শিরোনাম

প্রাণের বইমেলা

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০৬:১৩, ফেব্রুয়ারি ০২, ২০১৯

মানব সভ্যতা বিকাশের প্রারম্ভকাল থেকে বই মানবজীবনের এক গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। সময়ের বিবর্তনে মানুষ নিজেকে প্রকাশ করার তাগিদে বইকে আঁকড়ে ধরেছে আপ্রাণ। লিপি আবিষ্কারের পর থেকে মানুষ মনের কথা লিখতে শুরু করে। গাছের ছাল-বাঁকল, পাতা, পাহাড় গাত্রে অথবা পাথরে মানুষ লিখে রাখত কথামালা। পরবর্তী সময়ে মানুষ আবিষ্কার করে কাগজ। তবে বইয়ের জগতের ধারণা পাল্টে যায় মুদ্রণ যন্ত্র আবিস্কারের পর। খ্রিষ্টীয় পনেরো শতকে জার্মানির ইয়োহানেস গুটেনবার্গ আবিষ্কার করলেন ছাপাখানা। এরপরই পাল্টে যায় বইয়ের জগতের চিত্র। মুদ্রণযন্ত্রের সঙ্গে পরিচয়ের ফলে বইয়ের প্রচার ও প্রসারও বাড়তে থাকে। ১৭৭৮ সালে ভারতীয় উপমহাদেশে ছাপাখানার বিস্তার ঘটে। এর ধারবাহিকতায় পরবর্তীতে বাংলাদেশেও মুদ্রণশিল্প বিকাশ লাভ করে। বিশ্বের প্রথম বইমেলা শুরু হয় জার্মানিতে। কারো কারো মতে, জার্মানির লিপজিগ শহরে হয়েছিল প্রথম বইমেলা। বাংলাদেশে ভাষার মাসে পুরো মাস চলে বইমেলা। এবার দেশ-বিদেশের বইমেলা নিয়ে লিখেছেন-জিয়াউল ইসলাম

১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হয় । এর এক বছর পর ১৯৭২ সালে ৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পুঁথিঘর এবং মুক্তধারার প্রতিষ্ঠাতা চিত্তরঞ্জন সাহা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন বর্ধমান হাউস প্রাঙ্গণে এক টুকরো চটের ওপর ৩২টি বই নিয়ে অনানুষ্ঠানিকভাবে এক বইমেলার সূচনা করেন। এই ৩২টি বই চিত্তরঞ্জন সাহা প্রতিষ্ঠিত স্বাধীন বাংলা সাহিত্য পরিষদ বর্তমানে মুক্তধারা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বাংলাদেশি শরণার্থী লেখকদের লেখা। ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত তার একার দায়িত্বে এবং উৎসাহে বইমেলা চলতে থাকে। ধীরে ধীরে মানুষের মাঝে বাড়তে থাকে এই মেলার গ্রহণযোগ্যতা। ১৯৭৬ সালে অন্যান্যরা অণুপ্রাণিত হোন। ১৯৭৮ সালে বাংলা একাডেমির তৎকালীন মহাপরিচালক আশরাফ সিদ্দিকী বাংলা একাডেমিকে মেলার সাথে সরাসরি সম্পৃত করেন। ১৯৭৯ সালে মেলার সাথে যুক্ত হয় বাংলাদেশ পুস্তুক বিক্রেতা ও প্রকাশক সমিতি; এই সংস্থাটিও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন চিত্তরঞ্জন সাহা। ১৯৮৩ সালে কাজী মনজুরে মওলা বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক হিসেবে বাংলা একাডেমিতে প্রথম ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’র আয়োজন সম্পন্ন করেন। কিন্তু সেই সময় তৎকালীন সরকারের বিরুদ্ধে শিক্ষা ভবনের সামনে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে ট্রাক তুলে দিলে দুজন ছাত্র নিহত হয়। ওই মর্মান্তিক ঘটনার পর সেই বছর আর বইমেলা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৮৪ সালে নতুন আঙ্গিকে সাড়ম্বরে বর্তমানের অমর একুশে গ্রন্থমেলার সূচনা হয়। গ্রন্থমেলার জন্য বিধিবদ্ধ নীতিমালা প্রণীত হয়। সেই থেকে অমর একুশে গ্রন্থমেলা প্রতি বছর প্রায় একই আঙ্গিকে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। তবে আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে মেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর সংখ্যা বাড়তে থাকে। ১৯৮০ সালের গ্রন্থমেলায় যে সংখ্যা ছিল মাত্র ৩০; মাত্র পাঁচ বছর পর ১৯৮৫ সালে সে সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৮২তে। ১৯৯১ সালে এ সংখ্যাটি ১৯০-এ উন্নীত হয়। এর মাত্র এক বছরের ব্যবধানে ১৯৯২ সালে অনুষ্ঠিত অমর একুশে গ্রন্থমেলায় অংশগ্রহণকারী প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২৭০। সত্তর দশকের শেষ দিকে মেলার ব্যাপক আয়োজন শুরু হলেও এ আয়োজন পূর্ণতা পায় আশির দশকের মাঝামাঝি এসে। নব্বইয়ের শুরুতে মেলা অভাবনীয় ব্যাপ্তি লাভ করে ও পাঠকের দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৪ সাল থেকে অমর একুশে গ্রন্থমেলার মূল আয়োজন বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণ ছাড়িয়ে পাশের সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সম্প্রসারণ করা হয়। মেলায় বই আসে রাজধানী ঢাকার বাংলাবাজার এলাকা থেকে। পঞ্চাশ দশকের শুরুতে বাংলাবাজারে বইয়ের বাজার যাত্রা শুরু হয়। বইমেলাকে কেন্দ্র করে বাংলাবাজারেও প্রকাশক, লেখক এবং সংশ্নিষ্ট সবাই বইয়ের কাজে ব্যস্ত থাকে। বাংলা একাডেমিতে বই মেলা চলে ফেব্রুয়ারির পুরো এক মাস। তবে মেলার প্রথমে দিকে দিন থেকে ২১শে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত গ্রন্থমেলা নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হতো। এরপর ক্রেতা, দর্শক ও বিক্রেতাদের আবেদনের প্রেক্ষিতে ফেব্রুয়ারি শেষ দিন অবধি এই মেলা বাংলা একাডেমি প্রাঙ্গণে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় মেলা নিয়ন্ত্রণের যাবতীয় দায়িত্ব পালন করে। প্রকাশনীসমূহের স্টলগুলো প্রকাশক এলাকা, প্রকাশক-বিক্রেতা এলাকা, শিশু কর্ণার, সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এবং লিটল ম্যাগাজিন ইত্যাদি এলাকায় বিভাজন করে স্থান দেয়া হয়। এছাড়া মেলা চত্বরকে ভাষা শহীদ সালাম, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউর এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, আব্দুল করিম সাহিত্য বিশারদ প্রমুখ ব্যক্তিত্বের নামে ভাগ করা হয়। এই মেলায় দেশের খ্যাতনামা সব প্রকাশনী, বই বিক্রেতা ছাড়াও দেশের বাইরে, যেমন ভারত, রাশিয়া, জাপান প্রভৃতি দেশ থেকেও নানা প্রকাশনা সংস্থা তাঁদের বই ও প্রকাশনা নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। এই মেলায় গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারেরও বহু রাষ্ট্রায়ত্ব প্রতিষ্ঠান, যেমন- বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন, বাংলাদেশ প্রত্মতত্ত্ব অধিদপ্তর ইত্যাদি তাদের স্টল নিয়ে মেলায় অংশগ্রহণ করে। এছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানও অংশ নেয়। মেলাতে ইদানিং বিভিন্ন ডিজিটাল প্রকাশনা যেমন সিডি, ডিভিডি ইত্যাদিও স্থান করে নিয়েছে। এছাড়া বিভিন্ন মোবাইল ফোন সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানও তাদের সেবার বিবরণসহ উপস্থিত হয়। মেলাতে বেশ জনপ্রিয়তার সাথে স্থান করে নিয়েছে লিটল ম্যাগাজিনও। মেলার মিডিয়া সেন্টারে থাকে ইন্টারনেট ও ফ্যাক্স ব্যবহারের সুবিধা। এছাড়া থাকে লেখক কর্ণার এবং তথ্যকেন্দ্র। মেলা প্রাঙ্গণ পলিথিন ও ধূমপানমুক্ত। মেলায় বইয়ের বিক্রয়ে ২০-২৫ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় থাকে। এছাড়া মেলায় শিক্ষাসহায়ক পরিবেশ ও তথ্যের নিরাপত্তার জন্য বিশেষ টাস্কফোর্স রাখা হয়, যারা বইয়ের কপিরাইট বা মেধাসত্ত্ব আইন লঙ্ঘন করেছে কি-না শনাক্ত করেন ও যথাযোগ্য ব্যবস্থা নেন। বইমেলায় প্রবেশের জন্য ছুটির দিন ও ছুটির দিন বাদে অন্যান্য দিন আলাদা প্রবেশ সময় থাকে। মেলায় প্রবেশের জন্য কোনো প্রবেশ ফি ধার্য করা হয় না।বইমেলা চলাকালীন প্রতিদিনই মেলাতে বিভিন্ন আলোচনা সভা, কবিতা পাঠের আসর বসে; প্রতি সন্ধ্যায় থাকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়া মেলাতে লেখককুুঞ্জ রয়েছে, যেখানে লেখকেরা উপস্থিত থাকেন এবং তাঁদের বইয়ের ব্যাপারে পাঠক ও দর্শকদের সাথে মতবিনিময় করেন। এছাড়া মেলার তথ্যকেন্দ্র থেকে প্রতিনিয়ত নতুন মোড়ক উন্মোচিত বইগুলোর নাম, উদীয়মান লেখক ও প্রকাশকের নাম ঘোষণা করা হয় ও দৈনিক প্রকাশিত বইয়ের সামগ্রিক তালিকা লিপিবদ্ধ করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন রেডিও ও টেলিভিশন চ্যানেল মেলার মিডিয়া স্পন্সর হয়ে মেলার তাৎক্ষণিক খবরাখবর দর্শক- শ্রোতাদেরকে অবহিত করে। এছাড়াও মেলার প্রবেশদ্বারের পাশেই স্টল স্থাপন করে বিভিন্ন রক্ত সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছাসেবার ভিত্তিতে রক্ত সংগ্রহ করে থাকে।২০১০ সাল থেকে এই মেলার প্রবর্তক জনাব চিত্তরঞ্জন সাহার নামে একটি পদক প্রবর্তন করা হয়। পূর্ববর্তী বছরে প্রকাশিত বইয়ের গুণমান বিচারে সেরা বইয়ের জন্য প্রকাশককে এই পুরস্কার প্রদান করা হয়। পুরষ্কারটির আনুষ্ঠানিক নাম ‘চিত্তরঞ্জন সাহা স্মৃতি পুরস্কার’। এছাড়া স্টল ও অঙ্গসজ্জার জন্য দেয়া হয় ‘সরদার জয়েনউদদীন স্মৃতি পুরস্কার’। সর্বাধিক গ্রন্থ ক্রযের জন্য সেরা ক্রেতাকে দেয়া হয় ‘পলান সরকার পুরস্কার’।

দেশে দেশে বই উৎসব 
কলকাতায় ১২ দিনের বইমেলা : ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং লন্ডন বইমেলার পরের স্থানটি কলকাতা বইমেলার। সে হিসেবে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বইমেলা এটি। মেলা শুরু হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। মেলা অনুষ্ঠিত হয় জানুয়ারির শেষ বুধবার থেকে ফেব্রুয়ারির প্রথম রোববার পর্যন্ত। সব মিলিয়ে মেলার মেয়াদ ১২ দিন। তবে মেলা আয়োজনের প্রথম দিকে এর মেয়াদ ছিল সাতদিন। জনপ্রিয়তার কারণে পরে মেলার মেয়াদ বাড়ানো হয়। বইমেলা ছাড়া কলকাতাকে কল্পনা করতে পারে না কলকাতাবাসী। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, মেলায় প্রতিবছর গড়ে প্রায় ২ মিলিয়ন মানুষের সমাগম হয়। সবদিক বিবেচনায় ২০০৫ সালে মেলার মেয়াদ সাতদিন থেকে বাড়িয়ে বারদিন করা হয়। ফ্রাঙ্কফুর্ট এবং লন্ডন এ দুটি বইমেলার সঙ্গে কলকাতার বইমেলার পার্থক্য হল- এখানে পাঠকদেও গুরুত্ব দেয়া হয় সবচেয়ে বেশি। বই ব্যবসা এ মেলার মূল উদ্দেশ্য নয়। সেদিক থেকে কলকাতা বইমেলাকে বলা যায় বিশ্বের সবচেয়ে বড় অব্যবসায়িক বইমেলা। কলকাতা বইমেলার অফিসিয়াল নাম কলকাতা বইমেলা বা কলকাতা পুস্তকমেলা। এছাড়াও ভারতের জয়পুরে সাধারণত জানুয়ারি মাসের শেষের দিকে অনুষ্ঠিত হয় জয়পুর সাহিত্য উৎসব। ভারতের আর একটি বড় বইমেলা হলো নয়াদিল্লি বইমেলা। এ মেলা শুরু হয়েছিল ১৯৭২ সালে। নয়াদিল্লির বইমেলার আয়োজক এনবিটি (ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট)। মেলা শুরু হয় ফেব্রুয়ারিতে। এ মেলার অর্থনৈতিক গুরুত্ব অনেক।

৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো ফ্রাঙ্কফুর্ট মেলা : জার্মানির ফ্রাঙ্কফুর্টে আয়োজিত হয় বাণিজ্যিক দিকে থেকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বই মেলা। ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার ইতিহাস সাড়ে পাঁচশো বছরেরও বেশি পুরনো। ফ্রাঙ্কফুর্টের কাছেই মেইনজে যখন জোহানেস গুটেনবার্গ ছাপাখানার প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতি সাধন করেন, তখন স্থানীয় বই বিক্রেতাদের আয়োজনে প্রথমবারের মত বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়।প্রতি বছর অক্টোবরের মাঝামাঝি এই মেলার আয়োজন করা হয়। পাঁচ দিনব্যাপী মেলার প্রথম তিনদিন উন্মুক্ত থাকে কেবল বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে আগমনকারীদের জন্য। পরবর্তী দুই দিন মেলায় ঢুকতে পারেন যে কেউ। সারা পৃথিবী থেকে মানুষ এই মেলায় আসেন বইয়ের আন্তর্জাতিক প্রকাশনা স্বত্ব ও লাইসেন্সিং ফি নিয়ে দর কষাকষি করতে। ‘জার্মান পাবলিশার্স এন্ড বুকসেলার্স এসোসিয়েশন’ এর একটি সহযোগী সংগঠন এই মেলার আয়োজন করে। ১০০টিরও বেশি দেশ থেকে অন্তত ৭,০০০ সংস্থা অংশ নেয় এই মেলায়। আর এখন প্রায় তিন লক্ষ মানুষের আগমন ঘটে মেলায়। প্রকাশনা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তি ও বাণিজ্যের জন্য এই বইমেলাকে পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বইমেলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৫০ সাল থেকে প্রতি বছর এই বইমেলা চলাকালীন ‘পিস প্রাইজ অব দ্য জার্মান বুক ট্রেড’ পুরস্কার প্রদান করা হয়। আরও একটি মজার পুরস্কার দেয়া হয় প্রতিবার। মেলায় প্রদর্শিত বইগুলোর মধ্যে সবচেয়ে অদ্ভুত নাম হয় যে বইয়ের, সেটিকেই এই পুরস্কারটি দেয়া হয়। চলতি বছরের ১১ অক্টোবর থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা।

বুয়েন্স আয়ার্স আন্তর্জাতিক বইমেলা:পৃথিবীর বৃহত্তম বইমেলাগুলোর একটি বুয়েন্স আয়ার্স আন্তর্জাতিক বইমেলা। আর্জেন্টাইন সোসাইটি অব রাইটার্স এর প্রতিষ্ঠিত ‘ফান্দাসিঁও এল লিব্রো’ নামক একটি অলাভজনক সংস্থা এই বইমেলার আয়োজন করে থাকে। ১৯৭৫ সালের মার্চে প্রথমবারের মত বুয়েন্স আয়ার্স আন্তর্জাতিক বইমেলা অনুষ্ঠিত হয়। সাড়ে সাত হাজার বর্গমিটার জায়গা নিয়ে অনুষ্ঠিত সেবারের মেলায় ৫০ জন লেখক এবং আর্জেন্টিনার বাইরের আরও ৭ টি দেশ অংশ নেয়। প্রথম বারেই বইমেলায় দর্শনার্থী হয়েছিল প্রায় দেড় লাখ। সবার জন্য উন্মুক্ত এই মেলার আয়োজন হয় আর্জেন্টাইন রুরাল সোসাইটির ৪৫ হাজার বর্গ মিটার এলাকা নিয়ে। বিশ্বের ৫০ টি দেশের অংশগ্রহণে এই মেলায় দর্শনার্থীর সংখ্যা ১২ লাখ। তিন সপ্তাহ ব্যাপী আয়োজিত এই মেলা প্রতি বছর এপ্রিলে অনুষ্ঠিত হয়।

লন্ডনে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বইমেলা :প্রকাশনার দিক থেকে লন্ডন বইমেলা বিশ্বের সবচেয়ে বড় বইমেলার অন্যতম। তবে আয়তনে ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলার মতো বড় না হলেও এ মেলার গুরুত্ব অনেক। বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম বইমেলা এটি। সাধারণত বছরের মার্চ মাসে এ মেলার আয়োজন করা হয়। মেলা শুরু হয় ১৯৭৬ সাল থেকে। সব মিলিয়ে মেলার মেয়াদ ১২ দিন। তবে মেলা আয়োজনের প্রথমদিকে এর মেয়াদ ছিল ৭ দিন। জনপ্রিয়তার কারণে পরবর্তীতে মেলার মেয়াদ বাড়ানো হয়। তবে কখনও কখনও অক্টোবরেও মেলার তারিখ পরিবর্তন হয়, সেই সঙ্গে পাল্টে যায় মেলার স্থানও। যেমন ২০০৬ সালে মেলাটি হয়েছিল লন্ডনের অলিম্পিয়া এক্সিবিশন সেন্টারে আবার পরের বছর হয় ডকল্যান্ডের আর্ল কোট এক্সিবিশন সেন্টারে। গত বছর এ মেলায় বিশ্বের প্রায় একশরও বেশি দেশ থেকে ২৩ হাজার প্রকাশক, বই বিক্রেতা, সাহিত্য প্রতিনিধি, লাইব্রেরিয়ান, সংবাদমাধ্যম কর্মী অংশ নিয়েছিল। প্রকাশিতব্য বইয়ের প্রচারের জন্য, অন্য প্রকাশক থেকে বইয়ের স্বত্ত্ব অথবা বইয়ের অনুবাদ স্বত্ত্ব কেনা-বেচার জন্য প্রকাশকরা এ মেলায় অংশ নেয়। ফ্রাঙ্কফুর্টের বইমেলার সঙ্গে এ মেলার বড় পার্থক্য হল- এটি প্রকৃত অর্থে প্রকাশকদের মেলা। এখানে সাধারণ পাঠকের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। এখানে ভিড় করেন বিভিন্ন দেশের প্রকাশকরা।

নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিন বইমেলা ২০০৬ সাল থেকে :যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের ব্রুকলিনে আয়োজিত হচ্ছে ব্রুকলিন বইমেলা। অন্যান্য বইমেলার মতো এখানেও বড়দের পাঠের দিকেই প্রধানত নজর দেয়া হয়। তবে বাড়তি আয়োজনও থাকে শিশুদের জন্য। শিশুদের বইয়ের আয়োজনসহ থাকে তাদের জন্য নানা কর্মপ্রক্রিয়া। ব্রুকলিন বইমেলায় চলে বড়দের পাঠচক্র, সাহিত্য আলোচনা, বই বিকিকিনি এবং লেখকদের সঙ্গে প্রকাশকদের চুক্তি স্বাক্ষর।

ওয়ে নদীর তীরে হংকং বইমেলা :ওয়েলসের ব্রেকনকশায়ার ডিস্ট্রিক্টের ছোট বাজার শহর হে-অন-ওয়ে; সেটারই ছোট নাম হলো ‘হে’। হে-কে বলা হয়ে থাকে বইয়ের শহর। আসলে এটা ওয়েলসের জাতীয় বইয়ের শহর। শহরটি ওয়ে নদীর দক্ষিণ-পূর্ব তীরে অবস্থিত। হংকং বইমেলা শুরু হয়েছিল ১৯৯০ সালে। প্রতি বছর মধ্য জুলাইয়ে এ মেলা শুরু হয়। হংকং কনভেনশন অ্যান্ড এক্সিবিশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত মেলার উদ্দেশ্য হংকংয়ের জনগণের জন্য কম দামে দেশি বা বিদেশি বই পৌঁছে দেওয়া। এ মেলা মূলত আন্তর্জাতিক বই ব্যবসাকে উৎসাহিত করে। দশ দিনব্যাপী চলা এ আসরে প্রায় আশি হাজার দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। হংকং বইমেলার প্রথম আসর বসে ১৯৯০ সালে। হংকংয়ে বছরের একটি প্রধান আকর্ষণে পরিণত হয়েছে এ বইমেলা। প্রতি বছর দর্শনার্থীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে।

ইতালির তুরিন আন্তর্জাতিক বইমেলা : মে মাসের মাঝামাঝি ইতালির তুরিনে অনুষ্ঠিত হয় তুরিন আন্তর্জাতিক বইমেলা। এটাই ইতালির সবচেয়ে বড় বইয়ের বাণিজ্য মেলা। এ বইমেলা শুরু হয় ১৯৮৮ সালে। সে বছরের ১৮ মে উদ্বোধন করা হয় মেলা। উদ্বোধন করেন নোবেলজয়ী রুশ কবি যোসেফ ব্রডস্কি। ব্যবসায়ী গিদো আকোনেরো এবং বই বিক্রেতা আনজেলো পেজানা বইমেলার নাম দেন মেলোন দেল লিব্রো। পরবর্তীতে নাম রাখা হয় তুরিন আন্তর্জাতিক বইমেলা। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে এযাবৎ বেশ কয়েকবার নাম বদল করা হয়েছে এ মেলার।

শিশু সাহিত্যের বইমেলা :ইতালির বোলোগনাতে প্রতি বছর মার্চ কিংবা এপ্রিলে চার দিনব্যাপী অনুষ্ঠিত হয় বোলোগনা শিশু সাহিত্যের বইমেলা। ১৯৬৩ সাল থেকে চলে আসছে এ মেলা। শিশুদের বইয়ের লেখক প্রকাশকসহ আরো অনেক পেশাদার লোকজনের আগমন ঘটে এ মেলায়। অনুবাদের জন্য এবং বই থেকে অন্য মাধ্যমের শিল্প তৈরির জন্য এখানে বইয়ের স্বত্ত্ব কেনাবেচা হয়।

চীনে সংহাই সাহিত্য উৎসব :চীনের সাংহাইতে অনুষ্ঠিত হয় সংহাই সাহিত্য উৎসব। স্বল্প পরিসরে হলেও আন্তর্জাতিক আবহে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এ উৎসব। যেমন নবীনতম বুকারজয়ী লেখক এলিনর ক্যাটন থেকে শুরু করে বেস্ট সেলিং এমি ট্যান পর্যন্ত ঘুরে গেছেন এ উৎসব।

জাপানে টোকিও আন্তর্জাতিক বইমেলা :পঁচিশটি দেশের প্রায় ষোল হাজার প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহনে ১৯৯৩ সাল থেকে জাপানে চলছে টোকিও আন্তর্জাতিক বইমেলা। টোকিওর বিগ সাইট কনভেন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে এ বইমেলা। বইয়ের বাণিজ্যিক কাটতি এবং প্রচার বাড়ানোই মূলত এ মেলার উদ্দেশ্য।

কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলা:এটি আরব বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বইমেলা। এর আয়োজক জেনারেল মিসরীয় বুক অর্গানাইজেশন। এ বইমেলাটি শুরু হয়েছে ১৯৬৯ সালে। কায়রোর ইন্টারন্যাশনাল ফেয়ার গ্রাউন্ডসে মেলাটি অনুষ্ঠিত হয়। মেলার অন্যতম উদ্দেশ্য শিশু সাহিত্যে আগ্রহী লেখক ও প্রকাশকদের ফোরাম তৈরি। প্রতি বছর এ মেলায় প্রায় ৩ লাখেরও বেশি দর্শনার্থী আসেন।

তেহরান আন্তর্জাতিক বইমেলা :তেহরানে বিগত চব্বিশ বছর ধরে আন্তর্জাতিক এ বইমেলার আয়োজন হয়ে আসছে। প্রতি বছর মে মাসের চার তারিখ থেকে চৌদ্দ তারিখ পর্যন্ত এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। লেখক-পাঠক আর গ্রন্থানুরাগীদের ভিড়ে বইমেলা অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণ। কয়েক মিলিয়ন ইরানি পাঠক বার্ষিক এ বইমেলায় এসে বই কেনাকাটা করেন। এ মেলা ইসলামের ইতিহাস, ইরান ও বিশ্বের ইতিহাস, শিল্প-সাহিত্যের ইতিহাস এবং পবিত্র প্রতিরক্ষা যুদ্ধ সংক্রান্ত বইয়ের জন্য বিখ্যাত।

আবুধাবি আন্তর্জাতিক বইমেলা:২০০৭ সালে আবুধাবির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য কর্তৃপক্ষ এবং ফ্রাঙ্কফুর্ট বইমেলা কর্তৃপক্ষ যৌথভাবে ‘কিতাব’ নামের একটি সংগঠন দাঁড় করায়। এ কিতাবই এখন আয়োজন করছে আবুধাবি বইমেলা। মার্চের ১৫ থেকে ২০ তারিখে এ মেলা শুরু হয়। মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় বইমেলা এটি। এছাড়াও পৃথিবীর নানা প্রান্তে আরো অনেক বইমেলার আয়োজন করা হয়ে থাকে। সেগুলোর মধ্যে স্কটল্যান্ডের উইগটন বইমেলা, যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের পিইএন ওয়ার্ল্ড ভয়েসেস ফেস্টিভ্যাল, যুক্তরাজ্যের ওয়ার্ডস বাই দ্য ওয়াটার ফেস্টিভ্যাল, সিডনি রাইটার্স ফেস্টিভ্ল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত