শিরোনাম

তারেককে ফিরিয়ে আনতে সমস্যা হবে না : অ্যাটর্নি জেনারেল

নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ১৬:১৩, অক্টোবর ১১, ২০১৮

রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা মাহবুবে আলম বলেছেন, মৃত্যুদণ্ডের ক্ষেত্রে অনেক দেশই দণ্ডিতকে পলিটিক্যাল অ্যাসাইলাম বা রাজনৈতিক আশ্রয় দেওয়া হয়। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক রহমানের তো যাবজ্জীবন সাজা হয়েছে। তাই তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনতে সমস্যা হবে না।

বৃহস্পতিবার (১১ অক্টোবর) অ্যাটর্নি জেনারেল তার কার্যালয়ে সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। এসময় পুরো রায় দেখে পর্যালোচনা করে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সাজা বাড়ানোর আবেদনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।

মামলার ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে এলে দ্রুত শুনানির মাধ্যমে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে জানিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, রায়ে যাদের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে তাদের আদালত থেকে বিনা খরচে রায়ের কপি দেওয়া হয়। আর তারা যদি আপিল ফাইল করে, তবে সেটাও ডেথ রেফারেন্স হিসেবে হাইকোর্টে আসবে। সেক্ষেত্রে আমরা রাষ্ট্রপক্ষ যত দ্রুত সম্ভব শুনানির জন্য পদক্ষেপ নেব। তবে এটাতে পেপারবুক তৈরি করার বিষয় রয়েছে, সেগুলো আদালতের বিষয়। মামলার আপিল শুনানিতে আমাদের পদক্ষেপগুলো আমরা নেব।

তিনি আরও বলেন, এ মামলায় তারেক রহমানকে যদি নাটের গুরু বলা হয়ে থাকে, তবে সেটা রায় পর্যালোচনা করে দেখব। রায় পড়ে যদি দেখি তারও মৃত্যুদণ্ড হওয়া উচিত ছিল, তবে তার দণ্ড বাড়াতে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে আপিল করব। এর সবটাই নির্ভর করবে রায়টি পড়ার পর।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, এই মামলায় একজন পাকিস্তানি নাগরিকেরও সাজা হয়েছে। এখানে আমরা অনুমান করছি, বাংলাদেশের ক্ষতি করার জন্য, বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করার জন্য পাকিস্তান এখনও নিবৃত্ত হয়নি। পাকিস্তান এরই মধ্যে সন্ত্রাসবাদে জড়িয়ে পড়েছে। আমরা সেক্ষেত্রে জেএমবিসহ জঙ্গিদের দমন করতে সফল হয়েছি। সাজাপ্রাপ্ত ওই পাকিস্তানি নাগরিককে নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।

পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টো নিজে খুন করেননি, কিন্তু খুন করিয়েছেন বলে তাকেও মৃত্যুদণ্ড পেতে হয়েছে উল্লেখ করে মাহবুবে আলম বলেন, তাই আমারও মনে হয়, তারেকের অন্যান্যদের মতো ফাঁসি হওয়া উচিত ছিল। আজ বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় এসেছে, রাষ্ট্রীয় সমর্থন, প্ররোচনা ও অর্থায়নে এই হামলা হয়েছে।

এদিকে, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলায় তারেক রহমানের সর্বোচ্চ সাজা না হওয়ায় আওয়ামী লীগের অনেক নেতাকর্মী অখুশি হলেও আইনজ্ঞসহ কেউ কেউ এমনটি ভেবে সন্তুষ্ট যে এতে বিএনপির দ্বিতীয় শীর্ষ নেতাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সহজ হবে। তাঁরা বলছেন, বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মৃত্যুদণ্ড হলে তাঁকে দেশে ফেরত আনা হয়তো সম্ভব হতো না। বঙ্গবন্ধুর পলাতক খুনিদের ফেরত আনার ক্ষেত্রে বড় অন্তরায় হিসেবে কাজ করছে তাদের সর্বোচ্চ সাজা।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সদস্য দেশগুলোসহ বেশ কিছু দেশ মৃত্যুদণ্ডবিরোধী। ওই সব দেশে অবস্থানরত কোনো বিদেশির যদি নিজ দেশে মৃত্যুদণ্ড হওয়ার আশঙ্কা থাকে তবে সেই ব্যক্তিকে তারা প্রত্যর্পণ করে না। যুক্তরাজ্য ইইউ থেকে বেরিয়ে গেলেও মৃত্যুদণ্ডবিরোধী অবস্থান বদলায়নি। মৃত্যুদণ্ড হওয়ার আশঙ্কা থাকলে যুক্তরাজ্য সাধারণত কোনো বিদেশিকে তার দেশে ফেরত পাঠায় না।

যুক্তরাজ্য গোপনীয়তা নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করায় ব্যক্তিবিশেষের রাজনৈতিক আশ্রয় বা ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া বিষয়ে তথ্য দেয় না। তবে যুক্তরাজ্যে অভিবাসন ও রাজনৈতিক আশ্রয় বিষয়ে কাজ করেন, এমন একজন আইনজীবী বলেন, আদালতের রায়ের পর বাংলাদেশ এবার আরো জোর দিয়ে ব্রিটিশ সরকারকে বলতে পারবে যে তারেক রহমানের মৃত্যুদণ্ড হয়নি। তাই দেশে ফেরত পাঠালে তাঁর জীবনের ঝুঁকি নেই। তবে ব্রিটিশ সরকার নয় বরং অভিবাসনবিষয়ক আদালতই এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।

ওই আইনজীবী আরো বলেন, তারেক রহমান যে যুক্তরাজ্যে রাজনৈতিক আশ্রয়ের জন্য আবেদন করেছেন, এটি বেশ আগেই প্রকাশ পেয়েছে। তাঁর কাছে বাংলাদেশের কোনো পাসপোর্ট নেই। বর্তমান প্রেক্ষাপটে তিনি ফিরতে চাইবেন বলেও মনে হয় না। এমন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকার তারেকের বিষয়ে আদালতের রায়ের তথ্য তুলে ধরে রায় কার্যকর করার জন্য ব্রিটিশ সরকারকে নতুন করে অনুরোধ জানাতে পারে। তবে তারেক রহমানও ফিরতে না চাইলে বাংলাদেশে তাঁর সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা আদালতকে জানাতে পারেন। সেই আদালত যদি তারেক রহমানকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত দেন, তবে এর বিরুদ্ধেও ইউরোপীয় মানবাধিকার আদালতে আপিল করার সুযোগ থাকবে।

কূটনৈতিক সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ অভিবাসন বিভাগ যখন কাউকে রাজনৈতিক আশ্রয় দেয় তখন পারিপার্শ্বিক অনেক কিছু বিবেচনা করে থাকে। এ ক্ষেত্রে অভিযুক্ত ব্যক্তিরা নিজেদের নির্দোষ এবং তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক বলে দাবি করে থাকেন। তারেক রহমানের ক্ষেত্রেও হয়তো তা-ই হয়েছে এবং আগামী দিনেও তা-ই হবে।

জানা গেছে, ২০১৫ সালের শুরুতে রাজনৈতিক সহিংসতার সময় পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ততকালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসনের কাছে লেখা চিঠিতে অভিযোগ আইনগতভাবে মোকাবেলার জন্য তারেক রহমানকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছিলেন। কিন্তু ব্রিটিশ সরকার এর কোনো জবাব দেয়নি। গত ফেব্রুয়ারি মাসে তত্কালীন ব্রিটিশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী বরিস জনসনের ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশ তারেক রহমানকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানালে তিনি যুক্তরাজ্যের অবস্থান তুলে ধরেন।

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার রায়ে গতকাল বুধবার সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার ছেলে যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত তারেক রহমানকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিয়েছেন বিচারিক আদালত। একই মামলায় সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী লুৎফুজ্জামান বাবর ও সাবেক উপমন্ত্রী আব্দুস সালাম পিন্টুসহ ১৯ জনের মৃত্যুদণ্ড হয়েছে।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের সমাবেশে ভযাবহ গ্রেনেড হামলায় যাঁরা আহত হয়েছিলেন তাঁদের অনেকেই ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারেক রহমানের মৃত্যুদণ্ড না হওয়ায়। ওই গ্রেনেড হামলার ‘হোতা’ হিসেবে তারেক রহমানের সর্বোচ্চ সাজা না হওয়ায় আওয়ামী লীগও পুরোপুরি সন্তুষ্ট নয় বলে জানিয়েছেন দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। তারেক রহমানের ফাঁসির দণ্ড না হওয়ায় ঢাকা আইনজীবী সমিতি কম্পাউন্ডে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা। বিক্ষোভ সমাবেশে বার কাউন্সিলের সদস্য অ্যাডভোকেট নজিবুল্লাহ হিরু বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল তারেক রহমানের বিরুদ্ধে। প্রমাণও হয়েছে তা। কাজেই তাঁকে কেন মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে যাবজ্জীবন সাজা দেওয়া হলো? আমরা এর প্রতিবাদ করছি।’ অ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘তারেক রহমানকে মৃত্যুদণ্ড থেকে রেহাই দেওয়ার রায় আমরা মানি না।’

তবে এই রায়কে ‘সঠিক ও ভালো’ বলে মনে করছেন আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীদের অন্যতম নেতা ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম। গতকাল তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আমি মনে করি যে এটা একটা খুব ভালো কাজ হয়েছে যে তারেক রহমানকে শুধু যাবজ্জীবন দেওয়া হয়েছে। এখন তাঁকে নিয়ে এসে সাজা খাটানোর জন্য পথটি অন্তত খুলে গেছে। সেদিক থেকে সরকার এমবাসি, হাইকমিশন দিয়ে যথোপযুক্ত পদক্ষেপ নেবে বলে আমি আশা করি। তারেক রহমানকে সেখান থেকে নিয়ে এসে তাঁর সাজা কার্যকর করা হবে।’

বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলায় দণ্ডিত কয়েকজন বিভিন্ন দেশে অবস্থান করলেও তাদের ফেরত আনা যাচ্ছে না। সে ক্ষেত্রে তাদের সর্বোচ্চ সাজাকে কারণ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
ওই উদাহরণ তুলে ধরে প্রবীণ আইনজ্ঞ ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার আসামিদের ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে যে মৃত্যুদণ্ডের অজুহাতটা দেওয়া হচ্ছে, এখানে সে অজুহাতের সুযোগ নেই। এই রায়ে সুযোগ রাখা হয়েছে যাবজ্জীবন দিয়ে। কারণ তারেক রহমানের তো ফাঁসি হওয়ারই কথা। যাবজ্জীবন দেওয়াটা ভালো সিদ্ধান্ত হয়েছে বলে আমি মনে করি।’ তারেককে ফিরিয়ে আনতে কূনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে তারেক রহমানকে দেশে ফিরিয়ে আনার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহিরয়ার আলম গতকাল বলেন, ‘২১ আগস্ট আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার এ রায় যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আলোচনায় গতি জোগাবে। কারণ এই মামলায় যথেষ্ট সাক্ষী-প্রমাণ রয়েছে। এই জঘন্যতম হত্যাকাণ্ডের বিষয়টি বিশ্ব নেতৃবৃন্দও অবহিত আছেন। তাই তারেক রহমানের যাবজ্জীবন দণ্ড তাঁকে দেশে ফেরত আনার ব্যাপারে শক্তি হিসেবে কাজ করবে।’

প্রধানমন্ত্রীর তথ্য-প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয় গত রাতে এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘যুক্তরাজ্যের সঙ্গে আমাদের কোনো বহিঃসমর্পণ চুক্তি নেই। কিন্তু জাতিসংঘ সনদ অনুযায়ী অন্য কোনো সদস্য দেশের অনুরোধে শাস্তিপ্রাপ্ত আসামিদের সমর্পণ করতে পারে। যুক্তরাজ্য সম্প্রতি চারজন সন্দেহভাজন আইএস সদস্যকে মৃত্যুদণ্ড হতে পারে জেনেও যুক্তরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিয়েছে।’

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত