শিরোনাম

কেন থাকি উপবাস

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ১৭:৩৯, মে ২৯, ২০১৮

উপোস বা উপবাস থাকা নিয়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক একটি ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, মাঝে মধ্যে উপোস করা শরীর ও মস্তিষ্কের জন্য বেশ উপকারী। আর ধর্মে উপবাস নিয়ে বলা হয়েছে ‘উপবাস” ঈশ্বরের সঙ্গে আধ্যাত্মিক সংযোগ স্থাপন করাকে সাহায্য করে। বৌদ্ধ, হিন্দু, ইসলাম, জৈন ও ইহুদি ধর্মসহ জগতের অনেক ধর্মের মধ্যে উপবাস করা হল এক সাধারণ প্রথা। এবার সেই উপবাস বা উপোস নিয়ে লিখেছেন- জিয়া উল ইসলাম

উপবাস কীঃ উপবাস শব্দের বাংলায় অর্থ অনশন উপোস। সামাজিক বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যে নির্দিষ্ট একটি সময়ের জন্য খাদ্য গ্রহণ না করাকেই বলে উপবাস। বিবাহ, পূজার্চনা , রোজ এবং বিভিন্ন ব্রত উপলক্ষে উপবাস পালন করা হয়। ‘উপবাস করা হল এমন কিছু, যা আপনাকে আধ্যাত্মিকতা নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করতে সাহায্য করে এবং আপনাকে মনে করিয়ে দেয় যে, বস্তগত জিনিসগুলো আপনার জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়।’ বলেছেন একজন ক্যাথলিক ভদ্রমহিলা। ‘উপবাস করা আপনাকে ঈশ্বরের সঙ্গে আধ্যাত্মিক সংযোগ স্থাপন করতে সাহায্য করে।’ বলেছেন একজন ইহুদি রব্বি। ‘আমার বিশ্বাস অনুযায়ী উপবাস করা হল এক বাধ্যবাধকতা, ঈশ্বরের প্রতি আমার ভক্তি ও কৃতজ্ঞতা দেখানোর এক প্রধান উপায়। আমি উপবাস করি কারণ আমি ঈশ্বরকে ভালোবাসি।’বাহাই বিশ্বাসের একজন অনুসারী। সাধনক্ষেত্রে ইন্দ্রিয় সংযম অত্যাবশ্যক কর্ম, আর এ জন্য উপবাস একটি প্রধান উপায়। উপবাস শব্দটির মধ্যে দুটি বিষয়ের দ্যোতনা আছে; একটি হলো খাদ্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকা এবং অপরটি কামনোবাক্যে ইষ্টদেবতার সান্নিধ্য অনুভব করা।দেহ-মনকে সুস্থ ও নীরোগ রাখার জন্যও অনেকে নিয়মিত সাপ্তাহিক বা পাক্ষিক উপবাস পালন করেন। তাঁদের ক্ষেত্রে দৈহিক ব্যাপারটিই প্রধান, মানসিক সংযম সেখানে গৌণ। অপরদিকে যাঁরা ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে উপবাস পালন করেন তাঁরা দেহ-মন উভয় দিক থেকেই সংযত হযে থাকেন। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ এগুলি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও উপবাস বিশেষ ভূমিকা রাখে। উপবাস দ্বারা সংযমী সাধক মন, বুদ্ধি ও প্রজ্ঞা দিয়ে আরাধ্য দেব-দেবীর সান্নিধ্য অনুভব করেন এবং এর মাধ্যমে অন্তরে প্রশান্তি লাভ করেন। তাই আত্মিক ভাবনায় ঋদ্ধ ব্যক্তিগণ দেহ ও মন উভয় সুস্থ রাখার জন্য সপ্তাহের নির্দিষ্ট দিনে, একাদশী তিথিতে অথবা অমাবস্যা ও পূর্ণিমা তিথিতে উপবাস পালন করেন। এছাড়া বিশেষ পূজা-অর্চনাদির সময় ও ভক্তগণ উপবাস পালন করেন। যেমন সরস্বতী পূজা উপলক্ষে হিন্দু ছাত্র-ছাত্রীরা উপবাস পালন করে। ব্যক্তিবিশেষের শক্তি-সামর্থ্য অনুযায়ী উপবাসের প্রকৃতি বিভিন্ন রকম হযে থাকে। যদি কেউ পূর্ণ একটা তিথি (প্রায় চবিবশ ঘণ্টা) উপবাস থাকতে না পারেন তাহলে তিনি স্বাভাবিক আহারের পরিবর্তে কিঞ্চিৎ লঘুখাদ্য গ্রহণ করতে পারেন। আবার কেউ কেউ উপবাসের সময় পানীয় পর্যন্ত গ্রহণ করেন না। বহু সাধক-মহাপুরুষের জীবনে ক্রমাগত দুই, তিন, চার, পাঁচদিন ব্যাপী উপবাসের কাহিনীও জানা যায়। স্বাভাবিক উপবাস দেহ ও মনকে সুস্থ ও পবিত্র রাখে।

সকল ধর্মে উপবাসঃ বৌদ্ধ, হিন্দু, ইসলাম, জৈন ও যিহুদি ধর্মসহ জগতের অনেক ধর্মের মধ্যে উপবাস করা হল এক সাধারণ প্রথা। অনেক লোক বিশ্বাস করে যে, নির্দিষ্ট সময়কালের জন্য খাদ্য গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা একজনকে ঈশ্বরের আরও নিকটবর্তী করে। নিম্নে বিভিন্ন ধর্মের উপবাস থাকা সর্ম্পকে বলা হলো:-

ইসলাম ধর্মঃ
ইসলামের পঞ্চস্তম্ভের চতুর্থ স্তম্ভ রোজা বা উপবাস। পবিত্র রমজান মাসে সারা জাহানের মুসলমানগণ রোজা পালন করে থাকেন। ইসলাম ধর্মে রামাদান মাসে ফজর থেকে মাগরিব পর্যন্ত পূর্নবয়স্ক সুস্থ সবল নারী-পুরুষের জন্য বাধ্যতামুলক। রোজা পালন সময়ে কোন প্রকার খাদ্য গ্রহন এবং পান সম্পূনরূপে নিষিদ্ধ। আল কোরআনে বলা হয়েছে সাওম বা রোজা পালনের মাধ্যমে মুসলমানগণ তাকওয়া অর্জন করে। বিশ্বাস করা হয় রোজা মানুষকে আত্মশুদ্ধি অর্জনে সাহায্য করে এবং পাপ প্রবৃত্তি থেকে দূরে রাখে। মুসলমানেরা বিশ্বাস করেন রোজা শুধু খাবার ও পানীয় বর্জন নয়। রোজা হচ্ছে কথা ও কর্মে মিথ্যা পরিহার করা, অশোভনীয় ভাষা পরিহার, ঝগড়া ফ্যাসাদ এবং কুপ্রবৃত্তি ও খারাপ চিন্ত থেকে দূরে থাকাই রোজা। তাই সব কিছু মিলিয়ে রমজান মাসে প্রকৃত মুসলমানগণ নিজেদের নৈতিক চরিত্র এবং অভ্যাষের উন্নতি সাধনে কাজ করে চলেন। রোজা মুসলমানদেরকে ধৈর্য্য এবং আত্মসংযম শিক্ষা দেয়। ব্যক্তিগত ভুল ভ্রান্তি শোধরাতে সাহায্য করে। রোজা বেহেশত অর্জনে সাহায্য করে। রমজান মাসে প্রতিটি মুসলমানের জন্য রোজা পালন করা ফরজ বা বাধ্যতামূলক। তবে ইসলামের আরো কিছু দিবসে রোজা পালনে উৎসাহিত করা হয়েছে। আরাফার দিবসে (জুল হজ্ব মাসের ৯ তারিখ) আরাফায় অবস্থানরত হাজীরা এই দিনে রোজা পালন করবেন না। আশুরার দিনে( মুহাররম মাসের দশ তারিখ) রোজা পালন করা হয়। সুন্নি মুসলমানেরা এই দিনের আগের দিন ও পরের দিনও রোজা পালন করে। অন্যদিকে শিয়াহ অনুসারীরা শুধু মাত্র এদিনেই রোজা রাখেন। শাওয়াল মাসের ছয়দিন রোজা পালন করা হয় ( রমজানের পরবর্তী মাস) প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩,১৪ এবং পনেরো তারিখ প্রতি সপ্তাহের মংগল ও বৃহস্পতিবার নিষিদ্ধ দিন বাদে অন্যান্য সকল দিন ( দাউদ নবীর রোজা নামেও পরিচিত) রজব মাসের ২৭ তারিখ মিরাজ উপলক্ষ্যে শাবান মাসের ১৫ তারিখ শব ই বরাত উপলক্ষ্যেরোজা রাখার জন্য বছরের কয়েকটি দিন মুসলমানদের জন্য নিদিষ্ট করা হয়েছে। ইদ উল ফিতর (শাওয়াল মাসের এক তারিখ) তাশরিক (১১, ১২, ১৩ যিলহজ্ব), সুন্নী মুসলমানেরা অনুসরণ করেন। ইদ উল আযহা (শিয়া মতালম্বীদের কোন কোন শাখা এই দিনে রোজা রাখার পক্ষে মত প্রকাশ করে)

বাহাই ধর্মঃ
বাহাই ধর্মানুসারীদের জন্য বাহাউল্লাহা কিতাবই আকদাসে বাহাই মাস আলা (২ মার্চ- ২০ মার্চ) এ ১৯ দিনের রোজা রাখার বিধানের কথা উল্লেখ করেছেন।[১] সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত কোনরূপ পানাহার এমনকি ধূম্রপান পর্যন্ত নিষিদ্ধ। ১৫ থেকে ৭০ বয়সী সকল বাহাইকে এই রোজা বা উপবাস পালন করতে হবে। অসুস্থ, গর্ভবতী, ঋতুবতী, পর্যটক, কঠোর পরিশ্রমকারীদের জন্য রোজার বিধান শিথিল করা হয়েছে। তবে যারা কঠোর পরিশ্রম করেন তাদেরকে নির্জনে স্বাভাবিকের তুলনায় কম আহার করতে বলা হয়েছে।

বৌদ্ধ ধর্মঃ
বৌদ্ধধর্মে বৌদ্ধ ভিক্ষুরা বিনয় নীতি অনুসরণ করে যাতে সাধারনত দুপুরের আহারের পরে সেদিন আর কোন খাবার গ্রহন করে না। যদিও এটাকে উপবাস বলা চলে না। তবুও শৃংখলিত আহার বিধি ধ্যান এবং সুস্বাস্থ অর্জনে সাহায্য করে। গৌতম বুদ্ধ প্রথম জীবনে অর্থ্যাৎ রাজপুত্র সিদ্ধার্থ দুজন শিক্ষকের তত্বাবধানে শিক্ষাগ্রহন করেন। এসময়ে তিনি খুবই কম খাদ্য গ্রহন করতেন। পরবর্তীতে তার উপদেশ মালায় তিনি কম খাদ্য গ্রহনের কথা উল্লেখ করেন। বৌদ্ধ ধর্মানুসারীদের সপ্তাহের একটি দিনে অষ্টবিধান অনুসরন করতে বলা হয়েছে যাতে দুপুর থেকে পরদিন সকাল পর্যন্ত উপবাসের বিধান রয়েছে। বজ্রযান অনুসারীরা নুয়াং নে অনুসরণ করে যা তান্ত্রিক অনুশাসন চেনরেজিগের মত।

খ্রিস্টান ধর্মঃ
খ্রিস্ট ধর্মের বাইবেলিকার বইয়ের মধ্যে ইসাইয়াহ (৫৮:৬-৭), জাকারিয়াহ (৭:৫-১০), বুক অফ দানিয়েলে উপবাসে কথা বলা হয়েছে। তবে এখানে উপবাসে খাদ্য পানীয় পরিহারের বদলে সৃষ্টিকর্তার আদেশ পূর্ণরূপে প্রতিপালন করতে গরীব এবং দুর্দশাগ্রস্থকে সাহায্যের কথা বলা হয়েছে। বুক অফ দানিয়েলে আংশিক উপবাসের কথা বলা হয়েছে।খ্রিস্টধর্মের বিভিন্ন শাখা বা চার্চ উপবাস পালন করে থাকে। তবে কিছু শাখা এটাকে পালন করে না। ক্যাথলিক চার্চ এবং ইস্টার্ণ অর্থোডক্স চল্লিশ দিনের আংশিক উপবাস পালন করে থাকে। ইথিওপিয়ান অর্থোডক্স চার্চ বছরে কয়েকবার সপ্তাহব্যাপী আংশিক উপবাস পালন করে। উক্ত সময়ে তারা মাংস এবং দুগ্ধ আহার থেকে বিরত থাকে। বাইবেলে (লেভিক্টাস ২৩:২৭,৩১) বলা হয়েছে, সবার উচিত সপ্তম মাসের নবম দিনের সন্ধ্যা থেকে দশম দিনের সন্ধ্যা পর্যন্ত কোনরূপ খাদ্য গ্রহন না করা।

হিন্দু ধর্মঃ
হিন্দু ধর্মে উপবাস একটি আনুসংগিক অংশ। ব্যক্তিগত বিশ্বাস এবং আঞ্চলিক রীতিনীতি অনুসারে হিন্দু ধর্মে বিভিন্ন ধরণের উপবাস প্রচলিত আছে। অনেক হিন্দু মাসের নির্দিষ্ট কিছু দিন যেমন একাদশী, প্রদোষ অথবা পূর্ণিমাতে উপবাস পালন করেন। সপ্তাহের কয়েকটি দিন নির্দিষ্ট দেবতার জন্য উপবাস পালন করার বিধান আছে অনেক অঞ্চলে। যেমন সোমবার শিবের জন্য, বৃহস্পতিবার বিষ্ণুর জন্য এবং শনিবার আয়াপ্পার জন্য উপবাস পালন করা হয়। মংগলবারে দক্ষিণ ভারত এবং উত্তর পশ্চিম ভারতে উপবাস পালন করা হয়। দক্ষিণের হিন্দু জনগোষ্ঠী বিশ্বাস করে মঙ্গলবার শক্তির দেবী মারিয়াম্মানের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছে। উপবাসকারীরা সূর্যোদয়ের আগে খাবার গ্রহন করে মুসলিমরা যেমন সেহেরি খায়। এবং সূর্যাস্তের পরে তারা উপবাস ভঙ্গ করে। তবে এই উপবাসকালীন সময়ে তারা পানীয় জল পান করে থাকে। উত্তর ভারতে মঙ্গলবার দেবতা হনুমানের জন্য নির্দিষ্ট। উপবাসকারীরা এইদিনে সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্তকালীন সময় পর্যন্ত শুধুমাত্র দুধ এবং ফল খেয়ে থাকেন। উত্তর ভারতের হিন্দ্রুা মধ্যে বৃহস্পতিবার উপবাস পালন করে থাকে। উপবাসকারী একটি গল্প বা শ্রুতি শ্রবনের মাধ্যমে উপবাস শুরু করে। বৃহস্পতিবারের উপবাসকারীরা বৃহস্পতি মহাদেবের পূজা করে। তারা হলুদ কাপড়; পরে এবং হলুদ রঙের খাবার খেতে পছন্দ করে। এদিন মহিলারা কলা গাছের পূজা করে এবং জল ঢালে। হলুদাভ বর্ণের ঘি দিয়ে খাবার প্রস্তুত করা হয়। বৃহস্পতিবার গুরুর জন্য উৎসর্গ করা হয়। যে সকল হিন্দুরা গুরু মন্ত্র গ্রহন করে তাদের অনেকেই বৃহস্পতিবার উপবাস পালন করে থাকে। ধর্মীয় উৎসব উপলক্ষ্যেও উপবাস পালন করা হয়। যেমন মহাশিব রাত্রীতে অধিকাংশ হিন্দু উপবাস পালন করে এবং তারা একবিন্দু জল পর্যন্ত পান করে না। নভরাত্রিতে উপবাস পালন করে। ভারতের অনেক অঞ্চলের বিবাহিত হিন্দু রমনীরা স্বামীর সুস্বাস্থ্য, আয় উন্নতি, দীর্ঘায়ু কামনা করে উপবাস পালন করে থাকে। একটি ঝালরের মাধ্যমে চাঁদ দেখার মধ্য দিয়ে তারা এই উপবাস ভংগ করে। শ্রাবণ মাসে অনেকে শ্রাবন উদযাপন করে। এই সময়ে অনেকেই সপ্তাহের একটি দিন তারা তাদের পছন্দের দেবতার জন্য উপবাস করে। আবার অনেকেই পুরো শ্রাবন মাস উপবাস পালন করেন। অন্ধ্রপ্রদেশে কার্তিক মাসের শুরুর দিনে অনেক হিন্দু বিশেষ করে রমনীরা উপবাস পালন করে থাকে। এ মাসের সোমবার তারা শিবের জন্য, পূর্ন চন্দ্রের দিন কার্তিকের জন্য উপবাস পালন করে থাকে। শ্রী বিদ্যায় উপবাস করতে নিষেধ করা হয়েছে। এই তান্ত্রিক শাস্ত্রে বলা হয়েছে দেবী মানুষের মধ্যে বাস করেন। তাই কেউ যদি ক্ষুধার্ত থাকে তবে দেবীও ক্ষুধার্ত থাকে। শ্রীবিদ্যায় শুধু মাত্র পিতা মাতার মৃত্যু বার্ষিকীতে উপবাসে কথা বলা হয়েছে।মহাভারতের অনুশাসন পর্বে একাধিকবার উপবাসের কথা বলা হয়েছে। ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে উপদেশ দিয়ে বলেন, ‘উচ্চজ্ঞানের উপবাস প্রথা পালন করো যার কথা সবাই জানে না’।

জৈন ধর্মঃ
জৈন ধর্মে বিভিন্ন ধরণের উপবাস প্রথা পচলিত আছে। এর একটি হচ্ছে চৌবিহার উপবাস যাতে পরবর্তী দিনের সূর্যোদয় পর্যন্ত কোন প্রকার খাবার বা পানি গ্রহন করা যায় না। আরেকটি উপবাস ব্রত হচ্ছে ত্রিবিহার উপবাস যেখানে কোন খাবার খাওয়া যায় না কিন্তু ফুটানো পানি পান করা যায়। জৈন ধর্মমতে যে কোন উপবাসের মূল লক্ষ্য হচ্ছে অহিংসা অর্জন। সাধারনত পাজ্জ্যশনে উপবাস পালন করা হয়। কোন ব্যক্তি যদি পাজ্জ্যশনে আটদিন উপবাস পালন করে তবে তাকে বলা হল আত্থাই এবং দশদিন উপবাস করলে বলা হয় দশ লক্ষন। আর মাসব্যাপী উপবাস পালন করলে বলা হয় মশখমন। জৈনদের মধ্যে উপবাস পালন না করে খুবই কম খাবার আহার করার রীতি অতি সাধারণ দৃশ্য। যে সকল ব্যক্তিরা মসুরের ডাল এবং স্বাদহীন খাবার শুধুমাত্র লবন ও মরিচ দিয়ে খেয়ে থাকেন তাদের বলা হয় আয়ামবলি। জৈনরা দিনে একবার মাত্র খাবার গ্রহন করে একাসসন নামে উপবাস পালন করে। দিনে দুই বার খাবার খেয়ে বিয়াসন উপবাস পালন করে।

ইহুদি ধর্মঃ
ইহুদি ধর্মে উপবাস মানে সকল ধরণের খাবার ও পানি গ্রহন থেকে বিরত থাকা। ঐতিহ্যগতভাবে ইহুদিরা বছরে ছয়দিন রোজা পালন করে থাকে। ইয়াম কিপ্পুর হচ্ছে ইহুদি বর্ষপঞ্জিকার সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ দিন। এদিন সকল পূর্ণবয়স্ক নারী পুরুষ উপবাস পালন করে থাকে। এই পবিত্র দিনে তারা উপসনার চেয়ে উপবাসকেই বেশী গুরুত্ব দিয়ে থাকে। যদি কেউ উপবাস পালন করে বিছানায় শুয়ে থাকে তবুও সে পূর্ণ ধর্মীয় বিধান পালনের পূণ্য লাভ করবে। দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উপবাসের দিন তিশা বাব। আনুমানিক ২৫০০ বছর আগে এই দিনে ব্যবলনিয়া জেরুজালেমের প্রথম পবিত্র মন্দির ধ্বংস করে দেয় এবং প্রায় ২০০০ বছর আগে রোমানরা জেরুজালেমের দ্বিতীয় পবিত্র মন্দির ধ্বংস করে দেয়। তিশা বাব এ ইহুদিরা বিভিন্ন ট্রাজেডিতে পতিত হয়েছে। সেই উপলক্ষ্যে তারা এই দিনটিকে পালন করে। এমনকি দ্বিতীয় যুদ্ধে সংঘটিত হলোকাস্টও এই তিশা বাবের সময়ে সংঘটিত হয়।

শিখ ধর্মঃ
শিখধর্মে উপবাস প্রথাকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। গুরু গ্রন্থ সাহিবে বলা হয়েছে উপবাস কোন আত্মিক সুবিধা বয়ে আনে না। তাই শরীরকে কষ্ট দিয়ে কোন লাভ নেই। তবে শুধু মাত্র স্বাস্থ্যজনিত কারণে উপবাস করার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।

উপবাস থাকা স্বাস্থের জন্য ভালো নাকি খারাপঃ বিশ্বের নানা প্রান্তে নানা কারণে মানুষ সারাদিন বা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য খাবার গ্রহণে বিরত থাকে, রোজা রাখে বা উপবাস পালন করে। ধর্মীয় কিংবা আধ্যাত্মিক কারণে ছাড়াও শরীরের উপকার হবে, এমন ধারণাও রয়েছে অনেকের। এক প্রতিবেদনে বিষয়টি জানিয়েছে ফক্স নিউজ।কিছু সময়ের জন্য খাদ্য গ্রহণে বিরতি নেওয়া কি স্বাস্থ্যের জন্য ভালো? এ প্রশ্নে অনেক বিশেষজ্ঞই ইতিবাচক উত্তর দিয়েছেন। অর্থাৎ কিছু সময়ের জন্য খাদ্য গ্রহণে বিরতি নেওয়ার উপকারিতা রয়েছে। চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, কিছু সময়ের জন্য খাবার গ্রহণে বিরত থাকার ফলে দেহের কোলেস্টরেল নিয়ন্ত্রণ, হৃদরোগের সম্ভাবনা কমানো ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি হ্রাস পায়। এতে দীর্ঘ জীবনের সম্ভাবনাও বেড়ে যায়। তবে চিকিৎসকরা জানান, স্বাস্থ্যগত এ উপকারিতা সবার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নাও হতে পারে।এটি দেহের জন্য তখনই উপকারী হবে, যখন তার শুরুতে ও শেষে স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া হবে। অস্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া হলে এর উপকারিতা থাকবে না বরং তা বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে।এছাড়া খাবারে বিরতি দেওয়ার সময় কিছু সাময়িক সমস্যা হতে পারে। সমস্যাগুলোর মাঝে রয়েছে মাথাব্যথা, মুড খারাপ হওয়া ও মনোযোগ দিতে ব্যর্থতা। তবে এ সমস্যাগুলো বেশি হয় উচ্চমাত্রায় ফ্যাট ও চিনিযুক্ত খাবার খাওয়ায় অভ্যস্তদের মাঝে। এ ধরনের খাবারগুলো হঠাৎ বাদ গেলে দেহ বিষয়টিকে বিপদ হিসেবেই বিবেচনা করে। কিন্তু যারা আগে থেকেই স্বাস্থ্যকর খাবার খেতে অভ্যস্ত, তাদের এতে প্রতিক্রিয়া কম হয়। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে সারাদিন যদি খাবারে বিরতি দেওয়া সম্ভব না হয় তাহলে একবেলা করে বিরতি দেওয়া যেতে পারে। এতে অভ্যস্ত হওয়ার পর সারাদিন খাবার না খেয়েও থাকা যাবে। একবার সারাদিন খাবারে বিরতি দেওয়ার পরদিন এ কাজে বিরতি দেওয়া যেতে পারে। এরপর আবার তা শুরু করা যায়। এতে অনেকের যথেষ্ট উপকার পাওয়া গেছে। চিকিৎসকরা আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় উল্লেখ করেছেন- স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া। খাবারে বিরতি দেওয়ার ক্ষেত্রে এটি সবার প্রথম পদক্ষেপ বলে মনে করছেন তারা। কারণ, স্বাস্থ্যকর খাবারে অভ্যাস না করলে খাবারে বিরতির কোনো উপকারিতা পাওয়া নাও যেতে পারে।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত