শিরোনাম

ইশতেহারের বাজেটেও চ্যালেঞ্জ

প্রিন্ট সংস্করণ॥জাহাঙ্গীর আলম  |  ১০:৩৬, জুন ১৪, ২০১৯

পরিকল্পনামন্ত্রী থাকা অবস্থায় বাংলাদেশকে উন্নত দেশ হওয়ার স্বপ্ন দেখাতে শুরু করেন আহম মুস্তফা কামাল। সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রুপ দিতে একাদশ সংসদে অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পেয়েই তিনি অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন পেশার মানুষের সুবিধা-অসুবিধার ব্যাপারে চালিয়ে যান আলোচনা।

অবশেষে মন্ত্রী সভার অনুমোদনের পর স্পিকার ড. শিরীন শারমিনের সভাপতিত্বে নতুন অর্থমন্ত্রী অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ২০১৯-২০ অর্থবছরের জন্য ব্রিফকেসে করে গতকাল বিকাল ৩টার পর ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বাজেট জাতীয় সংসদে পেশ করেন।

এরমধ্যে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১৬ কোটি টাকা। বাজেটে ঘাটতি ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। নির্বাচনি ইশতেহারকে গুরুত্ব দিয়ে সাজানো হয়েছে এই বাজেট।

তবে এই চিত্র ঠিক থাকবে কি না তা নিয়ে শঙ্কাই থেকে যাচ্ছে। বাজেটে বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হলেও অনেকেই অপ্রতুল বলে মনে করেন। তাই বাজেটে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলেও অভিযোগ অনেকের।

‘সমৃদ্ধ আগামীর পথযাত্রায় বাংলাদেশ : সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’ শিরোনামে এই বাজেট পেশ করার ঘণ্টা পার না হতেই অর্থমন্ত্রী কিছুটা অসুস্থ হয়ে পড়েন। তারপরও বাজেট বক্তৃতায় তিনি বলেন, প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে নতুন আঙ্গিকে তৈরি করা হয়েছে এই বাজেট। এটা হচ্ছে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ, কোয়ালিটি সম্পন্ন ‘স্মার্ট’ বাজেট। এবারে বাজেটের আকার বাড়লেও সংক্ষিপ্ত বাজেট বক্তৃতায় সবকিছু তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে। করের বোঝা না বাড়িয়ে আওতা বাড়িয়ে ব্যবসাবান্ধব করার কথা বলেন তিনি। এ বাজেটে নিত্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে তার কোনো কিছু রাখা হয়নি।

অর্থমন্ত্রী বলেন, শুধু এক বছরের জন্য নয়, সুখী, সমৃদ্ধ ও কল্যাণমুখী সূদুরপ্রসারী লক্ষ্য নিয়ে ২০৪১ সালকে টার্গেট করে সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তোলা হবে এবারের বাজেট। ৪টার পর তিনি স্পিকারের কাছে বিশ্রামের জন্য ৫ মিনিট সময় চান। তারপরও তিনি স্বাভাবিক না হওয়ায় একপর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী সংসদে দাঁড়িয়ে বলেন, আমার এবং অর্থমন্ত্রীরও চোখে সমস্যা।

এসময় অর্থমন্ত্রী অন্য মন্ত্রীকে বক্তৃতা দিতে বললে স্পিকার প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি পড়ুন। এ সময় প্রধানমন্ত্রী রসিকতা করে বলেন, বসে না দাঁড়িয়ে পড়ব। স্পিকার বলেন, আপনার ইচ্ছা। এরপর অর্থমন্ত্রীর পক্ষে প্রধানমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতা পড়তে শুরু করেন। বাজেটে শুধু হিসাব-নিকাশের খতিয়ান থাকছে তা না। যুক্ত হচ্ছে রাজনৈতিক

দর্শন। যেখানে বঙ্গবন্ধুর শতবর্ষ জন্মদিন পালনের বিষয় থেকে একেবারে নির্বাচনি ইশতেহারের প্রতিফলন থাকছে। একাদশ সংসদের নির্বাচনি ইশতেহারের প্রথম শর্তই ছিলো আমার গ্রাম আমার শহর। সেই ইশতেহারকে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে এবারের বাজেটে।

গত দেড় দশকে রপ্তানি আয় বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ। রেমিট্যান্সও তিন গুণ, বৈদেশিক রিজার্ভ নয় গুণ। মাথাপিছু আয় গত ৫ বছরে ৩ গুণ বেড়েছে। তাই বাজেটের আকারও বাড়ছে। সব রেকর্ড ছাড়িয়ে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৮০ কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে। বিশাল ব্যয়ের জন্য আয়ও ধরা হয়েছে বাজেটে। মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৮১ হাজার ৯৭৮ কোটি টাকা।

এরমধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড-এনবিআর নিয়ন্ত্রিত কর হচ্ছে ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা বা ৬২ দশমিক ২ শতাংশ। বাকি কর অন্য খাত থেকে আদায় করা হবে। এছাড়া বৈদেশিক ঋণ ৭৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা বা ১২ দশমিক ২ শতাংশ এবং বৈদেশিক অনুদান দশমিক ৮ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ ঋণ হচ্ছে ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা বা ১৪ দশমিক ৮ শতাংশ। এরমধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা এবং জাতীয় সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণ হচ্ছে ২৭ হাজার কোটি টাকা।

তারপরও বাজেটে ঘাটতি থাকছে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা বা প্রায় ৫ শতাংশ। যা চলতি অর্থবছরে ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। চলতি অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে মার্চ পর্যন্ত মাত্র ৫৪ দশমিক ৯ শতাংশ। তাই সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকার যাই করুক রাজস্ব আদায়ই বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে। বাজেটে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি-এডিপিতে বরাদ্দ রাখা হচ্ছে ২ লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা।

জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাজেটের একটি গুরুত্বপূর্ণ। তাই এবারের বাজেটে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ লক্ষ্য ধরা হচ্ছে। এই প্রবৃদ্ধি বাড়লে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে। আকার হচ্ছে ২৮ লাখ ৮৫ হাজার ৮৭২ কোটি টাকা। যা চলতি অর্থবছরের আকার হচ্ছে ২৫ লাখ ৩৬ হাজার কোটি টাকা।

সার্বিকভাবে শক্তিশালী অভ্যন্তরীণ চাহিদার পাশাপাশি রপ্তানি ও রাজস্ব আয়ের গতিশীলতার কারণে এ প্রবৃদ্ধি অর্জন সহায়ক হবে। আর মূল্যস্ফীতি ধরা হচ্ছে ৫ দশমিক ৫ শতাংশ। গ্রাম হবে শহর। এ স্লোগানকে অগ্রাধিকার দিয়ে গ্রামে সব শহরের সুযোগ দেয়ার ব্যবস্থার কথা বলা হয়েছে। যাতে শহরের উপরে চাপ কমে। ১ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের জন্য ১০০ অর্থনৈতিক অঞ্চল করা হচ্ছে।

বাজেটে মুক্তিযোদ্ধা, হিজড়া, শিক্ষক, ডাক্তার, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীসহ শিক্ষিত বেকারদের গুরুত্ব দেয়া হয়েছে বাজেটে। এভাবে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হচ্ছে। বন্ধ হলে দুর্নীতি উন্নয়নে আসবে গতি স্লোগানে দুর্নীতি দমন কমিশনকে একটি যথাযথ কার্যকর কমিশন হিসেবে দেখার কথা বলা হয়েছে বাজেটে।

দীর্ঘ সাত বছরের ভ্যাট আইনকে এবারে ৫ স্তরের করে ব্যবসাবান্ধব করেই কার্যকর করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, আগের মতোই সংসদে অর্থমন্ত্রী বলেন, করের বোঝা না বাড়িয়ে উপজেলা পর্যায়ে এর আওতা বাড়িয়ে এক কোটিতে নিয়ে যাওয়া হবে। ব্যবসাবান্ধব করে সব আমদানি পণ্য অটোমেশনের মাধ্যমে খালাস করা হবে। যাতে কেউ মিথ্যা ঘোষণা না দিতে পারে।

২০১৯-২০ অর্থবছরে রপ্তানিকে বিকশিত করতে পোশাক, চামড়া, আইসিটি খাতে গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। বস্ত্র ও পোশাকে প্রণোদনা দেয়াসহ সব পণ্যে ১ শতাংশ প্রণোদনা দেয়া হবে। শুধু তাই নয়, বেকার শিক্ষিতদের জন্য ১০০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিলও গঠন করা হয়েছে।

কৃষকরা ফসলের নায্যমূল্য না পেলেও যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য প্রথমবারের মতো শস্য বিমা চালু করা হচ্ছে এবারের বাজেটে। কৃষি খাতে ২৮ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে এবারের বাজেটে। দুর্ঘটনায় অনেকে আহত নিহত হলেও ক্ষতিপূরণ যাতে পায় তার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ জন্য এবারে অ্যাকসিডেন্ট ইন্স্যুরেন্সের ব্যবস্থাও থাকছে।

ব্যবসায়ীরা ব্যাংক থেকে ঋণ নিলেও কোনো কারণে খেলাপি হলে বের হবার সুযোগ থাকে না। তাই এবারে তাদের বের করার সুযোগ করা হয়েছে বাজেটে। ব্যাংকিং খাত বিশেষ করে খেলাপি ঋণ নিয়ে অনেক সমালোচনা হচ্ছে। তাই এবারের বাজেটে ব্যাংক কমিশন গঠনের ব্যাপারে পদক্ষেপও থাকছে। প্রবাসীদের আয় আরও উৎসাহিত করতে আগামী অর্থবছরে ২ শতাংশ হারে প্রণোদনা প্রদান করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

এবারের সব চেয়ে আলোচিত হচ্ছে ৫ স্তরের ভ্যাট আইন নিশ্চিত করা হবে। এ ব্যাপারে ব্যবসায়ীদের কিছু ব্যাপারে আপত্তি থাকলেও তারা তা মেনে নিয়েছেন। অর্থনীতির অবিচ্ছেদ্য অংশ পুঁজিবাজার। তাই একে শক্তিশালী করতেও পদক্ষেপ থাকছে। তবে ব্যক্তি আয়ের সীমা আগের মতোই আড়াই লাখ টাকা থাকছে। একইসঙ্গে অন্যান্য করমুক্ত আয়ের সীমা অপরিবর্তিত থাকছে।

শুধু তাই নয়, পাবলিকলি ট্রেডেড কোম্পানিসহ অন্যান্য ব্যাংক, বিমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের করের হার অপরিবর্তিত থাকছে। তবে পল্ট্রিশিল্পে কর আরোপ না করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এবারের বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনি অনেক বাড়ছে। মুক্তিযোদ্ধাদের মাসিক ভাতা ১০ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা করা হচ্ছে। গরিব মানুষদের সুরক্ষার জন্য বিভিন্ন কর্মসূচিও থাকছে।

রপ্তানিকারকদের সুসংবাদ হচ্ছে, রপ্তানি করলেই পাবেন প্রণোদনা। আর যারা শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়তে চান তাদের জন্য থাকছে ৫ বছরের জন্য কর অবকাশের সুবিধা। এ সুবিধা এই অর্থবছরেই শেষ হওয়ার কথা। কিন্তু শিল্প উন্নয়ন ও বিনিয়োগের কথা চিন্তা করে এই কর অবকাশ আরও বাড়ানো হচ্ছে। শিল্পে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ থাকছে। দেশে শিল্প বিকাশের ক্ষেত্রে এই সুযোগ দেওয়া হবে। তবে শর্ত থাকবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে।

প্রবাসে যারা বসবাস করেন তাদের জন্য থাকছে বিশেষ প্রণোদনা। বিদেশে বর্তমানে ৭০ থেকে ৮০ লাখ প্রবাসী অবস্থান করছেন। এদের বিমার সুবিধার বিষয়টি এবারের বাজেটে গুরুত্ব পাচ্ছে। অর্থাৎ এদের সবাইকে বিমার আওতায় আনা হবে। এবারের বাজেটে দেশে-বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির প্রয়াস থাকবে। উন্নয়ন বাজেটে সর্বোচ্চ বরাদ্দ রাখা হচ্ছে জনপ্রশাসন খাতে সাড়ে ১৮ শতাংশ।

এরপরই শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে ১৫ দশমিক ২ শতাংশ। এরপর পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে ১২ দশমিক ৪ শতাংশ। এরপরে স্থানীয় সরকার বিভাগে ৭ দশমিক ২ শতাংশ, বিদ্যুৎ ও জ্বালানিখাতে ৫ দশমিক ৪ শতাংশ, স্বাস্থ্যে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণে ৪ দশমিক ৯ শতাংশ, কৃষিতে ৩ দশমিক ৭ শতাংশ।

নতুন অর্থবছরের বাজেটে সম্পূরক শুল্ক বাড়ানোর কারণে সব ধরনের সিগারেট, বিড়ি, জর্দা ও গুলের দাম বাড়তে পারে। একই কারণে বাড়তে পারে মোবাইল ফোনে কথা বলার খরচ। এভাবে বিলাসী পণ্যের দাম বাড়তে পারে। তবে নিত্যপণ্যের দাম কমবে এবারের বাজেটে। বিশেষ করে দেশি শিল্পকে এগিয়ে নিতে পণ্যের দাম বাড়বে না, কমবে।

শিক্ষা খাতে বরাদ্দ ৮৭ হাজার ৬২০ কোটি টাকা দেওয়া হলেও এটা আরও বাড়ানো দরকার ছিলো। এমপিওর জন্য বাজেটে প্রয়োজনীয় অর্থের জোগানের কথা বলা হলেও তার পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি।

আওয়ামীগের পক্ষ থেকে এ বাজেটকে স্বাগত জানিয়ে গতকাল বলা হয়েছে এটা কর্মমুখী, গণমুখী ও বাস্তবসম্মত। বাজেটে ১৬ কোটি মানুষেরই আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে।

তবে বিএনপির পক্ষ থেকে স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, অনির্বাচিত সরকারের বাজেটে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। এই সংসদ, সরকার, সত্যিকার অর্থে জনগণের ভোটে নির্বাচিত নয়। তাই বাজেট দেয়ার নৈতিক অধিকার এ সরকারের নেই।

প্রস্তাবিত বাজেট একটি ধারাবাহিক বাজেট উল্লেখ করে ঢাকা চেম্বার মনে করে, এ ধরনের বড় বাজেট বাস্তবায়নের সক্ষমতা বৃদ্ধি, জবাবদিহিতা নিশ্চিতকরণ এবং দক্ষতা উন্নয়ন একান্ত অপরিহার্য।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত