শিরোনাম

অসাম্প্রদায়িক চেতনায় বর্ষবরণ

প্রিন্ট সংস্করণ॥নিজস্ব প্রতিবেদক  |  ০০:২৯, এপ্রিল ১৬, ২০১৯

বাঙালির প্রাণের উৎসব নববর্ষকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বরণ করেছে দেশবাসী। বর্ষবরণে প্রতি বছরের মতো এবারো মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন ছিল রাজধানীতে। বাঙালি জাতি জীর্ণ-পুরাতনকে পেছনে ফেলে সম্ভাবনার নতুন বছরে প্রবেশ করেছে। রাজধানী ঢাকাসহ দেশব্যাপী বর্ণিল উৎসবে পহেলা বৈশাখ উদযাপিত হয়েছে। ‘এ বৃহৎ লজ্জারাশি চরণ-আঘাতে/চূর্ণ করি দূর করো মঙ্গলপ্রভাতে/মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে/উদার আলোক-মাঝে উন্মুক্ত বাতাসে’- নৈবেদ্য কাব্যগ্রন্থের ৪৮ নম্বর কবিতায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এভাবে সব বাধা পেরিয়ে অনুপ্রেরণা খুঁজেছিলেন। আর রবীন্দ্রনাথের অনুপ্রেরণায় সময়কে ধারণ করে প্রেরণার সন্ধান করা হয়েছে এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রায়। এবারের মঙ্গল শোভাযাত্রার প্রতিপাদ্য ‘মস্তক তুলিতে দাও অনন্ত আকাশে’। সকাল সাড়ে ৯টার আগেই বের হয় মঙ্গল শোভাযাত্রা। ঐতিহ্য অনুযায়ী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান শোভাযাত্রার উদ্বোধন করেন। অংশ নেন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থীসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য মানুষ। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণীতে দেশবাসীসহ সমগ্র বাঙালিদের আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। শোভাযাত্রায় ছিল মূল আটটি শিল্পকাঠামো। সবই চেনাজানা। বাঘের মুখ থেকে কাঁটা তোলার চিরায়ত গল্পটি উপস্থাপিত হয়েছে বাঘ ও বকের অনুষঙ্গে। মঙ্গলের বার্তা প্যাঁচা। সমৃদ্ধির কথা বলেছে ছাগল আর সিংহের সমন্বয়ের বিশেষ মোটিফ। লোকজ ঐতিহ্যের চিত্র মেলে ধরেছে গাজির পটের গাছ। এছাড়া অনুষঙ্গের মধ্যে ছিল দুই মাথা ঘোড়া, দুই পাখি, কাঠঠোকরা। ছিল পঙ্খিরাজ ঘোড়ায় সওয়ার মানুষ। অন্যদিকে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সকাল ১০টায় উপাচার্য ড.মীজানুর রহমানের উদ্বোধনের মধ্যে দিয়ে শোভাযাত্রা শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়টি। তাদের এবারের থিম ছিল নদী। সে উপলক্ষে বিভিন্ন ধরনের নৌকা ও মাছ শোভা পেয়েছে মঙ্গল শোভাযাত্রায়। ?মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঐক্যবদ্ধভাবে ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত-সমৃদ্ধ অসাম্প্রদায়িক সোনার বাংলাদেশ গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয়ে বাঙালি জাতি গত রোববার বাংলা নববর্ষ-১৪২৬ বরণ করেছে। বাঙালির আত্মপরিচয়ের তালাশ আহ্বানে রমনার বটমূলে ছায়ানট ১৪২৬ বঙ্গাব্দ বরণ করে। সূর্যোদয়ের সাথে সাথে বাঁশিতে রাগ আহীর ভাঁয়রো পরিবেশনার মধ্য দিয়ে রমনা বটমূলে শুরু হয় ছায়ানটের প্রভাতী আয়োজন। একক ও সম্মিলিত কণ্ঠে সংগীত পরিবেশনা আর কবিতায় ছায়ানটের শিল্পীরা স্বাগত জানান পহেলা বৈশাখকে। নানান রঙের পোশাকে এ সময় রমনার বটমূলে শতাধিক শিল্পী তাদের সুর-ছন্দ আর তাল-লয়ে বৈশাখের বন্দনা করে স্বাগত জানান নতুন বছর ১৪২৬-কে। তাদের সে আয়োজনে ছিলো বৈশাখের মগ্নতা, হূদয়ে নতুনকে কাছে পাওয়ার তৃষ্ণা। বাংলা নববর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা গত রোববার সকালে তার সরকারি বাসভবন গণভবনে দল এবং বিভিন্ন সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। প্রতিবছরের ন্যায় এবারো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। চারুকলার মঙ্গল শোভাযাত্রাটি ঢাবি উপাচার্যের নেতৃত্বে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষের অংশগ্রহণে শাহবাগ মোড় হয়ে টিএসসি ঘুরে চারুকলায় এসে শেষ হয়। শোভাযাত্রায় অনেক বিদেশি অতিথিও উপস্থিত ছিলেন। শোভাযাত্রায় আবহমান বাংলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের প্রতীকী উপস্থাপনের জন্য নানা বিষয় স্থান পায়। কেবল দেশের বড় শহরগুলোতেই নয়- এবারের বর্ষবরণ দেশের উপজেলা থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। সকল বিভাগীয় শহর, সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, উপজেলা শহর ও নদীবন্দর এলাকায় সকালে শোভাযাত্রার মধ্যদিয়ে বাংলা নববর্ষ বরণ উৎসব শুরু হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে উদযাপিত হয়েছে বাংলা নববর্ষ-১৪২৬। ক্যাম্পাসে দিনব্যাপী বর্ষবরণের অনুষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশগ্রহণ করে। নববর্ষ উপলক্ষে গত রোববার ছিল সরকারি ছুটির দিন। জাতীয় সংবাদপত্রগুলো বাংলা নববর্ষের বিশেষ দিক তুলে ধরে ক্রোড়পত্র প্রকাশ করেছে। সরকারি ও বেসরকারি টিভি চ্যানেলে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানমালা প্রচার করা হয়। বাংলা নববর্ষের দিন সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে (এতিমখানা) উন্নতমানের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবার পরিবেশন করা হয়। শিশু পরিবারের শিশুদের নিয়ে ও কারাবন্দিদের পরিবেশনায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং কয়েদিদের তৈরি বিভিন্ন দ্রব্যাদি প্রদর্শন করা হয়। সব জাদুঘর ও প্রত্নস্থান সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত রাখা এবং শিশু-কিশোর, ছাত্র-ছাত্রী, প্রতিবন্ধী ও অটিস্টিক শিশুদের বিনা টিকিটে প্রবেশের সুযোগ ছিল। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ মিশনসমূহ এ উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানমালার আয়োজন করে। অভিজাত হোটেল ও ক্লাবে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা এবং ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের আয়োজন করা হয়। মঙ্গল শোভাযাত্রার ইতিহাস তালাশ করে পাওয়া যায়, চারুকলা থেকে এই শোভাযাত্রার প্রচলন হয়েছিল ১৯৮৯ সালে। এর পূর্বে ১৯৮৫ সালে রাজশাহীতে এর প্রচলন হয়েছিল বলে জানা যায়। ১৯৯৬ সাল থেকে চারুকলার এই আনন্দ শোভাযাত্রা ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ নামকরণ হয়। ২০১৬ সালে আয়োজনটি ইউনেসকোর অপরিমেয় বিশ্ব সংস্কৃতি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। অন্যদিকে বাঙালির প্রাণের উৎসব বৈশাখকে বরণ করতে সকাল ছয়টা বাজার আগেই বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ রঙ-বেরঙের পোশাক পড়ে উপস্থিত হয় রমনায়। ছায়ানটের বর্ষবরণে এবারের স্লোগান ‘অনাচারের বিরুদ্ধে জাগ্রত হোক শুভবোধ’। তাদের বর্ষবরণের আয়োজনের শুরুতে ছিল প্রকৃতির স্নিগ্ধতা ও সৃষ্টির মাহাত্ম্য নিয়ে ভোরের সুরে বাঁধা গানের পরিবেশনা। পরের ভাগে ছিল অনাচারকে প্রতিহত করা এবং অশুভকে জয় করার জাগরণী সুরবাণী, গান-পাঠ-আবৃত্তিতে দেশ-মানুষ-মনুষ্যত্বকে ভালোবাসার প্রত্যয়। বরাবরের মতো এবারো সকাল সোয়া ছয়টার দিকে ছায়ানটের বর্ষবরণের অনুষ্ঠান শুরু হয়। আয়োজন শেষ হয় সকাল সাড়ে ৮টার দিকে। জাতীয় সংগীত গেয়ে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সমাপ্তি টানার আগে শুভবোধ জাগরণের আহ্বান জানান ছায়ানট সভাপতি সন?জীদা খাতুন। এর আগে অসিত কুমার দের রাগ ললিত আলাপ ও বন্দিশ পরিবেশনার মধ্য দিয়ে শুরু হয় মূল আয়োজন। পরে ছায়ানটের নবীন-প্রবীণ শিল্পীরা সমবেত কণ্ঠে শোনান রবীন্দ্রনাথের ‘মোরে ডাকি লয়ে যাও’ গানটি। খায়রুল আনাম শাকিল শোনান অজয় ভট্টাচার্যের লেখা ‘প্রথম আলোয় লহ প্রণিপাত’ গানটি। ছায়ানটের বর্তমান, সাবেক শিক্ষার্থী ও শিক্ষক নিয়ে শখানেক শিল্পী এই আয়োজনে অংশ নেন। ছিল ১৩টি একক ও ১৩টি সম্মেলক গান এবং দুটি আবৃত্তি। রবীন্দ্র রচনা থেকে বেছে নেয়া হয়েছে আবৃত্তি দুটি। ত্রপা মজুমদার আবৃত্তি করেন ‘প্রশ্ন’ এবং জহিরুল হক খান করেন ‘এবার ফিরাও মোরে’। একই ধারায় গানগুলো নির্বাচন করা হয়েছে কাজী নজরুল ইসলাম, অতুলপ্রসাদ সেন, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, রজনীকান্ত সেন, লালন শাহ, মুকুন্দ দাস, অজয় ভট্টাচার্য, শাহ আবদুল করিম, কুটি মনসুর, সলিল চৌধুরী ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের রচনা থেকে। ছায়ানটের আয়োজনে সামিল হতে ভোরেই রমনার বটমূলে নানা শ্রেণি-পেশা ও বয়সের মানুষের সমাগম ঘটে। তাদের পরনে ছিল রঙিন পোশাক। মনে উচ্ছ্বাস। তারা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে পুরো অনুষ্ঠান উপভোগ করেন। রমনার এই অনুষ্ঠানকে ঘিরে সংশ্লিষ্ট এলাকায় নেয়া হয় কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা। নিরাপত্তা বাহিনীর বিপুলসংখ্যক সদস্যকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে দেখা যায়। রমনায় প্রবেশের ক্ষেত্রে করা হয় তল্লাশি। বাঙালির প্রাণের এই উৎসবকে ঘিরে দিনভর ছিল নানা আয়োজন। উল্লেখ্য, কৃষিকাজ ও খাজনা আদায়ের সুবিধার জন্য বাংলা সন গণনার শুরু মোঘল সম্রাট আকবরের সময়ে। হিজরি চন্দ্রসন ও বাংলা সৌর সনের ওপর ভিত্তি করে প্রবর্তিত হয় নতুন এই বাংলা সন। ১৫৫৬ সালে কার্যকর হওয়া বাংলা সন প্রথমদিকে পরিচিত ছিল ফসলি সন নামে, পরে তা পরিচিত হয় বঙ্গাব্দ নামে। কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ সমাজের সঙ্গে বাংলাবর্ষের ইতিহাস জড়িয়ে থাকলেও এর সঙ্গে রাজনৈতিক ইতিহাসেরও সংযোগ ঘটেছে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত