শিরোনাম

প্রকৃতির রাজকন্যা বিছানাকান্দি

প্রিন্ট সংস্করণ॥হাসান আরিফ  |  ১৭:৪৬, আগস্ট ৩০, ২০১৮

রাত নয়টা পঞ্চাশ মিনিটে ট্রেন ছাড়ার সময়। আমি সময়ের খানিক আগেই কমলাপুর রেল স্টেশনে হাজির। উদ্দেশ্য একদিনে সিলেটের বিছানাকান্দি ঘুরে আসা। একরাত সিলেট সার্কিট হাউসে থেকে পরের দিন ঢাকা ফিরে আসবো। আমার সঙ্গী আরো দু’জন আছে। যদিও তারা এখনো আসেনি। চলে আসবে তাজানি। তারা দু’জন এক সাথেই আছে। সময় একটু একটু করে ট্রেন ছাড়ার কাছাকাছি এগুচ্ছে। এখনো বাকি দুজনের সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। নয়টা পয়তাল্লিশ মিনিটে সঙ্গী দু’জনের একজনকে কল দিলাম, কল রিসিভ করেই বলছে, আমরা আসছি। ঘড়ির কাটা তত সময়ে আরো কয়েক মিনিট এগিয়ে গেছে। তারপরও তাদের দেখা নেই। আবারো কল দিলে, ওরা বলছে, আসছি। ততক্ষণে নয়টা পঞ্চাশ বেজে গেছে। এবার মনে বিছুটা সংঙ্কা, তবে কি তারা আসছে না! মনে মনে ভাবলাম শেষ বারের মতো একটা কল দেই। কল দিতেই অপর প্রান্ত থেকে বললো এইত আমরা। সামনে তাকিয়ে দেখি দু’জন দৌড়াতে দৌড়াতে আসছে। সামনে আসতেই তারা বললো, তারা নাকি স্টেশনেই ছিল, কথাটার সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও তা নিয়ে কথা বাড়ানো সমচিৎ মনে না হওয়ায় নিরব থাকলাম। তবে তাড়াতাড়ি ট্রেনে উঠার জন্য তাগাদা দিয়ে, নিজেও সহায়তা করলাম। তিনজন যখন ট্রেনে বসি, তখন রাত দশটা বেজে গেছে। তারা আসাতে সস্তি হলেও, অসস্তি আবার বাড়তে থাকলো। ট্রেন ছাড়ছে না। সময়ের ট্রেন সময়ে ছাড়লে আমার দুই সঙ্গী হয়তো ট্রেন মিস করতো। এখন আর অতিরিক্ত সময় অপেক্ষা করতে মন চাইছে না। পাশে প্লাটফর্ম থেকে পরের ট্রেনও ছেড়ে যাচ্ছে দেখে বিরক্ত আরো বেড়ে যাচ্ছে। সঙ্গী দু’জনও তাদের অসস্তির কথা জানান দিচ্ছে। এক সময় ট্রেন চলার হুইসেল দিলে সস্তি কিছুটা ফিরে আসে। তখন ঘড়ির কাটা সাড়ে দশটা ছাড়িয়ে গেছে। সকাল পাঁচটার পর ট্রেন পৌঁছে দিলো সিলেটে। সেখানে আগে থেকেই কথা বলে রাখা সার্কিট হাউসের উদ্দেশ্যে পায়ে হেটে সিলেটের কিং ব্রিজের উপর যাওয়ার সময় তিনজনের সেলফি তোলা। এসময় আমার সঙ্গী রহমান আজিজ ট্রেনে একটু ঝামেলায় ফেলেছিল তাও ভুলে যাই। যদিও সে ঝামেলা থেকে ওকে উদ্ধার করতে আমার বেশ বেগ পেতে হয়েছিল। অপর সঙ্গী আবু আলীও সাথেই ছিল। সেলফি তোলার সময় একজন পুলিশ বাধা দিলো। কথা নাবাড়িয়ে গন্তব্যের উদ্দেশ্যে চলে গেলাম। সার্কিট হাউসে গিয়ে একটু ফ্রেশ হয়ে, আবারো বেড়িয়ে পরি। দিনটা পহেলা মে থাকায় সমস্ত দোকানপাট আর যানবাহব বন্ধ। ফলে সকালের নাস্তা করা সম্ভব হবে কি না তার নিশ্চয়তা নেই। যে পুলিশ আমাদের কিং ব্রিজ থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, সেই পুলিশের সহায়তাই চাইতে হলো। তিনি জানান, আপনারা যেহেতু বিছানাকান্দি যাবেন তাহলে কিছুটা সামনে আম্বরখানা সিএনজি স্টেশন গেলে খাবার হোটেল পাবেন। ওইখান থেকেই বিছানাকান্দির সিএনজিও পাবেন। আম্বরখানা সিএনজি স্টেশন যেতে জন প্রতি ১০ টাকা সিএনজি ভাড়া। সেখানে গেলে দু’তিনটা হোটেল খোলা আছে। এর মধ্যে ভাল একটা হোটেলে পরোটা, ভাজি আর ডিম খেয়ে বেড়িয়েই সিএনজির খোজ শুরু করলাম।একটু সামনে যেতেই লম্বা লাইনে লাইনে একটার পেছনে একটা সিএনজি দাড়িয়ে আছে। কাছে যেতেই ‘বিছনাকান্দি যাইবেন’, ভাড়া জানতে চাইলে দুই হাজার টাকা দাম হাকেন। এর নিচে কেউ যাবে না। আর কেই সিরিয়ালও ভঙ্গ করবে না। কিন্তু একদাম এক রেট বিষয়টি আমার ভাল না লাগায় আমরা একটু সামনের দিকে এগুতেই অপর দিক থেকে আসা এক সিএনজি চালককে বললাম বিছানাকান্দি যাবা। সে যেতে চাইলে, দরমাম করে বারো শত টাকায় যেতে রাজি হলে আমরা তার সিএনজিতে উঠে পড়ি।সিএনজি কিছু দূর এগুতেই পেছন থেকে আরেকটা সিএনজি আমাদের সিএনজিকে ধাওয়া করা শুরু করে। ওই সিএনজি আমাদের সিএনজিকে আটকানার চেষ্টা করছে। বিপদ বুঝে আমরা কিংকতর্ব্যবিমূঢ় হয়ে পরি। এক সময় ধাওয়া করা সিএনজিটা আমাদের সিএনজির গতিরোধ করে। ওই সিএনজি থেকে তিনজন এসে আমাদের সিএনজির চালকের উপড় চড়াও হয়। তাদের কথা বার্তায় যা বুঝা গেলো তা হচ্ছে, বিছানাকান্দ্রি যেতে হলে লাইলেন সিএনজির বাইরে অন্য কোন সিএনজি যেতে পারবে না। যেতে হলে তাদের সিএনজি নিয়েই যেতে হবে। লোকগুলি আমাদের সিএনজি তাদের স্ট্যান্ডে নিয়ে যেতে চাইছে। অবস্থা বেগতিক দেখে আমাদের চালক ইশারা দিয়ে নেমে যেতে বলে। আমরা তার কথামতো নেমে যাই এবং একটা চায়ের দোকানে গিয়ে চা খেতে থাকি। এর মধ্যে চালকের সাথে কথা হয় সে সিএনজি নিয়ে সামনে চলে যাবে, আমরা পরে তাকে নিয়ে বিছানাকান্দি যাব। কিন্তু ধাওয়া করে আসা লোকগুলো আমাদের চায়ের দোকানের সামনেই অপেক্ষা করতে থাকে। একবার এসে জানতেও চায়, আমরা বিছানাকান্দি যাব কি না। আমরা তাদের যাবনা বলে চা খাওয়ার মন দেই। কিছুটা সময় গল্প করে একটা সময় আমরা দোকান থেকে বের হলে, তারা আবারো জানতে চায়, আমরা কি বিছানাকান্দি যাব না। গেলে তাদেরকে নিয়েই যেতে হবে। আমরা তাদেরকে না বলে, সামনে এগিয়ে যাই। কিছু দূর গেলে আমাদের জন্য অপেক্ষমান সিএনজিতে উঠে বিছানাকান্দির দিকে অগ্রসর হতে পেছন থেকে আবারো সেই লোকগুলো ধাওয়া করতে থাকে। এবারো ধাওয়া করা সিএনজির লোকগুলো আমাদের সিএনজির গতিরোধ করে। তাদের এই ব্যবহারে আমাদের মধ্যেও একটার জিদ চেপে বসে। এবার তাদেরকে আমরা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করি। এসময় আমাদের এই ছোট জটলা দেখে স্থানীয় দ’একজনও এগিয়ে আসেন। তারাও ঘটনা শুনে আমাদের সমর্থনেই কথা বললেন। কিন্তু কে শুনে কার কথা। আমাদের সাথে ক‚লাতে না পেরে তারা তাদের বসকে কলদিয়ে আসার জন্য বললে, আমাদের চালক কিছুটা ঘাবরিয়ে যায়। তবে আবারো আমাদের রহমান আজিজ তার সভাবসুলভ ভাবেই পারেত তাদের ঘাড় মটকিয়ে দেয়। তাকে কোনরকম থামানোর চেষ্ট আর ওদের প্রতিরোধ এক কঠিন সমস্যা হয়ে দাড়ায়। আবু আলীও তার স্বাধ্যমতো প্রতিরোধ করে চলছে। কোন ভাবেই নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে আমার মেজাজ চড়া হয়ে আমিও লোকগুলিকে বলি পারলে তারা এখান থেকে এই সিএনজি নিয়ে যাক। এভাবে চলতে থাকায় অবস্থা বেগতিক দেখে আমাদের সিএনজি চালকই এক সময় অনুরোধ করে আমরা যাতে তাকে ছেড়ে দেই। চালক আমাদের বুঝাতে চেষ্টা করছে, তাকে নিয়ে গেলে ফিরে আসার পর তাকে ঝামেলায় পড়তে হবে। তখন তার জন্য কেউ থাকবে না। তার এই অসহাত্ব দেখে সিএনজি ছেড়ে দিতে আমরা বাধ্য হলাম। এসময় রহমান আজিজের প্রতি আমার একটু বিশেষ নজর ছিল কারণ, ট্রেনে দুই দফা ঝামেলা পাকানোর কারণে। প্রথমবার ভৈইরবের হাকারদের সাথে আজিজের ঝামেলার শুরু হয়, একজনের ট্রেনের ভিতরে সিগারেট খাওয়াকে কেন্দ্র করে। আজিজ লোকটাকে সিগারেট খেতে বারণ করে। তখন লোকটা বলে, সিগারেট জানালার বাইরে রেখে খাচ্ছে তাতে সমস্যা কি। কিন্তু আজিজ তা মানতে নারাজ। এক কথায় দুই কথায় তা বড়আকাড় ধারণ করে। তখন ছিল মাঝ রাত। এসময় হকার গ্রুপ এক হয়ে আজিজকে কিছু একটা করার পরিকল্পনা করে। আমি এসময় কিছুটা দূরে থাকায় ঘটনার শুরেতে কিছুই জানতে পানিনি। ঘটনা বড় আকার ধারণ করলে কোনরকম মধ্যস্থতা করে তাদের থামাতে সমর্থ হলেও আজিজকে থামানোই দায় হয়ে পরে। যাই হউক কোন রকম একটা সমাধান করার পর লোকগুলি ভৈরব স্ট্রেশনে নেমে যায়। অপর ঘটনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন ছাত্রের সাথে। একটু দূরের দুই পাশে মেঘে ঢাকা মেঘালয় পাহাড় যেন স্বাগত জানায়। অবাক বিস্ময়ে বিছানাকান্দির রূপ দেখতে দেখতে এগোতে থাকলেই মূল স্পটে গিয়ে জলকেলিতে মেতে ওঠা আর পাথরে পাথরে হাটা যেনো অন্যরকম এক রোমাঞ্চ। শত শত পর্যটক পাহাড়ি নদীর শীতল পানিতে নেমে পরেছেন। কেউ নিজেকে ভিজিয়ে নিচ্ছেন ঘন্টার পর ঘন্টা। কেউ দল বেঁধে হুলুস্থুল করছেন। এদিক সেদিক অসংখ্য যুগল পানিতে থাকা ছোট ছোট পাথরে বসে গল্প জুড়ে দিয়েছেন। সামনে পাহাড়, পাহাড়ি ছোট গ্রাম, পাহাড়ি রাস্তার ছবি আর সেসব থেকে নেমে আসা বালুচরে নদীর ধারা যে কারো কয়েকঘন্টা সময় নয়, দিন পার করে দিতে একটুও ক্লান্তি লাগবে না। তবে বুক জুড়ে এক কষ্ট থেকেই যাবে-সামনে যেসব পাহাড় , গ্রাম দেখতে পাবেন তা কোনটাই আমাদের দেশের নয়। সবই পড়েছে ওপারে ভারতে। বিছানাকান্দিতে রয়েছে ছোট-বড় অগণিত পাথরের সমারোহ। চারপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে অজস্র পাথর, দেখে মনে হয় পুরো এলাকাটাই পাথরের বিছানা। পিয়াইন নদীর অগণিত পাথরের মাঝে হাঁটতে হবে সাবধানে পা ফেলে। একটু অসাবধানতার ফলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে। আমি নিজেই কয়েকবার পড়ে ব্যাথা পেয়েছি। পানির গভীরতা কম হলেও পাথরের মাঝে ভ্রমণকে করবে আরো রোমাঞ্চিত। একটু পরপর বিজিবি সদস্যদের সতর্কবাণী এনে দেবে আরোকটু অব্যধ্য হওয়া। তবে কোন ভাবেই ভারতীয় সীমানায় প্রবেশ করা ঠিক হবে না। যদিও আমরার অবাধ্যতার চুড়ান্ত পর্যায়ে গিয়েছিলাম। পিয়াইন নদী পাড় হয়ে উঠে পরেছিলাম মেঘালয় রাজ্যের পাহাড়ে। সেখানে একক আর গ্রুপ ছবি তোলায় এতোটাই মেতে ছিলাম যে, ভুলেই গেছিলাম এইটা আমাদের দেশ নয়। একসময় বিজিবির সতর্ক বাশি আর হাক ডাকে বুঝতে পারি তাদের মূল লক্ষ্য আমরাই। ফলে বাধ্য হয়েই ফিরে আসতে হলো।জলপাথরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের ওপরে নীল আকাশ মেঘের ছড়াছড়ি। ডানে-বাঁয়ে সামনে মেঘালয়ের উঁচু পাহাড়। পাহাড়ের গায়ে বেপরোয়া সাদা মেঘের দলগুলো যেন আঠার মতো লেগে থাকে হেলান দিয়ে। মাঝে ঝরনার বর্ষণধারা। স্বচ্ছ শীতল পানির তলদেশে পাথরের পাশাপাশি নিজের শরীরের লোমও দেখা যাবে স্পষ্ট। বর্ষায় এর সৌন্দর্য বৃদ্ধির সাথে সাথে বিপদ রয়েছে। মেঘালয়ে অতি বর্ষণ হলে ঢলের সৃষ্টি হয়। এসময় পানির উচ্চতা কয়েক হাত বৃদ্ধি পায়। সাবধাণ না হলে ভাসিয়ে নিয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। এখানে দৃষ্টির শেষ সীমানা পর্যন্ত শুধু পাথর আর পাহাড়। এর সৌন্দর্য দেখা গেলেও যাওয়া যাবে না। আন্তর্জাতিক সীমারেখার কারণে। তবে সৌন্দর্যর কারণে নিজেকে সামলানো বড় কঠিন। দীর্ঘ সময় জলপাথরের বিছানায় শুয়ে-বসে গোসল করার পর একই পথে বা ভিন্ন পথে হাদারপার পর্যন্ত ফিরতে হবে। এরপর সিএনজিতে ফের সিলেট শহর। তবে ভাগ্য ভাল হলে ভ্রমণের দিন যদি বডার হাট বসে তাহলে সেখানেও ঘুরার সুযোগ পাওয়া যাবে। আমরা যখন জলকেলিতে মেতে আছি তখন আবার ঝুম বৃষ্টি। আগেই বিজিবি বলেছিল, বৃষ্টি হলেই শ্রোত বেড়ে যাবে। তাই ভয় আর আতংক দুই আছে। দ্রুত পানি থেকে উঠে আশ্রয় নিলাম একটি খাবার হোটেলে। পানিতে নামার আগে এই হোটেলেই আমাদের ব্যাগ রেখে গিয়েছিলাম। হোটেলটি ভাসমান। পানি বৃদ্ধিন সাথে সাথে হোটেলটিও উপরের দিকে উঠতে থাকে। 
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত