শিরোনাম

‘গাড়িতে তুলে বলে চুপ থাক কথা বলবি না’

নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ১৮:১৮, এপ্রিল ১৬, ২০১৮

সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলনের তিন নেতাকে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে পুলিশের গোয়েন্দা শাখা-ডিবির বিরুদ্ধে। গাড়িতে তুলে চোখ বেঁধে তাদেরকে বলা হয়, ‘চুপ থাক কথা বলবি না।’ তুলে নেওয়ার দুই ঘন্টার পর সোমবার (১৬এপ্রিল) বিকেল সোয়া ৩টার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে এক সংবাদ সম্মেলনে একথা বলেন ওই তিন নেতা।

সোমবার বেলা পৌনে একটার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রবেশ ফটকের সামনে রিকশা থেকে ওই তিন নেতাকে নামিয়ে মাইক্রোবাসে করে পুলিশ তুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ উঠেছে। ওই তিন নেতা হলেন, বাংলাদেশ সাধারণ ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদের তিন যুগ্ম আহ্বায়ক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র নুরুল্লাহ নূর, এমবিএর (ব্যাংকিং অ্যান্ড ইনস্যুরেন্স বিভাগ) ছাত্র রাশেদ খান এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের মাস্টার্সের ছাত্র ফারুক হোসেন।

তুলে নেওয়ার দুই ঘণ্টার মধ্যে তাঁদের ছেড়ে দেয় পুলিশ। এর প্রতিবাদে আন্দোলনকারীরা বিকেল চারটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মিছিল করেন। পুলিশ ছেড়ে দেওয়ার পর বেলা সোয়া তিনটার দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে সংবাদ সম্মেলন করেন ওই তিন নেতা। তাঁদের ভাষ্য, গামছা দিয়ে চোখ বেঁধে পৌনে একটার দিকে তাঁদের একটি গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয়। চোখ খুলে দেওয়ার পর দেখেন, তাঁরা একটি কক্ষে। সেখানে তাঁদের বলা হয়, তাঁদের কিছু ভিডিও ফুটেজ দেখানো হবে। কিন্তু তাঁদের কিছুই দেখানো হয়নি।

তিন নেতা আরও বলেন, পরে তাঁদের নাম-ঠিকানা নিয়ে পৌনে তিনটার দিকে ছেড়ে দেওয়া হয়। তাঁরা জানান, মিন্টো রোডে গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) কার্যালয়ে তাঁদের নেওয়া হয়েছিল। এসময় তাঁদের কোনো নির্যাতন করা হয়নি।

সংবাদ সম্মেলনে নেতারা আরও জানান, বেলা ২টা ৫৫ মিনিটে তাঁরা সিএনজি চালিত অটোরিকশায় করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিরে আসেন। তাঁদের দেখে অন্যরা ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে স্বাগত জানায়। আন্দোলনকারী তিন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, তাঁরা ও তাঁদের পরিবার নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

ওই তিন নেতাকে তুলে নেওয়ার আগে আজ বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে পরিষদ আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে আগামী দুই দিনের মধ্যে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার করার দাবিজানানো হয়। সংবাদ সম্মেলনে ওই তিনজনই উপস্থিত ছিলেন।

সংবাদ সম্মেলনের ঘণ্টা খানেক পর ওই তিনজনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে রিকশা থেকে নামিয়ে একটি বড় মাইক্রোবাসে করে তুলে নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন প্রত্যক্ষদর্শী আরেক নেতা ও এক দোকান কর্মচারী।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী পরিষদের আরেক যুগ্ম আহ্বায়ক বিন ইয়ামিন ঘটনা সম্পর্কে জানান, সংবাদ সম্মেলন শেষে বেলা পৌনে একটার দিকে তাঁরা কয়েকজন দুপুরের খাবার খেতে রিকশায় করে চানখাঁরপুল যাচ্ছিলেন। রাশেদ, নুরুল্লাহ ও ফারুক এক রিকশায় ছিলেন। আর তিনি ছিলেন পেছনের রিকশায়। ওই তিনজনকে বহনকারী রিকশাটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে প্রবেশের ফটকের কাছে এলে পেছন থেকে তিনটি মোটরসাইকেল রিকশাটির সামনে গিয়ে গতিরোধ করে। পরে পেছন থেকে আরেকটি সাদা রঙের হাইএস মডেলের মাইক্রোবাস এসে সেখানে থামে। গাড়ি থেকে কয়েকজন নেমে রিকশা থেকে তিন নেতাকে নামিয়ে গাড়িতে তুলে নিয়ে চলে যায়।

একই তথ্য জানালেন, আরেক প্রত্যক্ষদর্শী হাসপাতালের ফটকের উল্টো দিকে খাবারের দোকানের কর্মচারী মো. সালাউদ্দিন। তিনি বলেন, মোটরসাইকেল ও গাড়ি থেকে নেমে সাত-আটজন ওই রিকশার সামনে দাঁড়ায়। তারা তিনজনকে রিকশা থেকে নামাতে গেলে কিছুটা ধস্তাধস্তি হয়। পরে তিনজনের প্রত্যেককে দুই পাশ থেকে দুজন করে ধরে গাড়িতে তুলে নিয়ে দ্রুত চলে যায়।

আন্দোলনকারী সংগঠনের যুগ্ম আহ্বায়ক রাশেদ খান জানান, ঝিনাইদহে তার বাবা নবাই বিশ্বাসকে তুলে নিয়ে নিয়ে থানায় রেখেছে পুলিশ। তাকে বিশ্রী ভাষায় গালিগালাজ করা হয়েছে। তাকে দিয়ে বলানোর চেষ্টা করা হচ্ছে যে, ছেলে (রাশেদ) জামায়াত-শিবিরের লোক। ‘আজ আমি রাজনীতির সঙ্গে জড়িত নই বলেই কি আমাকে জামায়াত-শিবিরের ট্যাগ দেওয়া হচ্ছে? নিজের এবং স্বজনের জীবন নিয়ে শঙ্কিত জানিয়ে রাশেদ বলেন, ‘আমাকে এবং আমার আত্মীয়স্বজনকে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। আমি আশঙ্কা করছি তাদের ওপরও আক্রমণ হতে পারে।’

নুর বলেন, সরকারের কাছে অনুরোধ কোটা সংস্কার আন্দোলনকারী কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্যদের এবং তাদের পরিবার পরিজনদের নিরাপত্তা দেওয়া হোক। আমরা ১০০ ভাগ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে আছি। ’

এ নিয়ে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার দেবদাস ভট্টাচার্য বলেন, তিনজনকে তুলে নেওয়া হয়নি। তাঁদের আলোচনার জন্য ডাকা হয়। পরে বেলা পৌনে তিনটায় রাশেদের মোবাইল ফোনে কথা হলে তিনি বলেন, তাঁদের ঢাকা মেডিকেল কলেজের সামনে থেকে তুলে নেওয়া হয়। পরে পৌনে তিনটার দিকে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, তাঁর বাবাকেও থানায় নেওয়া হয়েছে।

প্রসঙ্গত, গত ৮ এপ্রিল শাহবাগ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় আন্দোলনকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষে একজনের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ভবনে হামলা হয়। বেপরোয়া ওই হামলায় বাসভবনে তাণ্ডব চালানোর পাশাপাশি লুট করা হয় মূল্যবান সামগ্রী প্রত্নতাত্ত্বিক ও ঐতিহাসিক নিদর্শন এবং নথিপত্র। এই ঘটনায় চারটি এবং শাহবাগে সংঘর্ষের ঘটনায় আরও চারটি মামলা হয়েছে।

উপাচার্য ভবনে হামলার দায় অস্বীকার করে এ বিষয়ে ভিডিও ফুটেজ দেখে ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন কোটা আন্দোলনের নেতারা। তবে হামলাকারীরা সেখানকার সিসি ক্যামেরা ভেঙে রেকর্ডার খুলে নিয়ে গেছে। তারপরও নানা সূত্র থেকে ফুটেজ সংগ্রহ করেছে গোয়েন্দা পুলিশ। এই ফুটেজের বিষয়ে কোটা আন্দোলনকারীদের তিন নেতাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে বলে গোয়েন্দা বাহিনীর একটি সূত্র জানিয়েছে। সঙ্গে অন্য আরও কিছু বিষয় ছিল।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত