শিরোনাম
আজ সেই ভয়াল কালরাত

কূটনীতিকদের ব্যর্থতায় আজও মেলেনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

প্রিন্ট সংস্করণ॥এনায়েত উল্লাহ  |  ০০:১০, মার্চ ২৫, ২০১৯

মুক্তিযুদ্ধ একদিকে যেমন স্বাধীনতা এনে দিয়েছে, তেমনই কেড়ে নিয়েছে বহু বুদ্ধিজীবী, আত্মার আত্মীয়দের, বহু নারী হয়েছেন স্বামী ও সন্তানহারা। অনেকের কাছেই যুদ্ধের স্মৃতি হয়ে উঠেছে এক তমসাচ্ছন্ন রাত। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নারীর অংশগ্রহণ ছিল বহুমাত্রিক। দেশের ভেতরে ও বাইরে শরণার্থী ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা রিক্রুট করা, চাঁদা তোলা, ওষুধ, খাবার, কাপড় সংগ্রহ করা, ক্যাম্পে ক্যাম্পে রান্না করা, সেবা করা, চিকিৎসা করা, অস্ত্র শিক্ষা নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রহরী হিসেবে কাজ করা, এমনকি সক্রিয়ভাবে যুদ্ধ করার কাজেও অংশ নিয়েছিলেন বহু নারী। শুধু তাই নয়, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পীরা, মুক্তির গানের শিল্পীরা গানের মাধ্যমে, লেখার মাধ্যমে জাগিয়ে তুলেছিলেন দেশের ভেতরের অবরুদ্ধ, পীড়িত, নির্যাতিত নারী-পুরুষকে। আজ মুক্তিযোদ্ধাদের জবানি পড়লে বোঝা যায়, নারীদের সাহায্য ছাড়া গেরিলা যুদ্ধ চালানো দুরূহ হয়ে উঠতো। সে যুদ্ধ শুরুর পূর্বেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী যুদ্ধের নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ২৫ মার্চ রাতে অস্ত্রহীন বাঙালি জাতির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। এতে কি পরিমাণ বাঙালি মৃত্যুবরণ করেছিল তার সঠিক পরিসংখ্যান আজও কেউ দিতে পারেনি। শুধু তাই নয়, সে বিষয়ে আজও মিলেনি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। এ বিষয়ে দেখা দিয়েছে ভিন্ন ভিন্ন মত। মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আকম মোজাম্মেল হক মনে করেন, জাতিসংঘে নিযুক্ত বাংলাদেশি কূটনীতিকদের ‘ভুলে’ একাত্তরের পঁচিশে মার্চের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আসেনি। তবে এ ব্যাপারে ভিন্ন মত প্রকাশ করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন। তিনি মনে করেন, এটার জন্য একক কোনো গোষ্ঠী দায়ী না। তবে ভিতরগত কোনো বিষয় আছে কিনা সেটা মন্ত্রী ভালো বলতে পারবেন। অন্যদিকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় মনে করে, এটা একটা কাঠিন কাজ। স্বীকৃতির জন্য কাজ চলছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী গতকাল জাতীয় প্রেসক্লাবে ‘একাত্তরের ২৫ মার্চের গণহত্যা ও আমাদের ভাবনা’ শীর্ষক এক সেমিনারে আফসোস করে বলেছেন, ২০১৫ সালে জাতিসংঘ যখন আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয়, তখন দেশের কূটনীতিকরা পঁচিশে মার্চের গণহত্যার প্রেক্ষাপট ‘সঠিকভাবে তুলে ধরতে পারেননি’। জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিবছর ৯ ডিসেম্বর আন্তর্জাতিক ‘গণহত্যা দিবস’ পালিত হয়। অন্যদিকে বাংলাদেশ একাত্তরের ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির দাবি জানিয়ে আসছে। মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মতো ৯ ডিসেম্বরে কোনো সুনির্দিষ্ট ঘটনা নেই। আমাদের মুখ্য সুযোগ ছিল ২০১৫ সালে। তখন জাতিসংঘের ভুল সংশোধনের জন্য কূটনীতিকরা সেভাবে প্রতিবেদন উপস্থাপন করতে পারেন নাই। তবে সরকার এখন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ২৫ মার্চের গণহত্যা বিষয়ে সারা বিশ্বে জনমত গঠনে কাজ করছে বলে জানান মন্ত্রী। মুক্তিযুদ্ধে শহীদের সংখ্যা নিয়ে যারা বিতর্ক তোলেন, তাদের সতর্ক করে দিয়ে মোজাম্মেল বলেন, প্রতিষ্ঠিত সত্যকে যারা ‘বিতর্কিত’ করতে চায় রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের বিচার হওয়া উচিৎ। তারা ৩০ বছর ক্ষমতায় থেকে ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধকে পেছনে ঠেলে দিয়েছেন। তারা এখন শহীদের সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলে শহীদের সংখ্যাকে বিতর্কিত করতে চায়। তারা কি এখন এক দুই করে শহীদের সংখ্যা গোনেন? একাত্তরের যুদ্ধাপরাধের জন্য জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে আওয়ামী লীগ সরকার ‘গড়িমসি’ করছে বলে কোনো কোনো মহলের যে অভিযোগ রয়েছে, সে বিষয়েও কথা বলেন মন্ত্রী। একাত্তরে মুজিবনগর সরকারের বিরোধিতায় খোন্দকার মোশতাক, জিয়াউর রহমানের ভূমিকা প্রকাশে একটি ‘ট্রুথ কমিশন’ গঠন করা হবে বলে জানান আকম মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, বিসিএসে মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর ইতিহাস নিয়ে ১০০ নম্বরের প্রশ্নপত্র প্রণয়ন, স্কুলপর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঠ বাধ্যতামূলক করতে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় কাজ করে যাচ্ছে। সম্প্রীতি বাংলাদেশের আহ্বায়ক পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে এ সেমিনারে মূল প্রবন্ধ পাঠ করেন শহীদকন্যা নুজহাত চৌধুরী। তিনি বলেন, “পঁচিশে মার্চের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া খুব সহজ হবে না। একাত্তরে পাকিস্তানকে সহযোগিতা, সমর্থন জানিয়ে আসা আমেরিকা, চীন ও ইসলামিক উম্মাহর দেশগুলোর অমানবিক চেহারা যে তাহলে প্রকাশ হয়ে যাবে। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর তখনকার রেসকোর্স ময়দানে আত্মসমপর্ণের পর পাকিস্তান তাদের ১৯৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। প্রায় অর্ধশতক পর সেই সেনা কর্মকর্তাদের অপরাধের বিচারের জন্য একটি জাতীয় কমিশন গঠনের প্রস্তাব করেন নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক একে মো. আলী শিকদার। তিনি বলেন, “এ কাজটি না হলে পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক কখনো স্বাভাবিক হবে না। সেই সঙ্গে ধর্মান্ধ ও উগ্রবাদী রাজনীতিতে পাকিস্তান যে মদদ দিচ্ছে, তাও বন্ধ করতে হবে। অন্যদিকে গণহত্যার প্রায় অর্ধশত বছর পরও কেন এখনো তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলছে না তা নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিদেশিদের কাছ থেকে এ ব্যাপারে স্বীকৃতি আদায়ে কূটনৈতিক উদ্যোগও সীমিত। কারণ জাতিসংঘ ৯ ডিসেম্বরকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস পালনের সিদ্ধান্ত নেয় ২০১৫ সালে। আর্মেনিয়ায় গণহত্যার বিষয়ে দেশটির প্রস্তাবের ভিত্তিতে দিবসটি ঘোষণা করা হয়। ফলে জোরালো কূটনৈতিক তৎপরতা ছাড়া ২৫ মার্চকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা দিবস ঘোষণা আদায় করা খুব সহজ হবে বলে মনে করছেন না সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টির সাথে একমত পোষণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রীও। অভিযোগে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে জাতীয় সংসদে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে চোখে পড়ার মতো তেমন কোনো কূটনৈতিক তৎপরতা নেই। তবে দিবসটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি না মিললেও ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদে ২৫ মার্চ জাতীয় গণহত্যা দিবস পালনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। সেই সিদ্ধান্ত মোতাবেক আজ ২৫ মার্চ দ্বিতীয় বারের মতো দেশে জাতীয় গণহত্যা দিবস পালিত হচ্ছে। সরকারিভাবে কূটনৈতিক তৎপরতা জোরেশোরে না হলেও বেসরকারিভাবে বিচ্ছিন্ন কিছু প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু সরকারি পর্যায় থেকে বিভিন্ন দেশের মানব সভ্যতার ইতিহাসে একটি কলঙ্কিত হত্যাযজ্ঞের দিন। এদিন বাঙালির ওপর হিংস্র দানবের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ করেন পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ ইতিহাসের জঘন্যতম নৃশংসতা। কালরাতে রাজধানী ঢাকায় নির্বিচারে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের পাকহানাদার বাহিনীর ওই অভিযানে সেদিনের কালরাতে ঠিক কতজন মানুষকে হত্যা করা হয়েছিল, তার সঠিক হিসাব পাওয়া দুষ্কর। তবে ওই সময়ে যেসব বিদেশি সাংবাদিক ঘটনার ওপর প্রতিবেদন করেছিলেন, সেখানে সাত হাজার থেকে ৩৫ হাজার পর্যন্ত মানুষকে নির্বিচারে হত্যার বর্ণনা পাওয়া যায়। এরপর নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ৩০ লাখ মানুষকে হত্যা করে পাকহানাদার বাহিনী। শুধু হত্যাযজ্ঞই নয়, পাকবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসররা দুই লাখ নারীর সম্ভ্রমহানি করে। বাড়িঘরে আগুন ধরিয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, জাতিসংঘের সংজ্ঞায় এসবই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে গণ্য বলে বিবেচিত হওয়া উচিত। তবে সদস্য রাষ্ট্রগুলোর সম্মতি ছাড়া গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব নয়। এ কারণে বাংলাদেশ সরকারের কূটনৈতিক উদ্যোগের প্রয়োজন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং বিদেশে বাংলাদেশের দূতাবাসগুলো থেকে এখন পর্যন্ত তেমন কোনো প্রচেষ্টা চোখে পড়েনি। একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নির্বিকার থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করে। তারা মনে করেন, জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্ত মোতাবেক বাংলাদেশ সরকার ২০১৭ সালে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস হিসেবে ঘোষণা করেছে। আমরা নিজেদের উদ্যোগে বিভিন্ন দেশে সেমিনার করেছি। তাদের কাছে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছি। তাদের গণহত্যার স্বীকৃতি দেয়ার অনুরোধ জানিয়েছি। ওইসব দেশ বাংলাদেশের সরকারের কাছ থেকে অনুরোধ পাওয়ার অপেক্ষা করছে। দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার হলো, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এমন কোনো অনুরোধ এখনো জানানো হয়নি। এব্যাপারে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক আমার সংবাদকে বলেন, ‘গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি’ আদায়ে কাজ চলছে। অনেক ধরনের কাজ আছে। যার কিছু গণমাধ্যমকে জানানো হয় আর কিছু জানানো হয় না। তবে কাজ দ্রুত গতিতে চলছে। তবে তিনি এ ব্যাপারে বিস্তারিত কিছুই বলেননি। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে আরও জানা যায়, তারা মুক্তিযুদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের ওপর যে গণহত্যা চলেছে, তার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির জন্য কাজ চলছে। বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের সংসদীয় প্রতিনিধি দলের সদস্যরা সফর করে গণহত্যার স্বীকৃতি দেয়ার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছেন। তারা চায়, বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্ট থেকে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যাকে যেন স্বীকৃতি দিয়ে প্রস্তাব পাস করা হয়। এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণহত্যা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন আমার সংবাদকে বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়ভাবে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করেছে অনেক পরে। এটা আরও পূর্বে করার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বাংলাদেশ ২০১৭ সালে এ সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই জাতিসংঘ আর্মেনিয়ার অনুরোধে ৯ ডিসেম্বরকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করে। তিনি মনে করেন দেশের ভিতরে চর্চার জায়গাটা আরও বাড়াতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে জানাতে হবে। এ বিষয়ে গবেষণা বাড়াতে হবে। তাহলেই ধীরে ধীরে সবার মাঝে এ বিষয়ের গুরুত্ব বাড়বে এবং সেটা ধীরে ধীরে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাবে। এখন আমাদের বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টে প্রস্তাব পাস করিয়ে গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায় করানোর চেষ্টা চালাতে তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক সাহিত্য এবং দলিলে বাংলাদেশে গণহত্যার বিষয়টি আরও বেশি করে থাকার ব্যাপারে প্রচেষ্টা চালাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু রেফারেন্স দলিলে থাকা ছাড়া আন্তর্জাতিক কোনো সাহিত্যে কিংবা দলিলে বাংলাদেশে গণহত্যার বিষয়টি সেভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। রুয়ান্ডা, আর্মেনিয়া, কম্বোডিয়ায় পলপটের আমলের গণহত্যা যেভাবে আন্তর্জাতিক সাহিত্যে ও দলিলে প্রতিষ্ঠিত, বাংলাদেশের গণহত্যা সেভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। বাংলাদেশের গণহত্যাকে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ কিংবা সাধারণ একটা যুদ্ধ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু যুদ্ধ শুরুর আগে যেভাবে ২৫ মার্চ রাতে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে কিংবা নয় মাসের যুদ্ধে যেভাবে গণহত্যা চালানো হয়েছে তার বিবরণ আন্তর্জাতিক দলিলে কম দেখা যায়। অধ্যাপক দেলোয়ার হোসেন মনে করেন, ‘গণহত্যার বিষয় প্রতিষ্ঠিত করতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক উদ্যোগ যথেষ্ঠ নয়। এ ব্যাপারে সক্রিয় পদক্ষেপ তেমন দেখা যায় না। বিশ্বের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলাদেশের গণহত্যা স্টাডির ব্যাপারে বাংলাদেশকে আরও সক্রিয় উদ্যোগ নিতে হবে। এ ব্যাপারে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বিভিন্ন দেশের কাছে উত্থাপন করা যেতে পারে। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এবং ইউনেস্কোর মতো বিভিন্ন ফোরাম থেকে আমরা স্বীকৃতি আদায় করতে পারি। সবচেয়ে বড় কথা হলো, দেশের ভেতরে গণহত্যার বিষয়ে আরও বেশি পদক্ষেপ নিতে হবে। আমরা নিজেরাই গণহত্যা দিবস ঘোষণা করেছি বিলম্বে। আরও আগে হলে ভালো হতো। কূটনৈতিক ভুলের কারণে স্বীকৃতি পিছিয়েছে তিনি এমনটা মনে করেন না। তিনি মনে করেন এটা একটা বিশাল ব্যাপার, এ ব্যাপারে আগে বিভিন্ন দেশের বিভিন্ন সংস্থাগুলো থেকে আগে স্বীকৃতি নিতে হবে। পরে জাতিসংঘের ব্যাপারটা চিন্তা করতে হবে।

একাত্তরের গণহত্যার প্রসঙ্গ ‘আলোচনায় তুলবে জাতিসংঘ’
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর চালানো গণহত্যার স্বীকৃতির বিষয়টি আলোচনায় তোলার কথা বলেছেন জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি ও গণহত্যা প্রতিরোধবিষয়ক বিশেষ উপদেষ্টা অ্যাডামা ডিয়েং। গতকাল রোববার সকালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কার্যালয়ে তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করে অ্যাডামা ডিয়েং একথা বলেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সাংবাদিকদের ব্রিফ করেন। তিনি জানান, ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কীভাবে এ দেশে গণহত্যা ?শুরু হয়েছিল, এদেশের সাধারণ মানুষকে কীভাবে নির্বিচারে হত্যা করেছিল পাকিস্তানের হানাদার বাহিনী ও এদেশে তাদের দোসরেরা, সে বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে তুলে ধরেন। মুক্তিযুদ্ধে দুই লাখের বেশি নারী নির্যাতিত হয়েছিলেন এবং স্বাধীনতার পর জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করেছিলেন, সে বিষয়গুলোও শেখ হাসিনা জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারির সামনে তুলে ধরেন। প্রেস সচিব বলেন, “বাংলাদেশের জেনোসাইডের বিষয়টা রেইজ করবেন বলে জানিয়েছেন অ্যাডামা ডিয়েং। তিনি বলেছেন, তখন হয়তো কিছু দেশ এর বিরোধিতা করতে পারে।” ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে নিরস্ত্র বাঙালির ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, নির্বিচারে চলেছিল হত্যাকাণ্ড। ওই রাতে শুধু ঢাকায় অন্তত ৭ হাজার বাঙালিকে হত্যা করা হয়েছিল। পাকিস্তানি বাহিনীর সেই নৃশংসতার পর রুখে দাঁড়িয়েছিল বাঙালি, স্বাধীনতার জন্য শুরু হয়েছিল সশস্ত্র সংগ্রাম। নয় মাস যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর এসেছিল স্বাধীনতা। ইহসানুল করিম জানান, নারীর ক্ষমতায়ন এবং এ বিষয়ে বাংলাদেশের অগ্রগতি নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। “প্রধানমন্ত্রী বলেন, ইসলামে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হয়েছে। তিনি সারা দেশ ঘুরেছেন। সরকার নারীর ক্ষমতায়নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে দেখছে। জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ‘নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক’ হিসেবে তুলে ধরেন জানিয়ে ইহসানুল করিম বলেন, তিনি প্রধানমন্ত্রীকে বলেছেন, ‘নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে। আপনি বাংলাদেশের নারীর ক্ষমতায়নের প্রতীক’। নিউজিল্যান্ডে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় শোক প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বৈঠকে বলেন, ওই ঘটনার পর দেশটির সরকার ও জনগণ যেসব উদ্যোগ নিয়েছে তা প্রশংসার দাবি রাখে। বাংলাদেশে বিচ্ছিন্নভাবে কিছু সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলেও সরকার সেগুলো কঠোরভাবে দমন করেছে’ বলে জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারিকে জানান শেখ হাসিনা। প্রেস সচিব বলেন, রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় যেভাবে সহায়তা দিয়েছে, সেজন্য প্রধানমন্ত্রী বৈঠকে ধন্যবাদ জানান। অন্যদিকে অ্যাডামা ডিয়েং রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের অবস্থানকে সমর্থন করার কথা বলেন। তিনি (অ্যাডামা ডিয়েং) বলেন, ‘বাংলাদেশ একা রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। এ বিষয়ে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে। সে প্রচেষ্টা আমরা নিয়েছি। আমরা চাই ওই ঘটনায় (মিয়ানমারে রোহিঙ্গা নিপীড়ন) যারা জড়িত তাদের বিচার হোক। রোহিঙ্গারা ফিরে যাক। সেখানে একটা শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ে উঠুক’। অন্যদের মধ্যে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. নজিবুর রহমান, সামরিক সচিব মিয়া মোহাম্মদ জয়নুল আবেদীনসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত