শিরোনাম

রোহিঙ্গাদের যেতে হবে ঠেঙ্গারচরে

প্রিন্ট সংস্করণ॥ জাকির হোসেন  |  ০১:১৫, অক্টোবর ২৪, ২০১৭

অত্যাচার, নির্যাতন থেকে রেহাই ও জীবন বাঁচানোর জন্য মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে নেয়াখালীর ঠেঙ্গারচরে স্থানান্তর করা হবে। যেসব সাহায্য সংস্থা রোহিঙ্গাদের আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ করে দিতে চান তারা যেন ঠেঙ্গারচরেই তা নির্মাণ করে দেন বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গতকাল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে তার কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত মন্ত্রী সভার সাপ্তাহিক নিয়মিত বৈঠকে এক অনির্ধারিত আলোচনায় তিনি ওই মন্তব্য করেন। বিস্বস্ত সূত্রে একথা জানাগেছে। বৈঠকের একপর্যায়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, মিয়ানমারের লোকজন, সেনাবাহিনী বর্বর, অসভ্য। তাদের কাছ থেকে চাল আনাই ঠিক না। জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ওরা বর্বর, অসভ্য ঠিক আছে কিন্তু ওদের সঙ্গে ঝগড়াঝাটি করলে কি ঠিক হবে? মিয়ানমারের হেলিকপ্টার বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ঢুকে পড়েছিল। আমরা যদি জবাব দিতাম তাহলে রোহিঙ্গাদের দেশে ফেরৎ পাঠানোর মূল ইস্যুটিই হারিয়ে যেতো। তাই ধৈর্ষ্য ধরে বিষয়টি হ্যান্ডেল করায় মিয়ানমারের বিরুদ্ধে বিশ্ব জনমত সৃষ্টি হয়েছে।
মিয়ানমারের সঙ্গে সুসম্পর্ক রেখেই কূটনৈতিক পন্থায় আমাদের এগিয়ে যেতে হবে উল্লেখ করে প্রধামন্ত্রী বলেন, যাতে করে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরৎ পাঠানো যায়। এ লক্ষ্যে ১৯৯২ সালে একটা সমঝোতা স্মারক হয়েছিল। বর্তমানে ওইরকম একটা সমঝোতা স্মারক করার চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান-ভারত সমসময় একটা খারাপ সম্পর্কের মধ্যে থাকে কিন্তু দুই দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য তো চলছে। এদিকে মিয়ানমার থেকে আসা কক্সবাজারের অস্থায়ী শরণার্থী শিবিরে বসবাসরত রোহিঙ্গাদের ঠিকানা হচ্ছে নেয়াখালীর ঠেঙ্গারচরে। মানব বসতির সমস্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করেই তাদের ওখানে পুনর্বাসন করা হবে। কক্সবাজারের ক্যাম্পে খুব কম পরিমাণ জায়গায় এত মানুষের গাদাগাদিতে যে অমানবিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তা থেকে রক্ষা করতেই মূলত রোহিঙ্গাদের ঠেঙ্গারচারে স্থানান্তর করা হবে। তবে এই ঠিকানাও অস্থায়ী। রোহিঙ্গাদের ফিরে যেতে হবে মিয়ানমারেই বলে মনে করেন বাংলাদেশ সরকার।
প্রায় ২৫ বছর আগে জেগে ওঠা নোয়াখালির ঠেঙ্গারচরটিতে কোনো জনবসতি নেই। চরটির দের্ঘ্য প্রায় ২৫ কিলোমিটার এবং প্রস্থ প্রায় ১২ কিলোমিটার। বনবিভাগের তদারকিতে গত ১৫-২০ বছর ধরে সেখানে বনায়ন হচ্ছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে নোয়াখালীর মূল ভূখ- থেকে ট্রলারে করে হাতিয়া দ্বীপে যেতে সময় লাগে প্রায় দেড় ঘণ্টা। সেখান থেকে আবার স্পিড-বোটে করে আধা ঘণ্টা সময় লাগে ঠেঙ্গারচরে যেতে।
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ইতোপূর্বে এক বিবৃতিতে বলেছে, কক্সবাজার এলাকা থেকে রোহিঙ্গাদের ঠেঙ্গারচরে পাঠানো হলে চলাফেরার স্বাধীনতা, জীবিকা, খাবার এবং শিক্ষার সুযোগÑ সবকিছু থেকেই তারা বঞ্চিত হবে। ঠেঙ্গারচর বসবাসের জন্য মোটেও উপযুক্ত জায়গা নয়। বর্ষার সময় পানিতে তলিয়ে যায় এ চর। সংস্থাটি এই চরে রোহিঙ্গাদের না পাঠানোর জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতিও আহ্বান জানায়। এদিকে বেশকিছু দিন আগে ঠেঙ্গারচর পরিদর্শন করেন প্রধানমন্ত্রীর সামরিক সচিব। পরিদর্শনকালে তিনি চরের গাছকাটা বন্ধ করা, নৌযান নোঙর করার জন্য জেটি নির্মাণ, বিশুদ্ধ খাবার পানির জন্য নলকূপ স্থাপন ইত্যাদি নির্দেশনা দেন।
জানাগেছে এখনও মানব বসবাসের উপযোগী হয়নি ঠেঙ্গারচর। কারণ পানীয় জলের কোনো উৎস না থাকা, দ্বীপটি প্রতিনিয়ত জোয়ার-ভাটায় ডুবে যাওয়া, দ্বীপের অপেক্ষাকৃত উঁচু স্থানটি এখনও স্থায়ী না হওয়া, পাড় থেকে নেমে উঁচু স্থানে যেতে হাঁটু সমান কাদার স্তর এবং নানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ। চরে মানব বসতি গড়তে হলে ঝড় ও জ্বলোচ্ছ্বাস, জোয়ারের পানি, বেড়িবাঁধ, স্থাপনা, পানীয়জল এসব সমস্যার সমাধান করেই করতে হবে।
জানতে চাইলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক উর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, রাতারাতিই যে কাজটি হয়ে যাবে, এমন নয়। অবকাঠামো করতে সময় লাগবে। বিশেষ করে ঠেঙ্গারচরে স্কুল, মাদ্রাসা, মিঠা পানির ব্যবস্থা, রাস্তা ও বাঁধ ইত্যাদি নির্মাণ করেই রোহিঙ্গাদের নেয়া হবে। কক্সবাজারে রোহিঙ্গারা যেখানে বাস করে ওটা একটি ক্রাউডি প্লেস। ছোট একটি তাঁবুতে ১০ থেকে ১৫ জন করে থাকছে। একেবারে অমানবিক অবস্থা।
গত ২৫ আগস্টের পর থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৬ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এর আগে যে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে এসেছিল সব মিলিয়ে প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা আশ্রয় নিয়েছে। বর্তমানে কক্সবাজারের কুতুপালংয়ে অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে আছে তারা। তাঁবু, বাঁশ, পলিথিন, কাঠ, পাট-খড়ি ইত্যাদি দিয়ে এগুলো তৈরি করা হয়েছে। প্রকৃতি একটু বৈরী হলেই এগুলো টিকবে না। তাই একটু টেকসই আশ্রয়কেন্দ্র দরকার। এটা করতে হলে দরকার ৪ হাজার কোটি টাকা। জানিয়েছে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম। প্রধানমন্ত্রী এই টেকসই আশ্রয়কেন্দ্র করতে চাইছেন ঠেঙ্গারচরে। কারণ রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের লক্ষ্যে সমঝোতা স্মারক ও ফেরৎ পাঠাতে একটু হলেও সময় লাগবে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত