শিরোনাম

ভারতের কূটনীতির পরীক্ষায় বাংলাদেশ

প্রিন্ট সংস্করণ॥ বেলাল হোসেন  |  ০১:২৩, অক্টোবর ২৪, ২০১৭

মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গা মুসলিমদের নিয়ে বড় ধরনের সমস্যার মধ্য দিয়ে সময় পার করছে বর্তমান সরকার। জাতিসংঘের বারবার তাগাদা দেওয়া সত্ত্বেও কোনো কথায় গুরুত্ব দিচ্ছে না মিয়ানমার সরকার ও সেনাপ্রধান। অনেক দেশ ও আন্তর্জাতিক সংগঠনগুলো মিয়ানমারকে বিভিন্নভাবে অনুরোধ করার পরও তারা বর্তমান অবশিষ্ট রোহিঙ্গাদেরও দেশ থেকে তাড়িয়ে দিচ্ছে। অপরদিকে রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে পুরোপুরি নিশ্চুপ আছে ক্ষমতাধর দুই রাষ্ট্র চীন ও রাশিয়া। এছাড়াও ভারত প্রথম দিকে ত্রাণ পাঠালেও প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে বেশকিছুদিন তেমন কোনো ভূমিকা গ্রহণ করেনি। তবে গত রোববার (২২ অক্টোবর) ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বাংলাদেশ সফরে এসে রোহিঙ্গা সমস্যার সংকটময় মুহূর্তে কী পেল বাংলাদেশ– এর উত্তর খুঁজছেন বিশিষ্টজনেরা। ঢাকায় সফররত ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী সুষমা স্বরাজ বলেছেন, বর্তমানে এশিয়ার সবচেয়ে বড় শরণার্থী সংকট নিরসনে মিয়ানমারের অবশ্যই উচিত রাখাইন থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের ফেরত নেয়া। পরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাথে বৈঠকের সময়ও ভারতীয় পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, মিয়ানমারকে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে হবে। কিন্তু রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে ভারত মিয়ানমারের ওপর আসলে কতটা চাপ সৃষ্টি করতে পারবে?
বিবিসি বাংলার এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, দিল্লিতে ভারত সরকারের ঘনিষ্ঠ একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশনের গবেষক জয়িতা ভট্টাচার্য। তিনি বলছেন, প্রতিবেশী রাষ্ট্র হিসেবে ভারতের অবশ্যই একটা চেষ্টা করা উচিৎ। কিন্তু ভারত চাপ তৈরির এই কাজটি আসলে তারা কতটা করতে চায়? সে প্রসঙ্গে তিনি বলছেন, ব্যাপার হলো কতটা করতে পারবে। তবে ভারতে অবশ্যই রোহিঙ্গা ইস্যুকে খুব নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। বিভিন্নপর্যায়ে অবশ্যই ইস্যুটি নিয়ে পর্যালোচনা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের জন্য ভারত শুরুতেই ত্রাণ পাঠিয়েছে। কিন্তু তাদের ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে কখনই স্পষ্ট করে কিছু বলেনি। কিন্তু এবার ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়ার মধ্যেই এই সংকটের সমাধান। একদিকে ভারত চাইছে মিয়ানমারের সাথে সম্পর্ক তৈরি করতে। অন্যদিকে বাংলাদেশও ভারতের বন্ধু। ভারত কী মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে একই সাথে খুশি রাখতে পারবে?
গত আগস্টে মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতা শুরুর পর থেকে ৬ লাখের মতো রোহিঙ্গা পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে। দুই দিনের সফরে গত রোববার সকালে ঢাকায় আসেন সুষমা। নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ায় বাংলাদেশের প্রশংসাও করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। শরণার্থীদের ফেরত নেয়ার পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের শাস্তির কথাও বলেন সুষমা। তিনি বলেন, বাংলাদেশের জন্য এটা বিরাট বোঝা। বাংলাদেশ আর কতদিন এই ভার বইবে? এই সংকটের স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘আমাদের মতে, এই পরিস্থিতির দীর্ঘস্থায়ী সমাধান তখনই হতে পারে, যখন রাখাইন রাজ্যে আর্থ-সামাজিক এবং কাঠামোগত অবস্থার উন্নয়ন হবে। এমনটা হলে সেখানে বসবাসরত সব সম্প্রদায়ের মধ্যে তা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস)-র বরাত দিয়ে ডিপিএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে সুষমা বলেছেন, ‘ভারত মিয়ানমারের রাখাইনে সহিংসতার বিষয়টি নিয়ে উদ্বিগ্ন।’ সাধারণ জনগণের নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে পুরো বিষয়টি সামাল দিতে হবে বলে জানিয়েছেন তিনি। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় বাংলাদেশের পদক্ষেপগুলো ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরেন। শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘তার সরকার দেশের ১৬ কোটি মানুষের অন্নের সংস্থান যেহেতু করতে পারছে, এই শরণার্থীদের খাদ্যের ব্যবস্থাও করতে পারবে।’
প্রতিবেশীদের মধ্যে বাংলাদেশ গুরুত্বপূর্ণ ঃ প্রতিবেশীদের মধ্যে বাংলাদেশই ভারতের কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। বলেছেন, প্রতিবেশীদের অগ্রাধিকার দেওয়া ভারতের নীতি, এর মধ্যে বাংলাদেশ সবার উপরে। তিনি আরও বলেছেন, বাংলাদেশ ও ভারতের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক দ্রুত এগিয়ে চলেছে। এদিকে, চীনের ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির একজন কর্মকর্তা গত শনিবার সংবাদ সংস্থা এপিকে জানিয়েছিলেন, মিয়ানমারের রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং স্থিতিশীলতার জন্য দেশটিকে সমর্থন করছেন তারা। তারা সরকারের পদক্ষেপের নিন্দা জানাতে চান না। তারা নিন্দা জানাতে চান সন্ত্রাস এবং সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের।
জেনেভায় দাতা দেশগুলোর সম্মেলন ঃ গতকাল সোমবার জাতিসংঘের সদস্য দেশগুলোর প্রতিনিধিরা জেনেভায় জড়ো হয়েছেন রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য ৪৩ কোটি ৪০ লাখ মার্কিন ডলার ত্রাণ সংগ্রহের লক্ষ্যে। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ত্রাণ দিতে এই পরিমাণ অর্থ প্রয়োজন বলে মনে করছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার প্রধান ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি বলেছেন, ‘প্রয়োজনটা অনেক বেশি, কেননা, পরিস্থিতি ভয়াবহ।’ তিনি জানালেন, কক্সবাজারের কাছে যেসব শরণার্থী আশ্রয় নিয়েছে, তাদের খাদ্য, পানি, আবাসন, শৌচাগারের যথেষ্ট ব্যবস্থা নেই। এছাড়া খুব দ্রুত এ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছে রোগ। ১০ জন শিশুর মধ্যে ৬ জনই অপুষ্টিতে ভুগছে। তবে ত্রাণ আহ্বানের পাশাপাশি মিয়ানমারের রাখাইনে অবিলম্বে সহিংসতা বন্ধ করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর নেতারা।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত