাঁড়িয়ে বঙ্গবন্ধু বজ্রকণ্ঠে ঘোষণা করেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক এ আহ্বানে সাড়া দিয়ে সেদিন সমগ্র বাঙালি জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়ে মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলো। ৭১’র ২৫ মার্চ কালরাতে পাকিস্তানি সামরিক বাহিনী ‘অপারেশন সার্চ লাইট নামে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর আক্রমণ শুরু করলে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু তার ধানমণ্ডির ৩২ নম্বরের বাসভবন থেকে ওয়্যারলেসের মাধ্যমে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। ঘোষণার পরই বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে নিয়ে যায়। সেখানে কারাগারে আটক রেখে পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী তার প্রথম বিচার শুরু করে। তার নির্দেশনা মোতাবেক ৯ মাসের সশস্ত্র মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বীর বাঙালি ৭১’র ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে আনে। জন্মলাভ করে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের। ১৯৭২’র ১০ জানুয়ারি বিশ্ব নেতৃবৃন্দের চাপে পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয়। পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্তিলাভ করে তিনি স্বদেশ প্রত্যাবর্তন করেন এবং বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। দেশে ফিরেই তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করেন। এ জন্যে তিনি দেশ বিদেশের বিভিন্ন ব্যক্তিদের সাথে দেখা করেন দেশ গঠনে পরামর্শ করেন। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৩ সালে আলজেরিয়ায় জোট-নিরপেক্ষ সম্মেলনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রোর দেখা হয়েছিলো। তখন ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি, তবে শেখ মুজিবকে দেখেছি। ব্যক্তিত্ব ও সাহসে এ মানুষটি হিমালয়ের সমান। সুতরাং হিমালয় দেখার অভিজ্ঞতা আমি লাভ করেছি।’ এই উপমহাদেশের বাঙালি মনীষীদের নিয়ে পরিচালিত বিবিসির এক জরিপে সবাইকে ছাড়িয়ে ‘সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি’ নির্বাচিত হয়েছিলেন বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। বঙ্গবন্ধু তার জীবন উৎসর্গ করেছিলেন বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা, অর্থনৈতিক মুক্তির জন্য। তার সংগ্রামী জীবন চির অম্লান। ১৯৭৫ সালে সদ্য স্বাধীন একটি জাতির অর্থনৈতিক মুক্তি তথা একটি শোষণমুক্ত ও সুখী-সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে তিনি জাতীয় কর্মসূচি ঘোষণা করেন। কিন্তু সেই সুযোগ বেশিদিন পাননি তিনি। এর কিছুদিনের মধ্যেই ৭৫’র ১৫ আগস্ট কালরাতে ঘাতকদের তপ্ত বুলেটে সপরিবারে নিহত হন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সুখী-সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে দলমত নির্বিশেষে অসামান্য অবদানের জন্য আজ এদেশের মানুষের কাছে বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু এক ও অভিন্ন সত্ত্বায় পরিণত হয়েছে। সামগ্রিক বিচারে বঙ্গবন্ধু একজন ব্যক্তি নন, তিনি এক অনন্য সাধারণ ইতিহাস। তিনি কেবল বাঙালির নন, বিশ্বে নিপীড়িত-শোষিত মানুষের স্বাধীনতার প্রতীক, মুক্তির দূত। স্বাধীনতার মহান স্থপতি বঙ্গবন্ধু যে সোনার বাংলার স্বপ্ন দেখেছিলেন তা বাস্তবায়নের জন্য আমাদের নতুন প্রজন্মকে সোনার মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। শিশুদের প্রতি বঙ্গবন্ধুর মমতা ছিলো অপরিসীম। তাই ১৭ মার্চ তার জন্মদিনকে শিশুদের জন্য উৎসর্গ করে ‘জাতীয় শিশু দিবস’ ঘোষণা করা হয়েছে। দিনটিকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা ও পালনের বিষয়টি আগামী দিনের কর্ণধার শিশু-কিশোরদের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর বীরত্ব, রাজনৈতিক ও দেশপ্রেমের বিভিন্ন ইতিহাস শিখতে ও জানতে উদ্বুদ্ধ করবে। বাঙালি জাতিসত্ত্বার বিকাশ এবং তাদের জন্য বাংলাদেশ নামের স্বতন্ত্র আবাসভূমি প্রতিষ্ঠার জন্য জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইতিহাসে অমরত্ব লাভ করেছেন। আজীবন সংগ্রামী এই মহাপুরুষ জাতির সামনে একজন ত্যাগী ও অসম সাহসী রাজনীতিবিদ ব্যক্তিত্ব হিসেবে ইতিহাসের পাতায় তার নাম চিরস্থায়ী করে রেখে গেছেন। তার দেশপ্রেম, সংগ্রামমুখর জীবন এবং রাস্ট্রনায়কচিত ভাবমূর্তি চিরকাল বাঙালি জাতিকে আলোর পথ দেখাবে। একথা নির্দ্বিধায় বলা চলে যে, এই মহাপুরুষের জন্ম না হলে এই বাঙালি জাতি তাদের স্বাধীন সার্বভৌম স্বদেশ ও স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য অর্জন করতে সমর্থ হতো না। বঙ্গবন্ধুর বিশাল সাংগঠনিক ক্ষমতা, অতি উচ্চ দেশপ্রেমিক চেতনা এবং জনগণের স্বার্থের প্রশ্নে আপোষহীনতা তাকে প্রাতঃস্মরণীয় করে রেখেছে। এই মহান নেতার জন্মদিন উপলক্ষে বাঙালি জাতি তাকে বিনম্র শ্রদ্ধা ও ভালোবাসায় স্মরণ করবে। ১৯৭৫ এর ১৫ আগস্ট ঘাতকের নির্মম বুলেট তার নশ্বর দেহ আমাদের মধ্য থেকে কেড়ে নিলেও তার মৃত্যুঞ্জয়ী আদর্শ যুগে যুগে এ জাতিকে আলোর পথের যাত্রায় অনুপ্রাণিত করবে। আজ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনে তার রূহের মাগফিরাত কামনা করি এবং তার দেশপ্রেমের আদর্শে উজ্জীবিত হওয়ার শপথ গ্রহণ করি।

লেখক : সিনিয়র সাব এডিটর, দৈনিক আমার সংবাদ।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত