শিরোনাম

মৃত্যুঞ্জয়ী মহানায়ক

প্রিন্ট সংস্করণ॥বেলাল হোসেন  |  ০৩:৩৭, আগস্ট ১৫, ২০১৯

১৫ আগস্ট, ১৯৭৫। পৃথিবীর বুকে বিভীষিকাময় কালো একদিন। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর নিজ বাড়িতে সপরিবারে শহীদ হন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পৃথিবীতে কালে কালে লাখো-কোটি মানব জন্ম নেবে। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব আমাদের মাঝে কোনোদিন ফিরে আসবেন না এ কথা সত্য।

মৃত্যুঞ্জয়ী এক মহানায়ক বঙ্গবন্ধু থাকবে কোটি বাঙালির হূদয়ে। আজ সেই বেদনাবিধূর এবং শোকাবহ ১৫ আগস্ট। দেখতে দেখতে কেটে গেছে ৪৪টি বছর। মহাকালের কাছে ৪৪ বছর তুচ্ছ মূর্ত মাত্র। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যার মধ্যে দিয়ে বাঙালি জাতির ইতিহাসে যে কলঙ্কের কালিমা লেপণ হয়েছে, তা বইবে অনন্তকাল। মনে পড়ে শিশু রাসেলের কথা।

বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিবের কথা, শেখ কামাল, জামালসহ শহীদদের কথা। সেই সঙ্গে বঙ্গবন্ধু তার ৫৫ বছরের আয়ুষ্কালের মধ্যে ৩৫ বছরে রাজনীতি এবং সংগ্রামী জীবনের যে গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস সৃষ্টি করে গেছেন তা বাঙালি জাতির হূদয়ে বহতা নদীর মতোই বইতে থাকবে দীর্ঘকাল। মহানায়ক বঙ্গবন্ধুর ৩৫ বছরে রাজনৈতিক জীবনের ২৩ বছর (১৯৪৮-৭১) কেটেছে পাকিস্তানি শাসন-শোষণ এবং সামরিক শাসনের নামে নব্য ঔপনিবেশিকতার হাত থেকে এ দেশের সাত কোটি বাঙালিকে মুক্তি দেয়ার দৃঢ় প্রত্যয়ে, আন্দোলন এবং সংগ্রামে।

মাত্র তিন বছর সাত মাস চারদিন ছিলেন যুদ্ধে ধ্বংসপ্রাপ্ত ৩০ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের শাসনকর্তা। ফরিদপুর জেলা মুসলিম লীগের হোমগার্ড সদস্য থেকে পর্যায়ক্রমে দেশের মানুষের কাছে প্রিয় মুজিব ভাই, লিডার, বঙ্গবন্ধু এবং শেষে জাতির পিতা হিসেবে স্বীকৃতির মাধ্যমে ৩৫ বছররের সংগ্রামী জীবনের সমাপ্তি ঘটলেও বঙ্গবন্ধু আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন, বেঁচে থাকবেন, মহাকালের পথ ধরে। কারো ভাবনার পথ ধরে সময় চলে না। সময় চলে তার নিজ গতিতেই।

অনুরূপভাবে সময়ের বিবর্তনে সৃষ্টি হয় ইতিহাস। আবার ইতিহাস সৃষ্টির প্রয়োজনেই পৃথিবীতে কিছু মানুষের আগমন কিংবা প্রস্থান। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সেই কাতারেরই একজন মহানায়ক। বঙ্গবন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ এ দেশের মুক্তিকামী মানুষ মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে। এদিন তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দিলে বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হয়।

৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতির স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশের বিজয় অর্জিত হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙালি অধিষ্ঠিত করে তাদের জাতির পিতার আসনে। বিশ্ববাসীর কাছেও বঙ্গবন্ধু পরিচিত হয়ে ওঠেন নিপীড়িত-নির্যাতিত মানুষের নেতা হিসেবে। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে প্রথম সাক্ষাতে কিউবার কিংবদন্তি বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বলেছিলেন, ‘আমি হিমালয় দেখিনি কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি’। ব্যক্তিত্ব, সাহসিকতা ও নির্ভীকতায় এই ব্যক্তি হিমালয়। স্বাধীনতার পর দেশ পরিচালনায় বঙ্গবন্ধুর বলিষ্ঠ ও দূরদর্শী পদক্ষেপে বাংলাদেশ সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে যেতে থাকে। বঙ্গবন্ধুর এই সফলতা ও উন্নতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার গতি বুঝতে পেরেই স্বাধীনতাবিরোধী দেশি-বিদেশি ষড়যন্ত্রকারীরা ঠাণ্ডা মাথায় তাকে খুন করে। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট রাতে বঙ্গবন্ধুর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে সেনাবাহিনীর বিপথগামী একটি দল হানা দেয়। এ সময় তারা বঙ্গবন্ধুসহ তার পরিবারের সবাইকে একে একে হত্যা করে। বঙ্গবন্ধুর শিশুপুত্র শেখ রাসেলও সেদিন ঘাতকের হাত থেকে রেহাই পায়নি। বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনা এবং কনিষ্ঠ কন্যা শেখ রেহানা দেশের বাইরে থাকায় তারা প্রাণে বেঁচে যান।

স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে চার বছরের মাথায় মহান এই নেতাকে হত্যা করা হয়। ১৫ আগস্ট ইতিহাসের নিষ্ঠুরতম এই হত্যাকাণ্ডের আরও শিকার হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সহধর্মিণী বেগম ফজিলাতুন্নেছা মুজিব, বঙ্গবন্ধুর একমাত্র ভাই শেখ আবু নাসের, বঙ্গবন্ধুর জ্যেষ্ঠ পুত্র শেখ কামাল, শেখ জামাল, শিশুপুত্র শেখ রাসেল, পুত্রবধূ দেশবরেণ্য সুলতানা কামাল ও রোজী জামাল, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক যুবলীগের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান শেখ ফজলুল হক মণি ও তার অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী বেগম আরজু মণি, বঙ্গবন্ধুর ভগ্নিপতি ও তার মন্ত্রিসভার অন্যতম সদস্য কৃষক নেতা আবদুর রব সেরনিয়াবাত, তার ছোট

মেয়ে বেবী সেরনিয়াবাত, কনিষ্ঠ শিশুপুত্র আরিফ সেরনিয়াবাত, নাতি সুকান্ত আবদুলাহ বাবু, ভাইয়ের ছেলে শহীদ সেরনিয়াবাত, আবদুল নঈম খান রিন্টু, বঙ্গবন্ধুর জীবন রক্ষায় এগিয়ে আসা বঙ্গবন্ধুর প্রধান নিরাপত্তা অফিসার কর্নেল জামিল উদ্দিন আহমেদ।

স্বাধীনতার পরাজিত শক্তি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করলেও জাতির পথপ্রদর্শক হিসেবেই আজ বঙ্গবন্ধু তাদের হূদয়ে স্থান করে নিয়েছেন। ইতিহাস সত্যের পথে অবিরল, অবিচল। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করে খুনিচক্র বঙ্গবন্ধুর নাম চিরতরে মুছে ফেলতে চেয়েছিল।

কিন্তু ব্যর্থ হয়ে খুনি মোশতাক, ফারুক, রশিদ, ডালিম ইতিহাসের আঁস্তাকুড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। ৩৪ বছর পরেও খুনিদের ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলতে হয়েছে। বঙ্গবন্ধু তার কর্মের মাঝে, সৃষ্টির মাঝে আমাদের হূদয় মন্দিরে বেঁচে আছেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত