শিরোনাম

ভূমধ্যসাগরে ডুবলো ভাগ্য

প্রিন্ট সংস্করণ॥বেলাল হোসেন  |  ১১:২৫, মে ১৩, ২০১৯

ভাগ্যের চাকা পরিবর্তনে শেষ রক্ষা হলো না ৩৭ বাংলাদেশির। নিজ মাতৃভূমি ছেড়ে পাড়ি জমাতে চেয়েছিলেন ইউরোপে। ছয় মাস আগে একগুচ্ছ স্বপ্ন নিয়ে ঘর ছেড়েছিলেন তারা। অবশেষে জীবন যুদ্ধের কাছে হার মানতে হলো তাদের। আকাশ ছোঁয়ার স্বপ্ন ডুবলো সাগরে।

গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার পথে নৌকাডুবে অন্তত ৬০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৩৭ বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রোববার লিবিয়ার ত্রিপলির বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম-বিষয়ক উপদেষ্টা এ এস এম আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমরা তিউনিসিয়ার রেড ক্রিসেন্টের সঙ্গে কথা বলেছি। ডুবে যাওয়া নৌকাটিতে ৫১ জন বাংলাদেশি ছিলেন।

বেঁচে যাওয়াদের মধ্যে পাঁচজনকে তিউনিসিয়ায় চিকিৎসা দেয়া হচ্ছে। জীবিত উদ্ধারকৃত বাকিদের তিউনিসিয়ার রেড ক্রিসেন্ট ও আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা যৌথভাবে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে বলে জানান তিনি।

গত বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ৫১ বাংলাদেশিসহ ৭৫ অভিবাসী বহনকারী নৌকাটি ডুবে যায়। নৌকাডুবির কয়েক ঘণ্টা পর ১৬ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ১৬ জনের মধ্যে ১৪ জনই বাংলাদেশি। তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। উত্তর আফ্রিকার দেশ তিউনিসিয়ার উপকূলে এ নৌকাডুবির ঘটনা ঘটে। তিউনিসিয়ার রেড ক্রিসেন্টের কর্মকর্তারা জানান, উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের শনিবার সকালে তিউনিসিয়ার জার্জিস শহরের তীরে আনা হয়।

অপরদিকে রেড ক্রিসেন্টের বরাত দিয়ে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে তিউনিসিয়ার উপকূলের কাছে ভূমধ্যসাগরে অভিবাসীবাহী একটি নৌকা ডুবে যায়। এই নৌকাডুবিতে নিহত ৬০ জনের মধ্যে অধিকাংশই বাংলাদেশি। তিউনিসিয়ায় রেড ক্রিসেন্টের কর্মকর্তা মঙ্গি স্লিম বলেন, নৌকাটিতে প্রায় ৭৫ জন আরোহী ছিলেন। তাদের সবাই পুরুষ। তাদের মধ্যে ৫১ জনই বাংলাদেশি।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, তিউনিসিয়ার জেলেরা নৌকার আরোহীদের মধ্যে ১৬ জনকে উদ্ধার করেন। তাদের মধ্যে এক শিশুসহ ১৪ জন বাংলাদেশি। দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যমে ত্রিপোলির বাংলাদেশ দূতাবাসের বরাত দিয়ে বলা হচ্ছে, এই নৌকাডুবিতে ৩৭ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন।

গতকাল সংবাদিকদের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আবদুল মোমেন জানান, ঘটনার বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্য পাননি তিনি। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, উদ্ধার হওয়া ১৪ জনের সবাই বাংলাদেশি। যাদের এখনো পাওয়া যায়নি, তাদের মধ্যে কতজন বাংলাদেশি, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য নেই।

যেহেতু ৩৭ জনকে পাওয়া যাচ্ছে না, সে ক্ষেত্রে ৩০ থেকে ৩৫ জন মারা গেছেন বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, ওই ঘটনা জানার পর সেখানকার দূতাবাস থেকে এক কর্মকর্তা ঘটনাস্থলে চলে গেছেন। যারা নিখোঁজ, তাদের উদ্ধারের চেষ্টা চলছে। উদ্ধার হওয়ার ব্যক্তিদের দেশে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা হচ্ছে।

বেঁচে ফেরা অভিবাসীরা জানান, নৌকাটিতে ৫১ বাংলাদেশি ছিলেন। এ ছাড়া মিসর, মরক্কো, শাদসহ আফ্রিকার কয়েকটি দেশের নাগরিক ছিলেন। তারা আরও জানান, বৃহস্পতিবার গভীর রাতে ৭৫ অভিবাসী নিয়ে একটি বড় নৌকা লিবিয়ার উপকূল থেকে ইতালির উদ্দেশে রওনা হয়।

এরপর গভীর সাগরে নৌকাটি থেকে অপেক্ষাকৃত ছোট একটি নৌকায় যাত্রীদের তোলা হলে কিছুক্ষণ পরই সেটি ডুবে যায়। তিউনিসিয়ার রেড ক্রিসেন্ট কর্মকর্তা মঙ্গি স্লিম জানান, রাবারের তৈরি ‘ইনফ্লেটেবেল’ নৌকাটি ১০ মিনিটের মধ্যে ডুবে যায়। তিউনিসিয়ার জেলেরা ১৬ জনকে উদ্ধার করে জার্জিস শহরের তীরে নিয়ে আসেন।

জার্জিসের একটি আশ্রয়কেন্দ্রে অভিবাসীদের রাখা হয়েছে। তাদের অধিকাংশই বাংলাদেশি। উদ্ধার হওয়া অভিবাসীরা জানান, ঠাণ্ডা সাগরের পানিতে তারা প্রায় আট ঘণ্টা ভেসে ছিলেন। আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) কর্মকর্তারা জানান, জাতিসংঘের শরণার্থী-বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের পক্ষ থেকে এ দুর্ঘটনায় ৬৫ জনের প্রাণহানির খবর নিশ্চিত করা হয়েছে। ১৬ জনকে জীবিত উদ্ধারের কথাও তারা জানান।

তিউনিসিয়ার রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা টিএপির খবর অনুযায়ী, ডুবে যাওয়া নৌকায় ৭০ জনেরও বেশি অভিবাসনপ্রত্যাশী ছিলেন। সি ফ্যাক্স উপকূলের ৪০ নটিক্যাল মাইল দূরে এটি ডুবে যায়। তিউনিসিয়ার রাজধানী তিউনিস থেকে ওই স্থানের দূরত্ব প্রায় ২৭০ কিলোমিটার।

দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, মর্মান্তিক ওই নৌকাডুবির পর অভিবাসীদের উদ্ধারে একটি মাছ ধরা নৌযান নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় তিউনিস নৌবাহিনী। তারা জীবিতদের পাশাপাশি তিনজনের মরদেহ উদ্ধারে সমর্থ হয়। এর আগেও নৌকা ডুবে বহু মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন। এ বছরের প্রথম চার মাসে সেখানে নৌকা ডুবে ১৬৪ জন মারা গেছে বলে জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার তথ্য। এসব ঘটনার মধ্য দিয়ে মানবপাচারের ভয়াবহ চিত্রও বেরিয়ে আসছে।

তিউনিসিয়ায় যাচ্ছেন বাংলাদেশের প্রতিনিধি : ভূমধ্যসাগরে নৌকাডুবির ঘটনায় হতাহত বাংলাদেশিদের ব্যাপারে খোঁজখবর নিতে এবং জীবিতদের দেশে ফেরানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে তিউনিসিয়ায় বাংলাদেশের প্রতিনিধি পাঠানো হচ্ছে। গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, জীবিত উদ্ধার হওয়া ১৬ জনের মধ্যে ১৪ জন বাংলাদেশি। পররাষ্ট্রমন্ত্রী এ কে আব্দুল মোমেন জানিয়েছেন, তিউনিসিয়া উপকূলে নৌকাডুবিতে কতজন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন সে বিষয়ে কোনো তথ্য এখন পর্যন্ত তাদের কাছে নেই।

‘সংবাদমাধ্যমসহ বিভিন্ন সূত্র থেকে আমরা জানতে পেরেছি, ওই নৌকায় ৫১ জন বাংলাদেশি ছিলেন। তার মধ্য থেকে ১৪ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। সে হিসাবে ৩৭ জন বাংলাদেশি নিহত হওয়ার কথা জানতে পেরেছি। তবে এই সংখ্যার বিষয়ে আমরা এখনো নিশ্চিত হতে পারিনি। সরেজমিন ব্যবস্থা নিতে লিবিয়ার বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে আমরা তিউনিসায় প্রতিনিধি পাঠাচ্ছি।’

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছেন, সম্প্রতি পাঁচ বাংলাদেশি অবৈধভাবে ইরাকে গিয়ে আটক হয়ে জেল-জরিমানার মুখোমুখি হয়েছেন। তাদের ফেরানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। আদম ব্যবসায়ীরা লিবিয়াতে মানুষ পাঠিয়ে তাদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলছে উল্লেখ করে তিনি মন্তব্য করেন, মানব পাচার রোধে অভিবাসন বিভাগকে আরও শক্ত ভূমিকা নিতে হবে। তিউনিসিয়াতে শরণার্থীদের আশ্রয় সংক্রান্ত কোনো আইন নেই।

বেঁচে যাওয়া এসব শরণার্থীরা এখন বাড়ি ফিরবেন নাকি জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মাধ্যমে আশ্রয় প্রার্থনা করবেন, সেই সিদ্ধান্ত নিতে ৬০ দিন পাবেন তারা। যে ১৪ জন বাংলাদেশিকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে তাদের দেশে ফেরত আনার ব্যাপারে জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত হওয়ার পর দেশে ফেরানোর উদ্যোগ নেয়া হবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, বাংলাদেশ থেকে লিবিয়াতে লোক পাঠানো সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ রয়েছে। সেকারণে অভিবাসন প্রত্যাশীরা বিভিন্ন প্যাকেজের মাধ্যমে অন্য দেশ হয়ে লিবিয়াতে যায়। পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, তিউনিসিয়ার স্থানীয় রেড ক্রিসেন্ট আমাদের তথ্য দিয়ে সহায়তা করছে। লিবিয়াতে আমাদের মাত্র একজন লেবার কাউন্সিলার কাজ করছেন এবং তার পক্ষে এতজন লোকের দেখভাল করাটা মুশকিলের বিষয়।

ভূমধ্যসাগরে নিহত ১৫ জনই সিলেটের : আমার সংবাদের সিলেট প্রতিনিধি জানান, স্বপ্নের দেশ ইউরোপে পাড়ি জমাতে যাওয়ার পথে নৌকাডুবে নিহতদের মধ্যে সিলেটের নাগরিক রয়েছেন ১৫ জন। নিহত ৬০ জনের মধ্যে অধিকাংশই বাংলাদেশি বলে জানা গেছে। সিলেটের নিহত নাগরিকদের মধ্যে পাঁচজনের পরিচয় পাওয়া গেছে।

এরা হলেন- সিলেট জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি শাহরিয়ার আলম সামাদের ছোট ভাই শামীম আলম, সাবেক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক মাসুদ আহমদের ছোট ভাই মারুফ আহমদ, ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার কটালপুর এলাকার মুয়িদ পুর গ্রামের হারুন মিয়ার ছেলে আব্দুল আজিজ (২৫), একই গ্রামের মন্টু মিয়ার ছেলে আহমদ (২৪) এবং সিরাজ মিয়ার ছেলে লিটন (২৪)। এ ঘটনায় ফেঞ্চুগঞ্জের দিনপুর গ্রামের আরেকজন নিহত হয়েছে। আর অপর ৯ জনের নাম পরিচয় জানা যায়নি।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত