শিরোনাম

আজ বিশ্ব ডাউন সিনড্রোম দিবস

প্রিন্ট সংস্করণ॥এনায়েত উল্লাহ  |  ০০:২৯, মার্চ ২১, ২০১৯

প্রতিবন্ধিতা জীববৈচিত্র্যের একটি অংশ। সব প্রতিবন্ধিতা দৃশ্যমান নয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধিতা দীর্ঘস্থায়ীও নয়। বরং বিভিন্ন ক্ষেত্রে অস্থায়ী প্রতিবন্ধিতা দেখা যায়। বাংলাদেশে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিবন্ধী ব্যক্তি রয়েছে মর্মে ধারণা করা হয়। প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে বেশির ভাগই দারিদ্র্যের শিকার তথা নিম্নআয়ভুক্ত বলে বিভিন্ন গবেষণায় এতদ সংক্রান্ত তথ্য লক্ষ করা যায়। প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য নিরসন ও জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ সময়ের দাবি। দারিদ্র্য নিরসন ও জীবনমান উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন তাদের উপযোগী চিকিৎসা, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রদানে লক্ষ্যভিত্তিক পরিকল্পিত কার্যক্রম গ্রহণ। এই লক্ষ্যে প্রতিবন্ধিতার ধরন চিহ্নিতকরণ, মাত্রা নিরূপণ ও কারণ নির্দিষ্টপূর্বক প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠী’র সঠিক পরিসংখ্যান নির্ণয়ের নিমিত্তে ইতোমধ্যেই দেশব্যাপী ‘প্রতিবন্ধিতা শনাক্তকরণ জরিপ কর্মসূচি’ গ্রহণ করা হয়েছে। ডাউন সিনড্রোম এক ধরনের শারীরিক অসক্ষমতা। যাকে আমরা সহজ ভাষায় প্রতিবন্ধী বলে থাকি। অসচেতনতার কারণে হয়ে থাকে বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা। দেশে দিন দিন ডাউন সিনড্রোম শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে বর্তমান বিশ্বে প্রতি ১ হাজার শিশুর মধ্যে একটি শিশু ডাউন সিনড্রোম বা ডাউন শিশু হিসেবে জন্ম নিয়ে থাকে। প্রতি বছর প্রায় ৩ থেকে ৫ হাজার শিশু এই ক্রোমোসোম ব্যাধি নিয়ে জন্মগ্রহণ করে এবং এটি বিশ্বাস করা হয় যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় ২লাখ ৫০ হাজার পরিবার ডাউন সিনড্রোম দ্বারা প্রভাবিত হয়। ধারণা করা হয় বিশ্বে ৭ মিলিয়ন ডাউন সিনড্রোম এ আক্রান্ত ব্যক্তির বসবাস রয়েছে। ডাউন সিন্ড্রোমের ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ শিশু শ্রবণ শক্তিতে সমস্যা। ডাউন সিন্ড্রোমের ৪০ থেকে ৪৫ শতাংশ শিশুর জন্মগত হূদরোগ আছে। অন্ত্রের সিন্ড্রোমের শিশুদের মধ্যে উচ্চতর ফ্রিকোয়েন্সিতে অন্ত্রের অস্বাভাবিকতা দেখা দেয়। আরেকটি উদ্বেগ পুষ্টির দিক সম্পর্কিত। ডাউন সিন্ড্রোমের কিছু শিশু, বিশেষ করে গুরুতর হূদরোগের সাথে যারা শিশু শৈশবে উন্নতি করতে ব্যর্থ হয়। অন্যদিকে, স্থূলতা এবং প্রারম্ভিক প্রাপ্তবয়স্কদের সময় স্থূলতা প্রায়ই উল্লেখ করা হয়। এই অবস্থার উপযুক্ত পুষ্টিকর পরামর্শ এবং আগাম খাদ্যতালিকাগত নির্দেশিকা প্রদান করে প্রতিরোধ করা যেতে পারে। থাইরয়েড ডিসফাংশন স্বাভাবিক শিশুদের চেয়ে ডাউন সিন্ড্রোমের শিশুদের ক্ষেত্রে বেশি সাধারণ। দেশে সঠিক পরিসংখ্যান না থাকলেও ধরা হয় দেশে প্রায় ২ লাখ ডাউন শিশু আছে। তবে সমাজ সেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, গতকাল পর্যন্ত দেশে সনাক্তকৃত ডাউন সিনড্রোম শিশুর সংখ্যা ৩ হাজার ৫৮৫ জন। ডাউন শিশুরা সাধারণত আমাদের সমাজে প্রতিবন্ধী শিশু হিসেবে বেঁচে থাকে। তবে সঠিক যত্ন নিলে শিশুরা অন্য স্বাভাবিক শিশুদের মতো পড়ালেখা করতে পারে ও উচ্চ শিক্ষিত হয়ে পেশাগত জীবনেও সফল হতে পারে। বিশেষঞ্জ চিকিৎসকরা জানান, ডাউন সিনড্রোম কোনো রোগ নয়, বরং এটি আমাদের শরীরের জেনেটিক পার্থক্য এবং ক্রোমজমের একটি বিশেষ অবস্থা। গর্ভাবস্থায় শিশুর শরীরের কোষ বিভাজনের সময় সংঘটিত হয়, যা জন্মগতভাবে একটি অতিরিক্ত ক্রোমজম প্রতিটি দেহকোষের ক্রোমজমে অবস্থান করে। আজ বিশ্ব ডাউন সিনড্রোম দিবস-২০১৯। ১৪তম দিবসটি পালনে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধিনস্থ সমাজসেবা অধিদপ্তর ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। দেশে ৬ষ্ঠ বারের মতো ও বিশ্বে ১১ বারের মতো দিবসটি পালন করা হচ্ছে। এর পূর্বে দিবসটির জন্ম হলেও দিবসটি পালন করা হয়নি। দিবসটি উপলক্ষে সমাজসেবা অধিদফতরের অডিটোরিয়ামে এক আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে সমাজকল্যাণমন্ত্রী নুরুজ্জামান আহমেদ এমপি প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে। সাধারণত ৩৫ বছরের পর থেকে গর্ভধারণে এর ঝুঁকি বাড়তে পারে, তবে কম বয়সী মায়েদের ক্ষেত্রেও লক্ষণীয় মাত্রায় ডাউন সিনড্রোম শিশু জন্ম নিচ্ছে। তবে বিভিন্ন পরিচর্যা ও চিকিৎসার মাধ্যমে শারীরিক সমস্যাগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা যায়। ময়মনসিংক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডা. মো. মমিনুল হক মমিন বলেন,উপযুক্ত পরিবেশ ও বিশেষ শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে বড় করতে পারলে ডাউন শিশুরা কর্মক্ষম হয়ে অর্থবহ জীবনযাপন করতে পারে। ডাউন সিনড্রোম শিশু ও ব্যক্তিদের সামাজিক মর্যাদা, গ্রহণযোগ্যতা, অধিকার প্রতিষ্ঠা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও কর্মসংস্থা এর সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করে যাচ্ছে সমাজসেবা অধিদপ্তর। ব্রিটিশ চিকিৎসক জন ল্যাঙ্গডন ডাউন ১৮৬৬ সালে এ শিশুদের চিহ্নিত করেন বলে তার নামানুসারে ‘ডাউন সিনড্রোম’ কথাটি প্রচলিত হয়। এক গবেষণায় দেখা গেছে, যত বেশি বয়সে মা হবেন, সন্তানের ডাউন সিনড্রোম নিয়ে জন্মের আশঙ্কা তত বেশি। ২৫ বছর বয়সী প্রতি ১ হাজার ২শ গর্ভবতী মায়ের মধ্যে একজন, ৩০ বছর বয়সী প্রতি ৯শ জনের মধ্যে একজন, আর ৪০ বছর বয়সী প্রতি একশ মায়ের মধ্যে একজনের ডাউন শিশু হতে পারে। ডাক্তারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, অসচেতনতার কারণেই দেশে ডাউন শিশুর সংখ্যা বাড়ছে। তবে আশার কথা, গর্ভবতী নারীর শরীর পরীক্ষা করে, এখন দেশেই ডাউন শিশু শনাক্ত করা সম্ভব। ডাউন শিশুরা সাধারণত প্রতিবন্ধী শিশু হিসেবে বেঁচে থাকে। তারা অন্য শিশুদের তুলনায়, শারীরিক ও মানসিকভাবে দেরিতে বেড়ে ওঠে। তিনি আরো জানান, এ ছাড়া ডাউন শিশুর শারীরিক জটিলতায় ভুগে। বেশির ভাগ ডাউন শিশুর জন্মগত হার্টের সমস্যা থাকে, যার কারণে অনেকেই জন্মের পর মারা যায়। কারো কারো হার্টের অপারেশনের প্রয়োজন হয়। শুধু তাই নয়, ডাউন শিশুদের অনেকেই লিউকেমিয়া, থায়রয়েড সমস্যা, দৃষ্টিশক্তি ও শ্রবণ-শক্তির সমস্যা, পরিপাকতন্ত্রের সমস্যা, জীবাণু সংক্রমণ, শারীরিক স্থূলতা ইত্যাদি জটিলতায় ভুগতে পারে। ডাউন শিশুদের গড় আয়ু সাধারণ মানুষের চেয়ে কম। যেহেতু মায়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডাউন শিশু হওয়ার ঝুঁঁকিও বাড়ে, তাই চিকিৎসা বিজ্ঞানে অধিক বয়সে, বিশেষ করে ৩৫-এর বেশি বয়সে মা হওয়াকে নিরুৎসাহিত করা হয়। মায়ের আগের বাচ্চাটি যদি ডাউন সিনড্রোমে আক্রান্ত থাকে তবে পরবর্তী সময়ে বাচ্চা নেয়ার ক্ষেত্রেও চিকিৎসকের পরামর্শ নেয়া উচিত। দেশে জনসচেতনতার মাধ্যমে এ ডাউন সিনড্রোম শিশুর জন্ম কমানো সম্ভব বলে মনে করেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কর্তৃপক্ষরা।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত