অগ্রগতি নেই এমপি খুনের তদন্তে

কে এই মাসুদ

প্রিন্ট সংস্করণ॥আব্দুল লতিফ রানা | ১১:৫৬, জানুয়ারি ১১, ২০১৭

সুন্দরগঞ্জের সংসদ সদস্য মো. মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন খুনের ঘটনায় ৪৫ জনকে আটক করা হলেও দীর্ঘ ১০ দিনেও এই খুনের রহস্য উদ্ধার করতে পারেনি তদন্তকারী সংস্থা। তবে ৮ জনকে গ্রেফতার দেখিয়ে ৭ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে তদন্তকারী কর্মকর্তাগণ।গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে পুলিশের মহা-পরিদর্শক (আইজিপি) একেএম শহিদুল হক বলেছেন, এমপি লিটন হত্যার ঘটনায় তেমন কোনো অগ্রগতি নেই। এই হত্যাকা-টি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। এটাকে আইনশৃংখলা পরিস্থিতির অবনতি বলা যাবে না। বরং দেশে এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে আইনশৃংখলা পরিস্থিতি ভালো আছে।

সূত্র জানায়, এমপি লিটন হত্যাকাণ্ডের পর থেকে পুলিশ সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে জামায়াত-শিবির নেতকার্মীদের আটক করে। আর আওয়ামী লীগ ও তার অঙ্গ সংগঠনের কয়েকজন নেতাকেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা থানায় ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেছে। সুন্দরগঞ্জ উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের বেশ কয়েকজন দলীয় নেতাকর্মী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সন্দেহের তালিকায় রেখেছে পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এ খুনের ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ধারে আইন-শৃঙ্খলাবাহিনী জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ৪৫ জনকে আটক করে। কিন্তু এখন পর্যন্ত আসল খুনিরা ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, লিটন হত্যাকা-ের সুরাহা না হওয়ায় স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে। এরই মধ্যে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সহ-সভাপতি মো. আহসান হাবীব মাসুদকে পুলিশ গত শুক্রবার তার নিজ বাড়ি থেকে আটক করে। এরপর তাকে লিটন হত্যামামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিনের রিমান্ড চেয়ে আদালতে পাঠায়। আদালত তার সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। গ্রেফতারকৃত মাসুদ এখন পুলিশ হেফাজতে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

এছাড়া, গত বৃহস্পতিবার উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক শহীদুল ইসলামকে নিজ বাড়ি থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি টিম ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের পর ছেড়ে দিয়েছে। অপরদিকে স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের মাঝে চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। তারা বলছেন, এমপি লিটন হত্যার ১০ দিন পেরিয়ে গেলেও প্রকৃত খুনিরা সনাক্ত ও গ্রেফতার হয়নি। আর হত্যাকা-ে ব্যবহৃত দুটি পালসার মোটরসাইকেলও উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা। তারা আরো বলছেন, আওয়ামী লীগের সেরকম কোনও বিভেদ ছিল না। অন্য কোনও দলের বিরুদ্ধেও হত্যাকা- ঘটানোর কোনও অভিযোগ নেই। আর এমপি লিটন যেহেতু জামায়াত-শিবিরকে এলাকায় রুখে দিয়েছিলেন সে কারণেই জামায়াত-শিবির চক্রের দিকেই আমাদের সন্দেহ।

এদিকে পুলিশের আইজি, এমপি মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন খুনের মামলায় উল্লেখযোগ্য কোনও অগ্রগতি হয়নি বলে দাবি করে বলেছেন, এমপি লিটন হত্যাকা-টি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা। আমাদের পুলিশের সকল সংস্থা এ হত্যাকা-ের তদন্ত করছে। এর যদি কোনো অগ্রগতি হয়, সাংবাদ মাধ্যমকে জানানোর মতো অবস্থা হয়, তাহলে অবশ্যই আমরা আপনাদের ডেকে তা জানাবো। তিনি আরও বলেন, এখন তদন্ত চলছে। এ হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত জঙ্গি, জামায়াত নাকি দলীয় কেউ সব বিষয় সামনে রেখে নিরপেক্ষ এবং পেশাদারিত্বের সাথে তদন্ত কার্যক্রম চালাচ্ছে আইনশৃংখলাবাহিনী।

আর সুন্দরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিয়ার রহমান আমার সংবাদকে বলেন, আমি আইজি স্যারের সঙ্গে আছি। এ হত্যাকা- সম্পর্কে আইজি স্যার বলেছেন। এরপর তিনি বলেন, এমপি লিটন হত্যার ঘটনার পর থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা তদন্তকাজ চালাচ্ছেন। ইতোমধ্যে আটক, গ্রেফতার ও রিমান্ডে এনে বিভিন্নজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। আমরা আশা করছি খুব অল্প সময়ে হত্যার রহস্য উন্মোচিত হবে। আর এ হত্যাকা-ের পর সুন্দরগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে জামায়াত-শিবির ও আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা মাসুদসহ প্রায় ৪৫ জনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়। এদের মধ্যে আটজনকে গ্রেফতার দেখিয়ে সাতদিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

সুন্দরগঞ্জের সর্বত্র আতঙ্ক: এমপি লিটন খুনের পর সুন্দরগঞ্জের সর্বত্র এখন আতঙ্ক বিরাজ করছে। প্রকাশ্যে সাধারণ মানুষ কথা বলতে ভয় পাচ্ছেন। রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ও প্রশাসনের লোকজনের মধ্যে বেশি ভয় বিরাজ করছে। তারা আশঙ্কা করছেন, যে কোনও সময় দুর্বৃত্তরা হামলা চালাতে পারে। এমপি লিটনকে বাড়ির বৈঠকখানায় ঢুকে গুলি করে হত্যা করা হলো, সেখানে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা কোথায়? সেইসঙ্গে নয় দিনেও এমপি লিটন হত্যাকা-ের রহস্যের জট না খোলায় স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মাঝে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে স্থানীয় আওয়ামী লীগের এক সমর্থক বলেন, আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি আমরা। সন্ধ্যার আগেই বাড়িতে ফিরে যান। রাতে কাছের কোনও আপনজন গেলেও পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়ার পরই দরজা-জানালা খোলেন। দিনেও একা কোথাও যেতে ভয় পাই। বিশেষ করে এমপি লিটনের মৃত্যুর পর আরও আতঙ্কিত হয়ে পড়েছি। প্রকাশ্যেই জামায়াত-শিবিরের ক্যাডাররা মোটরসাইকেলে বাড়ির সামনে মহড়া দেয় বলেও জানান তিনি। সুন্দরগঞ্জের এক পুলিশ সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে মুঠো ফোনে বলেন, সুন্দরগঞ্জের তদন্তকেন্দ্রের নিরস্ত্র চার পুলিশ সদস্যকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় এখনও আমাদের মাঝে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তবে আমরা আগের চেয়ে ওইসব ঘটনা প্রতিরোধে অনেক সক্ষম।

লিটন খুনের প্রত্যক্ষদর্শী দুই কিশোরের চাঞ্চল্যকর তথ্য: আওয়ামী লীগের সংসদ সদস্য (এমপি) মঞ্জুরুল ইসলাম লিটনকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। এ হত্যাকা- নিয়ে প্রত্যক্ষদর্শী দুই কিশোরের বর্ণনায়ও উঠে এসেছে দুঃসাহসিক এ হত্যাকাণ্ডের খণ্ডচিত্র। ঘটনার সময় শনিবার বিকাল ৪টা। পাঁচজন অপরিচিত লোক সংসদ সদস্যের বাড়ির সামনে রেললাইনে বসেছিলেন। তারা দুটি মোটরসাইকেলে করে সেখানে আসেন। দীর্ঘসময় ধরে তারা বারবার মোবাইল ফোনে কথা বলছিলেন। তাদের মধ্যে দুজন মাঝেমধ্যে হাঁটাহাঁটি করছিলেন এবং রেল ঘুমটির পাশে সড়কের ওপর মোটরসাইকেলের পাশে দাঁড়িয়ে কথা বলছিলেন। এ সময় জুয়েল রানা ও সাইফুলসহ ৮ থেকে ৯ জন কিশোর এমপি লিটনের দেয়া ক্রিকেট খেলার সামগ্রী দিয়ে তার বাড়ির বাইরের উঠোনে ক্রিকেট খেলছিল। তখন এমপি লিটন একটি চেয়ারে বসে খেলা দেখছিলেন। বিকাল আনুমানিক সাড়ে ৫টার দিকে মোটরসাইকেল নিয়ে তিনজন অপরিচিত ব্যক্তি এমপির বাড়ির বাইরের উঠোনে এসে দাঁড়ায়। একজন মোটরসাইকেলে বসে থাকেন। দুজন এমপিকে বৈঠকখানায় যেতে বলেন।

এ সময় এমপি লিটন বলেন, ‘কী বলার এখানে বললেই হবে’। ঘাতকরা একপর্যায়ে জরুরি কথা আছে জানিয়ে অনেকটা জোর করেই এমপি লিটনকে বাসবভনের বৈঠকখানায় নিয়ে যান। কিছুক্ষণের মধ্যে কিশোররা ঘরের ভেতর থেকে কয়েকটি গুলির শব্দ ও চিৎকার শুনতে পান। এসময় দৌঁড়ে ঘরে যাওয়ার চেষ্টা করলে খুনিরা অস্ত্র উঁচিয়ে এক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে মোটরসাইকেলযোগে পালিয়ে যায়। এরপর কিশোররা ঘরে গিয়ে দেখতে পায় এমপি লিটন বাড়ির ভেতরের উঠোনের দিকে ছুটে যাচ্ছেন। পরে ওই কিশোররা ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে খুনিদের ধাওয়া করলেও তারা দুটি মোটরসাইকেলে চড়ে দ্রুত পালিয়ে যায়। আশপাশের লোকজন ছুটে এসে এমপি লিটনকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। এর দুই ঘণ্টা পর সেখানেই চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান।

এমপি লিটন খুনের ঘটনায় গ্রেফতার কে এই মাসুদ? চাঞ্চল্যকর সংসদ সদস্য মনজুরুল ইসলাম লিটন হত্যাকা-ে জড়িত সন্দেহে স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা আহসান হাবীব মাসুদকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এরপরই স্থানীয় আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের বিষয়টি সামনে চলে আসে। তবে দলটির স্থানীয় নেতারা বলছেন, জেলা কিংবা থানা আওয়ামী লীগে দলীয় কোনও কোন্দল নেই। ব্যক্তিস্বার্থে কেউ যদি বিপথগামী হয়, সেই দায় দল নেবে না। গ্রেফতারকৃত মাসুদের বাবার নাম মৃত আফতাব উদ্দিন। সুন্দরগঞ্জের বেলকা ইউনিয়নের পশ্চিম বেলকা গ্রামে তাদের বাড়ি। রংপুর কারমাইকেল বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের ছাত্র থাকা অবস্থায় জাসদ ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এরপর গত ২০০০ সাল থেকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা সদরে বসবাস শুরু করেন। তার স্ত্রী আঞ্জুমান আরাও স্থানীয় একটি প্রাথমিক স্কুলের শিক্ষিকা। তিনি সুন্দরগঞ্জে থাকার সময় জাতীয় পার্টির রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হন। জামায়াত অধ্যুষিত এলাকায় জামায়াত নেতাদের সঙ্গে তার দহরম-মহরম ছিল।

গত ২০০৯ সালের উপজেলা নির্বাচনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী হিসেবে এবং জামায়াতের সমর্থন নিয়ে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার ভাইস চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এরপরই ২০১০ সালে মাসুদের নেতৃত্বে এমপি মনজুরুল ইসলাম লিটনের ওপর দলবল নিয়ে হামলা চালান। এ ঘটনায় তার বিরুদ্ধে সুন্দরগঞ্জ থানায় একটি হত্যাচেষ্টা মামলা করেছিলেন এমপি লিটন। তখন গাইবান্ধা-১ আসনের এমপি ছিলেন জাতীয় পার্টির কর্নেল (অব.) কাদের খান। আর তখন লিটন ছিলেন সুন্দরগঞ্জ উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি। গত ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে লিটন সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার অল্প কদিনের মধ্যেই আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন স্বেচ্ছাসেবক লীগে যোগ দেন মাসুদ। এরপর এমপি লিটনের ঘনিষ্ঠভাজন হয়ে ফায়দা হাসিলের চেষ্টায় লিপ্ত হন। কিন্তু লিটন তাকে তেমন পাত্তা দিতেন না বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানিয়েছে।

অপরদিকে ২০১৫ সালের অক্টোবরে শিশু সৌরভের গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় এমপি লিটনের বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে মাসুদও একজন। জামায়াত-শিবির, জাতীয় পার্টির কিছু নেতাকর্মীর সঙ্গে সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার বর্তমান মেয়র ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল্লাহ আল মামুনও তার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছেন। আর এমপি লিটনের নাম ভাঙিয়ে মাসুদ সুবিধা আদায় ও নিয়োগবাণিজ্যের চেষ্টা করলে এমপি লিটন বেশ কবার মারধরের চেষ্টা করেন। কিন্তু মাসুদ উপস্থিত নেতাকর্মীদের মধ্যস্থতায় এমপি লিটনের রোষানল থেকে ছাড়া পান।

উল্লেখ্য, গত ৩১ ডিসেম্বর সন্ধ্যা ৬টার দিকে সুন্দরগঞ্জ উপজেলার সর্বানন্দ ইউনিয়নের শাহবাজ এলাকায় নিজ বাড়িতে দুর্বৃত্তদের গুলিতে মঞ্জুরুল ইসলাম লিটন আহত হন। পরে আশঙ্কাজনক অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় লিটনের বোন তাহমিদা বুলবুল বাদি হয়ে অজ্ঞাত ৪ থেকে ৫ জনকে আসামি করে সুন্দরগঞ্জ থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলাটি একাধিক সংস্থা তদন্ত করছেন।



 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
close-icon