শিরোনাম

রহস্যঘেরা মহানায়িকা

প্রিন্ট সংস্করণ॥  |  ০১:৪১, জানুয়ারি ১৯, ২০১৯

কিংবদন্তি নায়িকা চলে গিয়েছেন পৃথিবী ছেড়ে। কিন্তু আজও বাঙালির মনে চির অমলিন সেই হাসি। তাঁর সম্পর্কে আজও মানুষের নানা কৌতূহল। আজও যখন বিকিনিতে ট্রোলড হন নায়িকারা, তখন সেই আমলে শুধু তোয়ালেতে সমুদ্রের ধারে ক্যামেরায় পোজ দিয়েছেন । বাড়ির সকলে কৃষ্ণা বলে ডাকতেন, স্কুলে ভর্তির সময় তার নাম দেওয়া হয় রমা। রমা নাম করলেন সিনেমায়, হয়ে উঠলেন সুচিত্রা। তাঁর বোন উমাদেবী একদিন তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, ‘তুই সিনেমায় নামলি, অভিনয়ের কী জানিস?’ সুচিত্রা বলেছিলেন, ‘না দিদি, টাকা খুব দরকার, সিনেমা করতেই হবে। চেষ্টা করে দেখি, কতটা পারি। গ্ল্যামার কুইন, এককালের মহানায়িকা, দর্শকদের হৃদয়ের রানি, সুঅভিনেত্রী সুচিত্রা সেনের ১৭ জানুয়ারি ছিল তার প্রয়াত হওয়ার ৫ম বার্ষিকী। এবার তার অজানা রহস্যঘেরা জীবন নিয়ে লিখেছেন-জিয়া উল ইসলাম

সাধারণ একজন নারী। তাঁর সম্পর্কে আজও মানুষের নানা কৌতূহল । আজও বাঙালির মনে চির অমলিন সেই হাসি। তিনি কিংবদন্তি চলে গিয়েছেন পৃথিবী ছেড়ে। আসলে সে কে? তাকে ঘিরে কেন এত রহস্য ? এ প্রশ্নের জবাব হতে পারে অনেক। সুচিত্রা সেন চিত্রজগতে আসেন ’৪৭-উত্তর পরিবেশে মহাযুদ্ধ ও উপমহাদেশ বিভক্তির ধ্বংস ও উত্তেজনার পর। দর্শকেরা তাঁর মধ্যে একটি নতুন রূপ প্রত্যক্ষ করে। সেটি ছিল সৌন্দর্য ও প্রেমের চিরায়ত বাঙালিয়ানার প্রতীক। সুচিত্রার অভিনয়, লাবণ্য, শাড়ি পরার ধরন, চুল বাঁধা, অমলিন হাসি, হাঁটাচলা, ঘাড় বাঁকিয়ে তাকানো ভক্তহূদয়কে গভীরভাবে স্পর্শ করে। তারা উন্মুখ হয়ে তাঁর নিখুঁত মুখশ্রীর সৌন্দর্য পান করতেন। সুচিত্রার ছবির পরিচালকেরাও এর ব্যবহার করেছেন সর্বোচ্চ। সুচিত্রার চলচ্চিত্র মানেই ক্লোজআপের পর ক্লোজআপ। সেকালে পেছনে ব্যাকলাইট জ্বালানো ও লেন্সে নেট-লাগানো সেই ক্লোজআপে সুচিত্রার চেহারা হয়ে উঠত অপার্থিব।সুচিত্রার জনপ্রিয়তার উল্লেখযোগ্য অংশ নিশ্চিতভাবে এসেছে উত্তম কুমারের সঙ্গে তাঁদের জুটির অসামান্য সাফল্য থেকে। পর্দায় তাঁদের ঠোঁটে গান গাওয়া হেমন্ত মুখোপাধ্যায় ও সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ও তাঁদের সাফল্যে কম অবদান রাখেননি। সময়ও একটা বড় নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে সুচিত্রা সেনের মহানায়িকা হওয়ার পেছনে। ১৯৫০ ও ১৯৬০-এ দশক ছিল বিশ্বব্যাপী সৃজনশীলতার বছর। এর প্রভাব পড়ে বাংলাতেও। সুচিত্রা ছিলেন এই দুই দশকেরই ‘স্বপ্নের দেবী’ পর্দালোকের। তিনি চিত্রজগৎ ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন একেবারে যথাযথ সময়ে। এ ব্যাপারে অভিনেত্রী মাধবী মুখোপাধ্যায়ের মন্তব্যটি স্মরণযোগ্য। মাধবী বলেছেন, উনি (সুচিত্রা) জানতেন কখন থামতে হয়। আমরা অনেকে তা পারিনি। আসলে এই থেমে যাওয়াটাও জীবন ও শিল্পের অনুষঙ্গ। থামতে না জানলে পচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।’ এই অপ্রাপ্যতা ও দূরত্ব সুচিত্রার ওপর ফেলেছিল অতিরিক্ত রহস্যের আভা। সুচিত্রা সেনের ছিল অসম্ভব ব্যক্তিত্ব। সবার সঙ্গে মিশতেন না। রুচি ও আত্মমর্যাদাবোধ ছিল প্রখর। সত্যজিৎ রায়কে দেবী চৌধুরাণী ছবির জন্য দীর্ঘ ও একান্ত শিডিউল দেননি। গুলজারকেও একটি ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন বয়সের কথা ভেবে। তিনি সবচেয়ে বিরক্ত হয়েছিলেন ডাকসাঁইটে নির্মাতা-অভিনেতা রাজকাপুরের আচরণে। রাজকাপুর তাঁর কাছে ছবিতে অভিনয়ের প্রস্তাব নিয়ে এসে গোলাপ ফুলের তোড়া রেখে সুচিত্রার পায়ের কাছে বসে পড়েন। সুচিত্রা বিরক্ত হয়ে তাঁর ছবির প্রস্তাব ফিরিয়ে দেন।

সুচিত্রার দশ কথা
১। আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার জয়ী প্রথম বাঙালি অভিনেত্রী ছিলেন সুচিত্রা সেন। ১৯৬৩ সালে মস্কো চলচ্চিত্র উৎসবে ‘সাত পাকে বাঁধা’ ছবির জন্য এই স্বীকৃতি পান তিনি।
২। বলিউডে শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘দেবদাস’ অবলম্বনে বেশ কয়েকটি কাজ হয়েছে। এগুলোতে পাবর্তী বা পারুল চরিত্রে অভিনয় করেছেন অনেকে। তবে হিন্দি ছবিতে প্রথম এ চরিত্রে দেখা গেছে সুচিত্রা সেনকে।
৩। বলিউডে ‘দেবদাস’ই ছিলো সুচিত্রা সেনের প্রথম ছবি। এ ছবিতে পার্বতী চরিত্রে স্মরণীয় অভিনয়ের জন্য সেরা অভিনেত্রীর পুরস্কার পান সুচিত্রা সেন।
৪। সুচিত্রা সেনের ‘আন্ধি’ গুজরাটে মুক্তির পর ২০ সপ্তাহ নিষিদ্ধ ছিলো। কারণ তিনি যে চরিত্রে অভিনয় করেছেন তা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর ছায়া থাকার কারণে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ১৯৭৭ সালে জনতা পার্টি ক্ষমতাসীন হওয়ার পর গুজরাটের সরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে প্রচারিত হয় ছবিটি।
৫। চলচ্চিত্র থেকে সরে দাঁড়ানোর পর স্বেচ্ছায় অন্তরালে চলে যান সুচিত্রা সেন। এরপর থেকে বেশিরভাগ সময় রামকৃষ্ণ মিশনে কেটেছে তার। নির্জন ও নিভৃত জীবনযাপন করায় হলিউড কিংবদন্তি গ্রেটা গার্বোর ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার মিল খুঁজেছেন অনেকে।
৬। উত্তম কুমারের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের জুটি বাংলা ছবির ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। ১৯৫৩ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ ছবিতে প্রথমবার একফ্রেমে দেখা যায় তাদেরকে। তারা একসঙ্গে প্রায় ৩০টি ছবিতে অভিনয় করেন।
৭। সময় ফাঁকা না থাকার কারণে সত্যজিৎ রায়ের ‘চৌধুরানী’ ছবিতে কাজ করতে অপরাগতা প্রকাশ করেন সুচিত্রা সেন। এ কারণে অস্কারজয়ী পরিচালক সত্যজিৎ ছবিটি আর বানাননি।
৮। ‘উত্তর ফালগুনী’ ছবিতে যৌনকর্মী পান্নাবাই ও তার কন্যা আইনজীবী সুপর্ণার দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেন সুচিত্রা সেন।
৯। সুচিত্রা সেনই একমাত্র ভারতীয় অভিনয়শিল্পী যিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার গ্রহণে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। পুরস্কারটি পাওয়ার নিয়ম অনুযায়ী নয়াদিল্লিতে যেতে হতো তাকে। কিন্তু তিনি জনসমক্ষে আসতে চাননি।
১০। ১৯৫২ সালে নির্মিত সুচিত্রা সেনের প্রথম বাংলা ছবি ‘শেষ কোথায়’ কখনও মুক্তি পায়নি।

রহস্যই থেকে গেলো উত্তম-সুচিত্রার প্রেম
১৯৫৩ সালে মুক্তি পেয়েছিলো উত্তম-সুচিত্রা জুটির প্রথম ছবি ‘সাড়ে চুয়াত্তর’। প্রথম ছবিতেই হিট উত্তম সুচিত্রা জুটি। একের পর এক ছবি করার সুবাদে উত্তম-সুচিত্রার সখ্যতা বাড়লো। কিন্তু তাদের এই সখ্যতা কাল হয়ে উঠলো সুচিত্রার স্বামী দিবানাথ সেনের কাছে। আর তা আঁচ করতে পেরে ১৯৫৪ সালেই দীবানাথ সুচিত্রাকে চাপ দিলেন অভিনয় ছেড়ে দিতে। কিন্তু স্বামীর বৈরি মনোভাবের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেই উত্তমের সঙ্গে অভিনয় করে গেলেন সুচিত্রা সেন। আর হ্যা, স্বামী দীবানাথের মতো ঐ একই বছর উত্তম সুচিত্রার ভক্তরাও ভাবতে লাগলো বাস্তবেই উত্তম সুচিত্রা প্রেমিক যুগল। কারণ ঐ একই বছর মুক্তি পায় তাদের অভিনীত ৬টি ছবি। জীবন ঘনিষ্ঠ অভিনয়ই ভক্তদের ভাবতে সহায়তা করেছিল উত্তম সুচিত্রার প্রেমের গুঞ্জনের খবর। এই খবরের পিছনে সুচিত্রার ভূমিকাও কম ছিলো না।ওই বছরেই মুক্তি পাওয়া ‘অগ্নি পরীক্ষা’ ছবির পোস্টারে সুচিত্রার স্বাক্ষরসহ লেখা ছিলো ‘আমাদের প্রণয়ের স্বাক্ষী হলো অগ্নি পরীক্ষা’। পোস্টারের এই লেখা দেখে অজোরে কেঁদেছিলেন উত্তম কুমারের স্ত্রী গৌরী দেবী। যার প্রভাব পড়ে সুচিত্রার দাম্পত্য জীবনেও। সুচিত্রা সেনের বালিগঞ্জের বাসায় এক বিশাল পার্টির আয়োজন করা হয়। পার্টিতে উত্তম কুমারের প্রিয় ব্যান্ড ব্ল্যাক ডগ’ হুইস্কিও ছিলো। উত্তমের স্ত্রী, সুচিত্রার স্বামীসহ প্রযোজকরাও ছিলেন সেই পার্টিতে। হঠাৎ মধ্যরাতে সবার অনুরোধে নাচতে হলো উত্তম সুচিত্রাকে। উত্তম কুমার সুচিত্রার কোমরে হাত দিয়ে খুব ঘনিষ্ঠ হয়ে নাচছিলেন। আর এ দৃশ্য দেখে সইতে পারেন নি সুচিত্রার স্বামী দিবানাথ। ছুরি হাতে ছুটে গেলেন উত্তম কুমারের দিকে। পার্টি লন্ডভন্ড হয়ে গেল। প্রাণ বাঁচানোর জন্য এদিক ওদিক ছুটলেন উত্তম কুমার। কিন্তু ধরা পড়ে গেলেন দীবানাথের হাতে। উত্তম হাতজোড় করে প্রাণ ভিক্ষা চাইছিলেন দিবানাথের কাছে। আর দিবানাথ বলছিলো, ‘উত্তম আই উইল কিল ইউ। শেষে দিবানাথকে থামান উত্তমে স্ত্রী দেবী। ছাড়া পেয়েই উত্তম কুমার দৌড়ে পালালেন। একেবারে ২ কি.মি. দৌড়ে নিজের বাড়িতে গিয়ে সেদিন থেমেছিলেন উত্তম। এ ঘটনার কিছুদিন পরে সুচিত্রা স্বামী, শ্বশুরের বাড়ি ছেড়ে উঠেন নিজের ভাড়া বাসায়। আর এরপর থেকে দাম্পত্য কলহে জড়িয়ে পড়েন উত্তমও। জানা যায়, সুচিত্রাকে সবাই মিসেস সেন বলে ডাকলেও উত্তম সুচিত্রাকে তার আসল নাম ‘রমা’ বলেই ডাকত। আর সুচিত্রা উত্তমকে ডাকতো ‘উতো’ বলে। সুচিত্রা উত্তমের প্রেমের গুঞ্জনের কারণেই মদ্যপানে আসক্ত হয়ে পড়েছিলেন সুচিত্রার স্বামী দিবানাথ সেন। আর প্রচুর মদ্যপানের ফলেই মৃত্যু হয়েছিলো দিবানাথের। এতসব ঘটনার জন্ম যাদের প্রেমকে ঘিরে তাদের বিয়ে কি সত্যিই হয়েছিলো। হয় তো অনেকেই বলবেন মৃত্যুর আগে অসুস্থ সুচিত্রা উত্তমের কেবিনেই চিকিৎসা নিয়েছিলেন। সেটা তাদের প্রেমের গভীরতা প্রমাণ করলেও তাদের বিয়ে হয়েছিলো কি না তা আজো রহস্যই রয়ে গেছে।

‘আজ থেকে আপনার নাম সুচিত্রা সেন’
পরিসংখ্যান বলে তাঁর শেষ ছবি দত্তা। অজয় কর পরিচালিত এই ছবিতে তাঁর বিপরীতে ছিলেন সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। সালটা ১৯৭৮। এরপর থেকে তাঁকে আর কোনও ছবিতে অভিনয় করতে দেখা যায়নি। নিজের উপরে চাপিয়ে দিয়েছিলেন এক শক্তপোক্ত আস্তরণ। চলচ্চিত্রজগতের কোনও খবরই তাঁকে আর স্পর্শ করতে পারেনি। ধীরে ধীরে সকলের অগোচরে চলে গিয়েছিলেন তিনি। মহানায়িকার ডাকনাম ছিল কৃষ্ণা। তারপর কখন যে তিনি রমা সেন থেকে আবার সুচিত্রা সেন হয়ে গেলেন তা নিয়ে মাথা ব্যথা নেই কারোরই। সবার উপরে আসলে তিনি মহানায়িকা। তবে, বিভিন্ন সময়ে তাঁকে নিয়ে প্রকাশিত নানা লেখায় পাওয়া যায়, তাঁকে সাত নম্বর কয়েদী ছবিতে নায়িকার ভূমিকায় প্রথম অভিনয় করার সুযোগ দেন পরিচালক সুকুমার দাশগুপ্ত। ছবির সহ পরিচালক নীতীশ রায় তাঁর নাম দেন সুচিত্রা। হঠাতই একদিন স্টুডিওর সেটে সকলের সামনে তাঁকে বলা হয়, “আজ থেকে আপনার নাম হল সুচিত্রা সেন।” পরিচালক দেবকী কুমার বসুর শ্রী কৃষ্ণ চৈতন্য ছবিতে অভিনয়ের পরই তাঁকে আর পিছন ফিরে তাকাতে হয়নি। স্বামী দিবানাথ সেনের অনুপ্রেরণায় কিংবা বলা ভালো, তাঁর হাত ধরেই তাঁর অভিনয়জগতে আসা। একের পর এক বাংলা ও হিন্দি ছবিতে অভিনয় করেছেন বিভিন্ন পরিচালক এবং অভিনেতার সঙ্গে। সুচিত্রা সেন মানুষ হিসেবে কেমন ছিলেন, তাঁর অভিনয়ক্ষমতা কেমন ছিল, তিনি কী ভালোবাসতেন আর বাসতেন না সেসব নিয়ে বিশিষ্টদের মধ্যে কেউই বয়ান দিতে তেমন ইচ্ছাপ্রকাশ করেননি। কারণ অবশ্য অজানা। সামান্য স্মৃতিচারণায় মুখর হলেন দেবী চৌধুরানী ছবিতে মহানায়িকার সঙ্গে অভিনয় করা রঞ্জিত মল্লিক। তিনি বলেন, “সুচিত্রা সেনের দাপুটে অভিনয়ের কথা বাঙালি ভুলবেন না কোনওদিন। আমি ঠিক একটি ছবিতেই ওঁর সঙ্গে অভিনয় করার সুযোগ পেয়েছি, যেটা রিলিজ করেছে। তাঁর সঙ্গে আরও একটি ছবিতে কাজ করছিলাম আমি। কিন্তু সেটা মাঝপথে বন্ধ হয়ে যায়। ছবিটির নাম চতুরঙ্গ। পূর্ণেন্দু পত্রী শুরুও করেছিলেন ছবির কাজ। কিন্তু তাঁর আকষ্মিক প্রয়াণে বন্ধ হয় ছবির শুটিং। একবার শুনেছিলাম মহানায়িকা মনেপ্রাণে চেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের চতুরঙ্গ অবলম্বনে তৈরি হোক ব্যতিক্রমী ছবি। কিন্তু তাঁর সেই আশা পূরণ হয়নি। আমার সঙ্গে তাঁর খুব কম সময়ই সাক্ষাৎ হয়েছে। অপরিচিতদের সঙ্গে একটু দূরত্ব বজায় রেখে চলতেন। কিন্তু কাছের মানুষদের সঙ্গে ততটাই খোলামেলা থাকতেন যতটা একজন সাধারণ মানুষ থাকেন। বাইরে থেকে ওঁকে গুরুগম্ভীর মনে হত। কিন্তু কাছ থেকে দেখার পর বুঝেছি মানুষটা কতখানি মনখোলা। হাসি-ঠাট্টা, রসিকতা সবই করতে দেখেছি ওঁকে। সাংঘাতিক ডেডিকেটেড ছিলেন যে কোনও কাজের ব্যাপারে। সবরকম পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারতেন।

ক্যারিয়ারে গড়তে সইতে হয়েছে অনেক অপমান
নবদ্বীপ হালদার নিঃসন্দেহে ভালো অভিনেতা ওনার ট্রেডমার্ক কন্ঠ আজও বাংলাছবিতে চিরভাস্বর। কৌতুক শিল্পী হিসেবেই জনপ্রিয় নবদ্বীপ হালদার। কিন্তু উনি নিজেকে বিশাল কিছু মনে করতেন এবং অত্যন্ত অহংকারী ছিলেন নবদ্বীপ হালদার। ১৯৫০-৫১ সালের কথা। সুচিত্রা সেনকে যে কি সংগ্রাম করতে হয়েছে তার একটি নমুনা এই ঘটনা। তখন ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে। একজন শিল্পপতির পুত্রবধূ তবু স্বামীর ব্যবসা ডাউন হওয়ায় আর চেহারায় অপরুপ লাবন্য থাকায় (সুচিত্রার স্বামী দিবানাথ সেন চাইতেন সুন্দরী বউ সিনেমায় নেমে তাঁর মুখোজ্জ্বল করুক যদিও পরে বউ নাম করলে তাঁর পুরষত্বে লাগে আর অশান্তি) ছবির জগতে এসেছেন সুচিত্রা। কিন্তু তখন তিনি প্রতিষ্ঠিত নায়িকা নন। এক গ্রীষ্মের দুপুরের দাবদাহে ঘমার্ক্ত অবস্থায় সুচিত্রা কাজের দরকারে প্রেমেন্দ্র মিত্রের কাছে যান কিন্তু প্রেমেন্দ্র মিত্রের বাড়ি গিয়ে শোনেন প্রেমেন্দ্র বাবু নবদ্বীপ হালদারের বাড়ি গেছেন। ওখানেই তাকে পাওয়া যাবে। কাজের তাগিদে এক গৃহবধূ সেদিন স্বামী সংসার বাঁচাতে ছুটে যান ফের নবদ্বীপ হালদারের বাড়ি ঐ গ্রীষ্মের দুপুরে। সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র ১৯৫৩ সালে ‘ময়লা কাগজ’ ছবিটি পরিচালনার পরিকল্পনা করেছিলেন। ঐ সময় প্রেমেন মিত্তির ও ধীরাজ ভট্টাচার্য-র সঙ্গে নবদ্বীপ হালদারের খুবই হৃদ্যতা ছিল। নবদ্বীপ হালদার-র বাড়িতে এক আড্ডায় সুশীল চক্রবর্তীও ছিলেন। এক সময় কাজের লোক এসে খবর দিল এক ভদ্রমহিলা প্রেমেন বাবুকে খুঁজছেন।কথাটা শুনে নবদ্বীপ বলে উঠলেন- প্রেমেন তুমি কি দুনিয়ার মেয়েকে আমার বাড়ির ঠিকানা দিয়ে এসেছো যে, এখানেও তোমাকে খুঁজতে আসছে? এই সুশীল দেখ তো কে এসেছে। তেমন বুঝলে হটিয়ে দিবি। সুশীল বাবু এসে দেখলেন সুচিত্রা সেনকে। কয়েকটি ছবির সুবাদে সুচিত্রা সেনের মুখটি তখন মোটামুটি পরিচিত। কিন্তু শুরুর দিক তখন সুচিত্রার। সুশীল বাবুকে দেখে সুচিত্রা সেন বললেন- ‘এখানে প্রেমেনবাবু আছেন?’ সুশীল বাবু বললেন- হ্যাঁ আছেন। কিন্তু তিনি তো এখন ব্যস্ত। সুচিত্রা সেন বললেন- ‘আমি ওনার বাড়িতে গিয়েছিলাম। সেখানে শুনলাম উনি এখানে এসেছেন। ওনার সঙ্গে আমার একটু দেখা করা দরকার।’কথাটা শুনে সুশীল চক্রবর্তী বললেন- ‘আপনি একটু বসুন। আমি ভেতরে গিয়ে খবর দিচ্ছি।’ সুশীল বাবু ভেতরে এসে খবরটা দিতেই নবদ্বীপ হালদার বলে উঠলেন- নিশ্চয়ই পার্ট চাইতে এসেছে। তুই গিয়ে বলে দেগা, আমাদের সব পার্ট দেয়া হয়ে গেছে। আপনি যেতে পারেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র বললেন- ‘না না অত কড়া কথা বলার দরকার নেই। তুমি বরং গিয়ে বলগে উনি যেন পরে আমার বাড়িতে দেখা করেন। আজ আমি ব্যস্ত। এখন দেখা করা যাবে না।’ব্যস্ত মানে নিছক আড্ডা দিচ্ছেন। সুশীল বাবু বাইরের ঘরে গিয়ে সংবাদটি দিলেন। শুনে সুচিত্রা সেনের মুখটা কেমন মলিন হয়ে গেল। ব্যাগ থেকে রুমালটা বের করে কপালের ঘাম মুছে নিলেন। তারপর ধীর পদক্ষেপে বেরিয়ে েেগলেন নবদ্বীপ হালদারের বাড়ি থেকে।’ ‘কি ক্ষমাহীন ধৃষ্টতা। হয়ত এটাই সমাজের নিয়ম। মানুষকে একটা জায়গায় পৌঁছানোর আগে সীমাহীন অপমান সইতে হয়। সুচিত্রা সেনের মতো শত বছরের অতুলনীয় অভিনয় শিল্পীকেও অভিনয় জগতে প্রবেশের জন্য এমনি অপমান সইতে হয়েছে। বদ্বীপ হালদার এর ব্যবহার কাজের মাধ্যমে জবাবটা দিয়েছিলেন সুচিত্রা সেন। ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ই তো নবদ্বীপ হালদার পরিচারক মেস বাড়ির সুচিত্রা নায়িকা।

সাধারণ জীবন
সুচিত্রা সেন ১৯৩১ সালের ৬ এপ্রিল বাংলাদেশে পাবনা জেলার জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা করুণাময় দাশগুপ্ত ছিলেন এক স্থানীয় বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও মা ইন্দিরা দেবী ছিলেন গৃহবধূ। তিনি ছিলেন পরিবারের পঞ্চম সন্তান ও তৃতীয় কন্যা। পাবনা শহরেই তিনি পড়াশোনা করেন তিনি। ১৯৪৭ সালে বিশিষ্ট শিল্পপতি আদিনাথ সেনের পুত্র দিবানাথ সেনের সঙ্গে সুচিত্রা সেনের বিয়ে হয়। ১৯৭৮ সালে সুদীর্ঘ ২৫ বছর অভিনয়ের পর তিনি চলচ্চিত্র থেকে অবসরঘ্রহণ করেন। এর পর তিনি লোকচক্ষু থেকে আত্মগোপন করেন। ২০০৫ সালে দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারের জন্য সুচিত্রা সেন মনোনীত হন, কিন্তু ভারতের প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে সশরীরে পুরস্কার নিতে দিল্লি যাওয়ায় আপত্তি জানানোর কারণে তাকে পুরস্কার দেওয়া হয়নি। ২০১৪ সালের ১৭ জানুয়ারি কলকাতার বেল ভিউ হাসপাতালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ৮২ বছর বয়সে সুচিত্রা সেনের মৃত্যু হয়।তার একমাত্র কন্যা মুনমুন সেনও একজন খ্যাতনামা অভিনেত্রী।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত