শিরোনাম

আইনমন্ত্রীর কথায় সিনহার বিরুদ্ধে মামলা নয়: দুদক

নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ১৮:১৯, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০১৮

দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেছেন, সুনির্দিষ্ট দালিলিক প্রমাণ ছাড়া কারও বিরুদ্ধে তদন্ত ও মমলা করা যায় না। পদত্যাগী প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বিরুদ্ধেও কারও কথায় ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ নেই।

সোমবার (২৪ সেপ্টেম্বর) দুপুরে নিজ কার্যালয় থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সময় সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার (এস কে সিনহা) বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ প্রসঙ্গে সাংবাদিকদের প্রশ্নের উত্তরে তিনি এ কথা বলেন।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক গতকাল রোববার (২৪সেপ্টেম্বর) বিকেলে নারায়ণগঞ্জে জেলা আইনজীবী সমিতির কার্যকরী কমিটির অভিষেক ও ডিজিটাল বার ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের উদ্বোধন শেষে বলেন, সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ দুদক খতিয়ে দেখছে। দুদক তার বিরুদ্ধে যখন মামলা করবে, তখনই মামলা হবে। সরকার এখানে কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।

এস কে সিনহার পদত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করে আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেন, ‘তিনি পদত্যাগ করেছেন তার কারণ হচ্ছে, আপিল বিভাগের তাঁর সহযোগী বিচারকেরা তাঁর সঙ্গে বসতে, আদালত চালাতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন। কেন অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন? অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন এই কারণে যে তিনি দুর্নীতিবাজ। বিচারপতিরা যখন বারবার বলেছেন, আমরা আপনার সঙ্গে একসঙ্গে বসব না, তখন তিনি উপায় না দেখে পদত্যাগ করেছেন।’ ‘আজকে পদত্যাগের প্রায় এক বছরে তিনি এসে নতুন গল্প সৃষ্টি করেছেন। এটা আমি আগেও বলেছি, এখনো বলছি, এটা হচ্ছে একজন পরাজিত ব্যক্তির হা–হুতাশ।’

আইনমন্ত্রী বলেন, ‘আরেকটি কথা হয়তো আসতে পারে, কেন দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা এখন পর্যন্ত হয়নি। আমরা কিন্তু সব সময় বলে আসছি, আইন সকলের ঊর্ধ্বে এবং তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন সেটা খতিয়ে দেখছে। তারা যখন তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করবে, তখনই মামলা হবে। সেখানে সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করবে না।’ তিনি বলেন, ‘এস কে সিনহা আজ যা বলছেন তা সর্বৈব মিথ্যা।’

‘এস কে সিনহার বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে এবং মামলা করা হতে পারে’- সাংবাদিকদের এমন এক প্রশ্নের উত্তরে দুদক চেয়ারম্যান বলেন, ‘মাননীয় মন্ত্রীর কথায় তো মামলা হবে না। মন্ত্রীর কথায় অনুসন্ধানও হবে না। সরকার নিজেরাই বলে স্বাধীন কমিশন। মন্ত্রী যা বলেছেন উনি ওনার কথা বলেছেন। মাননীয় মন্ত্রীর কোনো কথার প্রভাব দুদকে পড়ার কোনো রকমের সম্ভাবনা নেই। আমরা আপনাদের গ্যারান্টি দিচ্ছি। আমার কথা পরিষ্কার কারও বিরুদ্ধে এভিডেন্স ছাড়া আমরা কনক্লুসিভ কনভিন্সড না হলে কারও বিরুদ্ধে কোনো অনুসন্ধান হবে না, তদন্তও হবে না।’

কোনো অভিযোগ পেয়েছেন কি না এমন প্রশ্নে চেয়ারম্যান বলেন, ‘আই হ্যাভ নো কমেন্ট। ৪ কোটি টাকার যে অনুসন্ধান, তা কবে শেষ হবে আমি বলতে পারব না। টাকাটা কোথায় গেছে তা আমাদের বের করতে হবে। তদন্ত কর্মকর্তাদের বলা হয়েছে, অনুসন্ধান তাড়াতাড়ি শেষ করতে। তারা সম্ভবত কালকেও গেছে। আজকেও গেছে। ওই টাকা কোথায় গেল, কীভাবে গেল; তা তো জানতে হবে।’

দুদকে চলমান ‘ফারমার্স ব্যাংকের চার কোটি টাকা কেলেঙ্কারি’ প্রসঙ্গে ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘দুজন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অবৈধভাবে ঋণ প্রদান ও ঋণের টাকা অন্য কোথাও যাওয়া, সেটার অনুসন্ধান চলছে। সেই চার কোটি টাকার ব্যাপারে আপনারা এক ইঙ্গিত দিয়েছিলেন (যে সেই টাকা সিনহার অ্যাকাউন্টে জমা হয়েছে)। আমরা কিন্তু সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো কিছু বলিনি। তদন্ত চলছে। এখনও এ বিষয়ে বিস্তারিত বলার সময় আসেনি।’

বেসিক ব্যাংকের মামলা স্থবির হয়নি জানিয়ে দুদক চেয়ারম্যান আরও বলেন, ‘বেসিক ব্যাংকের মামলা স্থবির হয়নি। বেসিক ব্যাংকে কত টাকা জমা হয়েছে আপনারা খবর নিয়ে দেখুন। আপনারা দেখছেন এ আসামি ধরা হচ্ছে না। ওই আসামি ধরা হচ্ছে না। আবদুল হাই বাচ্চুকে ধরা হচ্ছে না। আপনারা কী জানেন কত টাকা জমা হয়েছে?’

এদিকে, গত ২১ সেপ্টেম্বর সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অনুসন্ধান শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে জানিয়েছেন দুদকের আইনজীবী খুরশীদ আলম খান। তিনি বলেন, ‘বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে অনুসন্ধান করছে দুদক।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে দুদক চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বলেন, ‘দুদকের আইনজীবী তো আমাদের মুখপাত্র না। সে আমাদের স্থায়ী উকিলও না। তিনি যে কোনো ব্যক্তির উকিল হতে পারেন, আপনারও হতে পারে। আইনজীবী যেটা বলেছে, সেটা তার নিজস্ব বক্তব্য। তিনি দেশে নেই, আমি তার কাছে এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাও করতে পারছি না।’

এক বছর আগে যাকে ঘিরে বাংলাদেশের বিচারঙ্গনে রীতিমত ভূমিকম্প ঘটে গিয়েছিল, সেই বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা বিদেশে বসে একটি বই লিখেছেন, যেখানে দেশত্যাগ ও পদত্যাগ নিয়ে এসেছে বেশ কিছু বিস্ফোরক মন্তব্য।

‘এ ব্রোকেন ড্রিম: রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’ শিরোনামে আত্মজীবনীমূলক এই বইয়ে বাংলাদেশের সাবেক এই প্রধান বিচারপতি দাবি করেছেন, তিনি দেশ ছেড়েছেন ‘হুমকির মুখে’; একই কারণে বিদেশ থেকে পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। আর সেই হুমকি সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা– ডিজিএফআইয়ের তরফ থেকে এসেছিল বলে দাবি করা হয়েছে বইটিতে। ৬১০ পৃষ্ঠার এই বইটি অ্যামাজনের কিন্ডেল সংস্করণে বিক্রি হচ্ছে। বইয়ের কিছু অংশ অ্যামাজনের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে।

বিচারপতি সিনহা ভূমিকায় লিখেছেন, ১৯৭৪ সাল থেকে বাংলাদেশের বিচারাঙ্গনে যুক্ত থাকার সুবাদে এর রূপান্তর এবং বাধাগ্রস্ত হওয়ার ঘটনাগুলো দেখার সুযোগ পেয়েছেন তিনি। সিলেটের নিম্ন আদালতের একজন আইনজীবী হিসেবে শুরু করে বাংলাদেশের বিচারালয়ের শীর্ষ অবস্থানে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালনের সৌভাগ্য হয়েছে তার।

“কিন্তু ২০১৭ সালে বিচার বিভাগের স্বাধীনতার পক্ষে ঐতিহাসিক এক রায় দেওয়ার পর বর্তমান সরকার আমাকে পদত্যাগ করতে এবং নির্বাসনে যেতে বাধ্য করে।” বিচারপতিদের অভিশংসনের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেওয়াকে ওই রায়ের মাধ্যমে অবৈধ ঘোষণা করেছিল বাংলাদেশের সুপ্রিম কোর্ট। আর তারপর যা ঘটেছে, তাকে বিচারপতি সিনহা বর্ণনা করেছেন ‘নজিরবিহীন ঘটনা’ হিসেবে।

পৌন তিন বছর প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব পালন করা বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার অবসরে যাওয়ার কথা ছিল ২০১৮ সালের ৩১ জানুয়ারি। কিন্তু কার্যকাল শেষ হওয়ার ৮১ দিন আগেই তাকে ‘নজিরবিহীন’ ওই পরিস্থিতির মধ্যে পদত্যাগ করতে হয়। বাংলাদেশে আর কখনও কোনো প্রধান বিচারপতিকে নিয়ে এত আলোচনা হয়নি; আর কোনো প্রধান বিচারপতিকে পদত্যাগও করতে হয়নি।

অবসরের পর রায় লেখা নিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সহকর্মীর সঙ্গে বাদানুবাদ, বিচার বিভাগের ক্ষমতা খর্ব করার অভিযোগ আনা, অধস্তন আদালতের বিচারকদের চাকরিবিধির গেজেট প্রকাশ নিয়ে সরকারের সঙ্গে বিরোধ, সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে ভাস্কর্য স্থাপন নিয়ে উত্তেজনা- এরকম বহু ঘটনায় বিচারপতি সিনহা বহুবার সংবাদ শিরোনামে এসেছেন।

সর্বশেষ ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায় এবং কিছু পর্যবেক্ষণের কারণে ক্ষমতাসীনদের তোপের মুখে ২০১৭ সালের অক্টোবরের শুরুতে তিনি ছুটিতে যান। সরকারের পক্ষ থেকে অসুস্থতার কথা বলা হলেও ১৩ অক্টেবর তিনি রীতিমত বোমা ফাটিয়ে বিদেশে চলে যান। বিচারপতি সিনহা বলে যান, তিনি অসুস্থ নন, ক্ষমতাসীনদের সমালোচনায় তিনি ‘বিব্রত’। তার ছুটির মেয়াদ শেষে ১১ নভেম্বর সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, বিচারপতি সিনহা পদত্যাগপত্র পাঠিয়ে দিয়েছেন।

পদত্যাগ করার পর বিচারপতি সিনহার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচার, আর্থিক অনিয়ম ও নৈতিক স্খলনসহ সুনির্দিষ্ট ১১টি অভিযোগ ওঠার কথা সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে জানানো হয়। বলা হয়, ওইসব অভিযোগের কারণে আপিল বিভাগের অন্য বিচারকরা আর প্রধান বিচারপতির সঙ্গে বসে মামলা নিষ্পত্তিতে রাজি নন। সেসব অভিযোগ নিয়ে দুদক পরে অনুসন্ধানও শুরু করে।

ক্ষমতাসীন দলের নেতা স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম সেসময় বলেন, একজন বিচারপতির মাধ্যমে দেশে জুডিশিয়াল ক্যু করার চেষ্টা হয়েছিল।আর আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছিলেন, বিচারকদের নিয়ন্ত্রণে সংবিধান রাষ্ট্রপতিকে যে ক্ষমতা দিয়েছে, শৃঙ্খলা বিধির নামে তা কেড়ে নিতে চেয়েছিলেন বিচারপতি সিনহা।

বিচারপতি সিনহার পর ভারপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির দায়িত্বে আসেন বিচারপতি আবদুল ওয়াহহাব মিঞা। তার সময়ে বিচারকদের চাকরিবিধির গেজেট নিয়ে সরকারের সঙ্গে সর্বোচ্চ আদালতের টানাপড়েনের অবসান ঘটে। উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে নেওয়া অবৈধ ঘোষণার যে রায় নিয়ে সঙ্কট জটিল মাত্রা পেয়েছিল, সেই রায় পুনর্বিবেচনার জন্যও সরকার আবেদন করে। অবশ্য সরকার সৈয়দ মাহমুদ হোসেনকে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব দিলে আপিল বিভাগের তখনকার জ্যেষ্ঠতম বিচারক ওয়াহহাব মিঞাও চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে বিদায় নেন।

বিচারপতি সিনহার বইয়ের ভূমিকাসহ ১০টি অধ্যায় অ্যামাজানের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। আইন পেশায় এস কে সিনহার টিকে থাকার সংগ্রাম, নানা অভিজ্ঞতা, বাংলাদেশের বিচার বিভাগের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের নৈতিকতার ‘অবক্ষয়’, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও বাংলাদেশের ‘শিশু গণতন্ত্রের’ অবস্থা, পুলিশের ‘বাড়াবাড়ি’, জরুরি অবস্থার প্রভাব এবং ‘ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ডিজিএফআইয়ের অর্থ আদায়ের’ বিষয়ে আলোকপাত করার কথা বলা হয়েছে ভূমিকায়।

শৈশব থেকে নিজের ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার এবং যুদ্ধাপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনাল নিয়েও এ বইয়ে লিখেছেন বিচারপতি সিনহা। বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতির পদে থাকা অবস্থায় কোন পরিস্থিতিতে সরকারের সঙ্গে বিরোধ তৈরি হয়েছিল, কোন পরিস্থিতিতে দেশ ছাড়তে হয়েছিল, আর কেন বিদেশে থেকে পদত্যাগ করতে হয়েছিল- সে বিষয়ে নিজের ভাষ্য এ বইয়ে তুলে ধরেছেন সাবেক প্রধান বিচারপতি।

তিনি লিখেছেন, ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীর মাধ্যমে যখন বিচারক অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে দেওয়া হল তখন থেকেই টানাপড়েনের শুরু। ২০১৬ বছরের ৫ মে হাইকোর্ট সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে রায় দেয়। পরের বছর জুলাইয়ে আপিল বিভাগের রায়ে তা বাহল থাকলে ক্ষমতাসীনদের সমালোচনায় পড়েন বিচারপতি সিনহা।

পরের মাসে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হলে তাতে বিচারপতি সিনহার ৪০০ পৃষ্ঠার পর্যবেক্ষণ দেখে শুরু হয় ব্যাপক বিতর্ক। সাবেক প্রধান বিচারপতি বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হক ওই রায়কে ‘ভ্রমাত্মক’ বলেন। ওই পর্যবেক্ষণে সংসদ ও সরকার এবং জাতির জনককে খাটো করা হয়েছে অভিযোগ তুলে বিচারপতি সিনহার পদত্যাগের দাবি তোলে আওয়ামী লীগ সমর্থক আইনজীবীরা; অন্যদিকে বিএনপি প্রধান বিচারপতির পক্ষে দাঁড়ায়।

সেই সময়ের কথা তুলে ধরে বিচারপতি সিনহা তার বইয়ে লিখেছেন, “আপিল বিভাগের রায়ের পর ১৩ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্টে একটি প্রস্তাব পাস করা হয়, যেখানে সুপ্রিম কোর্টের রায় বাতিলের জন্য আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা বলা হয়। পার্লামেন্টের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে যাওয়ায় প্রধানমন্ত্রী, তার দলের লোকজন এবং সরকারের মন্ত্রীরা আমার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। আইনমন্ত্রীসহ মন্ত্রিসভার সদস্যরা আমার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ আনতে থাকেন।”

বিচারপতি সিনহা অভিযোগ করেছেন, ওই সময় তাকে তার বাসভবনে আটকে থাকতে হয়। আইনজীবী ও বিচারপতিদেরকে তার সঙ্গে দেখা করতে দেওয়া হচ্ছিল না। সংবাদমাধ্যমকে বলা হচ্ছিল- তিনি অসুস্থ, ছুটির আবেদন করেছেন। “কয়েকজন মন্ত্রী বলছিলেন যে, আমি চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাব। ২০১৭ সালের ১৪ অক্টোবর আমি যখন দেশ ছাড়তে বাধ্য হলাম, একটি বিবৃতি দিয়ে আমি বিভ্রান্তি দূর করার চেষ্টা করলাম যে আমি অসুস্থ নই, চিরতরে দেশ ছেড়েও যাচ্ছি না।

“আমি আশা করছিলাম, আদালতে আমার অনুপস্থিতি আর আদালতের নিয়মিত অবকাশের মধ্যে পরিস্থিতি কিছুটা থিতিয়ে আসার সুযোগ পাবে এবং সুবিবেচনার উদয় হবে, সরকার হয়ত ওই রায়ের মর্ম বুঝতে পারবে, তারা বুঝবে যে বিচারবিভাগের স্বাধীনতা রাষ্ট্র ও দেশের জন্যই দরকার। "শেষ পর্যন্ত আমার পরিবার আর স্বজনরা যখন দেশের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা, যাকে বলা হয় ডিরেক্টরেট জেনারেল অব ফোর্সেস ইন্টেলিজেন্স, তাদের হুমকির মুখে পড়ল, তখন আমি বিদেশ থেকেই পদত্যাগপত্র জমা দিই।"

গত ২ অক্টোবর তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে এক মাসের ছুটির আবেদন করেন এবং রাষ্ট্রপতি তা অনুমোদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রপতি সংবিধানের ৯৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতির আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠতম বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞাকে প্রধান বিচারপতির অনুপস্থিতিতে প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব দেন।

উচ্চ আদালতের বিচারকদের অপসারণের ক্ষমতা সংসদের হাতে ফিরিয়ে নিতে ২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ সংশোধনের প্রস্তাব সংসদে পাস হয়, যা ষোড়শ সংশোধনী হিসেবে পরিচিত। নয়জন আইনজীবীর রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট ২০১৬ সালের ৫ মে সংবিধানের ওই সংশোধনী ‘অবৈধ’ ঘোষণা করে রায় দেন। গত ৩ জুলাই আপিল বিভাগও ওই রায় বহাল রাখেন। যার পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ পায় ১ আগস্ট।

রায়ের পর্যবেক্ষণের প্রধান বিচারপতি বলেন, ‘মানবাধিকার ঝুঁকিতে, দুর্নীতি অনিয়ন্ত্রিত, সংসদ অকার্যকর, কোটি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত।’ ৭৯৯ পৃষ্ঠার রায়ে সরকার, সংসদ, রাজনীতি, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ, সামরিক শাসন এবং রাষ্ট্র ও সমাজের বিভিন্ন বিষয়ে এমন অনেক পর্যবেক্ষণ উঠে আসে। এরপরই প্রধান বিচারপতি এসকে সিনহার দেয়া রায় ও পর্যবেক্ষণের তীব্র সমালোচনা করেন সরকারের মন্ত্রী-এমপি ও নেতারা। সরকারদলীয় নেতাকর্মীরা প্রধান বিচারপতির পদত্যাগও দাবি করেন।

প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে ১১ অভিযোগ হলো: *তার আয়-ব্যয়ের হিসাব সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। জ্ঞাত উৎসের বাইরে থেকে ২০১৫-১৬ এবং ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ব্যাংকে টাকা পাওয়া গেছে। *বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা সিঙ্গাপুরে একটি ব্যাংকে অ্যাকাউন্ট করেছেন। ওই ব্যাংক অ্যাকাউন্টে অন্তত দেড়কোটি টাকা রয়েছে। এ ধরনের অ্যাকাউন্ট করার ক্ষেত্রে তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের কোনো অনুমতি নেননি। *অস্ট্রেলিয়ায় একটি ব্যাংকে বিচারপতির একটি অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়া গেছে। ওই অ্যাকাউন্টেও বাংলাদেশি টাকায় এক কোটির বেশি টাকা রয়েছে। ওই অ্যাকাউন্ট করার ক্ষেত্রেও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে।*কানাডায় একটি ব্যাংকে বিচারপতি সিনহার একটি অ্যাকাউন্ট পাওয়া গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন না নিয়ে জালিয়াতির মাধ্যমে ওই অ্যাকাউন্ট বিচারপতি সিনহা লেনদেন করেছেন। *বিচারপতি সিনহা তথ্য গোপন করে এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ থেকে অবৈধভাবে প্লট নিয়েছেন। *বিচারপতি সিনহার সুপ্রিম কোর্ট সোনালী ব্যাংকের বেতন অ্যাকাউন্টে চার কোটি টাকা ব্যাংক ড্রাফট আকারে জমা হয়। এই আয়ের কোনো উৎস তিনি জানাতে ব্যর্থ হন। *পাঁচজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে বিভিন্ন মামলায় অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার জন্য বিচারপতি সিনহা অন্তত ৬০ কোটি টাকা বিভিন্ন পর্যায়ে গ্রহণ করেন। বাংলাদেশের ব্যাংকের অনুমোদন না নিয়ে অবৈধ পন্থায় বিদেশে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা পাচার করেছেন। যে ব্যক্তিকে দিয়ে টাকা পাচার করিয়েছেন তিনি স্বীকারোক্তি দিয়েছেন।*সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের অন্যান্য বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ ছাড়াই একজন সাবেক বিচারপতির বিরুদ্ধে দুর্নীতির মামলা বন্ধ করতে দুদককে চিঠি দিয়েছেন।*সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্টার এবং অধস্তন আদালতে বিচারক বদলির ক্ষেত্রে ঘুষ গ্রহণ করেছেন। *একজন নারী কর্মকর্তার সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন, যার ভিডিও রাষ্ট্রপতির কাছে দেওয়া হয়।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত