শিরোনাম

অভাব অনটন যেখানের নিত্যসঙ্গী

বেলাল হোসেন মিলন, বরগুনা  |  ১২:৪৪, জানুয়ারি ৩০, ২০১৯

রূপালী ইলিশের অন্যতম আবাসস্থল হিসেবে পরিচিত সাগর উপকুলীয় বরগুনা জেলার সদর, পাথরঘাটা ও তালতলী উপজেলা এখন অনেকটাই মৎস্যশুন্য। ভয়াবহ প্রতিকূল আবহাওয়ার, জলদস্যুতা, অপহরণ, মুক্তিপণ, এনজিও ও মহাজনী ঋণের বোঝা, চরম অভাব অনটন আর দরিদ্রতা জেলে পরিবারগুলোকে নিত্যসঙ্গী করে রেখেছে। চারিদিকে বিরাজমান আশা-নিরাশার প্রতিচ্ছবি। পেশা পরিবর্তনের দোলাচালে দূর্বিসহ জেলেজীবন। অভাবের কষাঘাতে জর্জরিত বরগুনা সদর, পাথরঘাটা ও তালতলী উপজেলার জেলেপল্লীগুলো।

মিলছেনা রূপালী ইলিশসহ অন্যান্য প্রজাতির মাছ
সাগর উপকুলীয় বরগুনা, তালতলী ও পাথরঘাটা সন্নিকটবর্তি পায়রা-বিষখালী-বলেশ্বরের মোহনায় ইলিশের ভরা মৌসুমে ধরা পড়েনা ইলিশ। ইলিশ ধরার নামে নির্বিঘ্নে চলে ঝাটকা নিধনের মহোৎসব। এছাড়াও গলদা-বাগদা পোনা শিকারের নামে ইলিশের রেণুসহ অসংখ্য সামুদ্রিক মাছের বিভিন্ন প্রজাতির পোনা ধ্বংস করা হয়। কারেন্ট জাল ব্যবহারের কারণে ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোন পোনামাছ নিস্তার পায়না পোনাশিকারীদের কবল থেকে। একটানা বছরের ছয়মাস অবাধে পোনা শিকারের ফলে ইলিশসহ নানাজাতের মৎস্য শুন্য হয়ে পড়েছে সাগর উপকুলীয় পায়রা-বিশখালী, বলেশ্বরসহ সাগরকেন্দ্রিক জলাশয়সমূহ। প্রতিনিয়ত পোনা শিকারের ফলে ইলিশের প্রজননক্ষেত্র হিসেবে খ্যাত সাগর উপকুলীয় বরগুনা, তালতলী ও পাথরঘাটা সন্নিকটবর্তি পায়রা-বিষখালী-বলেশ্বরের মোহনা। পোনা শিকারের ক্ষেত্রে মৎস্য অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর দায়িত্বশীল ভুমিকা সক্রিয় থাকলে মৎস্যসম্পদে সমৃদ্ধ বরগুনা-পাথরঘাটা-তালতলী অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পাশাপাশি এঅঞ্চলের জেলে পল্লীতে বসবাসরত প্রতিটি সদস্যের জীবনমানের চালচিত্র।

প্রতিকুল আবহাওয়ার ভয়াবহতা
বছরের ছয়মাসের বেশীরভাগ সময়েই বঙ্গোপসাগরে প্রতিকূল আবহাওয়া বিরাজ করে। ঝড়ো হাওয়া, জলোচ্ছাস, ঘূর্ণিঝড়, টনের্ডোসহ নানাবিধ দুর্যোগকালিন সাগর থাকে চরমভাবে উত্তাল। যথাসময়ে আবহাওয়া সংবাদ না জানার কারণে অসংখ্য ইঞ্জিনচালিত ফিশিংবোট দুর্যোগকবলিত হয়ে নিখোজ হয়। জেলেদের ঘটে সলিল সমাধি।
প্রতিকুল আবহাওয়ার ভয়াবহতা বিরাজকালিন বিকল্প কোন কর্মসংস্থান না থাকায় নিষ্কর্ম থাকে উপকুলীয় জেলেরা।

জলদস্যুতা, ডাকাতি, গণডাকাতি, অপহরণ ও মুক্তিপণ
সাগরে অপহরণ আর মুক্তিপণের ‘নাটক’ চলে প্রতিনিয়ত। চলে ডাকাতি, গণডাকাতি ও লুটপাট। গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে জলদস্যুদের কবলে পড়ে জেলেরা। জলদস্যুরা নির্বিঘ্নে চালায় ডাকাতি, গণডাকাতি ও লুটপাট। হরহামেশা মেরে ফেলে জেলেদের। জীবিত জেলেদের হাত-পা বেঁধে ফেলে দেয় গভীর সমুদ্রে। সর্বস্ব লুটপাট করেও খান্ত হয় না জলদস্যুরা। মোটা অংকের মুক্তিপণের দাবীতে অপহরণ করে জেলেদের নিয়ে যায় অজ্ঞাত স্থানে। বেদম মারধররত অবস্থায় মুঠোফোন ধরিয়ে দেয় জেলেদের স্বজনদের হাতে।

এদের কবল থেকে মুক্তির জন্য জনপ্রতি পাঁচ থেকে দশ লক্ষ টাকা। দাবীকৃত টাকা চব্বিশ ঘন্টার সময়সীমা দিয়ে হত্যার হুমকি প্রদান করে। গহীন সুন্দরবনের অজ্ঞাত আখড়ায় আটককৃত জেলেরা নির্মম নির্যাতন ভোগ করে মুক্তিপণের চাহিদা পূরণ করে কোনমতে জীবন নিয়ে লোকালয়ে ফিরে আসেন। প্রতিবছর সুন্দবরবনে আস্তানা গড়া বিভিন্ন জলদস্যু বাহিনী অর্ধশত জেলের নিকট থেকে মুক্তিপণ আদায় করে থাকে।

দাদন আর এনজিও’র ঋণের জালে বন্দি জেলেরা
বঙ্গোপসাগর-বিষখালী-বলেশ্বর আর পায়রার মোহনা-সুন্দরবন তীরবর্তী বরগুনা সদর, তালতলী ও পাথরঘাটার জেলেদের জীবন-জীবিকা মহাজনের দাদন আর এনজিও’র ঋণের জালে বন্দি হয়ে পড়েছে। মাছ ধরতে নদীতে নামার প্রস্ততিকালেই মহাজন-আড়তদারদের দাদনে ঋণী হয় জেলেরা। মাছ বিক্রির টাকা দিয়ে সে দাদন পরিশোধ করে সংসার চালানোর অবস্থায় থাকে না তারা। ফলে জীবনজীবিকার দায়ে বার বার নানা এনজিও’র কাছ থেকে ঋণ নিতে বাধ্য হয় জেলেরা।

উপকুলীয় এলাকার জেলে সম্প্রদায়ের মধ্যে সিংহভাগ হতদরিদ্র। শুধুমাত্র মাছের উপর নির্ভর করেই চলেনা পরিবারের সকল সদস্যের ভরণপোষন। মাছধরার সামগ্রী ক্রয়, মুক্তিপণ পরিশোধ, অসুখবিসুখের চিকিৎসা, পরিবারের ছোটবড় অনুষ্ঠানাদি ইত্যাদি সম্পন্ন করতে ঋণ নিতে হয় স্থানীয় বা জাতীয় একাধিক এনজিও থেকে। এসকল এনজিওর সাপ্তাহিক কিস্তির টাকা জোগার করতে পেরেশানীতে থাকতে হয় গোটা সপ্তাহজুড়ে। এছাড়াও গ্রহণ করতে হয় স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে বড় অংকের ঋণ। সাগর থেকে আহরিত মাছ প্রথমেই মহাজনের আড়তে বাধ্যতামূলক মাছ বিক্রি করতে হয় গৃহীত ঋণের বিপরীতে। সেখানে মূল্য থাকে নামেমাত্র।

বরগুনা সদর উপজেলার পায়রা-বিশখালী নদী তীরবর্তী সোনাতলা গ্রামের জেলে পঞ্চার্শোধ সোলায়মান বেপারী ক্ষোভের সাথে জানান, ‘সারাজীবন জল, জাল, মাছ ও ট্রলার নিয়াই কাটাইলাম। পিছনের দেনা পরিশোধ করার জন্য ঋণ-ধার কর্জ করে সাগরে নামি। সপ্তাহখানেক গাধার মত খাইট্টা-খুইট্টা অনেক সময় খালি হাতেই ফিরতে হয়। মহাজনের চাপ ও এনজিওগুলোর কিস্তি পরিশোধে ব্যর্থ হয়ে পালাইয়া বেড়াইতেছি।’

বরগুনার তালতলী উপজেলার নিশানবাড়িয়া ইউনিয়নের বঙ্গোপসাগর তীরবর্তী তেঁতুলবাড়িয়া গ্রামের মোসলেম ফকির (৬০) জানান, ‘মুক্তিপণ পরিশোধ করতে সব খুইয়ে মাছধার ইস্তফা দিয়াছি। স্থানীয় এনজিও হইতে ঋণ নিয়া জলদস্যুদের হাত হইতে ছাড়িয়ে আনছেন পরিবারের লোকজন। সেই ঋণের টাকা শোধ করিতে পারি নাই। এখনও দেড় লাখ টাকা দেনা। কিস্তি দিতে না পারায় মামলা করে বৃদ্ধ বাপ-মাকে জেলও খাটাইছে ওই এনজিও।’

পাথরঘাটা সদর ইউনিয়নের গহরপুর গ্রামের ইউপি সদস্য শাহ আলম খান বলেন, ‘ বেশীরভাগ সময়েই মাছ না পেয়ে অনেকটা মানবেতর জীবন-যাপন করে জেলে পরিবারগুলো। ঠিকমত খাবার জোটে না, স্কুল পড়ুয়া সন্তানদের লেখাপড়া করাতে পারে না। বেঁচে থাকার জন্য তাই এনজিও’র ঋণ ছাড়া কোনো উপায় নেই তাদের। এ ঋণ পরিশোধে বাধ্য হয়ে অনেক সময় ঘরের আসবাবপত্র, টিন ও চাল পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়। যারা তাও পারে না, জেলে যায় বা কিস্তি শোধের সময় এলে পালিয়ে যায়’।

মহাজনদের দাদন এনজিওগুলোর ঋণের বোঝা বহন অসম্ভব বলে জানিয়েছেন বরগুনা সদর, পাথরঘাটা ও তালতলী এলাকার জেলে ও মৎস্য ব্যবসায়ী আলী আকাব্বার মুন্সী (৫৫), মোতাহার মৃধা (৪৫), খলিল হাওলাদার (৩০) লোকমান ফকির (৪৮), আলমগীর হোসেন (৪৪)।

চরম অভাব অনটন আর দরিদ্রতা
প্রতিকুল আবহাওয়া, জলদস্যু-ডাকাতদের হিংস্রতাসহ নানাবিধ উৎপাতে বছরের বেশীরভাগ সময়েই ইঞ্জিরচালিত ট্রলার নিয়ে সাগরে যেতে পারে না সাগর উপকুলীয় বরগুনা, পাথরঘাটা ও তালতলীর জেলেরা। নানাবিধ প্রতিকুলতায় জেলেদের পরিবারে দেখা দেয় আকাল ও চরম দুর্ভোগ। খেয়ে না খেয়ে জীবন কাটে জেলে পল্লীর অসংখ্য সদস্যের। বর্ষায় ভিজে, প্রখর রোদে শুষ্ককাষ্ঠ হয় শরীর।

প্রচন্ড শীতে জোটে না একখন্ড শীতবস্ত্র। চারিদিকে নিরাপদ পানির তীব্র সংকট। প্রায়শঃ প্রাদুর্ভাব দেখা দেয় ডায়রিয়া, আমাশয়সহ নানাবিধ পেটের পীড়াজনিত রোগ। চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত জেলেপাড়ার নারী-শিশুসহ অধিকাংশ মানুষ। জেলেপল্লীর যেকোন রোগীর জন্যই স্থানীয় কমিউনিটি ক্লিনিক ‘সর্বোচ্চ’ চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র। জেলেপল্লী সংলগ্ন কোন মাধ্যমিক বা ততোর্ধ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান না থাকায় ৯৫ ভাগ শিশু প্রাথমিক স্তর পেরুতে পারেনা বললেই চলে। সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ফিরে আসেনা অধিকাংশ জেলে। প্রবল প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ডাকাত, জলদস্যুদের নির্মম তান্ডব প্রতিবছর কেড়ে নেয় অসংখ্য প্রাণ। জেলেপল্লীর অধিকাংশ গৃহিনীই বিধবা। সংসারে আয় উপর্জনক্ষম কোন পুরুষ না থাকায় অনেক পরিবারই মানবেতর জীবনযাপন করে। জেলে পরিবারগুলোর মানোন্নয়নের জন্য মাঝে মধ্যে সরকারি সহায়তা বরাদ্ধ থাকলেও জেলে জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে বঞ্চিত হয় প্রকৃত জেলে পরিবার ও মৎসজীবিরা।

ইতিকথা
জীবনের চরম ঝুঁকি নিয়ে, ঝড়-তুফান ও বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করে সাগরের মাছ ধরে দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের আমিষ জোগান দেয়, সেই জেলে দিনাতিপাত করেন কিভাবে, কতশত প্রতিক‍ূলতা প্রতিনিয়ত তাদেরকে হানা দেয়, খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-চিকিৎসা-শিক্ষা-নিরাপত্তা ইত্যাদি বিষয়ে আমাদের নীতিনির্ধারকগণ গভীরভাবে যে উপলব্দি করেন তা প্রতীয়মান নয়। গত কয়েক দশকে বাংলাদেশে মাছের উৎপাদন ৪৫গুণ বাড়লেও জেলেদের জীবনমানের কোনো উন্নতি হয়নি। সামগ্রিকভাবে সাগর পাড়ের জেলেরা নানা বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার। অনেকের স্থায়ী ঘরবাড়িও নেই। কোনোভাবে অন্যের জায়গায় মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নেন। উপকূলীয় জেলেদের জীবনমান উন্নয়নের বিষয়টি দেখতে হবে সামগ্রিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের নিরিখে।

সমুদ্রগামী জেলেরা প্রতিনিয়তই নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। ডাকাত বা জলদস্যুদের আক্রমণের শিকার হয়ে নৌকা, জালসহ সহায়-সম্পদ হারান। অনেক ক্ষেত্রে জীবনহানির ঘটনাও ঘটে।
বাংলাদেশের সাগর উপকুলীয় এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্ব কোস্টগার্ড থাকলেও ডাকাত বা জলদস্যুদের তান্ডব থামছেনা। সাগর বা তীরবর্তী নদ-নদীর প্রাকৃতিক কারণে বছরের প্রায় ছয়মাস সময় বেকার থাকতে হয়। এসময়ে তাঁদের হাতে সঞ্চয় বলে কিছু থাকে না। ফলে মহাজনদের কাছ থেকে উচ্চ সুদে ঋণ নিয়ে তাঁদের জীবনকীবিকা নির্বাহ হয়। মহাজনের ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে পানির দামে মাছ আগাম বিক্রি করে দেন।

সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকায় মাছ শিকার করতে গেলে জেলেদের আরেক ঝামেলায় জড়াতে হয়। সেখানে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেদের নিকট থেকে বনবিভাগের সংশ্লিষ্ট রক্ষীরা ‘উপরি’ কামাই করে থাকে। এমনো শোনা যায় যে, যে পরিমান ‘উপরি’ দেয়া লাগে সে পরিমান মাছও বেশীরভাগ সময়ই আহরণ করা যায়না।

মৎস্যজীবীদের জীবনমান উন্নয়নে খাদ্য সহায়তার পাশাপশি আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়নে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিয়ে মহাজনদের ঋণচক্র থেকে মুক্তি, বিকল্প কর্মসংস্থান, প্রয়োজনীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, চিকিৎসাসেবা কেন্দ্র, উপকুল বিষয়ক মন্ত্রণালয় স্থাপনসহ স্বাভাবিক জীবনযাপনে সরকারে দৃষ্টি দেয়া একান্ত জরুরী।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত