শিরোনাম

কারাগারে বর্বরতার শিকার এক সিরিয়ান নারীর জবানবন্দী

সুলাইমান সাদী  |  ২০:৩৩, জুন ২৬, ২০১৯

বাশার আল-আসাদ সরকার পরিচালিত সিরিয়ার কারাগারের অকথ্য নির্যাতন ও অপব্যবহারের কথা উল্লেখ করেছেন এক মুক্তি পাওয়া নারী বন্দী। ভয়ংকর সেই দগদগে স্মৃতিগুলো এখনো জেগে আছে বলে তিনি মন্তব্য করেছেন।

তুর্কী সংবাদ সংস্থা আনাদুলোকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি তাঁর নাম গোপন রাখার অনুরোধ জানিয়ে বলেন, তাকে বিভিন্ন কারাগারে বন্দী রেখে নয় মাস যাবত বর্বরতর অপকর্মের মুখোমুখি করা হয়েছে।

গত বছরের মে মাসে ৩০ বছর বয়সী এ নারীকে গ্রেপ্তার করেছিল আসাদ সরকার।

গ্রেপ্তারের আগে তিনি দামেশকের শহরতলী পূর্ব গৌতায় একজন ফার্মাসিস্ট হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এসময় তিনি আসাদ সরকারের অনুগত বাহিনীর কঠোর নজরদারিতে ছিলেন।

তিনি গৌতার অধিবাসী। তবে আসাদ সরকারের রোষানল থেকে বাঁচতে ইকলিবে চলে যান। সরকারী বাহিনীর হামলায় তার ভাইবোনদের মৃত্যুর পর তার মা একমাত্র ওই মেয়েকে আবার গৌতায় ফিরে আসতে বলেন।

নির্যাতিত ওই নারী আনাদুলোকে বলেন, আমি আমার জিনিসপত্র গুছিয়ে (ইকলিব ছেড়ে) পূর্ব গৌতায় আমার মায়ের কাছে যাওয়ার প্রস্তুতি নিই। ফ্রি সিরিয়ান আর্মি চেকপয়েন্ট অতিক্রম করে আসাদ সরকার অনুগত চেকপয়েন্টে পৌঁছলাম। সেখানে তারা সবার পরিচয়পত্র চেক করছিল।

এখানে তার গাড়ি আটকে ফেলা হয়। আসাদ সরকারের ওয়ান্টেড লিস্টে  তার নাম ছিল। সেখানেই তাকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং আলেপ্পোর রাজনৈতিক নিরাপত্তা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়।

সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, নিরাপত্তা কেন্দ্রের সেলে আমার কাছে এক পঞ্চাশোর্ধ্ব নারী আসেন। তিনি আমার গায়ের সব কাপড় সরিয়ে নেন এবং যাচ্ছেতাই করে আমাকে সার্চ করেন।

সেখান থেকে তাকে আলেপ্পোর সেনা গোয়েন্দা কেন্দ্রে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় তার পেছনে বাঁধা ছিল।

তিনি বলেন, আমাকে সেখানে নিয়ে যাওয়ার সময় গাড়িতে মিলিটারিরা আমার সঙ্গে ঘৃণ্য আচরণ করে। তারা আমাকে লাঞ্ছিত করে। এসময় তারা আমাকে প্রথমবারের মতো চপেটাঘাত করে সোজা হয়ে বসে থাকার জন্য।

ওই সেনা গোয়েন্দা কেন্দ্রে তাকে এক-স্কোয়ার-মিটার একটি সেলে রাখা হয়। প্রথম জিজ্ঞাসাবাদের আগে সেখানে তিনি দুদিন সময় অতিবাহিত করেন।

তিনি বলেন, আমি সেখানে দুঘন্টাও শুয়ে থাকতে পারতাম না, সৈন্যরা চলে আসত। তারা আমার ওপর পানি ঢেলে দিত। চলে যাওয়ার আগে আমাকে অপমান করত। আমি সেখান থেকে ছোট ছোট শিশুদের চিৎকার আর মানুষের যন্ত্রণার শব্দও শুনতে পেতাম।

দ্বিতীয় দিন তাকে ওই সেল থেকে সরকারী সৈন্যরা বের করে নিয়ে যায় প্রথম জিজ্ঞাসাবাদের জন্য।

তারা আমার চোখ বেঁধে ফেলে। আমার দুহাত পেছনে মুড়িয়ে বাঁধে। আমাকে বাঁধা হচ্ছে কেন জিজ্ঞেস করলে প্লাস্টিকের হাতকড়াটি আরো শক্ত করে বাঁধে এবং আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে থাকে।

সৈন্যদের তিনি বারবার তার নিরপরাধ হওয়ার কথা বললেও তার সঙ্গে একই আচরণ করা হয়।

নির্যাতিত নারী বলেন, তার বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করা হয়, তিনি ফ্রি সিরিয়ান আমিকে ওষুধ সরবরাহ করে এবং তাদের সমর্থনে সরকারের সঙ্গে বিদ্রোহ করেছেন।

আনাদুলোকে তিনি বলেন, আমি তাদের বললাম, ফার্মেসিটি সব ধরনের রোগীদের জন্য উন্মুক্ত ছিল। সেখানে যারা আসত তারা সরকারের অনুগত নাকি সরকার বিরোধী তার কিছুই জানতাম না।

এসময় তার মনোবল দুর্বল করে দেয়ার জন্য শক্ত চপেটাঘাতও করা হয় বলে তিনি দাবি করেন।

তিনি বলেন, তারা আমার মুখে বালতি ভরে পনি ঢেলে দেয় এবং আমাকে টেনে তোলে। তারা আমার হিজাবও খুলে নেয়।

তিনি তাদের অত্যাচারের কারণে একসময় অজ্ঞান হয়ে পড়েন। যখন তার হুঁশ ফেরে তখন তিনি তার হাত-পা বাঁধা দেখতে পান। তিনি বলেন, আমি প্রচণ্ড ভয় পেয়ে যাই এ অবস্থা দেখে!

তাকে ২৩ বার প্রহার করা হয়েছে। বারবার অজ্ঞান হয়ে পড়ার পর হুঁশ ফিরে আসতেই তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং প্রহার করা হয়।

একসময় তার রুমে চারজন সৈন্য ঢোকে। তারাও একের পর এক তাকে নির্যাতন করতে থাকে। নির্যাতন বন্ধের সব আকুতি উপেক্ষা করে তাকে প্রহার করতে থাকে তারা।

তিনি বলেন, তারা তার সঙ্গে অপমানজনক অবস্থায় সেলফি তোলে। তারা তাকে অপমান করতে থাকে এবং  ধর্ষণের হুমকি দিতে থাকে।

সিরিয়ান ওই নারী বলেন, আমাকে এমনভাবে সেলে রাখা হয়েছিল, দুঘণ্টাও ঘুমানো যেত না সেখানে। মিলিটারিরা এসেই পানি ঢেলে জাগিয়ে দিত। উঠে দেখতাম ফ্লোর রক্তাক্ত হয়ে আছে। কিন্তু আমার দেহের কোন জায়গা থেকে রক্ত বেরুত বুঝতে পারতাম না।

এমন অমানুষিক নির্যাতন আর বর্বরতার ভেতর ৩২টি দিন কাটিয়েছেন। এসময় তার চোখে ঘুম আসত না। আতঙ্ক কাজ করত সবসময়। অন্যান্য সেল থেকে নির্যাতনের ভয়াবহ সব শব্দ ভেসে আসত।

এরপর তাকে আবার জিজ্ঞাসাবাদের জন্য ডাকা হয় এবং নতুন করে নির্যাতন শুরু করা হয়।

তিনি বলেন, তারা আমার হাত বাঁধে এবং আমার পা লম্বা করে রাখে।  যেন আমাকে ক্রুশবিদ্ধ করা হয়েছিল, তারা আমার পিঠ, আমার পা, সর্বত্র টিউব দিয়ে আঘাত করেছিল।

তিনি বলেন, আমার মুখ ও নাক থেকে রক্ত ​​বের হচ্ছে, আমি অনুভব করলাম আমার দেহের কিছু অংশ ভেঙে গেছে, আমার তিনটি পাঁজরে ফাটল ধরেছে, এখনও আমার শরীরে নির্যাতনের দাগগুলো রয়ে গেছে।

‘প্রতিদিন দুতিনঘণ্টা করে এভাবে আমাকে নির্যাতন করা হতো। ৩২ দিন পর আমাকে কমান্ডিং অফিসারের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি আমাকে অপরাধ স্বীকার করতে বাধ্য করার চেষ্টা করেছিলেন।

‘জলে ভরা একটা ব্যারেল ছিল, আমি বুঝতে পারলাম, তারা কারা ছিল। আমার শরীরের বিভিন্ন অংশে আঘাত করার পর তারা আমার চুল ধরে ফেলল এবং আমার মাথায়, পিঠে পিঁপড়ে ছেড়ে দিল। আমি অনুভব করলাম, যেন আমি ডুবে যাচ্ছি।

তিনি বলেন, তিনি আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছিলেন, তার জীবন গ্রহণ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কারণ তিনি আর সহ্য করতে পারছিলেন না।

তিনি বলেন, প্রত্যেকবার আমি অজ্ঞান হওয়ার সময় হলে তারা আমার মাথা টেনে নিয়ে যেত। জিজ্ঞাসাবাদকারী আমাকে বৈদ্যুতিক শক দিত।, এসময় আমার পুরো শরীর ভেজা থাকত।

 তিনি বলেন, আমি হতাশা অনুভব করেছিলাম। আমি আর এই ব্যথা সহ্য করতে পারছিলাম না। আমার আর কথা বলার শক্তি ছিল না।

‘তারা আমাকে এত নির্যাতন করেছিল, আমাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়, আমাকে চিকিত্সা করা হয় এবং আবার আমাকে কারাগারে ফিরিয়ে আনা হয়।

কারাগারে তার নির্যাতন ভোগের সময় তার পরিবার তাদের সম্পত্তি বিক্রি করে তার খোঁজে নেমে পড়ে। তার মুক্তির ব্যবস্থা করার জন্য নির্যাতনে অংশগ্রহণকারী এক কর্মকর্তাকে ঘুষ দিতে বাধ্য করা হয়।

তিনি মুক্তি পেতে ‘বিদ্রোহী বুদ্ধিজীবী’ হওয়ার অভিযোগ গ্রহণ করতে হয়েছিল। আদালতে আনার পর তাকে অ্যাডরা কারাগারে স্থানান্তরিত করা হয়। কারাগারটি ব্যাপক নির্যাতন আর বন্দীদের ধর্ষণের জন্য পরিচিত।

তিনি বলেন, টাকা খরচ করার পরও তাকে অবিলম্বে মুক্তি দেয়া হয়নি। কারণ তার শরীরে অত্যাচারের অনেক দাগ ছিল।  এসব দাগ কিছুটা কমার পরই নথিতে স্বাক্ষর করতে হয়েছিল তাকে।

তিনি বলেন, অ্যাডরায় উচ্চপদস্থ সৈন্যরা ছিল। তারা সেলে প্রবেশ করে সুন্দরী মেয়েদের বের করে নিয়ে যেত। তিনি আরও বলেন, ধর্ষণ এখানে নিত্যদিনের ঘটনা ছিল।

অ্যাডরা কারাগারে সাত মাস নির্যাতন ভোগের পর তাকে মুক্তি দেওয়া হয় এবং দামেস্কে অবস্থিত তার পরিবার ও বন্ধুদের সঙ্গে তাকে সাক্ষাৎ করতে দেয়া হয়।

তিনি বলেন, আমি কেবল তিনদিন সেখানে থাকতে পেরেছি এবং গোপনে আমার মাকে দেখতে পেরেছি। আমি মনে করলাম, আমি আমার পরিবারের জন্য হুমকির কারণ হয়ে উঠছি। তাই আমি আসাদ শাসিত অঞ্চলটিতে আর থাকতে চাইনি।

মুক্তির পর  তার বাগদত্তর কাছে তিনি ফিরে গিয়েছিলেন। তিনি বলেন, আমি আমার বাগদত্তাকে ডেকেছিলাম। তিনি একজন  বিদেশী নাগরিক ছিলেন। তিনি আমার বন্দিত্বের ব্যাপারে কিছু জানতেন না। যখন সব খুলে বললাম, তিনি বললেন, আমি যেন আর ফোন না করি তাকে।

নির্যাতিত ওই নারী বলেন, আমার বাগদত্তার ওই আচরণ আমার মুক্তির পর সবচেয়ে বেদনাদায়ক স্মৃতি ছিল।

‘এখন আমি আফরিনে থাকি আমার বন্ধুদের সাথে। আমি আমার পরিবারের সাথে কথা বলতে পারি না। আমি আমার পেশার অনুশীলন করতে পারছি না।

তিনি বলেন, আমি কৃতজ্ঞ  আমার পরিবারের কাছে। তারা কোনো না কোনোভাবে আমার পর্যন্ত পৌঁছতে পেরেছিলেন এবং আমাকে অকথ্য নির্যাতন থেকে মুক্ত করেছেন।

তিনি বলেন, আমি ওইসব কারাগারে থাকা নারীদের সাহায্য করার জন্য আমার কণ্ঠস্বর উঁচু করতে চাই। তাদের সাহায্যের প্রয়োজন খুবই। তারা সেখানে বেঁচে থেকেও মৃত হয়ে কাতরাচ্ছেন।

নির্যাতিত ওই নারী তার বন্দীজীবনের কথা বলার পর বলেন, তিনি যতটা সম্ভব শক্তিশালী জীবন চালিয়ে যেতে চান।

তিনি বলেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একটি ভিন্ন দেশে আামকে যেতে হবে। আমি সব ভুলে যেতে চাই। আমার নিজের পায়ে দাঁড়াতে চাই। আমার শিক্ষা সম্পূর্ণ করতে চাই।

২০১১ সালের শুরুর দিক থেকে সিরিয়া একটি বিধ্বংসী সংঘাতের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। তখন থেকে বাশার আল-আসাদের সরকার অপ্রত্যাশিত তীব্রতার সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের উপর অত্যাচারের স্ট্রিম রোলার চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিনই কোথাও না কোথাও বোমা হামলা করে সাধারণ মানুষের প্রাণ ছিনিয়ে নিচ্ছে।

জাতিসংঘের পরিসংখ্যান অনুযায়ী হাজার হাজার মানুষ নিহত হয়েছে এ যাবত। ১০ লক্ষেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছে। এমনকি নারী-শিশুরাও এ বর্বরতার শিকার হচ্ছে প্রতিনিয়ত।

কনসাইন্স মুভমেন্টের পরিসংখ্যান মতে সিরিয়া সংঘাত শুরু হওয়ার পর ১৩ হাজার ৫০০-এরও বেশি নারীকে কারাগারে বন্দী করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৭ হাজারেরও বেশি নারী এখনো বিভিন্ন কারাগারে আটক রয়েছেন। সেখানে তারা নির্যাতন, ধর্ষণ এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

উল্লেখ্য, কনসাইন্স মুভমেন্ট হলো সিরিয়া সরকারের কারাগারে বন্দী নারী ও শিশুদের মুক্তির জন্য জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে বিভিন্ন ব্যক্তি, মানবাধিকার গ্রুপ ও সংগঠনের একটি জোট।

এসএস

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত