শিরোনাম

অটোমান স্থাপত্যশৈলীতে চিত্তাকর্ষক সৌন্দর্য ইস্তাম্বুলের ‘ব্লু-মস্ক’

প্রিন্ট সংস্করণ॥আজিয়া উল ইসলাম  |  ১১:১৭, ডিসেম্বর ২১, ২০১৮

পূর্ব ইউরোপের একটি রাষ্ট্র তুরস্ক। তুরস্কের বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্রবিন্দু হচ্ছে তুরস্কের সবচেয়ে বড় শহর ইস্তাম্বুল। তুর্কি জনগণের প্রায় ৭০ দশমিক ৫ শতাংশ লোক এই শহরে বসবাস করে। এই ইস্তাম্বল শহরেই ছড়িয়ে আছে অটোমান সাম্রাজ্যের নিদর্শন। এই শহরটি আন্তঃমহাদেশীয় শহর হওয়ায় ইউরেশিয়ার শিল্প, সাহিত্য ও ইতিহাসের অন্যতম প্রধান মিলনস্থল। ইস্তাম্বুলের বিখ্যাত ও নয়নাভিরাম বসফরাস প্রণালীর তীরঘেঁষে মুসলিম ঐতিহ্যের নিদর্শন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ‘সুলতান আহমেদ মসজিদ’। এর অফিসিয়াল নাম ‘সুলতান আহমেদ মসজিদ’ হলেও চমৎকার নীল গম্বুজের সুবাদে লোকমুখে এটি ‘ব্লু-মস্ক’ বা ‘নীল মসজিদ’ নামে অধিক পরিচিত। তবে এই মসজিদটির আয়া সাফিয়া নামেও পরিচিতি আছে। মসজিদের দেয়ালেও প্রধান্য পেয়েছে নীল রঙের টাইলস। উসমানীয় মুসলিম খেলাফতের অনন্য স্থাপত্যকৃতি এই নীল মসজিদ। ১৯৩৪ সালে হাজিয়া সোফিয়াকে মিউজিয়ামে রূপান্তরত করার পর এটি ইস্তাম্বুলের প্রধান মসজিদে পরিণত হয়। তুরস্কে বেড়ানোর ক্ষেত্রে অন্যতম পর্যটন গন্তব্য এই সুলতান আহমেদ মসজিদ। আসলে এই ‘নীল মসজিদ’ একটি বাইজাইন্টাইন প্যালেসের ধ্বংসাবশেষের ওপর নির্মিত হয়। তুরস্কের মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় পর্যটন স্থান এ মসজিদটি।মসজিদটির সুউচ্চ গম্বুজ এবং নয়নাভিরাম মোজাইক পর্যটকদের হৃদয় কাড়ে। এটি প্রথমে ৯০০ বছর খ্রিস্টানদের গির্জা এবং এরপর ৫০০ বছর মুসলমানদের মসজিদ হিসেবে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষী হয়ে রয়েছে। উসমানীয় খেলাফতের দায়িত্ব নিয়ে ফাতিহ সুলতান মোহাম্মদ এই মসজিদেই নামাজ পড়তেন। ইস্তাম্বুল জয়ের পর এক ডিক্রিতে তিনি আয়া সোফিয়াকে মসজিদে রূপান্তর করার ঘোষণা দেন। বাইজেন্টাইন সম্রাট জাস্টিনিয়ান ৫৩৭ সালে আয়া সোফিয়া নির্মাণ করেন। তিনি স্পেন থেকে মধ্যপ্রাচ্যের বিশাল সাম্রাজ্যের অধিপতি ছিলেন। গ্রিক ভাষায় আয়া সোফিয়া নামের এই গির্জাটি তখন খ্রিস্টানদের কাছে ছিল অতুলনীয়। ১৪৫৩ সালে সুলতান ফাতিহ মোহাম্মদ দ্বিতীয় ইস্তাম্বুল দখল করেন এবং এটাকে মসজিদে পরিণত করেন।অটোম্যান স্থাপত্যশৈলীতে নির্মিত মসজিদটির প্রযুক্তিগত সৌন্দর্য সত্যিই দারুণ ও চিত্তাকর্ষক। এটি মুসলমানদের জন্য শুধু একটি মসজিদ নয় বরং ওই অঞ্চলের সর্বাধিক জনপ্রিয় ও আকর্ষণীয় স্থাপত্য-নিদর্শন। মসজিদটির মূল একটি গম্বুজের পাশাপাশি আটটি মাধ্যমিক গম্বুজ রয়েছে। মূল গম্বুজটির উচ্চতা ৪৩ মিটার। মসজিদের চার কোণে চারটি ও পেছনে আরও দুটিসহ ছয়টি সুউচ্চ মিনার রয়েছে। মিনারগুলো দূর থেকে দেখতে পেন্সিলের মতো মনে হয়। প্রধান চারটি মিনারের প্রতিটিতে স্তরবিশিষ্ট দূরত্বে তিনটি করে ব্যালকনি রয়েছে। আর অন্য দুটিতে রয়েছে দুটি ব্যালকনি। মসজিদের মিনার ও গম্বুজগুলো নীল-সাদা সীসার গাঁথুনি দ্বারা আচ্ছাদিত এবং মিনার ও গম্বুজের উপরের ভাগ সোনার প্রলেপযুক্ত তামায় নকশাকৃত। মসজিদের ভেতরের দিকের ছাদ এবং দেয়ালজুড়ে ২০ হাজার অত্যন্ত উঁচু মানের নীল রঙের আকর্ষণীয় টাইলস বসানো হয়েছে। এছাড়াও হাতে নির্মিত ইজনিক সিরামিক টাইলস, প্রাচীন নিকিয়া রীতির বিভিন্ন কারুকাজের পাশাপাশি বিভিন্ন ক্যাটাগরির পঞ্চাশটি টিউলিপ ডিজাইনের মাধ্যমে বেশ আকর্ষণীয় ও দৃষ্টিমুগ্ধ করা হয়েছে।
ভেতরের পিলারগুলোতে ঐতিহ্যগত নকশা এবং গ্যালারি অঞ্চলের দেয়ালগুলোতে সাইপ্রেসীয় রীতিতে বিভিন্ন ফল-ফুলের চিত্র অঙ্কন করা হয়েছে। সুলতানের নির্দেশে অত্যন্ত মূল্যবান পাথর ব্যবহার করা হয়েছিল ভেতরের সামগ্রিক কাজে। গম্বুজের ভেতরের কিছু অংশে নীল রং করা হয়েছে। এছাড়াও অত্যন্ত নিপুণভাবে ২০০টি স্বচ্ছ কাচ গম্বুজটিতে ছোট জানালা-খিড়কির মতো করে স্থাপন করা হয়েছে। সেগুলো দিয়ে প্রাকৃতিক আলো ভেতরে ঢুকতে পারে। প্রতিটি মাধ্যমিক গম্বুজে ১৪টি করে জানালা এবং কেন্দ্রীয় গম্বুজে ২৮টি জানালা রয়েছে। জানালার রঙিন কাচগুলো ভেনিসের সিগনোরিয়ার পক্ষ থেকে সুলতানকে উপহার দেয়া হয়েছিল। দীর্ঘকালের শৈল্পিকতা হ্রাস পাওয়ায় অনেকগুলোই বর্তমানে পরিবর্তন করা হয়েছে। ভেতরের দেয়ালগুলোর উপরিভাগে বাহারি কারুকাজ ও নকশাচিত্রের পাশাপাশি কুরআনের বিভিন্ন আয়াতের ক্যালিগ্রাফি রয়েছে। মসজিদটির দৈর্ঘ্য ২৪০ ফুট ও প্রস্থ ২১৩ ফুট। মসজিদ কমপ্লেক্সে আছে একটি মাদ্রাসা, একটি পান্থনিবাস এবং প্রতিষ্ঠাতার মাজার। ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্য স্থাপনাভুক্ত হাজিয়া সোফিয়া জাদুঘরের সামনেই ছয় মিনারের এই মসজিদ মুসলিম ঐতিহ্যের নিদর্শন হয়ে দাঁড়িছে আছে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত