শিরোনাম

ভূত-পেতনিদের দিন হ্যালোউইন

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ১১:৪৯, নভেম্বর ০৩, ২০১৮

চারিদিকে হুহু বাতাসের আওয়াজ। আকাশে চাঁদ। বাইরে সব পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। পিপলী সাহা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখে রাত ২টা। কোথাও টু শব্দ নেই। হঠাৎ আকাশে কালো মেঘ করলো এবং চারপাশে নেমে এলো ঘোর অন্ধকার। পিপলী সাহার ঘরের টেবিলে রাখা ছিলো মোমবাতি। জানালার ফাঁক দিয়ে বাতাস ডুকে দপ করে নিভে গেলো। আর চাঁদ কোথায় হারিয়ে গেলো কালো মেঘের আড়ালে পিপলী বুঝতেই পারলো না। ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘর। পিপলী সাহা একা রয়েছে ঘরে। হঠাৎ পায়ের আওয়াজ, দরজায় ঠক্ ঠক্ শব্দ। কে এলো এত রাতে? দরজা খুলতেই মূর্ছা যাবার জোগাড়। লম্বা টুপি মাথায়, হাতে উড়ন্ত ঝাড়ু নিয়ে দাঁড়িয়ে নাক বাঁকানো হ্যালোইন ডাইনি! ভূত বা আত্মাদের স্মরণ নিয়ে সবচেয়ে বড় আয়োজন মানেই হ্যালোউইন। গত ৩১ অক্টোবর সারা বিশ্বে হ্যালোউইন ডে বা ভূত-পেতনি, ডাইনি, আত্মাদের দিবস বলা হয়। এবার এই হ্যালোউইন নিয়ে লিখেছেন-জিয়া উল ইসলাম

১৭৪৫ খ্রিষ্টাব্দের দিকে “হ্যালোইন” বা “হ্যালোউইন” শব্দটির উৎপত্তি। “হ্যালোইন” শব্দের অর্থ “শোধিত সন্ধ্যা” বা “পবিত্র সন্ধ্যা”। এই শব্দটি স্কটিশ ভাষার শব্দ “অল হ্যালোজ” “ইভ” থেকে এসেছ। স্কটে ব্যবহৃত “ইভ” শব্দটি সংকুচিত বা সংক্ষিপ্ত হয়ে “ইন” হয়ে যায়। এভাবে সময়ের সাথে পরিবর্তিত হয়ে “হ্যালোজ” “ইভ” শব্দটি “হ্যালোইন”-এ রূপান্তরিত হয়। আয়ারল্যান্ডের এক ইন্দো ইউরোপিয়ান জনগোষ্ঠী যাদের কেল্টিক নামে ডাকা হতো। তাদের ক্যালেন্ডারের নাম গেলিক। সেই ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ৩১ অক্টোবর থেকে শীতের শুরু। এইদিন ফসল কাটা শেষ হয় তাদের। এই দিনটাকে বলা হয় সাম-হীন।‘সাম-হীন’ শব্দটির অর্থ হল ঊহফ ড়ভ ঃযব ংঁসসবৎ অর্থাৎ গ্রীষ্মকালের সমাপ্তি। এই কেল্টিক সভ্যতায় সাম-হীন কে মৃত্যুর দেবতা হিসেবে ধরা হত। আয়ারল্যান্ড শীতপ্রধান অঞ্চল, শীতকাল বেশ কষ্টকর ছিল জীবনধারণের জন্য। সেই সময়টাকে তারা অশুভ সময় মনে করত। তাহলে সেই দিনটি হচ্ছে অশুভ সময়ের শুরু। তারা বিশ্বাস করত জীবিত এবং মৃতদের জগতের মাঝে যে সূক্ষ্ম ফাঁক থাকে সেটা এইদিন বিলুপ্ত হয়ে যায়। মৃত মানুষ গুলো তখন নেমে আসতে পারে পৃথিবীতে। পরবর্তীতে এই এলাকা গুলোতে খ্রিষ্টান ধর্ম প্রাধান্য পেলেও এই দিনটিকে এখনো তারা সংস্কৃতি হিসেবে ধরে রেখেছে। এখনকার হ্যালোইন এর রীতিনীতি কেল্টিক ভাষী দেশগুলোর লোকজ রীতিনীতি ও বিশ্বাস দ্বারা প্রভাবিত বলে ধারণা করা হয়; সেসব দেশের কয়েকটি প্যাগান বা পৌত্তলিক ধর্মাবলম্বি আর অন্যান্যগুলো কেলটিক খ্রিস্টধর্ম অবলম্বন করে থাকে। জ্যাক স্যানটিনো, একজন লোকাঁচারবাদি, লিখেছেন “উত্তর আয়ারল্যান্ডে পবিত্রতা ও ধর্ম হলো হ্যালোইনকে বোঝার মৌলিক প্রসঙ্গ, কিন্তু এই উৎসব উৎযাপন নিয়ে আয়ারল্যান্ডের সর্বত্র একটি অস্বস্তিকর সাময়িক যুদ্ধবিরতির পরিস্থিতি সৃষ্টি হয় খ্রিস্টধর্মের রীতিনীতি ও বিশ্বাস এবং পুর্বে আয়ারল্যান্ডে যেসব ধর্ম প্রতিষ্ঠিত ছিলো তাদের মধ্যে”। ইতিহাসবিদ নিকোলাস রজার্স “হ্যালোইন” এর মূল উৎসের অনুসন্ধান করার সময় লক্ষ্য করেন, “কিছু লোকাঁচারবাদি হ্যালোইন এর উৎস খুজে পেয়েছিলেন ফল ও বীজের দেবীকে উত্সর্গীকৃত পোমোনার রোমান ভোজোত্সবে, অথবা মৃতদের উৎসব প্যারেন্টালিয়াতে; এবং এই উৎসবগুলো সাধারনত কেল্টিকদের সামহেন উৎসবের সাথে সম্পৃক্ত”। আইরিশ, যুক্তরাজ্য, ওয়লেশ সম্প্রদায়ের লোকেরা বিশ্বাস করতো যে প্রত্যেক নতুন বছরের আগের রাতে (৩১শে অক্টোবর) সাহেইন, মৃত্যুর দেবতা, আঁধারের রাজপুত্র, সব মৃত আত্মা ডাক দেয়। এই দিন মহাশূন্য এবং সময়ের সমস্ত আইনকানুন মনে হয় স্থগিত করা হয় এবং জীবিতদের বিশ্ব যোগদান করতে মৃত আত্মাদের অনুমোদন করে। তারা আরও বিশ্বাস করতো যে মৃত্যুর কারণে তারা অমর যুবক হয়ে একটি জমিতে বসবাস করতো এবং আনন্দে ডাকা হতো। মাঝে মাঝে বিশ্বাস করতো যে স্কটল্যান্ড এবং আয়ারল্যান্ড অঞ্চলের ছোট পাহাড়ে কখনো কখনো মৃতরা পরীদের সাথে থাকে। একটি লোককাহিনী থেকে বর্ণিত আছে যে সমস্ত মৃত ব্যক্তিরা ৩১শে অক্টোবর রাত্রিতে জীবিতদের বিশ্বে আসে আগামী বছরের নতুন দেহ নেওয়ার জন্য। এজন্য গ্রামবাসীরা এই খারাপ আত্মাদের থেকে বাঁচার জন্য ব্যবস্থা নেয়। এই প্রথাটি ছিল পবিত্র বেদি আগুন বন্ধ করা এবং নতুন আগুন জ্বালানো হতো) পরবর্তী প্রভাতে। আইরিশ, যুক্তরাজ্যবাসী কেল্টদিগের পরোহিতরা তারা মিলিত হতো একটি অন্ধকার বনের ছোট পাহাড়ে নতুন আগুন জ্বালানোর জন্য এবং বীজ ও প্রাণী উৎসর্গ করতো। আগুনের চারিদিকে নাচতো এবং গাইতো প্রভাত পর্যন্ত, পথ অনুমোদন করেতো সৌর বছর এবং আঁধার ঋতু মধ্যে। তাছাড়া ১ নভেম্বর ‘অল সেইন্টস ডে’ পালিত হয় যা যিশু খ্রিস্টের জন্য শহীদদের স্মরণার্থে পালিত হয়। এর আগের দিনের সন্ধ্যাবেলা থেকে শুরু ‘অল হ্যালো’স ইভ। এর নামই পরবর্তীকালে হয়েছে হ্যালোউইন। তবে ইতিহাসবীদদের মতে, ষোড়শ শতকে আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলসের অধিবাসীরা অতৃপ্ত আত্মা দূরীকরণে টারনিপের ব্যবহার করতেন। কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে টারনিপ চাষ হয় না। কিন্তু উনিশ শতক থেকে মার্কিন মুলুকেও ব্যাপক হারে পালিত হতে থাকে হ্যালোউইন। তাই অভিবাসনের পর আয়ারল্যান্ড, স্কটল্যান্ডের অধিবাসীরা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার পর হ্যালোউইনে টারনিপের বদলে কুমড়া ব্যবহার করতে শুরু করেন।

কেন হ্যালোউইনে ভৌতিক পোশাক ও মুখোশ পড়ে সবাই
সবাই নানা ধরনের ভৌতিক পোষাক ও মুখোশ পড়ে রাস্তায় বের হয় এবং বাচ্চারা বিভিন্ন ভৌতিক পোষাক পড়ে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বিভিন্ন মিষ্টি সংগ্রহ করে এই হ্যালোউইন উৎসবে কিন্তু কেন? তৎকালীন সমাজের মানুষরা মনে করত যে এইদিন মৃতরা তাদের মাঝে এই পৃথিবীতে তাদের সঙ্গেই ঘুরে বেড়ায়। সেই আত্মারা যেন তাদের ক্ষতি না করতে পারে, তাদেরকে নিজেদেরই একজন মনে করে সেজন্য তারা বিভিন্ন ভৌতিক পোষাক পড়ে রাস্তায় বের হত। আর এই আত্মাদের সন্তুষ্ট করার জন্যই তারা তাদের বাড়িতে ভৌতিক পোষাকে কেউ এলেই মিষ্টি দিয়ে খুশি করার চেষ্টা করত। কারণ সবাই মনে করতো এই এদের সাথে অতৃপ্ত আত্মা গুলো আছে। তাই ভৌতিক পোষাক পড়ে সবাই একাকার হয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতো।

উৎসবে রূপকথার মিষ্টি কুমড়ো ব্যবহার
হ্যালোউইনে উৎসবে মিষ্টিকুমড়ো ব্যবহার নিয়ে আছে এক রুপকথা। এই রূপকথার কাহিনীটা এসেছে আইরিশ রূপকথা থেকে। জ্যাক ও ল্যান্টার্ণটা হচ্ছে মিষ্টিকুমড়োর প্রদীপ। কেল্টিক বিশ্বাস অনুযায়ী জ্যাক নামের এক প্রতারক একবার ডেভিলকে তার সাথে মদ পান করার জন্য আহ্বান করলো। ডেভিল তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে মদ পান করতে আসলো জ্যাক এর সাথে, মদ পান শেষ করে জ্যাক বললো আমার কাছে তো টাকা নাই তুমি কি নিজে কয়েন (টাকা) হতে পারবে যাতে আমি মদের টাকা শোধ করতে পারি, ডেভিল তাকে বিশ্বাস করে কয়েন হয়ে গেলো, কিন্তু দেখা গেলো জ্যাক তাকে পকেটে ঢুকিয়ে ফেলল আর বের করল না। ডেভিল তখন তাকে অনুরোধ করতে লাগল তাকে ছেড়ে দেয়ার জন্য। জ্যাক তার কথায় রাজি হলো এই শর্তে যে ডেভিল আর কখনো তাকে বিরক্ত করবেনা এবং তার মৃত্যুর পর তাকে দাবি করবে না। একদিন জ্যাক মারা গেলো কিন্তু সে স্বর্গে যেতে পারলো না কারণ সে প্রতারক আর ডেভিল তাকে নরকে নিতে পারছেনা যেহেতু সে প্রমিজ করেছ, তখন ডেভিল কয়েক টুকরা জ্বলন্ত কয়লাসহ জ্যাককে ছেড়ে দিলো অন্ধকার ঘরে, জ্যাক সেখানে একটা মিষ্টিকুমড়া দেখতে পেলো যাকে ছিদ্র করে তার ভেতরের সব উপাদান বের করে জলন্ত কয়লা রাখলো এবং সেই থেকে জ্যাক এর আত্মা সারা দুনিয়ায় ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই থেকে এইভাবে মিষ্টিকুমড়োর ভেতর বাতি জ্বালিয়ে এই রূপকথা স্মরণ করা হয়।
যুক্তরাষ্ট্র : মার্কিনীদের মধ্যে হ্যালোউইন উৎসব অনেকটা জাতীয় উৎসবের রূপ নিয়েছে। গত কয়েক দশক ধরে চলা হ্যালোইন উৎসবের রীতি এখন প্রায় বিভিন্ন দেশ থেকে সেখানে অভিবাসী হওয়াদের মধ্যেও প্রচলিত। হ্যালোউইন উৎসবে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে বিভিন্ন কমিউনিটির মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন আয়োজন দেখা যায়। তবে কুমড়ো সাজ, ভুতুড়ে সাজসজ্জা সবক্ষেত্রেই দেখা যায়। কস্টিউম পার্টি হয় প্রায় সবখানেই। আর এদিন উপলক্ষে ভুতুড়ে কোনো স্থানেও তরুণদের বেশ ঝুঁকি নিয়েও ঘুরতে দেখা যায় দলধরে।
লাতিন আমেরিকায় হ্যালোউইন : লাতিন আমেরিকায় হ্যালোউইন পরিচিত ‘ডে অফ দ্য ডেড নামে’। মেক্সিকো ও স্পেনে নভেম্বর মাসের প্রথম দু’দিন পালিত হয় মৃতদের দিন। তবে মৃতদের সমাধিক্ষেত্রে শ্রদ্ধা জানানোর পরই উৎসবে মেতে ওঠে লাতিনরা। অনুষ্ঠিত হয় ভুতুড়ে সাজসজ্জার প্যারেড যা, প্রায় হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য।
অস্ট্রিয়া : ৩০ অক্টোবর থেকে ৮ নভেম্বর টানা একসপ্তাহ ‘অল সোলস উইক’ পালন করা হয়, যা ‘সেলিনোচ’ নামে পরিচিত। এই সময়টা পূর্বপুরুষদের মৃত আত্মার উদ্দেশ্যে টেবিলের খাবার, পানি ও আলো জ্বেলে রেখে ঘুমাতে যান অস্ট্রিয়ানরা।
জার্মানি : জার্মানিতে হ্যালোউইনে ছুরি, কাঁচিসহ ধারালো

দেশে দেশে হ্যালোউইন
জিনিসপত্র সব লুকিয়ে ফেলেন সে দেশের জনগণেরা। আর বার্লিনের হ্যালোউইন কস্টিউম পার্টি পৃথিবী বিখ্যাত।
চেক রিপাবলিক : বাড়ির ফায়ারপ্লেসের পাশে পরিবারের প্রত্যেক মৃত সদস্যের জন্য চেয়ার সাজিয়ে রেখে ঘুমোতে যান চেকরা। আত্মারা নেমে এসে পরিবারের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে যান বলেই বিশ্বাস তাদের।
জাপান : হ্যালোউইন জাপানে ‘ফেস্টিভ্যাল অফ হাঙ্গরি গোস্টস’ নামে পরিচিত। আর হ্যালোউইন অক্টোবর বা নভেম্বর মাসেই নয়, পুরো গ্রীষ্মকালজুড়েই পালিত হয়। আত্মাদের ভয়ে সারারাত ধরে আগুন জ্বলে।
চীন : চীনে নিজস্ব ক্যালেন্ডারের শেষে পালিত হয় ভুতুড়ে দিন। জাপানিদের সঙ্গে মিল রেখে আগুন জ্বালিয়ে আত্মা দূর করে চীনারা।
বাংলাদেশ : হ্যালউইন উৎসব এখন শুধু ইউরোপ কিংবা আমেরিকায় সীমাবদ্ধ নেই। ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বময়। এখন এই উৎসব পালন করা হয় বাংলাদেশেও। রাজধানীর কয়েকটি পাঁচতারকা হোটেলে হ্যালোউইন পার্টি আয়োজন করা হয়। এছাড়া ব্যক্তিগত আয়োজনেও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় কস্টিউম পার্টি অনুষ্ঠিত হয়। গুলশান ও ধানমন্ডির অভিজাত এলাকাগুলোতে এই উৎসব কেন্দ্র করে বেশ জমজমাট আয়োজন হয়ে থাকে।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত