শিরোনাম

নতুন আঙ্গিকে ‘স্মার্ট’ বাজেট আজ

প্রিন্ট সংস্করণ॥সঞ্জয় অধিকারী  |  ০০:১৫, জুন ১৩, ২০১৯

আজ একাদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বাজেট পেশ করবেন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল। টানা তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় আসার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের এটা প্রথম বাজেট।

একইসঙ্গে বর্তমান সরকারের অর্থমন্ত্রী হিসেবে আ হ ম মুস্তফা কামালেরও এটি প্রথম বাজেট। গত কয়েক বছরের ধারাবাহিকতায় এবারো রেকর্ড পরিমাণ বাজেট প্রস্তাব করা হচ্ছে।

তবে প্রায় দেড় লাখ কোটি টাকা ঘাটতি থাকায় বাস্তবায়ন নিয়ে শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের শিরোনাম করেছেন ‘সমৃদ্ধির সোপানে বাংলাদেশ, সময় এখন আমাদের’।

এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, এবারের বাজেট হবে ‘স্মার্ট’ বাজেট। এবার গতানুগতিক বাজেট হবে না। প্রচলিত ধারা থেকে বেরিয়ে নতুন আঙ্গিকে তৈরি করা হয়েছে এবারের বাজেট। বাজেট বক্তৃতার বইও আগের তুলনায় সংক্ষিপ্ত, সহজ করা হয়েছে। যাতে সবাই বুঝতে পারে।

অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, একই কাঠামোতে তৈরি হলেও ভ্যাট আইন কার্যকর করার বিষয়ে দিকনির্দেশনা থাকবে এবারের বাজেটে, যা আগের বাজেটগুলোতে ছিল না। এবারই ভ্যাট আইন কার্যকর করতে ক্রেতার সুবিধার্থে পাঁচ স্তরের ভ্যাট কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে।

একইসঙ্গে এবারের বাজেটে রাজস্ব আদায়ের প্রক্রিয়া সহজ করতে এনবিআরের জন্য নতুন করে দিকনির্দেশনা থাকবে। আর সঞ্চয়পত্রের সুদহার না কমলেও এ বিষয়ে নতুন কিছু দিকনির্দেশনা থাকবে। এসবই হবে সাধারণ মানুষের কাছে আকর্ষণীয় এবং গ্রহণযোগ্য। এসব কারণেই অর্থমন্ত্রী সম্প্রতি এবারের বাজেটকে ‘স্মার্ট বাজেট’ বলে দাবি করছেন।

জানা গেছে, ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার হবে ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার। এর মধ্যে রাজস্ব ব্যয় ধরা হয়েছে তিন লাখ ১০ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয় (এডিপি) ধরা হয়েছে দুই লাখ ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা।

আসন্ন ২০১৯-২০ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে তিন লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। এর মধ্যে কর বহির্ভূত আয় ধরা হয়েছে ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা।

বাজেটে জিডিপির আকার ২৮ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকার। আর প্রবৃদ্ধি ধরা হয়েছে ৮ দশমিক ২০ শতাংশ। নতুন বছরে মূল্যস্ফীতি ৫ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে ধরে রাখার চেষ্টা করা হবে বলেও বাজেটে উল্লেখ থাকছে।

২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটের আকার চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের চেয়ে ৫৮ হাজার ৬১৭ কোটি টাকা বেশি। কারণ চলতি অর্থবছরের মূল বাজেটের আকার ছিল ৪ লাখ ৬৪ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা।

লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে না পারায় ও উন্নয়ন প্রকল্পে পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্থ খরচ করতে না পারায় চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের আকার নির্ধারণ করা হয় ৪ লাখ ৪২ হাজার ৫৪১ কোটি টাকা। সেই হিসাবে আসন্ন বাজেটের আকার চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের আকারের চেয়ে ৮০ হাজার ৬৪৯ কোটি টাকা বেশি।

আসন্ন বাজেটে রেকর্ড পরিমাণ ব্যয় করতে গিয়ে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা ঘাটতি রাখছেন অর্থমন্ত্রী। এই ঘাটতি ব্যাংক ও সঞ্চয়পত্র থেকে ঋণের পাশাপাশি বিদেশি ঋণ ও অনুদান নিয়ে মেটানোর পরিকল্পনা রয়েছে।

তবে বিগত বছরগুলোর অভিজ্ঞতার আলোকে এই পরিকল্পনা কতটা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে, সে বিষয়ে আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। করের আওতা বাড়ানোর পাশাপাশি বাজেট ঘোষণার দিন থেকেই ভ্যাট আইন কার্যকর করার কথা জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। এ খাত থেকে তিনি আয়ের পরিমাণ বাড়ানোর আশা করছেন। এরই মধ্যে নতুন ৮০ লাখ নতুন করদাতা খুঁজে বের করার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া নতুন করে বাড়তি ভ্যাট ও শুল্ককর আদায়ের আশা করছেন মন্ত্রী।

আমদানি পর্যায়ে রাজস্ব আয় বাড়াতে দেশের সব বন্দরে স্ক্যানার মেশিন বসানো হবে। এর ফলে আমদানি পর্যায়ে শুল্ক আদায় বাড়ার পাশাপাশি আমদানি-রপ্তানির আড়ালে অর্থপাচার রোধ হবে বলে মনে করছেন অর্থমন্ত্রী। এসব লক্ষ্য সামনে রেখেই নতুন অর্থবছরের বাজেটে এনবিআরকে তিন লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা দেয়া হচ্ছে।

অর্থমন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী অর্থবছরে মোট রাজস্ব আয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭৭ হাজার ৮১০ কোটি টাকা। রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রার মধ্যে এনবিআরের ৩ লাখ ২৫ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। এনবিআর বহির্ভূত কর ব্যবস্থা থেকে ১৪ হাজার ৫০০ কোটি টাকা পাওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে।

এছাড়া সরকারের বিভিন্ন সেবার ফি, হাসপাতালের টিকিট মূল্য, সেতুর টোলসহ বিভিন্ন খাত থেকে ৩৭ হাজার ৭১০ কোটি টাকা আদায় করার পরিকল্পনা রয়েছে। অভ্যন্তরীণ আয়ের বাইরে আগামী অর্থবছর বিদেশ থেকে ৪ হাজার ১৬৮ কোটি টাকা অনুদান পাওয়ার আশা করছে সরকার।

বাজেটের ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকার মধ্যে নতুন অর্থবছরের পরিচালন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ ১০ হাজার ২৬২ কোটি টাকা। নতুন অর্থবছরে উন্নয়ন খাতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ২ লাখ ১৫ হাজার ১১৪ কোটি টাকা। এর মধ্যে ইতোমধ্যে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি) বাবদ ২ লাখ দুই হাজার ৭২১ কোটি টাকা ব্যয় প্রস্তাব অনুমোদন করেছে জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল (এনইসি)।

এছাড়া এডিপি বহির্ভূত বিশেষ প্রকল্প, স্কিম ও কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে বাকি অর্থ ব্যয়ের প্রস্তাব করা হবে। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান ও গ্রামীণ অবকাঠামো সংস্কারে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে নতুন অর্থবছরে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২ হাজার ১৮৪ কোটি টাকা।

বিদেশ থেকে অনুদান না পেলে ২০১৯-২০ অর্থবছরের বাজেটে ঘাটতি দাঁড়াবে ১ লাখ ৪৫ হাজার ৩৮০ কোটি টাকা। এটি মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপির ৫ শতাংশ। তবে বিদেশি অনুদান পাওয়া গেলে এই ঘাটতি দাঁড়াবে ১ লাখ ৪১ হাজার ২১২ কোটি টাকা, যা জিডিপির ৪ দশমিক ৮ শতাংশ।

এই ঘাটতি মেটাতে বিদেশ থেকে ৭৫ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে। বাকি ৭৭ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা দেশের ভেতর থেকে ঋণ নেয়া হবে। অভ্যন্তরীণ উৎসের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থাপনা থেকে নেয়া হবে ৪৭ হাজার ৩৬৪ কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে নিট ৩০ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়া হবে।

এর মধ্যে সঞ্চয়পত্র থেকে ২৭ হাজার কোটি ও অন্যান্য খাত থেকে ৩ হাজার কোটি টাকা ঋণ নেয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে বাজেটে। অর্থমন্ত্রীর এই বাজেট প্রস্তাবের পরে সংসদ সদস্যরা ভালো-মন্দ দিক নিয়ে জুন মাসজুড়ে করবেন আলোচনা। এরপরই চূড়ান্ত অনুমোদন পাবে সারা বছরের জন্য এই রেকর্ড বাজেট।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত