সন্দেহের তীর চিকিৎসকদের দিকে

প্রিন্ট সংস্করণ॥আফছার আহমদ রূপক | ১১:৪৮, জানুয়ারি ১১, ২০১৭

হার্টে বা হৃৎপি-ে রিং, পেসমেকার ও ডিভাইস পরানোর আগে মাঝেমধ্যেই সন্দেহ পোষণ করছেন রোগী ও তাদের স্বজনরা। এ সন্দেহের তীর হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের প্রতি। তারাই এসব বস্তু রোগীর হার্টে পরিয়ে থাকেন। শুধু রোগী ও তার আত্মীয় স্বজনই সন্দেহ করছেন এমন নয়, সন্দেহ করতে দেখা গেছে অন্যান্য বিষয়ের চিকিৎসকদেরকেও। এসব চিকিৎসক নিজেদের বা অন্যকোনো রোগীর হার্টে রিং, পেসমেকার বা ডিভাইস পরানোর প্রসঙ্গ আসলেই এমন সন্দেহ করছেন। রাজধানীর বেশ কয়েকটি হাসপাতালে রোগী, স্বজন এবং চিকিৎসকদের মধ্যে এমন সন্দেহ নিয়ে আলোচনা করতে দেখা যাচ্ছে অহরহই।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল, জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতাল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল, স্কয়ার, ইউনাইটেড, আল হেলাল, অ্যাপালো ও সিকদার হাসপাতালসহ হৃদরোগ চিকিৎসাকেন্দ্র আছে এমন বিশ্বের অনেক হাসপাতালেরই কিছু না কিছু হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক অপ্রয়োজনে হার্টে রিং, পেসমেকার, ডিভাইস পরাচ্ছেন বলে আলোচনা হচ্ছে। তাতে সবথেকে বেশি সন্দেহ হচ্ছে হৃদরোগীদেরই। এমনও ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে চিকিৎসকের প্রতি আস্থা না থাকায় রিং না পরেই বাড়ি চলে যাচ্ছেন কোনো কোনো হৃদরোগী। হৃদরোগে আক্রান্ত ৫০ বছর বয়সি শামসুদ্দিন তাদেরই একজন। চিকিৎসকদের পরামর্শের পরও রিং লাগাতে বিশ্বাস আসেনি তার। তাই হার্টে রিং না পরেই গত ডিসেম্বর মাসে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতাল ছেড়ে বাড়ি চলে যান তিনি। সামসুদ্দিন ওই হাসপাতালের অধ্যাপক ডা. আফজালুর রহমানের অধীনে ভর্তি ছিলেন। তার সন্দেহ শুরু হয়েছিল একজন ডাক্তারের কথাবার্তা থেকেই। আফজাল সাহেবের অধীনস্ত এই ডাক্তার সামসুদ্দিনকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন টাকা-পয়সা আছে? সামসুদ্দিন প্রশ্ন করেন কেন এবং কত?

জবাবে ডাক্তার জানালেন এনজিওগ্রাম পরীক্ষা করার পর হার্টে ব্লক ধরা পড়লে রিং পরাতে হবে। একটি রিংয়ের দাম ৫০ হাজার থেকে লক্ষাধিক। সামসুদ্দিন আবারো জানতে চাইলেন টাকা জোগাড় না থাকলে কি হবে। উত্তরে ডাক্তার বললেন তাহলে এনজিওগ্রাম পরীক্ষা হবে না। এখন এনজিওগ্রাম, পরে আবার রিং পরানো বাড়তি ঝামেলা। টাকা থাকলে এনজিওগ্রাম ও রিং পরানো একসঙ্গেই সম্ভব। সামসুদ্দিনও নাছোড়বান্দা। বললেন আগে এনজিগ্রাম করে দিন, পরে টাকা জোগাড় করে এসে রিং লাগাবো। তার উদ্দেশ্য ছিল এনজিওগ্রাম করার পর সিডি নিয়ে তিনি অন্য আরো ডাক্তারকে দেখিয়ে নিশ্চিত হবেন আদৌ রিংয়ের প্রয়োজন আছে কিনা, তারা বললেই তবে রিং পরাতে সিদ্ধান্ত নেবেন। সামসুদ্দিনের শুধু এনজিওগ্রাম করে দেওয়ার প্রস্তাবে রাজি হলেন না ডাক্তাররা।

বললেন ওষুধ লিখে দিই, বাড়ি চলে যান। ডাক্তারদের প্রায় প্রতিটি কথা শুনে সামসুদ্দিনের মনে খটকা লাগল। মনে প্রশ্ন জাগল সরকারি হাসপাতালে এভাবে দরকষাকষি কেন- তাহলে রিং পরালে নিশ্চয়ই ডাক্তারদের লাভ আছে। ছুটি নিয়ে বাড়ি চলে গেলেন সামসুদ্দিন। সেই যে গেলেন আর ফিরে এলেন না। এখন বাড়িতে ভালো আছেন ওষুধে। এভাবে কেবল সামসুদ্দিনই নন, ডাক্তারদের কাছ থেকে এমন কথা শুনে রিং ও পেসমেকার পরাতে এসে সন্দেহ বাড়ছে অসংখ্য রোগীর। শুধু জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালই নয়, সামসুদ্দিনের মতো এমন প্রশ্ন সরকারি-বেসরকারি অন্য হাসপাতালের হৃদরোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজনেরও। অভিযোগ উঠেছে, রিং বা পেসমেকার পরালে কোম্পানির কাছ থেকে একেকটি রিং বা পেসমেকার বাবদ ডাক্তাররা কমপক্ষে ৩০ শতাংশ কমিশন পান। কেউ কেউ কোম্পানির টাকায় ঘুরে আসছেন বিদেশ।

জানা গেছে এক থেকে তিন লাখ টাকার একটি রিংয়ের প্রকৃত মূল্য ৩০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা। আর প্রতিটি পেসমেকারের মূল্য এক থেকে সাড়ে ১২ লাখ টাকা। এগুলোর প্রকৃত মূল্য ৩০ হাজার থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা। এই মুহূর্তে সরকারি হাসপাতালে এসব রিং, পেসমেকার ও ডিভাইস সরবরাহ নেই। অন্য সময় পাওয়া যেত। কিন্তু কমদামি এবং রোগীর সংখ্যার তুলনায় ছিল নগণ্য। কাড়াকাড়ির মধ্যে কেউ পেত, কেউ বঞ্চিত হত। তাছাড়া বিত্তবান হৃদরোগীরা রিং, পেসমেকার বা ডিভাইস কমদামি বলে লাগাতে চায়ও না। তাই এখন সরকারি হোক আর বেসরকারি হাসপাতাল হোক, হৃদরোগীর প্রয়োজন কোম্পানির রিং ও পেসমেকার। বাণিজ্যটা শুরু এখানেই।

তবে এ কথা ঠিক যে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এসব বস্তু লাগানোর প্রয়োজন পড়ে। এগুলো লাগানোর পর রোগী অনেকদিন বেঁচেও থাকেন। আবার কিছুক্ষেত্রে হার্টের রক্তনালিতে ব্লক তেমন মারাত্মক নয়, তাতে রিং না পরিয়ে শুধু ওষুধের মাধ্যমেও চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব এবং রোগী বহুদিন বেঁচে থাকে। আবার এমনও হার্ট ফেইলিয়রের রোগী আছে, যাদের পেসমেকারের প্রয়োজন নেই, ওষুধই যথেষ্ট। কিন্তু কিছু অর্থলোভী ডাক্তার রিং, ডিভাইস ও পেসমেকার লাগাতে মরিয়া হয়ে যান। কখনো প্রয়োজনে এবং কখনো অপ্রয়োজনেই বিশ্বাস করে এগুলো লাগাতে রাজি হচ্ছেন রোগী এবং স্বজনরাও। তবে ব্লক না থাকলে অথবা হার্টের কার্যক্ষমতা না কমলে রিং ও পেসমেকার লাগানোর অভিযোগ নেই। অপ্রয়োজনে রিং ও পেসমেকার লাগিয়ে বড়লোকরা অর্থের কষ্ট টের না পেলেও মধ্যবিত্ত ও গরিব রোগীরা হচ্ছে সর্বস্বান্ত। ব্যয়বহুল এই বস্তু লাগিয়ে কারো কারো হতে হচ্ছে ভিটেমাটিহারা। আবার কিছু হৃদরোগীর বেলায় দেখা যায় পেসমেকার লাগবে বলে এমনভাবে ভয় দেখানো হয় যে এখনই না লাগালে রোগী মরে যাবে।

ঠিক এমনই একটি ঘটনা ঘটেছে জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ডিসেম্বর মাসে। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ সহযোগী অধ্যাপক ডা. মাহবুবুর রহমানের অধীনে ভর্তি হয়েছিলেন ৬০ বছরের বৃদ্ধ তারামিয়া চৌধুরী। তার হার্টের কার্যক্ষমতা স্বাভাবিক রাখতে হাসপাতালের নিজস্ব একটি অস্থায়ী বিকল্প যন্ত্র লাগানো হয় এবং বলা হলো দ্রুত টাকা জোগাড় করে পেসমেকার লাগাতে হবে। তারামিয়ার আত্মীয়-স্বজন যতই টাকা নেই এবং পেসমেকার লাগানো সম্ভব নয় বলছিল, ডাক্তাররা ততই পেসমেকার লাগানোর তাগিদ দিচ্ছিল। তারামিয়ার পরিবার আবারো অনুরোধ করল ছুটি দিতে। ডাক্তাররা বলল যন্ত্রটি খুলে দিলে যেকোনো সময় তারামিয়া মারা যাবে। স্বেচ্ছায় যেতে চাইলে লিখিত দিয়ে যেতে হবে। এতে রাজি হওয়ার পরও তিনদিন বেডে শুয়েছিলেন তারামিয়া। পরে পরিচালক অধ্যাপক ডা. এসটিএম আবু আজম যন্ত্রটি খুলে দিয়ে তারামিয়াকে ছুটি দেওয়ার নির্দেশ দেন। তারপরও একদিন দেরি করা হয়। অবশেষে তারামিয়া বাড়ি ফিরে যান এবং এখনো বেঁচে আছেন, ভালো আছেন। সম্প্রতি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের একজন ডাক্তার আমার সংবাদকে বলেন, হার্টের ব্লক পেলে কিংবা হার্টের কার্যক্ষমতা কমে গেলেই কি রিং ও পেসমেকার লাগানো বাধ্যতামূলক? মোটেও না।

সবক্ষেত্রে এগুলো লাগানোর প্রয়োজন না পড়লেও ডাক্তাররা কেন লাগাচ্ছেন-সে বিষয়ে রাষ্ট্রীয়ভাবে বা মিডিয়ার কোনো অনুসন্ধান নেই। অপ্রয়োজনে রিং, পেসমেকার লাগানোসহ ডায়াগনস্টিক পরীক্ষা-নিরীক্ষায় চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে কমিশন নেওয়ার অভিযোগের ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নিচ্ছেন- বাংলাদেশ মেডিকেল এন্ড ডেন্টাল কাউন্সিলের (বিএমডিসি) রেজিস্ট্রার ডা. জাহিদুল হক বসুনিয়ার কাছে বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের প্রশ্ন করেছেন এ প্রতিবেদক। জবাবে তিনি বরাবরই বলেছেন এমন অভিযোগ পাননি। পেলে অবশই তদন্ত করবেন এবং প্রমাণ পেলে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেবেন।



 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
close-icon