শিরোনাম

একাত্তরের মার্চের সেই উত্তাল দিনগুলি

প্রিন্ট সংস্করণ॥মোহাম্মদ জয়নাল আবেদীন  |  ০১:০৬, মার্চ ১৩, ২০১৯

১৯৭১ সালে আমি বিক্রমপুরের শ্রীনগর কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র। ১ মার্চ বেলা বারোটার পরে পৌরনীতির ক্লাস নিতে আসেন প্রভাষক আবদুর রউফ খান স্যার। ক্লাসে এসেই তিনি বলেন-‘এইমাত্র রেডিওর খবরে শুনলাম-ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন বন্ধ করে দিয়েছেন।’ এ কথা শোনামাত্র আমাদের মধ্যে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। ক্লাসের সব ছাত্র উত্তেজিত হয়ে ওঠে। আমি সবাইকে নিয়ে সাথে সাথে ক্লাস থেকে বেরিয়ে আসি। আমরা স্লোগান দিতে থাকি-‘ইয়াহিয়ার ঘোষণা, মানিনা মানিনা’, ‘তোমার আমার ঠিকানা, পদ্মা-মেঘনা-যমুনা’, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, বাংলাদেশ স্বাধীন করো,’ ‘তোমার নেতা, আমার নেতা, শেখ মুজিব, শেখ মুজিব’। আমারা স্লোগান দিতে দিতে কলেজ প্রাঙ্গন ছেড়ে শ্রীনগর বাজারে চলে আসি এবং পুরো বাজার প্রদক্ষিণ করি। এ সময় শ্রীনগর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছাত্র-ছাত্রীরাও আমাাদের সাথে যোগ দেয়। অল্প সময়ের মধ্যে মিছিলের আকার বড় হয়ে যায়। বাজারের দোকানদার, সওদা করতে আসা লোকজনের অনেকেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে শরিক হয় মিছিলে। আমাদের স্বাধীনতার আগে ওটোই ছিল আমাদের শেষ ক্লাসে যাওয়া। দেশ স্বাধীন হওয়ার আগে আমরা আর ক্লাসে ফিরে যাইনি। আমরা ভাবতে থাকি এরপর কী করা যায়। আমরা বুঝতে পারছিলাম পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে আমাদের আর থাকা সম্ভব না। সবাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশের অপেক্ষায় ছিলাম। বন্ধুরা একত্রিত হই, কথা বলি, অস্থির চিত্ত নিয়ে ঘুরে বেড়াই। এরই মধ্যে ৩ মার্চ কলকাতার আকাশবাণী বেতারের খবরে জানতে পারি আগের দিন অর্থাৎ ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের সামনে কেন্দ্রীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ নেতৃবৃন্দ স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করেছেন। পতাকার ছবি ও বিবরণ দেখে আমরাও সিদ্ধান্ত নিই শ্রীনগরে স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করব। আমি ও আমার বন্ধু ছাত্রলীগ নেতা (পরে শ্রীনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে মরহুম) ফজলুল হক ঢালি সেলিম ঢাকায় গিয়ে আমাদের এলাকা থেকে প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচিত সদস্য শাহ মোয়াজ্জেম হোসেনের সঙ্গে দেখা করে আমাদের পরিকল্পনার কথা জানাই। তাকে আমরা অনুরোধ করি শ্রীনগরে গিয়ে পতাকা উত্তোলন করার জন্য। কিন্তু তিনি আমাদের জানান যে, ওই সময়ে বঙ্গবন্ধু তাদেরকে ঢাকা ত্যাগ করতে নিষেধ করেছেন। তিনি আমাদেরকে পরামর্শ দিলেন ছাত্রলীগের কোনো কেন্দ্রীয় নেতাকে নিয়ে গিয়ে পতাকা উত্তোলনের কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য। তার পরামর্শ মতো আমরা ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় অফিসে যাই। সেখানে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা, যার বড়ি আমাদের পাশের থানা লৌহজংয়ের কাজির পাগলায়, তাকে পেলাম। তিনি তখন পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য। আমাদের কথা শুনে তিনি বললেন, ১৩ মার্চ তিনি শ্রীনগরে এসে পতাকা উত্তোলন করবেন। আমরা শ্রীনগরে ফিরে এসে স্বাধীন বাংলার পতাকা তৈরির কাজে নামি। কাপড় কিনে পতাকার ডিজাইন বুঝিয়ে দিই শ্রীনগর বাজারের তখনকার নামি টেইলার মাষ্টার কাজী এমারত হোসেনকে। তিনি অত্যন্ত যত্ন সহকারে পতাকাটি তৈরি করে দিয়েছিলেন। এ সময় আমরা প্রতিদিন মিছিল মিটিং করতে থাকি। সবাইকে এটা বোঝাতে চাই যে, আমরা স্বাধীনতার যুদ্ধে নামতে যাচ্ছি, সবাই প্রস্তুত হোন।
এরই মধ্যে আসে ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। সে সময় শ্রীনগর-ঢাকা যোগাযোগ ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত খারাপ। বর্ষায় সরাসরি লঞ্চ চললেও শুকনো মৌসুমে আর সরাসরি ঢাকা যাওয়া যেতো না। শ্রীনগর থেকে নৌকা বা ছোট স্পীডবোটে আলমপুর, সেখান থেকে বড় লঞ্চে ঢাকা। তাই রেসকোর্সের ওই জনসভায় যাওযা হয়নি। তাছাড়া পত্রিকার খবরে জেনেছিলাম বঙ্গবন্ধুর বক্তৃতা রেডিওতে সরাসরি সম্প্রচার করা হবে। আমরা অধীর আগ্রহ নিয়ে রেডিও সেটের সামনে অপেক্ষা করি। কিন্তু হতাশ হই। রেডিও বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করলো না। রাতেই খবর পেলাম পরদিন সকালে বঙ্গবন্ধুর ভাষণ প্রচার করা হবে। আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম এ ভাষণ বাজারে মাইকের মাধ্যমে প্রচার করব। আশুতোষ পোদ্দারের মাইক এনে লাগানো হলো শ্রীনগর বাজারের দক্ষিণ পাশে কাঠপট্টিতে। যথাসময়ে রেডিওতে ভেসে এলা বঙ্গবন্ধুর জলদ গম্ভীর কণ্ঠস্বর-‘ভাইয়েরা আমার’। প্রায় বিশ মিনিটের সে ঐতিহাসিক ভাষণ কয়েক শ’ মানুষ সেদিন শুনেছিল। বঙ্গবন্ধুর ভাষণের পর আমদের মনোবল আরো বেড়ে যায়। আমার নিশ্চিত হয়ে যাই এবার আমরা একটি স্বাধীন স্বদেশ পাবই। এদিকে বঙ্বন্ধুর ভাষণের পর পূর্ব পাকিস্তানের প্রশাসনের ওপর পাকিস্তানী সরকারের কর্তৃত্ব চলে যায়। তাঁর নিদেশ মোতাবেক চলতে থাকে সবকিছু। স্কুল কলেজ বন্ধ হয়ে যায়, খাজনা-ট্যাক্সও আর কেউ দিতে আসেনা। তহসিল অফিসের কর্মচারিরা অলস সময পার করতে থাকে। একটি নতুন দেশ পাবার ব্যকুলতা লক্ষ্য করি সবার মধ্যে। তখন আমি মেটামুটি পরিচিত হয়ে গেছি। বয়স্করা দেখা হলেই জিজ্ঞেস করতেন- কি বাবাজী কি হইতাছে? পারবা তো স্বাধীন করতে? বলতাম- ইনশাল্লাহ্।অবশেষে ঘনিয়ে এলো সেই প্রতীক্ষিত দিন। ১৩ মার্চ সকালে এমারত ভাই তার নিপুন হাতে তৈরি করা আমাদের জাতীয় পতাকা পৌঁছে দিলেন ছাত্রলীগ কার্যালয়ে। ঘনসবুজ জমিনে লাল বৃত্তের মধ্যে হলুদ কাপড়ে বাংলাদেশের মানচিত্র খচিত বিশাল আকৃতির সে পতাকা পেয়ে আমাদের আনন্দ দেখে কে! জয়বাংলা স্লোগানে আমরা আমদের উচ্ছ্বাস প্রকাশ করি। আগেই মাইকযোগে প্রচার করা হয়েছিল, শ্রীনগর থানা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের উদ্যোগে ১৩ মার্চ শ্রীনগর খেলার মাঠে (বর্তমানে শ্রীনগর স্টেডিয়াম) বিকাল তিনটায় জনসভা হবে। ফলে ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীরাও এসে জমায়েত হয়। সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত মোতাবেক আমি জনসভায় সভাপতিত্ব করি। স্থানীয় ছাত্রলীগ ও ছাত্র ইউনিয়নের নেতাদের বক্তৃতার পর প্রধান বক্তা কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগ নেতা আবদুস শহিদ খান সেন্টু বক্তৃতা শুরু করেন। এক পর্যায়ে তিনি সবাইকে বাম হাত বুকে ও ডান হাত উপরে তুলে স্বদেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন উৎসর্গ করার প্রত্যয়ে শপথ বাক্য পাঠ করান। এরপর তিনি স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করার জন্য প্রস্তুতি নেন। ঠিক সে মুহূর্তে পাকিস্তানের জাতীয় পতাকা নিয়ে সেখানে হাজির হন শ্রীনগরের পরিচিত মুখ আনিসুর রহমান তালুকদার। যিনি আনিস মেকার হিসেবেই বেশি পরিচিত ছিলেন। তিনি এসে বললেন-‘আগে এই পতাকা পোড়াতে হবে। এই পতাকা ধ্বংস করেই আমারা আমাদের স্বাধীন দেশের পতাকা আকাশে ওড়াবো’। আমরা সেটাই করলাম। চোখের সামনে মুহূর্তেই পাকিস্তানের পতাকা পুড়ে ছাই হয়ে গেল।এরপর সেন্টুভাই জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দিলেন শেষ ফাল্গুনের ধুলি ওড়ানো বাতাসে আমাদের স্বপ্নের স্বাধীন দেশের পতাকা পত পত করে উড়তে লাগলো। আমরা সামরিক কায়দায় পতাকাকে স্যালুট করলাম। এ সময় সেখানে উপস্থিত ছিলেন ছাত্রলীগ নেতা মোফাজ্জল হোসেন, মোহাম্মদ আলী, শেখ মোহাম্মদ ইদ্রিস, আবদুস শহিদ ভূঁইয়া, কেফাজউদ্দিন মাতব্বর প্রমুখ। স্বাধীন বাংলার পতাকাটি অনেকদিন পর্যন্ত সেখানে উড়েছিল। মে মাসের ৯ তারিখে হানাদার পাক বাহিনীর সৈন্যরা শ্রীনগরে আসার আগ পর্যন্ত তা উত্তোলিত ছিল।
পতাকা উত্তোলনের সে স্মৃতি আমাদেরকে আজো আবেগ তাড়িত করে। কী এক অসীম সাহসে আমরা নেমেছিলাম এক কঠিন যুদ্ধে। কবি হেলাল হাফিজ ঠিকই লিখেছেন-‘এখন যৌবন যার মিছিলে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়, এখন যৌবন যার যুদ্ধে যাবার তার শ্রেষ্ঠ সময়’। সে সময় আমাদের যৌবন ছিল, ছিল বুক ভরা সাহস। আমরা মায়ের মুক্তির জন্য যুদ্ধে নেমেছিলাম। মায়ের বিপদে তাঁকে রক্ষা করতে সন্তানই তো ঝাঁপিয়ে পড়ে। ৫২ তেও তো মায়ের ভাষার মর্যাদা রক্ষায় তার সন্তানেরা রাজপথে নেমেছিল, জীবন উৎসর্গ করেছিল। এলো ২৫ মার্চের ভয়ঙ্কর রাত। পরদিন খবর পেলাম ঢাকায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর নারকীয় হত্যাযজ্ঞের। আমরা সিদ্ধান্ত নিই যুদ্ধ যাবার। তারপর একদিন বেরিয়ে পরি যুদ্ধের ময়দানের খোঁজে। চলে যাই ভারতের আগরতলায়। সে আরেক ইতিহাস। পরবর্তিতে তা নিয়ে আলোচনা করা যাবে। আজ স্বাধীনতার সাতচল্লিশ বছর পর একান্তে বসে ভাবি, যে বাংলাদেশ নির্মান করতে চেয়েছিলেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, যে সুখি সমৃদ্ধ একটি দেশের ছবি তিনি দেখিয়েছিলেন এদেশের মানুষকে, আমরা কী সেই দেশ পেয়েছি? বঙ্গবন্ধু দেশটাকে গড়ে তোলার সময় পাননি। সে সময় তাকে দেয়া হয়নি। কুচক্রিরা তাকে হত্যা করে বাংরাদেশকে কা্লারিহীন নৌকায় পরিণত করতে চেয়েছিল। কিন্তু ওরা জানতো না একজন মানুষকে হত্যা করে একটি জাতিকে নিঃশেষ করা যায় না। নেতার আদর্শই তার পরবর্তি প্রজন্মকে সঠিক পথে চলার দিক নির্দেশনা দেয়। বঙ্গবন্ধুর আদর্শই আমাদের পথ চলার পাথেয়।

লেখক: মুক্তিযোদ্ধা, সাবেক উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক, বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক লি.।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত