শিরোনাম

মুসলিম সাম্রাজ্যের মুক্তা বিশ্ব ঐতিহ্য সমরকন্দ

প্রিন্ট সংস্করণ॥জিয়া উল ইসলাম  |  ০৫:১০, জানুয়ারি ০৪, ২০১৯

পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন শহর রোম, এথেন্স, ব্যাবিলনের মতো বা এই শহরগুলোর সমসাময়িক সময়ে প্রতিষ্ঠিত ২,৭৫০ বছরের পুরনো আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট, চেঙ্গিস খান, তৈমুর লংয়ের মতো বিশ্ববিজেতাদের উত্থান-পতনের স্থান উজবেকিস্তানের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং গুরুত্বপূণ শহর ‘সমরকন্দ’। চীনকে ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার সাথে সংযোগ সাধনকারী বিখ্যাত সিল্করোডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল সমরকন্দ। সেই সূত্রে এটি ছিল মধ্য-এশিয়ার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র। সমরকন্দ শহরটি অবস্থিত উত্তর-পূর্ব উজবেকিস্তানে, জারাফশান নদীর উপত্যকায়। সমরকন্দের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে উজবেকিস্তানের রাজধানী তাসখন্দ ও আরেক ঐতিহাসিক শহর বোখারার। সমরকন্দ থেকে তাজিকিস্তান সীমান্ত মাত্র ৩৫ কি.মি. দূরে। সমরকন্দ শহরটি ঠিক কখন স্থাপিত হয়েছিল তা সঠিকভাবে জানা না গেলেও প্রত্মতাত্ত্বিক গবেষণা থেকে ধারণা করা হয়, এটি খ্রিস্টপূর্ব অষ্টম বা সপ্তম শতকে স্থাপিত হয়েছিল। প্রত্যক্ষদশী এবং যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সেনাদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, খ্রিস্টপূর্ব ৩২৯ অব্দে গ্রিক বীর আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট সমরকন্দ জয় করেন। আলেকজান্ডারের আক্রমণের ফলে প্রাথমিকভাবে কিছু ক্ষয়ক্ষতির সম্মুখীন হলেও গ্রিকদের তত্ত্বাবধানে দ্রুতই সমৃদ্ধির শিখরে আরোহণ করে সমরকন্দ। সুবিধাজনক ভৌগলিক অবস্থান, অনুকূল জলবায়ু, প্রাকৃতিক ঝর্ণা ও স্বাদুপানির প্রাচুর্য, নিকটবর্তী পর্বতে খাবারের জন্য শিকারের সহজলভ্যতা, প্রবাহিত জারাফশান নদী প্রভৃতি নানা কারণে সমরকন্দে সেই প্রাচীনযুগেই বসতি স্থাপিত হয়েছিল। উমাইয়্যা খিলাফতের সময়ে আরব মুসলমানরা বীর কুতায়বা বিন মুসলিমের নেতৃত্বে সমরকন্দ অধিকার করেন। এই সময়ে সমরকন্দ পরিণত হয় বৈচিত্র্যময় ধর্মীয় সম্প্রদায়ের মিলনস্থলে। তবে অনেকেই আরবদের মাধ্যমে ইসলাম ধর্মকে সাদরে গ্রহণ করেন। এরপর ১২২০ সালে সমরকন্দ দেখেছে চেঙ্গিস খানের নির্মম, নির্দয় ধ্বংসযজ্ঞ। তলোয়ার আর আগুন দিয়ে চেঙ্গিস খান ছিন্নভিন্ন করে ফেলে সাজানো গোছানো সমরকন্দ। ১৩৭০ সালে সমরকন্দ বিশ্ববিখ্যাত বীর তৈমুর লংয়ের রাজধানীর মর্যাদা লাভ করে। তিনি সমরকন্দকে পুননির্মাণ করেন এবং শহরটির সৌন্দর্যবর্ধন করেন। তৈমুর শত্রুর প্রতি নিষ্ঠুর ছিলেন, কিন্তু শিল্পের প্রতি তার মমত্ববোধ ও আকর্ষণ প্রশংসার দাবী রাখে। শৈল্পিক স্থাপত্য দিয়ে তিনি তার রাজধানীকে সাজাতে কুন্ঠিত হননি। তৈমুরের মৃত্যুর পর তার প্ত্রু ও পৌত্রগণ সমরকন্দ শাসন করেন। তৈমুরের নাতি উলুগবেগ প্রায় ৪০ বছর সমরকন্দ শাসন করেন। তিনিই সম্ভবত সমরকন্দের ইতিহাসে সবচেয়ে শান্তিপ্রিয় শাসক ছিলেন। চৌদ্দ থেকে পনের শতককে বলা যায় সমরকন্দের ইতিহাসের স্বর্ণযুগ। এই সময় নগরীর বেশিরভাগ শক্তিশালী দুর্গ, রাস্তা, সুদৃশ্য গম্বুজ আচ্ছাদিত ভবন গড়ে ওঠে। পরবর্তী ১৫১০ সালে উজবেকরা সমরকন্দ দখল করে শাসন করে। এরপর বুখারার আমিররা শাসনব্যবস্থা পরিচালনা করে। এবং ১৮৬৮ সালে রাশিয়া সমরকন্দ দখল করে নেয়। ১৯২৫ সালে সমরকন্দ উজবেক সোভিয়েত সোসালিস্ট রিপাবলিকের রাজধানীতে পরিণত হয়। পরবর্তীতে ১৯৩০ সালে রাজধানী সমরকন্দ থেকে তাসখন্দে স্থানান্তর করা হয়। অবশেষে ১৯৯১ সালে উজবেকিস্তান স্বাধীন হওয়ার পর এটি উজবেকিস্তানের মধ্যে পড়ে এবং ঐতিহাসিক এই নগরীটি উজবেকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়। ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের গবেষণাকেন্দ্র হিসেবে সমরকন্দের খ্যাতি জগৎজোড়া। প্রাচ্য, পাশ্চাত্য, মঙ্গোলীয় ও ইরানি সংস্কৃতির স্রোতধারা মিলিত হয়েছে সমরকন্দের মোহনায়। কবি ও ইতিহাসবিদদের কাছে সমরকন্দ ‘প্রাচ্যের রোম’ বা ‘মুসলিম সাম্রাজ্যের মুক্তা’ হিসেবে পরিচিত। সমরকন্দকে এক শাসক ধ্বংস করেছে অন্য শাসক এসে গড়েছে আর এভাবে বারবার হারানো গৌরব ফিরে পেয়েছে সমরকন্দ। প্রতিবার হয়ে উঠেছে আরো সুন্দর, আরো মনোরম। মধ্য-এশিয়ার অন্যান্য শহরের মতোই সমরকন্দেরও অংশ দুটি; নতুন শহর ও পুরাতন শহর। নতুন শহরে রয়েছে প্রশাসনিক ভবন, সাংস্কৃতিক ভবন এবং উচ্চ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। পুরনো অংশে রয়েছে ঐতিহাসিক স্থাপনা, পুরনো দোকান ও পুরনো বাড়ি। তিমুরি রাজবংশের শাসনামলে নির্মিত অসাধারণ স্থাপত্যগুলোর দেখা মেলে শহরের পুরনো অংশে। এখানে আছে গুর-এ-আমির তৈমুর লং এবং তার উত্তরসূরীদের কবরের উপর নির্মিত স্মৃতিসৌধ। রাতে বিচিত্র আলোকসজ্জা এর সৌন্দর্য ছড়ায় স্মৃতিসৌধের উজ্জ্বল নীল গম্বুজ এবং নীল টাইলসের কারুকার্য । দৃষ্টিনন্দন স্থাপনাগুলোর অন্যতম বিবি খানম মসজিদ। বিবি খানম তৈমুরের স্ত্রী সারায় মুলক খানম এর ডাকনাম ছিল। কেউ কেউ বলেন, তৈমুরের ভারত বিজয় অভিযানকে স্মরণীয় করে রাখতে তার স্ত্রী এই মসজিদটি তাকে উপহার দেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন, তৈমুরের নিজের আদেশেই এটি নির্মিত করেন । এই মসজিদের স্থাপত্যশৈলীর বিশেষর্ত্ব হচ্ছে মসজিদের বাইরের অংশে জ্যামিতিক কারুকাজ, ফুলেল নকশার কাজ। যা সবাইকে আর্কষণ করে। সমরকন্দের প্রাচীন যুগের তরবারি, তীর-ধনুক, মুদ্রা, পান্ডুলিপি ও বইয়ের বিশাল সংগ্রহ রয়েছে যেখানে তার নাম আফ্রসিয়াব জাদুঘর। ঐতিহাসিক শহর আফ্রাসিয়াবের ধ্বংসাবশেষের পাশেই অবস্থিত। সমরকন্দে তৈমুর লংয়ের সময়কালে নির্মিত সর্বাধিক আর্কষণীয় স্থাপনা হচ্ছে রেজিস্তান স্কয়ার । সমরকন্দ শহরের একদম কেন্দ্রে অবস্থিত ।এটি শহরের প্রধান চত্বর। প্রাচ্যের চমৎকার স্থাপত্যশৈলীর অনন্য নিদর্শন হিসেবে এর খ্যাতি বিশ্বজোড়া। এই চত্বরটির তিনপাশে রয়েছে কেন্দ্রের দিকে মুখ করা তিনটি মাদ্রাসা। মাদ্রাসাগুলোর দু’পাশে রয়েছে নীল রঙের সুদৃশ্য উঁচু মিনার। ভবনের ছাদে থাকা দৃষ্টিনন্দন নীল মিনারও সহজেই দৃষ্টি কাড়ে। অনন্যসাধারণ এই স্থাপত্যের নির্মাণশৈলী দেখে প্রাচীন নির্মাতাদের প্রতি নিজের অজান্তেই মনে শ্রদ্ধাবোধ জেগে ওঠে। অনেকগুলো মসজিদ, সরাইখানা ও মাদরাসার সমন্বয়ে গড়ে উঠেছে রেজিস্তান স্কয়ার বিশাল একটি কমপ্লেক্স। ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও স্থাপত্যশৈলীর কারণে ২০০১ সালে ইউনেস্কো রেজিস্তান চত্বরকে ‘বিশ্বঐতিহ্য’ বলে ঘোষণা করে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত