শিরোনাম

প্রিয়াঙ্কা কি ইন্দিরা হতে পারবেন

প্রিন্ট সংস্করণ॥মো. শরীফ হাসান  |  ০২:৩৬, মার্চ ১৬, ২০১৯

চমকের রাজনীতিতে নতুন ধামাকা প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রের আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে যোগদান। আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের মাস তিনেক আগে কংগ্রেসের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ এলাকা উত্তর প্রদেশের রাজ্য কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। প্রিয়াঙ্কার দাদা মতিলাল নেহরুর কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট হওয়ার ঠিক শতবর্ষ পরে তিনি নেহরু পরিবারের সর্বশেষ, সুনির্দিষ্টভাবে বলতে গেলে ১১তম সদস্য হিসেবে রাজনীতিতে যোগ দিলেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে, সমপ্রতি কংগ্রেস প্রকাশিত বিজ্ঞপ্তিতে প্রিয়াঙ্কার নিয়োগের বিষয়টি এমনভাবে ঘোষণা করা হয়, যেন বিষয়টি কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট রাহুল গান্ধীর নির্বাচনে অংশগ্রহণের প্রস্তুতি হিসেবে দলীয় পদমর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের রদবদল ভিন্ন আর কিছুই নয়। প্রশ্ন হলো- কেন এই গোপনীয়তা? কংগ্রেস কি প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর যোগদানকে রুটিন কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেখছে? নিশ্চয় তা নয়। কংগ্রেস প্রিয়াঙ্কার নাম প্রথম কলামে উল্লেখ করতে চায়নি এটা ভেবে যে, পরিবারবাদ প্রচারণার সুযোগ হয়ে সমালোচনার কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে? তাহলে, আবার প্রশ্ন আসে, কেন কংগ্রেস আত্মরক্ষামূলক অবস্থান নিলো? ভারতীয় রাজনীতিতে রাজবংশ আর নোংরা বা কুৎসিত শব্দ নয়। কংগ্রেস ছাড়াও অন্য অনেক দলে পরিবারতন্ত্র জারি রয়েছে। এমনকি, ভারতীয় জনতা পার্টিও এর বাইরে নয়। সর্বোপরি, কংগ্রেস বেশ কটি নির্বাচনে জিতেছে। যদিও সমালোচকরা রাজবংশীয় শাসন, রাহুল ও প্রিয়াঙ্কার মা সোনিয়া গান্ধীর বিদেশি বংশপরিচয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে কংগ্রেসের দিকে আঙুল তুলেছেন। তাই এসব ইস্যু নিয়ে কথা বলাটা মৃত ঘোড়াকে চাবুক মারার মতো। প্রিয়াঙ্কার নাম তৃতীয় অনুচ্ছেদে উল্লেখ করার যে কারণই থাকুক না কেন, একটা বিষয় সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত, সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তার কংগ্রেসে যোগদান দলীয় কাজে তার অবস্থানকে সুদৃঢ় করবে এবং সামনের সারির একজন সক্রিয় সদস্য হিসেবে দুই দশক ধরে দলীয় রণকৌশল ও নীতিনির্ধারণী মহল থেকে মুক্তি দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করবে। এটি কংগ্রেসের শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের ভবিষ্যতের জন্য ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে। তাছাড়া এই পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে প্রতিষ্ঠাকালীন পরিবার ছাড়া কংগ্রেসের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব পোক্ত হতে পারে না এবং বহুদিন ধরে জপে আসা স্লোগান ‘প্রিয়াঙ্কা লও, কংগ্রেস বাঁচাও’ বাস্তবায়ন করতে প্রিয়াঙ্কা গান্ধী তুরুপের তাস হিসেবে কাজ করবে। সাধারণ সম্পাদক হিসেবে প্রিয়াঙ্কা উত্তর প্রদেশের অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে পড়া পূর্বাঞ্চলের দায়িত্ব গ্রহণ করবেন, যেটি প্রাথমিকভাবে তিনটি রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করে। প্রথমত, ৮০টি সংসদীয় এলাকার প্রায় অর্ধেক আসন এই এলাকার অন্তর্ভুক্ত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং গেরুয়াবসনধারী মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথের মতো বিজেপির হিন্দুত্ববাদী দুজন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধিসহ প্রায় এক ডজন দলীয় সহকর্মীর প্রতিনিধি আসন বরাদ্দ রয়েছে। দ্বিতীয়ত, এখানে উপস্থিত উচ্চশ্রেণির জনগোষ্ঠী এবং মুসলিম জনগোষ্ঠীর অধিকাংশই বিজেপি, সমাজবাদী দল ও বহুজন সমাজবাদী দলের পক্ষে যে সমর্থন তা কংগ্রেস ছিনিয়ে আনতে চায়। তৃতীয়ত, এটা প্রিয়াঙ্কাকে তার ভাই রাহুল গান্ধী ও মা সোনিয়া গান্ধীর নির্বাচনি এলাকা যথাক্রমে আমেথি ও রায়বেরেলির ক্ষমতা ধরে রাখতে সাহায্য করবে, যা তিনি ১৯৯৯ সাল থেকে করে আসছেন। প্রথমবারের মতো, তিনি সাংগঠনিক ভূমিকা পালন করবেন, যা পূর্বেকার আমেথি ও রায়বেরেলির নির্বাচনি প্রচারণা অপেক্ষা কঠিন হবে। দলের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তার দল গঠনে ভূমিকা রাখার ক্ষমতা রয়েছে এবং এমন একটি প্রদেশ যেখানে সংসদীয় ও বিধানসভা নির্বাচনে সাফল্যের হার নির্ভর করে ধর্ম এবং বর্ণের ওপর। নিরুৎসাহজনক কর্মকাণ্ডের অন্তর্ভুক্ত কাজ যেমন এই প্রদেশে রাজনৈতিক সমীকরণ পরিবর্তন করা ও পাঁচ বছর আগের নির্বাচনে মাত্র ৪৪টি আসন পেয়ে কংগ্রসের শোচনীয় পরাজয় কাটিয়ে ওঠার ক্ষেত্রে তিনি জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে পারেন এবং তাদের সমর্থনকে ভোটে পরিণত করতে পারেন। প্রিয়াঙ্কার সঙ্গে ইন্দিরা গান্ধীর সাদৃশ্যতাকে জনগণের কাছে মোহনীয় করে তুলে নেহরু গান্ধী পরিবারের হারানো ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে পারেন। তার পদক্ষেপকে আরও জটিল করে তোলে প্রদেশে কংগ্রেসের সংখ্যাগরিষ্ঠ দল থেকে সংখ্যালঘু দলে পরিণত হওয়া। সমাজবাদী দল, বহুজন সমাজবাদী দল এবং বিজেপির ধর্ম ও বর্ণভিত্তিক রাজনৈতিক আদর্শ, যা ১৯৮০ সাল থেকে প্রচারিত হয়ে আসছে, তার আড়ালে কংগ্রেসের দলীয় আদর্শ ঢাকা পড়ে। কংগ্রেসের সাংগঠনিক কাঠামো ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। যদিও রাহুল গান্ধী তার সহোদরকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে উত্তর প্রদেশের পূর্বাঞ্চলে নিয়োগ দিয়ে তার উদ্দেশ্য সুস্পষ্টভাবে প্রকাশ করেছেন, এসপি ও বিএসপি কর্তৃক সংগঠিত সামপ্রতিক নির্বাচনি জোট থেকে সরে যাওয়ার পরও তিনি প্রদেশের ক্ষমতা সহজে হাত ছাড়া করতে চান না। প্রকৃতপক্ষে, রাহুল গান্ধী প্রিয়াঙ্কাকে রাজ্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিযুক্ত করে বিএসপি প্রধান মায়াবতীকে একটি শক্তিশালী বার্তা প্রেরণ করেন। কেননা, তিনি দলীয় সহযোগিদের সঙ্গে ভোট চুক্তি ও আসন বণ্টন বিষয়ে কংগ্রেসের ক্ষমতা সম্পর্কে সন্দিহান ছিলেন। প্রিয়াঙ্কাকে রাজ্যের পূর্বাংশের সাধারণ সম্পাদক এবং অপর একজন প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ তুর্কি জ্যোতিরাদিত্য সিন্ধিয়াকে পশ্চিমাংশে নিয়োগ দিয়ে তরুণ ভোটারদের আকৃষ্ট করার আগ্রহের বিষয়টি কংগ্রেস সন্দেহাতীতভাবে প্রকাশ করেছে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর স্বীকৃত অর্জনসমূহ তার পদমর্যাদা অনুযায়ী যথেষ্ট কিনা সে সম্পর্কে রাজনীতি মহলে বিতর্ক চলতে থাকবে। সত্যিই, তিনি ১৯৯৯ সালের রায়বেরেলি নির্বাচনি এলাকায় দলের ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের জন্য নির্বাচনি প্রচারণা সফলভাবে সম্পন্ন করেছিলেন, যে এলাকায় সোনিয়া গান্ধীর আত্মীয় অরুণ নেহরু ১৯৯৮ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেছিলেন। অপরপক্ষে ২০১৭ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস ও এসপি’র মধ্যে জোট গঠন করে উত্তর প্রদেশে কাঙ্ক্ষিত ফলাফল অর্জনে প্রিয়াঙ্কা ব্যর্থ হয়েছেন। এদিকে দায়িত্ব পাওয়ার পর আনুষ্ঠানিকভাবে রীতিমতো ঝড় তুলে উত্তর প্রদেশ অভিযান শুরু করেছেন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। এরই মধ্য দিয়ে শুরু হলো তার নির্বাচনি প্রচার। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই রোড শোয়ের পর কংগ্রেস সম্পর্কে জোটবদ্ধ দুই শিবির সমাজবাদী পার্টি ও বহুজন সমাজ পার্টির মনোভাবের পরিবর্তন ঘটতে পারে। কংগ্রেসকে জোটে নেওয়ার ভাবনা প্রাধান্য পেতে পারে। কংগ্রেস প্রিয়াঙ্কা গান্ধীকে ইন্দিরা গান্ধীর যোগ্য উত্তরাধিকারী হিসেবে বিবেচনা করে। এই ব্যাপারে সন্দেহ নেই যে নেহরু-গান্ধী পরিবার দলীয় কোন্দল ও নীতি বিভক্তির সমস্যায় জর্জরিত কংগ্রেসকে ঐক্যবদ্ধ করে দলীয় কাঠামো সুদৃঢ় করেছে। প্রশ্ন হচ্ছে, কংগ্রেসের প্রতিষ্ঠাতা নেহরু-গান্ধী পরিবার দলের ধারাবাহিক সাফল্যের হার নিশ্চিত করতে পেরেছে কিনা? তাছাড়া কংগ্রেসকে এই বাস্তবতা অনুধাবন করতে হবে যে প্রয়াত প্রধানমন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে ভারতীয় রাজনীতি উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের সম্মুখীন হয়েছে। বর্তমানে বৃহৎ জনতাত্ত্বিক পরিবর্তন তরুণ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষী ভোটারদের কংগ্রেসমুখী করেছে, যার প্রভাবে নেহরু-গান্ধী পরিবারের ওপর নির্ভরতা যথেষ্ট পরিমাণে কমে এসেছে। সেক্ষেত্রে প্রিয়াঙ্কার সাফল্যের দুটি গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি হবে উত্তর প্রদেশে কংগ্রেস তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দলের সমর্থক শিবিরের ভোট অর্জনের ক্ষেত্রে সফল হয় কিনা। সমপ্রতি ভারতে কয়েকটি রাজ্য নির্বাচনে কংগ্রেস ভালো ফলও করেছে। এতে দলের অবস্থান এখন কিছুটা শক্ত। কিন্তু তারপরও বিজেপিকে ধরাশায়ী করে ক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা এখনও দলটির জন্য এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। সবশেষে কী হয় এটিই দেখার বিষয়।

লেখক : শিক্ষক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত