শিরোনাম

সারি সারি লাশ

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০৯:২৩, ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৯

২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীর আগুনের ঘটনায় ১২৪ জনের মৃত্যু হয়েছিল। নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডের পর তালিকা করে ৮০০ রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা পুরান ঢাকা থেকে কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। তবে শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। ফলে পুরান ঢাকা এলাকায় এবার হলো চকবাজার অগ্নিকাণ্ড। চুড়িহাট্টা জামে মসজিদ সংলগ্ন আসগর লেন, নবকুমার দত্ত রোড ও হায়দার বক্স লেনের মিলনস্থলের অগ্নিকাণ্ডে ঘটনায় এ পর্যন্ত ৬৭ জন প্রাণ হারিয়েছে। এবার চকবাজার অগ্নিকাণ্ডে ঘটনা নিয়ে লিখেছেন-জিয়া উল ইসলাম

গত ১ বছরে ফায়ার সার্ভিসের পরিসংখ্যান অনুযায়ী বাংলাদেশের সব বিভাগ থেকে রাজধানী ঢাকায় অগ্নিকান্ডের ঘটনার সংখ্যা ও ক্ষয়-ক্ষতি বেশি। পরিসংখ্যান বলছে, ২০১৮ সালে সারাদেশে ৮ হাজার ৪৬১টি আবাসিক ভবনে আগুনের ঘটনা ঘটেছে, এর ২০৮৮টি ঢাকায়, চট্টগ্রামে ২৮৫ ও রাজশাহীতে ১১৬টি। সারাদেশে ৫০৮টি নৌ দুর্ঘটনার মধ্যে ঢাকায় ১৯৫টি, চট্টগ্রামে ৫৪ ও খুলনায় ৪০টি। এসব ঘটনায় শুধুমাত্র ঢাকায় প্রাণ হারায় ১২১ জন। এক বছরে দেশে ১৬টি ভবন ধসের ঘটনার ১০টি ঢাকায়। এতে ৬ জন নিহত হয়। দেশের গার্মেন্টগুলোতে ১৭৩টি আগুনের ঘটনা ঘটেছে এর মধ্যে ১১৫টি ঢাকায়। শিল্প কারখানায় ১১৩১টি আগুনের ঘটনার মধ্যে ৫২৬টি ঢাকায়।কেন এত দুর্ঘটনার শিকার ঢাকা হচ্ছে? এ প্রশ্নের উত্তরে ফায়ার সার্ভিস মহাপরিচালক বলেছেন, ‘ঢাকার ডেনসিটি বেশি। অল্প জায়গায় বেশি মানুষ বসবাস করে। অনেক অপরিকল্পিত ও অবৈধ বৈদ্যুতিক সংযোগ রয়েছে। নতুন নতুন ইলেকট্রিক গ্যাজেট, ল্যাপটপ, মোবাইল চার্জারসহ অন্যান্য দাহ্য পদার্থের প্রাপ্যতা বেশি। তাই ঢাকায় অগ্নিকা-সহ অন্যান্য দুর্ঘটনার সংখ্যা বেশি।’ গত বছর দেশে যত অগ্নিকাণ্ডের ঘটেছে তার কারণ সম্পর্কে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তর একটি পরিসংখ্যান দিয়েছে। তাদের তথ্য বলছে, গত বছর দেশে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে ১৮ হাজারের কিছু বেশি।গত বছরের সব অগ্নি দুর্ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে বেশি হয়েছে বিদ্যুতের সর্ট সার্কিট থেকে। এর পরই বেশি আগুন লেগেছে চুলা থেকে। সর্ট সার্কিট থেকে আগুন লেগেছে প্রায় ৩৭ শতাংশ ক্ষেত্রে। আর চুলা থেকে আগুন লেগেছে ২৩.৪ শতাংশ। ২০১৮ সালে রিপোর্ট অনুযায়ী গত ৫ বছরে শিল্পে অগ্নিকান্ডের ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ২৩২টি। আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার কোটি টাকার মতো। গত পাঁচ বছরে ৬৪৫টি অগ্নিদুর্ঘটনা ঘটেছে। এসব দুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার মতো। এর মধ্যে ২০১৪ সালে ১৫২টি অগ্নিদুর্ঘটনায় ৮৫ কোটি, ২০১৫ সালে ২১৩টি দুর্ঘটনায় প্রায় ২৮ কোটি ও ২০১৬ সালে ১৯০টি অগ্নিদুর্ঘটনায় আর্থিক ক্ষতি হয়েছে প্রায় ৪৫ কোটি টাকা। তবে বাস্তবে এই ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেক বেশি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট খাতে ক্ষতির শিকারগ্রস্তরা। ২০১৮ সালে ৩১ মার্চে দেওয়া তথ্য অনুসারে বাংলাদেশে ৬ বছরে অগ্নিকা- হয়েছে ৮৮ হাজার। এ অগ্নিকান্ডে নারী, পুরুষ ও শিশুসহ ১ হাজার ৪০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এ খবর জানিয়েছে, ইলেকট্রনিক্স সেফটি অ্যান্ড সিকিউরিটি অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইউএসএসএবি)। ২০১২ সালে ২৪ নভেম্বর তৈরি পোশাক প্রতিষ্ঠান তাজরীন ফ্যাশনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১১১ নিহত হন। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীস্থ নবাব কাটরায় রাসায়নিক দাহ্য পদার্থের গুদামে ভয়াবহ বিস্ফোরণে নিহত হন নারী ও শিশুসহ ১২৪ জন নিহত হন। ২০০৯ সালের ১৩ই মার্চ বসুন্ধরা সিটির আগুন। ওই আগুনে প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। গত বছরের ১৯ নভেম্বর রাজধানীর হাজারীবাগের বউবাজার বস্তিতে লাগা আগুনে প্রাণ হারান ১১ জন। ২০১২ সালে গরীব অ্যান্ড গরিব গার্মেন্টসে লাগা আগুনে নিহত হন ২১ জন। এছাড়া হামীম গ্রুপের অগ্নিকান্ডে ২৯ জনের প্রাণহানি ঘটে। ২০১৩ সালের ২৮ জুন রাজধানীর মোহাম্মদপুরে স্মার্ট এক্সপোর্ট গার্মেন্টস লিমিটেডে আগুনে পুড়ে ৭ নারী পোশাক প্রমিক নিহত হন। ২০০৫ সালের এপ্রিলে স্পেকপ্রামে অগ্নিকা-ের ঘটনায় ৬৪ শ্রমিক নিহত হন। আহত হন প্রায় ৮০ জন। ২০১৩ সালে সভারের রানা প্লাজা ধ্বসে ১১০০ শ্রমিক নিহত হন। এ বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম মহানগরীর চাকতাই এলাকায় বস্তিতে আগুন লেগে ঘুমন্ত অবস্থায় নয় জনের মৃত্যু হয়েছে। আগুনে ভেড়া কলোনির ১৩ লাইনের প্রায় ২০০ ঘর পুড়ে যায়। ধ্বংসস্তুপে থেকে ৮ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়।

মুছেনি মেহেদির রঙ মুছে গেল জীবন
গত ২৮ জানুয়ারি ধুমধাম করে আফরুজা সুলতানা স্মৃতি ও মাহাবুবুর রহমান রাজুর বিয়ে হয়। রাজুর আর এর ভাই নাম রানা। রাজু ও রানা দু’জনে মিলে মোবাইলফোনের ব্যবসা করতেন পুরান ঢাকার চকবাজারে। চকবাজারে আগুনে পুড়ে মারা যান তারা। রাজুর স্ত্রী আফরোজা সুলতানা স্মৃতির বিয়ের হাতের মেহেদি এখনো শুকায়নি।স্মৃতি আজিমপুর গার্লস কলেজে এইচএসসি পরীক্ষার্থী। তিনিও ছোটবেলা থেকেই পরিবারের সঙ্গে পুরান ঢাকায় থাকেন। তার গ্রামের বাড়িও নোয়াখালীর সোনাইমুড়িতে। বিয়ের ২৫ দিনে স্বামীকে হারালেন তিনি। রাজুর শ্বশুর আবুল খায়ের কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, এটাই কী ছিল কপালে। কতো ধুমধাম করে মেয়ের বিয়ে দিয়েছিলাম। কিন্তু ভাগ্যের কি নির্মম পরিহাস। একমাস না যেতেই মেয়ে আমার বিধবা হলো। তিনি আরো বলেন, আগুনের খবর পেয়ে আমি ছুটে আসি। কিন্তু দোকানের কাছেই যেতে পারি নি। পরে শুনেছি আগুনের ভয়ে তারা দোকানের শাটার বন্ধ করে দিয়েছিল। পরে আর বের হতে পারেনি। নিহত দুইজনের ছোট ভাই খলিলুর রহমান মিরাজ বলেন, ঘটনার সময় আমি বাসায় ছিলাম। খবর পেয়ে সেখানে যাই। গিয়ে দেখি আমাদের দোকান পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। আমি চাইলেও ওই এলাকায় ঢুকতে পারি নি। সারারাত চকবাজার এলাকায় বসে ছিলাম। সকালে ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে লাশ শনাক্ত করতে পেরেছি। রাজুর মামা শ্বশুর বরকতউল্লাহ বলেন, অল্প কয়েকদিন হলো ওদের বিয়ে হয়েছে। আর এরই মধ্যে আল্লাহ তাকে নিয়ে গেল। মাইয়াডা কেমনে থাকবো- একমাত্র আল্লাহই জানে। রাজুর সঙ্গে আমার দুইদিন আগেও কথা হয়েছিল। খুব ভালো ছেলে ছিল। বিয়ের আগে থেকেই আমি ওকে চিনতাম। মূলত বিয়ের সব আয়োজন আমিই করেছিলাম।স্ত্রীর জন্য জীবন দিলেন স্বামীরিফাত ও রিয়া দুজন ভাল বন্ধু ছিলেন। বন্ধু থেকেই দ্ইুজনকে ভাললাগা তারপর বিয়ে। দুই বছর আগে রিফাত ও রিয়া বিয়ে করেন। বাস করতেন চকবাজারের চুড়িহাট্টার ‘ওয়াহিদ ম্যানশন’ তৃতীয় তলায় এক ফ্লাটে। রিয়া গর্ভবতী ছিলেন এবং শারীরিক অসুস্থ ছিলেন তাই ‘ওয়াহিদ ম্যানশন’ ভবনে যখন আগুন লাগে তখন রিয়া নিচে নামতে পারেনি, স্ত্রীকে নামাতে পারেননি বলে রিফাতও আর নিচে নামেনি। রিফাত ও রিয়া অনাগত সন্তানসহ আগুনে পুড়ে করুণভাবে মৃত্যুবরণ করেন। রিফাত ও রিয়ার এক বন্ধু আল-আকসার সাজিদ জানান রিয়া অসুস্থ ছিল অনেক। অন্তঃসত্ত্বা হওয়া ছাড়াও আরো কিছু শারীরিক সমস্যায় ভুগছিলেন। আগুন লাগার পর রিফাতের পরিবারের সঙ্গে তার কথা হয়েছিল। কিন্তু রিয়াকে নামাতে পারছিল না বলেই সে নিজেও নামেনি। দু’জনই পুড়ে মারা যায়।

বোনের বিয়ের কেনাকাটা হলে না রোহানের
রাজধানীর নর্থ-সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় সেমিস্টারের শিক্ষার্থী রোহান। রোহানের ছোট বোনের আগামী মাসেই বিয়ে। কয়েকদিন ধরেই বেশ ছোটাছুটি আর ব্যস্ততায় কাটাতে হচ্ছিল রোহানকে। বিয়ের কেনাকাটা করতেই চার বন্ধুকে নিয়ে বের হয়েছিলেন রোহান। সঙ্গে ছিল আরও কিছু কাজ। সব শেষ করে বাসায় ফিরবেন। কিন্তু পুরান ঢাকার চকবাজারের আগুন সব আনন্দ ও উৎসব থামিয়ে দেয়। রোহানের নানা ইউনুস খান বলেন, রোহানের ছোট বোনের বিয়ে আগামী মার্চে। আর তাই বন্ধুদের নিয়ে সে খুব ব্যস্ততার ভেতর ছিল। বুধবার সে কমিউনিটি সেন্টার ভাড়া ও ডেকোরেশনে কথা বলতে গিয়েছিল। কিছু কেনাকাটার কাজও বাকি ছিল, তখন এ দুর্ঘটনা ঘটে। রোহানের সঙ্গে ছিল উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের ‘এ’ লেভেলের ছাত্র আরাফাত। আগুনের লেলিহান শিখায় মৃত্যু হয়েছে তারও। কাজী আলাউদ্দিন রোডসংলগ্ন মসজিদ এলাকার বাসিন্দা আরাফাত। রোহানের সঙ্গেই অপর একটি মোটরসাইকেলে ছিলেন তার ভাগ্নে লাবিব, রমিজ ও সোহাগ। লাবিবের মাথার সামান্য অংশ পুড়লেও, প্রাণে বেঁচে গেছেন তিনি। চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ভয়াবহ এই অগ্নিকান্ডের সময় রাস্তায় যানজটে আটকে থাকায় অনেকে রাস্তায় প্রাণ হারিয়েছেন।

যেভাবে বেঁচে গেল আনাস রেস্টুরেন্টের ১৫ জন
চকবাজারে চুড়িহাট্টার রাজমহল খাবার হোটেলের বিপরীতেই চারতলা ভবনের নিচে আনাস রেস্টুরেন্ট। এই আ আনাস রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার রেজাউল হোসেন। তিনি জানান, রাজমহল খাবার হোটেলের বিপরীতেই চারতলা ভবনের নিচে আনাস রেস্টুরেন্ট। দোতলায় রেস্টুরেন্টের অফিস। অগ্নিকা-ের দিন বুধবার রাত ১০টার দিকে তিনিসহ ১৫ জন বৈঠক করছিলেন। সাড়ে ১০টার দিকে হঠাৎ বিকট শব্দ শুনতে পান। এ সময় বারান্দার গ্রিল দিয়ে তাকিয়ে দেখেন আগুন জ্বলছে চারদিকে। এমন আগুন এ জীবনে দেখেনি। দম বন্ধ হয়ে আসছিল। ভাবছিল বেঁচে ফিরবে কি-না। রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার রেজাউল হোসেন জানান, আগুন দেখে তিনিসহ সবাই নিচতলায় নেমে আসেন। কিন্তু আগুনের লেলিহান শিখায় বের হতে পারেননি। পরে ভবনের ছাদে চলে যান সবাই। ভবনের অন্যান্য তলায় কারখানা ও কর্মচারীদের মেস। বিস্ফোরিত হয়ে পারফিউমের কৌটা ছিটকে পড়ে ছাদে। তারা আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে পাশের একটি ভবনের ছাদে লাফ দেন তারা। সেখান থেকে তারা নিচে নেমে প্রাণে রক্ষা পান।

বাবাকে হারালেন ১১ মাসের যমজ ভাইবোন
ফুটফুটে দুই শিশু। বয়স ১১ মাস। যমজ ভাইবোন নাম আব্দুল্লাহ ও মেহজাবিন। দুই মামার কোলে এদিক ওদিক অপলক চোখে তাকাচ্ছেন। তাদের বাবা কাউসার আহমেদ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চতুর্থ বর্ষে ম্যানেজমেন্ট বিভাগে ছাত্র ছিলেন। ৩ বছর ধরে আছেন চকবাজার শাহী মসজিদ এলাকায়। সেখানেই নন্দ কুমার দত্ত রোডে, চুড়িহাট্টাতে গড়ে তোলেন মদিনা মেডিকেল সেন্টার অ্যান্ড ডেন্টাল কেয়ার নামের প্রতিষ্ঠান। কুমিল্লার হোমনা উপজেলায় বাড়ি কাউসারের। বাবার নাম খলিলুর রহমান। তৃতীয় বর্ষে থাকা অবস্থায় পরিবারিকভাবে বিয়ে হয় কাউসারের। স্ত্রী মুক্তা গৃহিণী। তাদের যমজ সন্তান আব্দুল্লাহ ও মেহজাবিন। কাউসারে স্বপ্ন ছিল হবেন ব্যাংক কর্মকর্তা। সেই স্বপ্ন অধরা রেখে চলে গেলেন কাউসার। এতিম করে দিয়ে গেলেন ফুটফুটে দুই শিশুকে। অগ্নিকান্ডের ঘটনার দিন ছিল মিড টার্ম পরীক্ষা। কাউসার আহমেদের সঙ্গে পরীক্ষা দিয়েছেন বন্ধু সাদিক খান তমাল। তিনি কান্না জড়িত কণ্ঠে বলেন, সকালে একসঙ্গে পরীক্ষা দিলাম। দুপুর পর্যন্ত ক্যাম্পাসে ছিলাম। আর রাতে সে লাশ হয়ে গেলো। কাউসাররা চারজন মিলে দিয়েছিলেন এই মেডিকেল সেন্টারটি। দন্ত চিকিৎসক ইলিয়াস সেই চারজনের একজন। তিনি বলেন, আগুন লাগার সময় ভেতরে ছিল কাউসার। সেসময় ক্লিনিকের গেট বন্ধ ছিল। খোলা থাকলে হয়তো বেরিয়ে আসতে পারতো সে। কাউসারের শ্যালক জাকির হোসেন বলেন, অগ্নিকান্ডের সময় ক্লিনিকে ইমতিয়াজ ও আশরাফুল নামে দুই দন্ত চিকিৎসক ও একজন রোগী ছিলেন। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, ওই ক্লিনিকে আগুন লাগার পর আর কেউ বের হতে পারেননি।

আল্লাহর অপার রহস্য অক্ষত মসজিদ
পুরান ঢাকার চকবাজারের চুড়িহাট্টা অবস্থিত শাহী জামে মসজিদ। ধারনা করা হয় বুধবার রাতে চকবাজারে আগুনের সূত্রপাত এই শাহী জামে মসজিদের মূল গেটের সামনে থেকেই। এ আগুনের লেলিহান শিখায় মসজিদের চারপাশের ৩০০ হাত এলাকার সব বাড়ি, দোকান ও অন্যান্য স্থাপনা পুড়ে ছাই। কঙ্কাল হয়ে দাঁড়িয়ে আগুনে পুড়ে যাওয়ার সাক্ষ্য দিচ্ছে সুউচ্চ ভবনগুলোও। এর মধ্যে ব্যতিক্রম শুধু চুড়িহাট্টা জামে মসজিদ। জনমনে গভীর বিস্ময় জাগিয়ে মসজিদটি অক্ষত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। কৌতূহলী মানুষ আসছে, আর মসজিদটি দেখছে। কেউ কেউ বলছে, ‘এ মহান আল্লাহর অপার রহস্য।’ এলাকাবাসীর ভাষ্য, শাহী মসজিদের নিচ থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয় একটি পিকআপ ভ্যানে থাকা সিলিন্ডার গ্যাস থেকে। যা পরে বিস্ফোরণ হয়ে বিদ্যুতের ট্রান্সফরমারে লাগে। সেখান থেকে দোকানে থাকা কেমিক্যালে লেগে যায় আগুন। মুহূর্তে মধ্যেই তা ছড়িয়ে পড়ে পুরো চকবাজারে। কিন্তু আশ্চর্যজনক মসজিদের তেমন কোনো সমস্যা হয়নি। এলাকার বাসিন্দা করিম মিয়া জানান, এটি একটি আশ্চর্যজনক ঘট্না। আল্লাহর ঘর আল্লাহ রক্ষা করেছেন। ছয়তলা মসজিদের নিচে থেকেই আগুনের সূত্রপাত। কিন্তু আল্লাহর রহমতে মসজিদের কিছুই হয়নি। মসজিদের দক্ষিণ পাশের দেয়ালের টাইলস, বিদ্যুতিক তার ও লোহার গেটের কাঁচ খসে পড়ে। এছাড়া মসজিদের ভিতরের অংশের কোনো ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। মসজিদের অপর পাশের দোকানে সব কিছু পুরে ছাই হলেও ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ (স.) লেখা সংবলিত লেখাংশটুকু ঠিকই অবিকল অবস্থায় রয়েছে।

যানজটের জন্য জীবন গেল যাদের
ঘটনা (১) ॥ চকবাজারের চুড়িহাট্টার শাহী মসজিদের মোড়টি রাস্তার দুই পাশে মার্কেট- দোকানপাট ও রেস্তোরার ভরা। রাস্তাটিতে এমনিতেই ভিড় লেগে থাকে। রাস্তাটি সরু হওয়ায় কোনও রকমে ওভারটেক করতে পারে দুটি প্রাইভেটকার। অগ্নিকান্ডের দিন বুধবার রাতে শহীদ মিনারে ‘ভিভিআইপি মুভমেন্ট’ থাকায় পুরানো কেন্দ্রীয় কারাগারের পেছনের সড়কে যানচলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছিল। সেকারণে চুড়িহাট্টার সড়কে যানজট আরও কয়েকগুণ বেড়ে গিয়েছিল। আর এই চুড়িহাট্টা মোড় পার হচ্ছিলেন রাশিদুল ইসলাম মিঠু ও সোনিয়া আক্তার দম্পতি রিকশা দিয়ে তাদের কোলে ছিল দুই সন্তান রামিম ও শাহির। চুড়িহাট্টার পাশেই রামিমের স্কুল বন্ধুর বোনের কান ফোড়ানোর দাওয়াত খেতে যাচ্ছিলেন তারা। রিকশাটি চুড়িহাট্টার মোড়ে যানজটে যখন আটকে ছিল, তখনই সিলিন্ডারে ভয়াবহ বিস্ফোরণটি হয়। মুহূর্তেই কেঁপে ওঠে পুরো এলাকা, সঙ্গে আগুনের লেলিহান শিখা। আগুনের ঝাটকা এসে লাগে সবার গায়ে। রিকশা থেকে পড়ে গিয়ে রামিম কোনও মতে দৌড়ে কিছুটা দূরে সরে আসে। কিন্তু শাহিরসহ মিঠু- সোনিয়া দম্পতি সেই জট থেকে আর বের হয়ে আসতে পারেননি। সেখানেই করুণ মৃত্যু হয় তাদের।
ঘটনা (২) ॥ কামরাঙ্গীচরের ইসহাক বেপারী ছিলেন ভ্যানচালক। ভ্যানে মালামাল নিয়ে হয়তো কোথাও যাচ্ছিলেন তিনি। চুড়িহাট্টার মোড়ে যানজটে আটকে থাকা অবস্থায় পুড়ে যায় মালামালসহ সেই ভ্যানটি। ঘাতক আগুনের ছোবল থেকে রেহাই মেলেনি ইসহাকের। রাস্তায়ই পুড়ে মারা যান তিনিও। ইসহাক বেপারীর বোন হাসিনা বেগম জানান, কামরাঙ্গীচরের মতবর বাজারে স্ত্রী চম্পা বেগম ও দুই সন্তান আলিফ (৫) ও আরাফাত (৩)-কে নিয়ে থাকতেন ইসহাক। গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের লৌহজংয়ে। কান্নাজড়িত কণ্ঠে ইসহাকের স্ত্রী চম্পা বেগম জানান, সকালে যে গামছা নিয়ে ইসহাক বের হয়েছিলেন, সেই গামছা দেখেই তাকে শনাক্ত করেছেন তারা।
ঘটনা (৩) ॥ প্লাস্টিকের ‘দানা’ আনানেওয়া করতেন মজিবর তার ঠেলাগাড়ি দিয়ে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে রিনা বেগম নামে এক নারী জানান, ঠেলাগাড়িতে মজিবরসহ চার জন ছিলেন। চুড়িহাট্টার মোড়ে যানজটে আটকে ছিল ঠেলাগাড়িটি। গাড়ির মালামাল ছিল তার ভাইয়ের ছেলে যে গোডাউনের ম্যানেজার, সেখানকার। এজন্য আগুন লাগার পর অন্যরা দৌড়ে প্রাণ বাঁচালেও মালামাল সরাতে গিয়ে আগুনের মধ্যে পড়ে মারা যান পাঁচ সন্তানের জনক মজিবর। রিনা বলেন, ‘আমরা পা আর গায়ের গেঞ্জি দেখে মজিবরকে শনাক্ত করেছি।
ঘটনা (৪) ॥ চকবাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আলী দোকান বন্ধ করে বাসায় ফিরছিলেন তিন বছরের ছেলে আরাফাতকে নিয়ে। সঙ্গে ছিল ছোট ভাই অপু রায়হানও। চুড়িহাট্টার সড়ক ধরে যানজট ঠেলে পাশের রহমতগঞ্জের ছাতামসজিদ এলাকার বাসায় ফিরছিলেন তারা।
কিন্তু হঠাৎ সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ভয়াবহ সেই আগুনে তিনজনই পুড়ে মারা যান। আলীর বন্ধু জুবায়ের জানান, ‘চাচা অপুর সঙ্গে বড় ছেলে আরাফাত বাবার দোকানে গিয়েছিল। একসঙ্গে বাসায় ফিরছিল তারা। কিন্তু আগুন একসঙ্গে কেড়ে নিলো তাদের।’ জুবায়ের জানান, আলীর স্ত্রী ইতি আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। স্বামী ও সন্তানের মৃত্যুর খবরে সেও অসুস্থ হয়ে পড়েছে। আর অপুর চার মাসের একটি সন্তান রয়েছে।
ঘটনা (৫) ॥ বুধবার রাত ১০টা ২১ মিনিটে চা খেতে বের হয়েছিলেন জয়নাল আবেদীন বাবুল। আগুনের পর থেকে তার মোবাইল বন্ধ। খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না তার।বাবুলের মেয়ে নাসরিন আক্তার জানান, কোনও এক বন্ধুর ফোন পেয়ে রাত ১০টা ২১ মিনিটে ২৬ নম্বর আজগর লেনের বাসা থেকে বের হন তার বাবা।
হাজী বালু ঘাটে যাবার কথা ছিল তার। চুড়িহাট্টার সড়ক দিয়েই যেতে হয়। নাসরিন জানান, আগুনে তার বাবা পুড়ে মারা গেছেন কিনা নিশ্চিত হতে পারছেন না। লাশ দেখে শনাক্তও করতে পারেননি। এদিকে ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স সদর দফতরের পরিদর্শক শরীফুল ইসলাম জানান, তারা রাস্তা থেকে অন্তত ১৪-১৫ জনের লাশ উদ্ধার করেছেন।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত