শিরোনাম

দেশ বিদেশের বড়দিন

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ০১:১৯, ডিসেম্বর ২২, ২০১৮

আর মাত্র দুইদিন পর বড়দিন। বড় দিন একটি বাৎসরিক খ্রিস্টীয় উৎসব। সারা পৃথিবীতে পালিত হবে বড়দিন। বড়দিন সরকারিভাবে ছুটি থাকে অনেক দেশে। আবার কিছু দেশে ২৫ ডিসেম্বর বড়দিন পালিত না হয়ে পালিত হয় ৬ জানুয়ারি। বড়দিনে উপহারে সবার পছন্দ চকলেট। খাবার তালিকায় থাকে পুডিং যার ভিতর থাকে এক খ- সোনার টুকরা। বড়দিনে সান্তা ক্লজ হাজির হয় সকলের মাঝে। বাড়িঘর করা হয় আলোকসজ্জা। এবার খ্রিস্টান জনসাধারণের সবচেয়ে বড় উৎসব নিয়ে লিখেছেন- জিয়া উল ইসলাম

বিশ্বের অধিকাংশ রাষ্ট্রেই বড়দিন একটি প্রধান উৎসব তথা সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয়। এমনকি অ-খ্রিস্টান সংখ্যাগরিষ্ঠ কয়েকটি দেশেও মহাসমারোহে বড়দিন উদযাপিত হতে দেখা যায়। কয়েকটি অ-খ্রিস্টান দেশে পূর্বতন ঔপনিবেশিক শাসনকালে বড়দিন উদযাপনের সূত্রপাত ঘটেছিল। অন্যান্য দেশগুলিতে সংখ্যালঘু খ্রিষ্টান জনসাধারণ অথবা বৈদেশিক সংস্কৃতির প্রভাবে বড়দিন উদযাপন শুরু হয়। তবে চীন (হংকং ও ম্যাকাও বাদে), জাপান, সৌদি আরব, আলজেরিয়া, থাইল্যান্ড, নেপাল, ইরান, তুরস্ক ও উত্তর কোরিয়ার মতো কয়েকটি উল্লেখযোগ্য দেশে বড়দিন সরকারি ছুটির দিন হিসেবে পালিত হয় না। অধিকাংশ দেশে প্রতি বছর বড়দিন পালিত হয় ২৫ ডিসেম্বর তারিখে। তবে রাশিয়া, জর্জিয়া, মিশর, আর্মেনিয়া, ইউক্রেন ও সার্বিয়ার মতো কয়েকটি ইস্টার্ন ন্যাশানাল চার্চ ৭ জানুয়ারি তারিখে বড়দিন পালন করে থাকে। কারণ এই সকল চার্চ ঐতিহ্যশালী জুলিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করে থাকে; জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের ২৫ ডিসেম্বর প্রামাণ্য জর্জিয়ান ক্যালেন্ডারের ৭ জানুযারি তারিখে পড়ে। সারা বিশ্বে, সাংস্কৃতিক ও জাতীয ঐতিহ্যগত পার্থক্যের পরিপ্রেক্ষিতে বড়দিন উৎসব উদযাপনের রূপটিও ভিন্ন হয়ে থাকে। জাপান ও কোরিয়ার মতো দেশে খ্রিস্টানদের সংখ্যা আনুপাতিকভাবে কম হলেও বড়দিন একটি জনপ্রিয় উৎসব। এই সব দেশে উপহার প্রদান, সাজসজ্জা, ও খ্রিষ্টমাস বৃক্ষের মতো বড়দিনের ধর্মনিরপেক্ষ দিকগুলি গৃহীত হয়েছে। ২৫ ডিসেম্বর তারিখে যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন উপলক্ষে এই উৎসব পালিত হয়। তবে এই দিনটিই যিশুর প্রকৃত জন্মদিন কিনা তা জানা যায় না। আদিযুগীয় খ্রিস্টানদের বিশ্বাস অনুসারে, এই তারিখের ঠিক নয় মাস পূর্বে মেরির গর্ভে প্রবেশ করেন যিশু। সম্ভবত, এই হিসাব অনুসারেই ২৫ ডিসেম্বর তারিখটিকে যিশুর জন্মতারিখ ধরা হয়। অন্যমতে একটি ঐতিহাসিক রোমান উৎসব অথবা উত্তর গোলার্ধের দক্ষিণ অয়নান্ত দিবসের অনুষঙ্গেই ২৫ ডিসেম্বর তারিখে যিশুর জন্মজয়ন্তী পালনের প্রথাটির সূত্রপাত হয়। বড় দিন একটি বাৎসরিক খ্রিস্টীয় উৎসব।

ইতালিতে উৎসব চলে ৮ ডিসেম্বর থেকে ৬ জানুয়ারি
ইতালিতে বড়দিন উদযাপন করা শুরু হয় সেই ৮ ডিসেম্বর থেকে; সেদিনই ওখানকার সবাই ক্রিসমাস ট্রি তৈরি করে। সঙ্গে সঙ্গে তারা যিশুর জন্মের সময়ের ছবি ফুটিয়ে তুলতে মা মেরি, জোসেফ, যিশু, একটি গাধা ও একটি হাঁসও তৈরি করে; এই মূর্তিগুলোকে বলে প্রিসেপে। ৮ ডিসেম্বর তো ওদের উৎসব শুরু হল, এই উৎসব কবে শেষ হয় ৬ জানুয়ারি। সেদিন ওরা সব প্রিসেপে আর ক্রিসমাস ট্রি তুলে ফেলে। এরমধ্যে ওরা ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনের পাশাপাশি ২৬ ডিসেম্বর সেইন্ট স্টিফেন’স ডে’ও পালন করে। এছাড়াও ইতালির উত্তরাংশে, বিশেষত সিসিলিতে আরেকটা দিন পালিত হয়; সেইন্ট লুসি’স ডে। ১৩ ডিসেম্বর এই দিনটি পালিত হয়। এই সেইন্ট লুসি’স ডে পালন করার পেছনে কিন্তু একটা গল্পও আছে। ১৫৮২ সাল, সিসিলিতে সেই বছর এক বিশাল দূর্ভিক্ষ দেখা দিল। সবাই না খেতে পেয়ে হা-হুতাশ করছে। এমন সময় সেইন্ট লুসি সেখানে এক জাহাজ গম নিয়ে উপস্থিত। সবাই এতই ক্ষুধার্ত ছিল, ওরা সেই গম থেকে আটা তৈরির জন্যও অপেক্ষা করলো না, তক্ষুণি গম পুড়িয়ে পুড়িয়ে খেতে শুরু করে দিল। এই ঘটনাকে উদযাপন করতে সেখানে সেইন্ট লুসি’স ডে’তে কোনো আটার তৈরি খাবার খাওয়া হয় না। ইতালিতে বড়দিনের আরেকটা মজা আছে। ওখানকার বাচ্চারা বড়দিনে রাখাল সেজে পাইপ বাজিয়ে বাজিয়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বড়দিনের গান গায় আর ছড়া কাটে। বিনিময়ে সব বাড়ি থেকে তাদেরকে টাকা দেওয়া হয়। আর সেই টাকা দিয়ে ওরা বড়দিনের উপহার কেনে।

পুডিংয়ে সোনা যে পায় তাকে ভাগ্যবান মনে করা হয়
অস্ট্রেলিয়ার ক্রিসমাস যখন আসে, তখন ওদের গ্রীষ্মকাল। তারপরও কিন্তু জাঁকজমক কম হয় না। ওরা ইউরোপ-আমেরিকানদের মতো করেই পালন করে বড়দিন; খ্রিস্টান ধর্মটা যে ওদের মধ্যে গেছে ইউরোপ-আমেরিকা থেকেই। আর ওখানকার আদিবাসীরা তো ওদের নিজেদের মিষ্টি-মিষ্টি ধর্মই পালন করে। তবে ওদের খাবার-দাবারের মধ্যে একটা বিশেষ পুডিং থাকে। সেই পুডিংয়ের ভেতরে এক টুকরো সোনা থাকে। সেই সোনার টুকরোটা যার ভাগ্যে পড়ে, ধরে নেওয়া হয়, তার ভাগ্য খুবই ভালো। সান্তাকে ওদের ঐতিহ্যবাহী পোশাক পরিয়ে দেন, সান্তার মাথায় চাপিয়ে দেন ঐতিহ্যবাহী ‘আকুব্রা’ হ্যাট। আর সেই ঐতিহ্যবাহী সান্তার গাড়িটি টেনে নিয়ে যা অদ্ভুত প্রাণী ‘ক্যাঙ্গারু’! অস্ট্রেলিয়ার ক্রিসমাসের দিন দু’টি বড় বড় খেলাও অনুষ্ঠিত হয়। এটাও ওদের ঐতিহ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। একটার নাম বক্সিং ডে টেস্ট। ডিসেম্বরের ২৫-২৬ তারিখকে ওরা বলে বক্সিং ডে, আরেকটা খেলা হয় ইয়ট রেস। সিডনি থেকে হোবার্ট পর্যন্ত হয় এই ইয়ট রেস। অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের মধ্যেও যে খ্রিস্টান নেই, তা নয়। আর ওরা ক্রিসমাসের আগে আগেই ক্রিসমাসের আগমনী বার্তা সবাইকে জানিয়ে দিতে অ্যাডিলেডে একটা বিশাল শোভাযাত্রার আয়োজন করে। তাতে লোক হয় প্রায় ৪ লাখ! আবার মেলবোর্নে ‘ক্যারোলস বাই ক্যান্ডললাইট’ নামে একটা মিউজিক্যাল শো হয়, অনেকটা কনসার্টই বলা যায়।

ব্রাজিলে ঘর সাজানো প্রতিযোগিতা হয়
সাও পাওলো, রিও ডি জেনিরোর মতো ব্রাজিলে বড় বড় শহরগুলো পুরোই সেজেগুজে বড়দিন পালন করে। এমনকি তুষার পড়ে না বলে ওরা অনেক সময় ক্রিসমাস ট্রি’র উপরে তুলো দিয়ে বরফের মতো বানিয়ে রাখে! আর সবচেয়ে মজা হয় কিউরিতিবা শহরে। সেখানে যাকে বলে ঘরবাড়ি সাজানোর প্রতিযোগিতাই হয়! ক্রিসমাসের দিন বিচারকরা বাড়ি বাড়ি ঘুরে কাদের বাসা সবচেয়ে সুন্দর করে সাজানো হয়েছে, সেটা খুঁজে বের করেন। আর সান্তা ক্লজকে ব্রাজিলিয়ানরা ডাকে, পাপাই নোয়েল বলে। আবার ওদের খাবারের তালিকাতেও থাকে বিশেষ একটা খাবার। চকলেট আর কনডেন্সড মিল্ক দিয়ে তৈরি এই বিশেষ খাবারটির নাম- ব্রিগেডেইরো। আবার ওদের উৎসবেও থাকে এক বিশেষ অংশ; ২৪ ডিসেম্বর রাত ১২ টা বাজলেই, মানে ২৫ ডিসেম্বর হওয়ার সাথে সাথে ওদের চার্চগুলোতে ‘মিসা দ্য গ্যালো’ উদযাপন করা হয়।

মেক্সিকানরা ৯ দিন ধরে দরজায় দরজায় ঘুরে বেড়ায়
মেক্সিকোতে ক্রিসমাসকে বলা হয় লাস পোসেদাস। ক্রিসমাসে ওরা অনেক আচারই পালন করে, যেগুলো শুধু মেক্সিকোতেই দেখা যায়। এরকম আচারের সংখ্যা কম করে হলেও ৩০টি হবে! যেমন প্রায় ৯ দিন ধরে শহরের মানুষেরা শহরের ঘরের দরজা থেকে দরজায় ঘুরে বেড়ায়। আসলে বেথলেহেমে আসার পর মা মেরি যিশুকে নিয়ে দিনের পর দিন এভাবে মানুষের ঘরের দরজা থেকে দরজায় ঘুরে বেড়িয়েছিল; কিন্তু কেউ তাঁকে আশ্রয় দেয়নি। সেই করুণ ঘটনা স্মরণ করেই তারা এই আচার পালন করে। মেক্সিকানদের ক্রিসমাসের উৎসবও চলে অনেক দিন ধরে। শুরু হয় ১২ ডিসেম্বর ‘লা গুয়াদালুপানা’ নামের ভোজ দিয়ে। আর শেষ হয় ৬ জানুয়ারি, ‘এপিফানি’ নামের ভোজ দিয়ে। আর তারা বিশ্বাস করে, মাঝরাতে শিশুদের স্টকিং (মোজা) উপহারে ভরে দিয়ে যায় ৩ জ্ঞানী ব্যাক্তি (থ্রি ওয়াইজ ম্যান)। সেই ৩ রাজা, যারা যিশুর জন্মের পরপরই তাঁর জন্য উপহার নিয়ে গিয়েছিলেন।

রাশিয়ায় ক্রিসমাস পালন করে ৬ জানুয়ারি
রাশিয়া ক্রিসমাস বা বড়দিন পালন করে ৬ জানুয়ারি। আমরা এখন গেরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করলেও রাশান চার্চ এখনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে সেই পুরনো জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে। আর সেই ক্যালেন্ডার অনুযায়ীই ওরা ৬ জানুয়ারি বড়দিন পালন করে। ক্রিসমাস আর নববর্ষ একসঙ্গে পালিত হয়। আর তাই ওদের নববর্ষের উদযাপনেও দেখবে ঠিক মধ্যেখানে একটা ক্রিসমাস ট্রি আছে। ওরা অবশ্য ক্রিসমাস ট্রি’কে ডাকে ইয়োল্কা নামে। আর ওরা ক্রিসমাস ট্রি হিসেবে পাইন গাছের বদলে বেশিরভাগ সময়েই ব্যবহার করে স্প্রাস গাছ। তবে ওরা এখন যেভাবে ক্রিসমাস পালন করে, আগে ঠিক সেভাবে পালন করত না। ওদের ক্রিসমাস উদযাপনের এই পালাবদল করেন পিটার দ্য গ্রেট। তিনি ১৭ শতকে ইউরোপে ঘুরতে এসে ওদেরকে ক্রিসমাস উদযাপন করতে দেখেন। আর ওদের উদযাপন দেখে তাঁর এতই ভালো লেগে যায়, তিনি রাশিয়াতেও সেগুলো প্রচলন করেন। তার ফলেই এসেছে ইয়োল্কা। এরকম ‘দায়েদ মরজ’, ‘গ্র্যান্ডফাদার ফ্রস্ট’, ‘স্নেগুরোচকা’, ‘দ্য স্নোমেইডেন’সহ আরও অনেক কিছুরই প্রচলন করেন তিনি। আর সেগুলো এখনো রাশানরা মহানন্দে পালন করে যাচ্ছে।

নাইজেরিয়ার বড়দিনে শহর থেকে গ্রামে ছুটে আসে
নাইজেরিয়ায় বড়দিন সব লোকজন বড় বড় শহর ছেড়ে তাদের গ্রামের দিকে ছুটতে শুরু করে। ফলে কয়েকদিনের মধ্যে শহরগুলো ফাঁকা হয়ে যায়; আর লোকজন বাজারগুলোতে ভিড় করে কেনাকাটা করতে। ওখানে বড়দিনের সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো, ওরা কিন্তু বড়দিনের কেক তেমন একটা তৈরি করে না; ওরা রান্না করে নানা পদের মাংস, সুস্বাদু সব মাংস। আর এই মাংসের তরকারিগুলোর আবার গালভরা সব নামও আছে-জুলোফ রাইস, টুয়ো, ফুফু। সঙ্গে থাকে নানা রকমের পানীয়।

ভারতে ক্রিসমাস ট্রি সাজায় আমগাছ বা কলাগাছ দিয়ে!
ভারতে বড়দিন এই দিনটি সরকারি ছুটি। ওরা ক্রিসমাস ট্রি সাজায় আমগাছ বা কলাগাছ দিয়ে! আবার দক্ষিণ ভারতে, তামিলনাড়ু কেরালা- কর্ণাটক- অন্ধ্রপ্রদেশের মানুষেরা ঘরের ছাদে ছোট ছোট মাটির প্রদীপ জ্বালায়। তবে শহুরে খ্রিস্টানরা আবার পশ্চিমাদের মতোই, মানে ইউরোপ-আমেরিকানদের মতোই বড়দিন উদযাপন করে।

বাংলাদেশে খাওয়া হয় পিঠা-পুলি, পোলাও, মাংস, বিরিয়ানি
১৬ শতকে পর্তুগিজরা এই বাংলাদেশ তথা অঞ্চলে আসে । এই অঞ্চলে প্রথম চার্চটিও পর্তুগিজরা বানিয়েছিল, বৃহত্তর যশোর জেলার কালিগঞ্জে (সুন্দরবনের কাছাকাছি অঞ্চলে), ১৫৯৯ সালে। প্রথম বড়দিন পালন করা হয় অবশ্য আরও পরে। সেটা ১৬৬৮ সালের কথা। কলকাতা নগরী যে পত্তন করেছিলেন সেই জব চার্ণক যাচ্ছিলেন হিজলির উদ্দেশ্যে। তো যাওয়ার পথে সুতানুটি গ্রামে আসার পর খেয়াল করলেন, বড়দিন এল বলে! কি আর করা, সেখানেই যাত্রাবিরতি করে বড়দিন পালন করলেন, সেই প্রথম বাংলাদেশে বড়দিনের উৎসব পালিত হল। সেই থেকেই বাংলাদেশে বড়দিন পালিত হয়ে আসছে। বড়দিন উপলক্ষে বড় বড় হোটেলগুলোতে তো বিশেষ আয়োজন থাকেই, সাজানো হয় ক্রিসমাস ট্রি-ও। অন্যান্য দেশে যেখানে পাইন গাছ দিয়ে ক্রিসমাস ট্রি বানানো হয়, সেখানে আমাদের দেশে সাধারণত ব্যবহৃত হয় ঝাউগাছ। আবার ক্রিসমাসের খাবার হিসেবে বিশেষ কেকের পাশাপাশি উৎসবে পিঠা-পুলি, পোলাও, মাংস, বিরিয়ানি, এসবও থাকে। ক্রিসমাস ক্যারল বা ক্রিসমাসের যে গানগুলো গাওয়া হয়, সেগুলোও সব ইংরেজি গানই গাওয়া হয় না, তার মধ্যে থাকে ভাটিয়ালী গান, কীর্তন, এমনকি রবীন্দ্রসঙ্গীতও । আর বাংলাদেশে বৃটিশরা ক্ষমতা গ্রহণ করার পর থেকেই দেশে বড়দিনে ছুটি পালন হয়ে আসছে।

ক্রিসমাসে যত বর্ণিল উপহার
ক্রিসমাসের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে লাল-সাদা পোশাকের সাদা দাড়ির নাদুসনুদুস সান্তাক্লজ। যে ফায়ার প্লেসের চিমনি দিয়ে চলে আসে ক্রিসমাসের গিফট হাতে। সান্তাক্লজ গিফটের পাশাপাশি সান্তাক্লজ পোশাকও শিশুদের কাছে আকর্ষণীয়। তাই বড়দিন উপলক্ষে শিশুদের বিভিন্ন রকম পোশাকের পাশাপাশি উপহার দেওয়া হয় সান্তাক্লজ পোশাক। চকোলেটের প্রতি শিশুদের বরাবরই বাড়তি আকষর্ণ থাকে। তাই উপহার হিসেবে দেওয়া হয় চকোলেট বক্সও। এ ছাড়া পুতুল, খেলনাসহ বিভিন্ন উপহারও শিশুরা পছন্দ করবে তাই এই সব উপহারও ক্রিসমাসে দেয়া হয়।

ক্রিসমাস কেক
ক্রিসমাসের আনন্দে কেক থাকবে না তা কি হতে পারে! এদিন প্রিয়জনকে চমকে দিতেও কেকের জুড়ি নেই। তা সে ব্ল্যাক ফরেস্টই হোক আর চকোলেট বা ভ্যানিলাই হোক। শুভেচ্ছা কিংবা ভালোবাসার কথা লিখে আকর্ষণীয় মোড়কে প্রিয়জনকে উপহার হিসাবে দেওযা হয় নানা রকম কেক।

ক্রিসমাস কার্ড
স্মার্টফোনের বদৌলতে এখন কার্ডের প্রচলন ঠিক আগের মতো নেই। কিন্তু বিশেষ দিনগুলোয় কার্ড এখনো বাড়তি আকর্ষণ। ক্রিসমাস ও নিউ ইয়ারকে সামনে রেখে শুভেচ্ছা ও শুভকামনা জানিয়ে যে কাউকে এখনো দেওয়া হয় ক্রিসমাস কার্ড। সেটা হতে পারে দুই পেজের সিম্পল কোনো কার্ড বা মনকাড়া ডিজাইনের মিউজিক্যাল কার্ড, সুগন্ধি কার্ড কিংবা হ্যান্ডপেইন্ট কার্ড।

পোশাক, পারফিউম, কিংবা গহনা
উপহার হিসেবে পোশাক, পারফিউম কিংবা গহনা অনেকেরই খুব পছন্দের। বড়দিন উপলক্ষে ব্যক্তিত্বের সঙ্গে মানানসই কোনো পোশাক উপহার দেওয়া হয়। আংটি, ব্রেসটেল, নেকলেসসহ নানা রকম গহনাও এই বড় দিনে উপহার দেওয়া হয়। সুগন্ধি অথবা বডি স্প্রেও উপহার দেয় বড়দিনে প্রিয় মানুষটিকে।

অবসর উপহার
প্রিয়জনের অবসরটা স্মৃতিময় করে তুলতে ক্রিসমাসে উপলক্ষে উপহার দেয প্রিয় কোনো লেখকের বই, গানের সিটি, সাউন্ড বক্স, গিটারসহ বিভিন্ন রকম মিউজিক ও খেলাধুলার উপকরণ। বড়দিন উপলক্ষে আরও উপহার পায় ফটোফ্রেম, মগ, ওয়াল ম্যাট, ফুল, সানগ্লাস, মানিব্যাগ, হাতঘড়ি, কাফলিংক সেট, ফুলদানি, পেইন্টিংস, চাবির রিংসহ নানা কিছু।

উপহারের মোড়ক
উপহারের মতো গুরুত্বপূর্ণ উপহারের মোড়টিও। তাই নান্দনিকভাবে সাজিয়ে বড়দিনে উপহার দেওয়া হয় । উপহারের মোড়ক সাজাতে ব্যবহার করতে করে রিবন, লেইস, জরি, ড্রাইফুল, রিবন ফুল, শোলার ফুলসহ নানা কিছু।

কে এই সান্তা ক্লজ
বড়দিন এলেই সান্তা ক্লজের কাছ থেকে পাওয়া চকোলেট আর উপহার যেন বাচ্চাদের পরম আরাধ্য। বিশেষ এইদিনে সান্তা ক্লজ আসে উপহারের ঝুড়িতে খুশির বারতা বয়ে। সঙ্গে ছোট-বড় সবার জন্য উপহার হিসেবে দেয় নানা রকমের মুখরোচক চকোলেট।তাই হয়তো বড়দিন মানেই যেন সান্তা ক্লজের কাছ থেকে উপহার পাওয়ার অন্যতম উপলক্ষ সঙ্গে মন্ডা-মিঠাই। খ্রিস্টীয় ধর্মের অংশ না হলেও সান্তা ক্লজ নামটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এই নামটি এসেছে খ্রিস্টান ধর্মযাজক সেন্ট নিকোলাসের ওলন্দাজ নাম সিন্টার ক্লাস থেকে। তার জন্ম হয়েছিল আধুনিক তুরস্কের নিকটবর্তী সমুদ্রবর্তী ‘পাতারা’ নামক এক গ্রামে। মায়রার বিশপ নির্বাচিত হওয়ার অল্পদিন পরই তাকে কারাদন্ড দেওয়া হয়। এরপর সম্রাট কনস্টেনটাইন ক্ষমতায় আরোহণ করলে তিনি মুক্তি লাভ করেন। সেন্ট নিকোলাস ছিলেন ধনাঢ্য বাবার দয়ালু ছেলে। কথিত আছে, সেন্ট নিকোলাস উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সব ধন-সম্পত্তি গরিব-দুঃখীদের মধ্যে বিলিয়ে দিয়েছিলেন। বিপদাপন্ন মানুষের সন্ধানে সেন্ট নিকোলাস এক জায়গা থেকে আরেক জায়গা, এক দেশ থেকে আরেক দেশ চষে বেড়াতেন। সেন্ট নিকোলাস পরিচিতি পেতে থাকেন বাচ্চাদের পরম বন্ধু ও সবার দুর্দিনের সাথী হিসেবে। এভাবেই একসময় সেন্ট নিকোলাস সারা ইউরোপে সবচেয়ে জনপ্রিয় সাধু ব্যক্তি হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেন। তার মৃত্যুর তারিখ ৬ ডিসেম্বরকে একটি পবিত্র দিন হিসেবে পালন করা হয়। ১৭৭৩-৭৪ এর দিকে একদল ওলন্দাজ পরিবারের সেন্ট নিকোলাসের মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপন উপলক্ষে সমবেত হওয়ার কথা নিউইয়র্ক পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়। একই সঙ্গে পরিচিতি পায় নামটি।

খাদ্য তালিকায় যা থাকে
বড়দিনে ভোজসভার খাদ্যতালিকা অবশ্য একেক দেশে একেক রকম হয়। ইংল্যান্ডের পারিবারিক ভোজসভায় থাকে ক্রিসমাস পুডিং। সিসিলি প্রভৃতি কয়েকটি অঞ্চলে ক্রিসমাসের পূর্বসন্ধ্যায় যে ভোজসভা আয়োজিত হয় তাতে থাকে বারো রকমের মাছ। ইংল্যান্ড ও ইংরেজি সংস্কৃতির দ্বারা প্রভাবিত দেশে বড়দিনের ভোজসভায় দেখা যায় টারকি (উত্তর আমেরিকা থেকে আনা), আলু, শাক-সবজি, সসেজ ও গ্রেভি ছাড়াও থাকে ক্রিসমাস পুডিং, মিন্স পাই ও ফ্রুুট কেক। পোল্যান্ড, পূর্ব ইউরোপের অন্যান্য দেশ ও স্ক্যান্ডিনেভিয়া অঞ্চলের ভোজে মাছের উপস্থিতি লক্ষণীয়। তবে এসব অঞ্চলে ভেড়ার মাংসের ব্যবহারও হয়। জার্মানি, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়ায় হাঁস ও শূকরের মাংস বেশ জনপ্রিয়। এ ছাড়া প্রয় সারা বিশ্বেই গোমাংস, হ্যাম ও মুরগির যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। ফিলিপাইনে ভোজসভার প্রধান খাদ্য হলো হ্যাম। বিশেষ ধরনের টার্ট ও কেকের সঙ্গে বিশেষ ডেজার্টও তৈরি হয়। ক্রিসমাস উপলক্ষে মিষ্টি আর চকোলেট সারা বিশ্বেই জনপ্রিয়। ক্রিসমাসের বিশেষ মিষ্টিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য জার্মান স্টোলেন, মারজিপান কেক বা ক্যান্ডি এবং জামাইকান রাম ফ্রুট কেক। উত্তরের দেশগুলোতে শীতকালে যে অল্প কটি ফল পাওয়া যায় তার মধ্যে কমলালেবু ক্রিসমাসের বিশেষ খাদ্য হিসেবে দীর্ঘকাল ধরে পরিচিত।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত