শিরোনাম

বিশ্বে আলো ছড়ানো মুসলিমদের পাঠাগার

প্রিন্ট সংস্করণ॥জিয়া উল ইসলাম  |  ০০:৫০, ফেব্রুয়ারি ০৮, ২০১৯

মানুষের জীবনে বই সবচেয়ে বিশ্বস্ত বন্ধু। বই মানুষের বিকারগ্রস্ততা দূর করে। বই অবসরের বিনোদন। বই আত্মার খোরাক জোগায়। বই হিংসা-বিদ্বেষ দূর করে একটি শান্তিময় পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় উৎসাহিত করে। মানবজীবনে বইয়ের কোনো বিকল্প নেই। আলো ছাড়া যেমন পথ চলা যায় না, তেমনি বই ছাড়া সত্যিকার কোনো মানুষ হতে পারে না। মানুষের দুই ধরনের ক্ষুধার সৃষ্টি হয়। একটি হলো দৈহিক ক্ষুধা, অন্যটি হলো মানসিক ক্ষুধা। দৈহিক ক্ষুধার চাহিদা যেমন সাময়িক, তেমনি এটা সহজলভ্য। আর মানসিক ক্ষুধার চাহিদা যেমন, তেমনি এটা পূরণ করাও কঠিন। ইসলাম এমনি একটি মানবহিতৈষী ধর্ম, যা এই জ্ঞানরাজ্যের ক্ষুধা নিবারণে অত্যধিক গুরুত্ব দিয়েছে এবং নানাভাবে এর প্রতি উৎসাহিত করেছে। মুসলমানদের সবচেয়ে প্রিয় গ্রন্থ আল কুরআন শুরুই হয়েছে ‘পড়ো’ নির্দেশ দিয়ে। পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, যারা জানে আর যারা জানে না, তারা কখনো সমান নয়। জ্ঞানের ক্ষুধা মেটানোর প্রধানতম অবলম্বন হলো পাঠাগার তৈরি করা। ইতিহাসে যেটাকে মধ্যযুগ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। সেখানে দেখা যায়, মুসলমানরা বিশ্বময় আলো ছড়ানোর জন্য যেভাবে পাঠাগার, গ্রন্থাগার গড়ে তুলেছিলেন, পৃথিবীর আর কোনো জাতি-গোষ্ঠী তখন তাদের ধারে-কাছেও ছিল না। তারা ছিল অন্ধকার জগতে নিমজ্জিত। বিশেষ করে ইউরোপ তখন তাকিয়ে ছিল মুসলিম সভ্যতার কেন্দ্রবিন্দু কর্ডোভা, গ্রানাডা, বাগদাদ আর মিসরের দিকে। সেখানে তারা বছরের পর বছর পড়ে থেকে জ্ঞানরাজ্যের সন্ধান করেছে। মধ্যযুগের ইতিহাস মুসলমানদের সমৃদ্ধির ইতিহাস, কর্ডোভার ইতিহাস মুসলমান শিক্ষাদীক্ষায় শ্রেষ্ঠত্বের ইতিহাস। দেখা যায়, সে সময় কর্ডোভা বিশ্ববিদ্যালয়ে যে গ্রন্থাগারটি প্রতিষ্ঠা হয়েছিল, তৎকালীন সেই পাঠাগারে সংরক্ষিত ছিল ছয় লাখ পান্ডুলিপি। আর এ বইগুলোর নামের তালিকা করতে লেগেছিল ৪৪টি বিশাল গ্রন্থের। পৃথিবীর ইতিহাসে তৎকালীন কর্ডোভা রাজ্যটি বইয়ের নগরীতে পরিণত হয়েছিল। আধুনিককালে তুরস্কের ‘সোলাইমানিয়া’ লাইব্রেরিটির অবস্থান শীর্ষে, ঐতিহ্য, বিশালতা ও সংগ্রহের বৈচিত্র্যে এটি অনন্য। তারপরে মিসরের ‘দারুল কুতুব’ যা প্রাচীন ঐতিহ্য ও ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চায় ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। ইরাকে আবদুল্লাহ মারাশি নাজাফি কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত বিখ্যাত লাইব্রেরিটি ইসলামি দুনিয়ায় ৩য় বৃহত্তম বলে দাবিদার। এ লাইব্রেরিতে ৫ম ও ৬ষ্ঠ শতাব্দীর ইসলামি সংস্কৃতির দুর্লভ সংগ্রহ রয়েছে। হাতে লেখা প্রাচীন কুরআন শরিফখানাও এ পাঠাগারে আছে। প্রাচীন হস্তলিপি সংগ্রহের দিক দিয়ে এ পাঠাগারটি শ্রেষ্ঠতম, এক লাখেরও বেশি প্রাচীন হস্তলিপি এখানে জমা আছে। বিজ্ঞানী ইবনে রুশদের ভূগোল সম্পর্কীয় কিতাব ‘আল কানুন’, খাজা নাছির উদ্দিন তুসির চিকিৎসাবিজ্ঞান শাস্ত্র ‘তাহরিরে একলিদেস’ ও শরিফ ইদ্রিসের ‘নাজহাতুল মুস্তাক’ নামের বিখ্যাত গ্রন্থগুলোর মূল পান্ডুলিপি এখনো বিদ্যমান আছে। গ্রন্থ সংগ্রহ ও জ্ঞানচর্চার সুবিধার্থে পবিত্র নগরী মদিনায় স্থাপন করা হয়েছে ‘মাকতাব আল আবদুল আজীজ’। এটি মসজিদে নববির বারান্দার পশ্চিম অংশে অবস্থিত। ইসলামি সভ্যতা ও জ্ঞানচর্চার স্বর্ণালি যুগের মিউজিয়ামও বটে। এ পাঠাগারের সংগ্রহ ইসলামি জ্ঞান-ভান্ডারের এক বিশাল অমূল্য সম্পদ। সারা দুনিয়ার দুর্লভ ইসলামি প্রকাশনার পান্ডুলিপিসহ অসংখ্য বৈচিত্র্যে ভরা পবিত্র কুরআন, হাদিস ও ধর্মীয় কিতাবের বিশাল সংগ্রহ সংরক্ষিত আছে। শুধু কুরআনে কারিমের পান্ডুলিপি রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৮৭৮টি, এর সঙ্গে রয়েছে ৮৪টি হস্তলিখিত কুরআনের বিশেষ অংশ। দুর্লভ অমূল্য কিতাবই আছে প্রায় ২৫ হাজার। ৪৮৮ হিজরিতে আলী বিন মুহাম্মদ আল বাতলিওসি কর্তৃক হরিণের চামড়ার ওপরে লিখিত পবিত্র কুরআনসহ ১৫৮ কেজি ওজনের বৃহদাকার হস্তলিখিত পবিত্র কুরআনের কপিটি এ লাইব্রেরির অহঙ্কার, যা গোলাম মুহিউদ্দিন কর্তৃক লিখিত। ‘মাকতাবাত আবদুল আজীজ’ পাঠাগারটি তথ্যগ্রন্থ, পান্ডুলিপি, অভিসন্দর্ভ, গবেষণাপত্র ও অত্যাধুনিক সুবিধাদির জন্য বিশ্ববিখ্যাত। ১৯৭৫ সালে বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ চত্বরে ‘ইসলামিক ফাউন্ডেশন’ প্রতিষ্ঠিত হয়। ধর্মীয়, ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা, মুসলিম ঐতিহ্য, মুসলিম মনীষীদের জীবনীমূলক বই প্রণয়ন ও প্রকাশ করে। এখানে বিভিন্ন ধর্মীয় গ্রন্থসহ অন্যান্য বইয়ের সংখ্যা ১ লাখ ১০ হাজারেরও বেশি। হজরত ওসমান (রা.) এর হাতে লেখা ও পবিত্র কুরআনের ছায়ালিপি, ৬১ কেজি ওজনের ১১০০ পৃষ্ঠা পৃথিবীর অন্যতম সর্ববৃহৎ হাতে লেখা কুরআন ও ২.৩৮ গ্রাম ওজনের ক্ষুদ্র এক কপি মুদ্রিত কোরআনের সংগ্রহ ইসলামিক ফাউন্ডেশন লাইব্রেরি আছে। ভারতের পাটনায় অবস্থিত খোদা বখশ ওরিয়েন্টাল লাইব্রেরি। ১৮৯১ সালে খান বাহাদুর খোদা বখশ এটি প্রতিষ্ঠা করেন। লাইব্রেরিটি দুর্লভ ফারসি ও আরবি পান্ডুলিপির জন্য বিখ্যাত। এখানে রাজপুত ও মোগল আমলে আঁকা নানা রকমের চিত্র সংরক্ষিত রয়েছে। বর্তমানকালে যে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি আমরা দেখি সেই লাইব্রেরি প্রতিষ্ঠা ইতিহাসে দেখা যায় মুসলমানদের অবদান। চতুর্থ শতাব্দীতে সর্বপ্রথম মুসলিম প্রশাসক সায়েব বিন আব্বাদ আরব জাহানে ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি প্রবর্তন করেন।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত