শিরোনাম

রোহিঙ্গা নিয়ে ভাবনা স্থায়ী সমাধানের পথ খুঁজতে হবে

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ১২:৩৮, মার্চ ১২, ২০১৯

মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা ১১ লাখ ছাড়িয়েছে। এদের বড় অংশেরই স্থান হয়েছে কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়া উপজেলায়। ফলে এ দুই উপজেলার সাড়ে পাঁচ লাখ স্থানীয় বাসিন্দা কার্যত অসহায় সংখ্যালঘুতে পরিণত হয়েছে। তাদের জীবনে নেমে এসেছে চরম দুঃখ-কষ্ট ও দুর্ভোগ। এখানকার বনাঞ্চল এরই মধ্যে প্রায় নিঃশেষ হয়ে গেছে। স্থানীয়দের বহু কৃষি জমিও চলে গেছে রোহিঙ্গাদের দখলে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়েছে দিনমজুর শ্রেণির মানুষ। তাদের কাজ নেই বললেই চলে। মজুরিও অনেক কমে গেছে। ছোটোখাটো কলকারখানা, দোকানপাট, হোটেল-রেস্তোরাঁয় আগে স্থানীয় অনেকের কাজ হলেও এখন রোহিঙ্গারা সেসব কাজ নিয়ে নিচ্ছে। কম পয়সায় পাওয়া যায় বলে মালিকরাও তাদেরই নিয়োগ দিচ্ছে। পাশপাশি আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি স্থানীয়দের বড় মাথাব্যথার কারণ হয়ে উঠেছে। চুরি বেড়ে যাওয়ায় গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগি পালনও প্রায় বন্ধ হতে চলেছে। এ অবস্থায় অনেকে এলাকা ছেড়ে চলে গেছে, অনেকে যাওয়ার কথা ভাবছে। কারণ তারা জানে না, কবে এ সমস্যার সমাধান হবে কিংবা আদৌ হবে কি না? এ সবই বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া খবর।প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা আগে থেকেই বাংলাদেশে অবস্থান করছিল। মিয়ানমারের সামরিকজান্তার নির্যাতনের শিকার হয়ে এসব রোহিঙ্গা বিভিন্ন সময়ে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। এর আগে ১৯৭৯ ও ১৯৯১ সালে রোহিঙ্গারা বড় সংখ্যায় বাংলাদেশে এসেছিল। পরবর্তীকালে তাদের একটি অংশ মিয়ানমারে ফিরে গেলেও অনেকেই থেকে যায় বাংলাদেশে। ২০১৭ সালের আগস্ট মাস থেকে রোহিঙ্গারা নতুন করে আসতে শুরু করে। এ সময় সবচেয়ে বেশি রোহিঙ্গা এসেছে। সংখ্যায় সাত লাখের ওপরে। মিয়ানমারে সেনাবাহিনী যখনই নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়, তখনই তারা দলে দলে বাংলাদেশে চলে এসে টেকনাফ ও উখিয়া অঞ্চলে বসতি গড়ে তোলে। এছাড়া রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পালিয়ে আসার প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরেই। ফলে বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের প্রকৃত সংখ্যা কত, তা নির্ণয় করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তাদের অনেকে কক্সবাজার থেকে দেশের অন্যান্য এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে। একটি অংশ নানা পন্থায় বাংলাদেশি পাসপোর্ট জোগাড় করে পাড়ি জমিয়েছে সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে। তাদের সংখ্যা প্রায় দুই লাখ হতে পারে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি সৌদি সরকার বাংলাদেশি পরিচয়ে যাওয়া বিপুলসংখ্যক রোহিঙ্গা নাগরিককে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নিয়েছে বলে সংবাদ মাধ্যমগুলো জানিয়েছে।রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য এক বিরাট সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থনৈতিক সমস্যার পাশাপাশি সামাজিক সমস্যাও প্রকট হয়ে উঠছে। এসব রোহিঙ্গা নাগরিক বিভিন্ন কায়দায় স্থানীয়দের সঙ্গে মিশে গিয়ে স্থায়ী অধিবাসী হওয়ারও চেষ্টা করছে। যদিও জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকার একটি নির্দিষ্ট স্থানে রোহিঙ্গাদের অবস্থানের ব্যবস্থা করেছে, কিন্তু সে ব্যবস্থা কখনো কখনো অকার্যকর হয়ে পড়ছে। এটা ঠিক যে, মানবিক কারণেই আরাকান রাজ্য থেকে বিতাড়িত এসব রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়েছে বাংলাদেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মানবিকতার দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন এর মাধ্যমে। তাই বলে এ সমস্যা বছরের পর বছর বয়ে বেড়াতে হবে- এমন কোনো কথা নেই। বাংলাদেশ এ সমস্যার সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দেন-দরবার চালিয়ে আসছে শুরু থেকেই। রোহিঙ্গাদের তাদের স্বদেশে ফেরত পাঠানোর জন্য আন্তর্জাতিক জনমত গড়ে তোলারও চেষ্টা করে চলেছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়ার জন্য মিয়ানমারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে আসছে অনবরত। কিন্তু এ ব্যাপারে মিয়ানমার বরাবরই টালবাহানার আশ্রয় নিয়েছে এবং এখনো তা করছে। বিশ্বসমপ্রদায়ও এ ব্যাপারে মিয়ানমারের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে। এরইমধ্যে জাতিসংঘের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গাদের শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে বাংলাদেশের কাছে। এই স্বীকৃতি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রোহিঙ্গাদের অবাধে চলাফেরা, কর্মসংস্থানসহ বেশকিছু অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়ে যাবে। বাংলাদেশে তাদের স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। বস্তুত মিয়ানমারও তাই চাইছে। তারা চাইছে, বিতাড়িত রোহিঙ্গারা যাতে আর কখনো মিয়ানমারে ফিরতে না পারে। এদিকে টেকনাফের অদূরে ভাসানচর নামে একটি স্থানে রোহিঙ্গাদের বসবাসের ব্যবস্থা করার খবর পাওয়া যাচ্ছে। সেজন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নির্মাণও নাকি শেষপর্যায়ে। তবে, এটা রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী কোনো সমাধান নয়। টেকনাফ-উখিয়া থেকে হয়তো তাদের সরিয়ে নেয়া সম্ভব হবে। কিন্তু তারা থেকে যাবে বাংলাদেশের ওপর বোঝা হয়েই। ফলে অনেকেই মনে করছেন সরিয়ে নেয়া নয়, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর দিকেই আমাদের সরকারের জোর দেয়া উচিত। বাংলাদেশ একটি ছোট্ট ভূখণ্ড। লোকসংখ্যা প্রায় ১৭ কোটি। অর্থনীতির অবস্থাও ততটা শক্ত নয়। এ অবস্থায় বাংলাদেশের পক্ষে এত বড় ঝুঁকি নেয়া কি কোনোভাবেই সম্ভব? এ বিষয়ে তাই সরকারকে ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত