শিরোনাম
বরগুনার শাহ জালাল নোমান

১২দিনে নৌকায় ভ্রমন করলেন ৪৫০ কিলোমিটার নদীপথ

মো. বেলাল হোসেন মিলন ও রতন চন্দ্র মালাকার, বরগুনা  |  ১৯:০১, নভেম্বর ০৪, ২০১৮

নদী মাত্রিক বাংলাদেশে সৌন্দর্য উপভোগ ও নদী নিয়ে শর্ট ফ্লিম তৈরির জন্য একাই সমগ্র বাংলাদেশের নদী পথে দুঃসাহসিক ভ্রমনেগত ২২অক্টোবর বেড় হয়েছিলেন, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেলন্স (ইউল্যাব) এর প্রক্তন ছাত্র ২৯ বছর বয়সী শাহ-জালাল নোমান। তিনি কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কচাঘাটা ইউনিয়ন থেকে কায়াক নামক একটি নৌকায় চড়ে বিভিন্ন জেলা ঘুরে গত শনিবার (০৩ নভেম্বর) ৪৫০ কিলোমিটার নদীপথ ভ্রমন করে বিষখালী নদীর বুক হয়ে পৌছায় বরগুনার পাথরঘাটায়। শাহ-জালাল নোমানের দ্বির্ঘ এই নৌপথে বিভিন্ন অভিজ্ঞতার কথা বলেছেন আমার সংবাদ প্রতিনিধি মো. বেলাল হোসেন মিলন ও রতন চন্দ্র মালাকারকে।

যে কারণে নৌপথে ভ্রমনের ইচ্ছা নোমানের:
আমাদের এ দেশ নদী মাত্রিক দেশ। বাংলাদেশে শাখা প্রশাখাসহ প্রায় ৮০০ নদ-নদী বিপুল জলরাশি নিয়ে ২৪,১৪০ কিলোমিটার জায়গা দখল করে দেশে বিভিন্ন অঞ্চলের মধ্যদিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। অথচ বাংলাদেশে নদী নিয়ে গবেষনা বা এই নদী নিয়ে কোন পর্যটন শিল্প তেমন করে এখনো গড়ে উঠেনি। আন্তর্জাতিক কোন ফ্লিম ফেস্টিবলে এখনো এদেশের নদী নিয়ে কোন ডকুমেন্টরী প্রতিযোগীতা হয়নি। এসকল দিক বিবেচনা করে ইউনিভার্সিটি অব লিবারেলন্স (ইউল্যাব) এর প্রক্তন ছাত্র মো. শাহজালাল নোমান সম্পূর্ন ব্যক্তিগত উদ্যোগে চার বছর ধরে তৈরী করেন ‘কায়াক’ নামক একটি নৌকা। নৌকায় ভ্রমন করার সময় নদীর বিভিন্ন রুপ, নদীর আগ্রাসন, নদীর বুকে জেগে ওঠা নৈস্বর্গীক চর, নদীর বুকে ছুটে চলা বিভিন্ন নৌ-যান ও বিশাল জলরাশির বুকে উড়ে চলা বিভিন্ন পখির ছবি ও ভিডিও ধারণ করাই হলো তার মূল লক্ষ্য। তিনি নিজের ব্যবহার করা মোবাইল ফোনসহ আরো দুটি ওয়াটার প্রুফ ক্যামেরায় ধারণ করে তার নৌ ভ্রমনের নদীর রুপ। একটি এ্যাভেঞ্চার ফ্লিম ফেষ্টিবেলে তিনি বাংলাদেশের নদী নিয়ে গবেষনা ও শর্ট ফ্লিম তৈরি করে জমা দেয়ার উদ্দেশ্যেই তার এই নৌ-যাত্রা।

কায়াক যাত্রী নোমানের পারিবারিক ও শিক্ষা জীবন:
বাংলাদেশ বর্ডার গার্ড এর অবসরপ্রাপ্ত সৈনিক মো. মাহবুবুল হক এর একমাত্র ছেলে মো. জালাল নোমান, মাতা একজন গৃহীনী। পৌত্রিক বাড়ি চাঁপুরের মতলব উপজেলায়। বর্তমানে তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে ছোট তিনি। বাবা চাকরির সুবাদে কিছুটা ভ্রমন পিপাসু। এ জেলা থেকে অন্য জেলায় ঘুরেছেন তিনি। বাবার সে ভ্রমনের গুন সম্পূর্ন রুপে পায় নোমান। ছোট বেলা থেকেই সে ভ্রমন প্রিয়। স্কুল জীবনে বাইসাইকেল চালিয়ে ঘুরেছেন সমগ্র উত্তর অঞ্চল। বাবার চাকরির সুবাদে ময়মনসিংহ জিলা স্কুল থেকে এস.এস.সি পাশ করে নোমান। পরে ঢাকার ঝিগাতলার বীর শ্রেষ্ঠ মুন্সি আ. রব স্কুল এন্ড কলেজ থেকে এইচ.এসসি পাশ করার পর ভর্তী হয় ইউনিভার্সিটি অব লিবারেলন্স (ইউল্যাব) এ। সেখান থেকে কৃতিত্বের সাথে মিডিয়া স্টাডিজ এন্ড জার্নালিজম বিষয়ে গ্রাজুয়েশন সমাপ্ত করেন তিনি। পরে পীচ ফর বাংলাদেশ নামে একটি সংগঠনে শিক্ষার উন্নয়ন শীর্ষক ফেলোশীপ করেন।

কিভাবে তৈরি করেণ কায়াক নৌকাটি:
মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান শাহজালাল নোমান। বাবার একমাত্র উপর্জনে চলে সংসার ও নিজের পড়া লেখার খরচ। তার পরেও বাবার দেয়া টাকা থেকে নৌকায় দেশ ভ্রমনের উদ্দেশ্যে একটু একটু করে জমানো শুরু করে টাকা। প্রতিমাসে জমানো টাকা দিয়ে নৌকা তৈরির জন্য ব্যবহৃত প্লাইউড ক্রয় করে নোমান। এভাবে কয়েক দফায় প্লাইউড কিনতে হয় তাকে। পরে ইউটিউবে বিভিন্ন এ্যাভেঞ্চার নৌকা তৈরির টিউটেরিয়াল দেখে নিজেই তৈরী করা শুরু করে তার দেশ জয়ের কায়াক নামের বিরল নৌকাটি। প্রায় ১ লাখ টাকা ব্যায়ে ৪ বছর ধরে একটু একটু পরিশ্রমে পূর্নাঙ্গ নৌকাটি তৈরী করতে সফল হন তিনি। প্লাইউড দিয়ে সম্পূর্ন নৌকাটি তৈরী হওয়ার পরে নৌকার উপরে ফইবারের আস্তরণ দিয়ে পুরো পানি নিরোধক করা হয়। এতে একধরণের ক্যামিকেল মেশানো হয়। যার ফলে নৌকাটি প্রচন্ড ডেউয়েও পানি ঢুকে না ।

কায়াকিং কি?
কায়াক মূলত লগি বা বৈঠার সাহায্যে চালানো যায় এমন এক ধরনের ফাইবার গ্লাসের তৈরি দ্রুতগতির ছোট নৌকা। এটি নদী, সমুদ্র বা সমুদ্র উপকূলে প্রতিযোগিতামূলক খেলায় চালানো হয়। একজন দ্বারা চালিত কায়াকগুলো লম্বায় ১০-১৫ ফুটের মত হতে পারে। আর বড় কায়াকগুলো ২৫-২৬ ফুট পর্যন্ত লম্বা হয়ে থাকে। বড় কায়াকগুলোতে ২-৩ জন বসতে পারে। কায়াকগুলো তাদের আকৃতি এবং নকশার কারণে বেশ দ্রুতগতির হয়ে থাকে।

কায়াকের ইতিহাস:
কায়াকের ইতিহাস খুঁজলে জানা যায় যে, কানাডার আলেস্কোতে প্রথম কায়াকের ব্যবহার শুরু হয়। এছাড়া গ্রিনল্যান্ডের দক্ষিণ পশ্চিম উপকূলে বসবাসরত এস্কিমোরা সিল মাছ শিকারের জন্য, হালকা কাঠের তক্তা এবং সিলের চামড়া দিয়ে তৈরি এক প্রকারের নৌকা ব্যবহার করত। এই নৌকাগুলোকে বলা হত কায়াক। ১৯৮৪ সালে প্রথম আধুনিক কায়াকের ব্যবহার শুরু হয় বলে জানাগেছে।

ভেসে ভেসে ৪৫০ কিলোমিটার:
তরুন ভ্রমন পিপাসু শাহজালার নোমানের নিজের তৈ‍রি করা কায়াক নৌকাটি সড়ক পথে কুড়িগ্রামে নিয়ে যান তিনি। সেখান গত ২২ অক্টোবর কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কচাঘাটা ইউনিয়নের ব্রক্ষ্মপুত্র নদী থেকে তিনি যাত্রা শরু করেন। সেখান থেকে সূর্যের আলো থাকা পর্যন্ত প্রথম দিনে নুন খাওয়ার চরে এসে পৌছায় তিনি। পরের দিন ভোর থেকে আবার তার কায়াক ভেসে চলে ভাসতে ভাসতে পৌছায় চিলমারীর আস্টামীর চরে। সেখানে রাতে যাত্রা বিরতির পরে যাত্রার তৃতীয় দিনে গাইবান্ধার ফুলছড়ির চরে আবার রাত্রি যাপন। পরের দিন সেখান থেকে সিরাজগঞ্জের কাজিপুরে পৌছান তিনি। ইতি মধ্যে তার এই দুঃসাহসিক যাত্রার ৪র্থ দিন অতিবাহিত হয়। পরের দিন যমুনা নদী পাড়হয়ে মাঝ খানে একটি চরে রাত কাটান। এর পরের দিন মানিকগঞ্জের হরিরামপুর পৌছায় তিনি। আবার ভেরের সূর্য্য উঠতে না উঠতে মাওয়া পাড় হয়ে পদ্মার চরে রাত্রি যাপন শেষে পরের দিন নড়িয়া থেকে শরিয়তপুরের আড়িগাও বাজারে পৌছায়। সেখানে নদীর তীরে তারঁ কায়াকটি রেখে একটি আবাসিক হোটেলে রাত্রি যাপন করে। সেখান থেকে পরের দিন তিনি পৌছায় বরিশালের টরকী বন্দরে। সন্ধ্যার পরে সেখানে পৌছালে তিনি সেখানেও একটি আবাসিক হোটেলে রাত্রি যাপন করেন। ওই দিন ভোরে সেখান থেকে যাত্রা শুরু করে ঝালকাঠির বাউকাঠি নামক স্থানে পৌছানোর পর তার কেটে গেছে ১০টি দিন। ১১তম দিনে বাউকাঠি থেকে ভাসতে ভাসতে তিনি পৌছায় বরগুনার বামনা উপজেলায়। সন্ধ্যার পরে বিষখালী নদীতে একটি অপরিচিত মডেলের নৌকা দেখে উৎসুক জনতা তার কাছে যায়। তিনি ততক্ষনে ক্লান্ত শ্রান্ত। স্থানীয়রা কোন মতে তাকে নদী থেকে উদ্ধার করে। পরে কিছু সময় বিশ্রামের পর তাকে বামনা জেলা পরিষদ ডাকবাংলোয় রাত্রিযাপনের ব্যবস্থা করে দেয় স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান চৌধূরী কামরুজ্জামান সগির। এভাবেই সেখানে ওই দিন রাত্রি যাপন করে পুনরায় ১২তম দিনে গত ০৩ নভেম্বর বিষখালী নদীর বুক হয়ে পৌছায় বরগুনার পাথরঘাটায়। আর সেখানে তিনি সমাপ্ত করেন তার ৪৫০ কিলোমিটার লম্বা নদী পথে একাই ভেসে চলার গল্প।

দীর্ঘ নৌ পথের চরাই-উত্রাই:
ব্রক্ষ্মপুত্র থেকে শুরু হলে ও নদীর বিশালতা ও নদীর উম্মাদনা তেমন না থাকলেও সেটা অনুভুত হয়েছে সর্বনাশা পদ্মার বুকে এসে। পদ্মার ঢেউয়ে নিজেকে বাঁচাতে মেঘনা নদীর বুকে তাঁর নৌকা নেওয়া সম্ভব হয়নি। ভবন সমান উচ্চতার ঢেউ আর নদীর স্রোত তাকে আর মেঘনা নদী দেখতে দেয়নি। কোন মতে নড়িয়ার ভিতর থেকে তিনি টরকী পৌছান। নদীর ঢেউয়ের ভয়াবহতা উত্তোরণ করতে পাওলেও বাউকাঠির খালে প্রবল কচুরিপানার স্তুপে আটকে যায় তার কায়াকটি। স্রোতের বিপরিতে নৌকা চালানো গেলেও কচুরিপানার জটে আটকে পড়ে তিনি। হাতের বৈঠার আঘাতে আঘাতে কচুরিপানা ভেঙ্গে কোন মতে বাউকাঠি পৌছায় তিনি। নতুন আগন্তুক। তাই অনেকেই তেমন ভালোভাবে তাকে নতুন জায়গায় মেনে নেয়নি। অনেকেই রাত্রি যাপনের স্থানটুকুও দেয়নি। তবে অনেক ভালো মানুষ এখনো এই দেশে আছে বিধায় তিনি বেশ ভালোভাবেই সবস্থানে রাত্রিযাপন করেছেন।

শাররীক অবস্থা:
প্রায় ১২ দিন নদীতে ভাসতে ভাসতে তার নিতম্ব ও কোমড়ে চর্মজাতীয় রোগের সৃষ্টি হয়েছে। বসতে বা চিৎ হয়ে শুয়ে থাকতে তার বর্তমানে বেশ কষ্ট হচ্ছে।

দুঃসাহসিক অভিযাত্রার অভিযাত্রী নোমান আমার সংবাদকে বলেন:
প্রতিকূল পরিবেশে দুঃসাহসিক অভিযাত্রার নায়ক শাহজালাল নোমান বলেন, শুধু নদী পথ নয় আমি এই যাত্রা নদী থেকে আকাশ পথে করতে চাই। নিজের তৈরী আকাশযান তৈরীর চিন্তা আছে আমার। আমি হিমালয় পর্বতের সবচেয়ে উচুশৃঙ্গে উঠতে চাই। আশা করি তা আমি পারবোই। নদী পথের অপরুপ সৌন্দর্য এদেশের ও বিশ্বের মানুষের মাঝে তুলে ধরতেই আমার এই অভিযাত্রা।

নোমানের বাবা অবসরপ্রাপ্ত বিজেপি কর্মকর্তা মাহবুবুর হক আমার সংবাদকে বলেন :
আমার একমাত্র ছেলে নোমান ছোটবেলা থেকেই একটু খেয়ালী স্বভাবের। যখন যেটা মনে আসে সেটা নিয়েই ব্যস্ত থাকে সব সময়। প্রথমে একটি সাইকেলে সে দেশের ৫৪টি জেলা ঘুরে বেড়িয়েছে। সেখানে তার সাথে অনেকেই ছিলো। কিন্তু এবারের যাত্রাটায় আমরা পরিবারের সবাই বেশ চিন্তিত ছিলাম। একাই বিশাল নদী পথে যাত্রা করায় ওর মা চিন্তায় চিন্তায় ব্যাকুল প্রায়। তবে আমার দৃঢ় বিশ্বাস ছিলো নোমান এ কাজটা সফলভাবে পারবেই। এবং ও পেরেছেও। কুড়িগ্রাম থেকে বরগুনার পাথরঘাটায় পৌছে সে লঞ্চযোগে পাথরঘাটা থেকে ঢাকায় পৌছাইছে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত