শিরোনাম

লাল সবুজের পতাকা এবার মহাকাশে

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ১২:৩০, মে ১২, ২০১৮

গ্রহ, সূর্য, কৃষ্ণবিবর বা দূরবর্তী ছায়াপথ এর ছবি ও তথ্য নিতে কক্ষপথে স্থাপন করতে হয় উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট। বাংলাদেশ সেই কৃত্রিম উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট নাম বঙ্গবন্ধু-১। আমরা আর পিছিয়ে নেই লাল সবুজের পতাকা পৌছে গেছে পৃথিবী থেকে প্রায় ৩৬ হাজার কিলোমিটার দুরে কক্ষ পথে এবার সেই উপগ্রহ বা স্যাটেলাইট নিয়ে বিস্তারিত লিখেছেন - জিয়া উল ইসলাম

স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ: স্যাটেলাইট বা উপগ্রহ হলো একটি কৃত্রিম বস্তু যা তথ্য সংগ্রহের জন্য অথবা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে পৃথিবী বা চাঁদ বা অন্য কোনো গ্রহের চারপাশে কক্ষপথে স্থাপন করা হয়। মনুষ্যনির্মিত হাজার হাজার স্যাটেলাইট পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরছে। এদের মধ্যে কোনোটি বিভিন্ন গ্রহের ছবি সংগ্রহ করে, কোনোটা আবহাওয়াবিদদের আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেয়া সহ বিভিন্ন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগের আভাস দিতেও সাহায্য করছে। কিছু স্যাটেলাইট অন্যান্য গ্রহ, সূর্য, কৃষ্ণবিবর বা দূরবর্তী ছায়াপথ এর ছবি নিতে কক্ষপথে ঘুরছে। এছাড়াও এমন কিছু উপগ্রহ রয়েছে যারা যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে মূলত ব্যাবহার করা হয়; যেমন টিভি সিগন্যাল, বিশ্বজুড়ে ফোন কল এর সংযোগ স্থাপন, ইত্যাদি কাজে ব্যাবহার করা হয়। স্যাটেলাইট বিভিন্ন আকৃতির হতে পারে। প্রত্যেক স্যাটেলাইট এর ২টি সাধারণ অংশ থাকে: অ্যান্টেনা এবং শক্তির উৎস। অ্যান্টেনা তথ্য গ্রহণ ও সংগ্রহের কাজ করে থাকে। সোলার প্যানেল অথবা ব্যাটারি, উভয়েই শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করতে পারে। নাসা’র স্যাটেলাইটে ক্যামেরা এবং কিছু সেন্সর লাগানো থাকে।

কক্ষপথে স্যাটেলাইট যেভাবে পাঠানো হয়: কক্ষপথে স্যাটেলাইট স্থাপন করার জন্য আলাদা মহাশূন্য যান রয়েছে। একে বলা হয় “উৎক্ষেপণ যন্ত্র (Launch Vehicle)“। কক্ষপথে স্যাটেলাইট স্থাপনের ক্ষেত্রে যে বিষয়ে সবচেয়ে বেশি মাথা ঘামাতে হয়, তা হলো অভিকর্ষজ ত্বরণ এবং মহাশূন্য যানটির গতির সমতা রক্ষা করা। কারণ অভিকর্ষজ ত্বরণ আমাদের উৎক্ষেপণ যন্ত্রকে পৃথিবীর দিকে টানতে থাকে। দুই ধরনের উৎক্ষেপণ যন্ত্র রয়েছে অপচয়যোগ্য রকেট এবং মহাশূন্য শাটল। অপচয়যোগ্য রকেটগুলো স্যাটেলাইট স্থাপন শেষে ধ্বংস হয়ে যায়। অপরদিকে মহাশূন্য শাটলগুলো স্যাটেলাইট স্থাপনের কাজে বারবার ব্যবহার করা যায়। উৎক্ষেপণ যন্ত্রের গতিবেগ উচ্চতার উপর অনেকটা নির্ভর করে। কম উচ্চতার কক্ষপথে (Low Earth Orbit = LEO) এর বেগ ৭.৮ কি.মি./সেকেন্ড, বেশি উচ্চতার কক্ষপথে (Geostationary Earth Orbit =GEO)এর বেগ ৩.১ কিমি/সে । কক্ষপথ এর ভিত্তি করে স্যাটেলাইট সিস্টেম কে কয়েক ভাগে ভাগ করা যায়। LEO ( Low Earth Orbit )- পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ১৬০-২০০০ কি.মি. উপরে অবস্থিত। সাধারণত পৃথিবীকে পর্যবেক্ষণকারী স্যাটেলাইটগুলো এই কক্ষপথে থাকে। পৃথিবী পৃষ্ঠের খুব কাছে থাকায় এই কক্ষপথে থাকা স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীকে খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারে। আন্তর্জাতিক স্পেস ষ্টেশন এই কক্ষপথে অবস্থিত। MEO ( Medium Earth Orbit) – পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ২০০০০ কি.মি. উপরে অবস্থিত। সাধারণত জিপিএস স্যাটেলাইট গুলো এই কক্ষপথে থাকে। এই কক্ষপথের স্যাটেলাইট গুলোর গতিবেগ মন্থর। এই স্যাটেলাইটগুলো পাঠাতে অনেক শক্তির প্রয়োজন হয়। GEO (Geostationary Earth Orbit) – পৃথিবী পৃষ্ঠ থেকে ৩৬০০০ কি.মি. উপরে অবস্থিত। এই কক্ষপথে অ্যান্টেনা এর অবস্থান নির্দিষ্ট থাকে। সাধারণত রেডিও এবং টিভি এর ট্রান্সমিশনের কাজে ব্যাবহার করা হয়।

কৃত্রিম উপগ্রহ কিভাবে কাজ করে: কৃত্রিম উপগ্রহ এমনভাবে পৃথিবীর চতুর্দিকে ঘূর্ণায়মান হয়, যাতে এর গতির সেন্ট্রিফিউগাল বা বহির্মুখীন শক্তি ওকে বাইরের দিকে গতি প্রদান করে - কিন্তু পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি একে পৃথিবীর আওতার বাইরে যেতে দেয় না। উভয় শক্তি কৃত্রিম উপগ্রহকে ভারসাম্য প্রদান করে এবং কৃত্রিম উপগ্রহটি পৃথিবীর চতুর্দিকে প্রদক্ষিণ করতে থাকে। যেহেতু মহাকাশে বায়ুর অস্তিত্ব নেই তাই এটি বাধাহীনভাবে পরিক্রমণ করে। কৃত্রিম উপগ্রহগুলো বৃত্তাকারে পরিক্রমণ করে না, তার গতি ডিম্বাকৃতির।টিভি ও বেতারসংকেত প্রেরণ এবং আবহাওয়া পর্যবেক্ষণকারী কৃত্রিম উপগ্রহগুলো সাধারণত পৃথিবীথেকে ৩৬ হাজার কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে। পৃথিবী থেকে বেতার তরঙ্গ ব্যবহার করে তথ্য পাঠানো হয়, কৃত্রিম উপগ্রহ সেগুলো গ্রহণ করে এবং বিবর্ধিত (এমপ্লিফাই) করে পৃথিবীতে প্রেরণ করে। কৃত্রিম উপগ্রহ দুইটি ভিন্ন কম্পাঙ্কের তরঙ্গ ব্যবহার করে সিগনাল (তথ্য) গ্রহণ এবং পাঠানোর জন্য। কৃত্রিম উপগ্রহ থেকে পৃথিবীতে আসা সিগনাল অনেক দুর্বল বা কম শক্তিসম্পন্ন হয়ে থাকে, তাই প্রথমে ডিস এন্টেনা ব্যবহার করে সিগনালকে কেন্দ্রীভূত করা হয় এবং পরে রিসিভার দিয়ে গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় কাজে ব্যবহার করা হয়।

কৃত্রিম উপগ্রহের জ্বালানী পায় যে ভাবে: কৃত্রিম উপগ্রহগুলোর উৎক্ষেপণের সময়ই পর্যাপ্ত জ্বালানি গ্রহণ করতে হয়। কারণ মহাকাশে রিফুয়েলিংয়ের কোনো সুযোগ নেই। তবে কিছু উপগ্রহ জ্বালানি হিসেবে সৌরশক্তি ব্যবহার করে। এদের গায়ে সৌরকোষ লাগানো থাকে, যা ব্যবহার করে থেকে সে সূর্য থেকে তার প্রয়োজনীয় শক্তি গ্রহণ করে।

পৃথিবীর প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ: মহাকাশে প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ উৎক্ষেপণের কৃতিত্ব সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের। ১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর উৎক্ষেপিত স্পুটনিক ১ নামের কৃত্রিম উপগ্রহটির নকশা করেছিলেন সের্গেই করালিওভ নামের একজন ইউক্রেনীয়। একই বছর সোভিয়েত ইউনিয়ন মহাকাশে দ্বিতীয় কৃত্রিম উপগ্রহ স্পুটনিক-২ উৎক্ষেপণ করে। স্পুটনিক-২ লাইকা নামের একটা কুকুর বহন করে নিয়ে যায়। অবশ্য উৎক্ষেপণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যে তাপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ত্রুটির কারণে লাইকা মারা যায়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালে মহাকাশে কৃত্রিম উপগ্রহ পাঠানোর পরিকল্পনা করে। তাদের পরিকল্পনা সফল হঃয় ১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি। তাদের প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ এক্সপোরার-১ এদিন মহাকাশে উৎক্ষেপণ করা হয়। ভারতের প্রথম মহাকাশ উপগ্রহ ASTROSAT আর বাংলাদেশের কৃত্রিম উপগ্রহ নাম বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট।

দেশভিত্তিক প্রথম উৎক্ষেপিত কৃত্রিম উপগ্রহ:

ক্রমিক নং: দেশ   সাল  রকেটের নাম উপগ্রহের নাম
১.  সোভিয়েত ইউনিয়ন ১৯৫৭ স্পুটনিক-পিএস স্পুটনিক-১
২. যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৮ জুনো-১  এক্সপ্লোরার-১
৩. ফ্রান্স ১৯৬৫ ডায়ামান্ট  এস্ট.রিক্স
৪. জাপান ১৯৭০ ল্যাম্বডা-৪এস  ওসুমি
৫. চীন ১৯৭০ লং মার্চ-১ ডং ফ্যাং হং-১
৬. যুক্তরাজ্য ১৯৭১ ব্ল্যাক এ্যারো  প্রোসপেরো এক্স-৩
৭. ভারত ১৯৮০ স্যাটেলাইট লাঞ্চ ভিহাইকেল  রোহিণী
৮. ইসরায়েল ১৯৮৮ শ্যভিত  ওফেক-১
৯. রাশিয়া ১৯৯২ সোয়ুজ-ইউ  কসমস-২১৭৫
১০. ইউক্রেন ১৯৯২ সাইক্লোন-৩ স্ট্রেলা

১১.

ইরান ২০০৯ সাফির-২  ওমিড

১২.

বাংলাদেশ   ২০১৮  ফ্যালকন ৯ বঙ্গবন্ধু-১

ব্যর্থ প্রথম স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করতে ব্যর্থ যত ঘটনা: মহাকাশে স্যাটেলাইট উৎক্ষেণ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া, চীন, ভারতসহ বিশ্বের অনেক দেশ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করে। এর মধ্যে সফল উৎক্ষেপণ যেমন রয়েছে, তেমনি ব্যর্থ উৎক্ষেপণেরও নজির রয়েছে। ২০১৭ সালের নভেম্বরে উৎক্ষেপণের পরপরই যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে রাশিয়ার আবহাওয়া স্যাটেলাইট ‘মিটিওর-এম’। এছাড়া বিভিন্নি সময়ে চীন, দক্ষিণ কোরিয়া ও ভারতীয় স্যাটেলাইটের ব্যর্থ উৎক্ষেপণের ঘটনা ঘটেছে। ২০১৭ সালের ২৮ নভেম্বর রকেটের মাধ্যমে মহাকাশে যাত্রা করে রাশিয়ার আবহাওয়া স্যাটেলাইট ‘মিটিওর-এম’। কিন্তু ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই মহাকাশযানটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন পড়ে। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে গাওফেন-১০ নামের একটি স্যাটেলাইটকে এর নির্দিষ্ট কক্ষপথে প্রবেশ করাতে ব্যর্থ হয় চীন। ২০১০ সালের জুনে মহাকাশে স্যাটেলাইট স্থাপনের উদ্দেশ্যে উৎক্ষেপণ করা দক্ষিণ কোরিয়ার একটি রকেট বিস্ফোরিত হয়। উৎক্ষেপণের দুই মিনিট ১৭ সেকেন্ড পর ভূ-কেন্দ্র থেকে এর সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

ফ্যালকন ৯ কি: ফ্যালকন নাইন কে বলা চলে একটি উপগ্রহ পাঠানো যান বা পরিবহন। ফ্যালকন ৯ উপগ্রহ এবং মহাকাশযানের নির্ভরযোগ্য এবং নিরাপদ পরিবহনের জন্য মহাকাশযান দ্বারা পরিকল্পিত এবং কক্ষপথে রয়েছে একটি দুই-স্তুরীয় রকেট। ফ্যালকন ৯ হল রিফ্লেট করতে সক্ষম প্রথম কক্ষয়ী রকেট। স্পেস এক্স বিশ্বাস করে যে রকেট পুনর্ব্যবহারযোগ্য স্থানটি প্রবেশের খরচ কমাতে এবং অন্য গ্রহগুলিতে বাস করার জন্য মানুষকে সক্ষম করার জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য। সর্বাধিক নির্ভরযোগ্যতা জন্য ফ্যালকন ৯ মাঠ থেকে ডিজাইন করা হয়েছিল। ফ্যালকন ৯ এর সহজ দুই-স্তুরীয় কনফিগারেশন বিচ্ছেদ ঘটনার সংখ্যা কমিয়ে দেয় - এবং ৯ টি প্রথম পর্যায়ে ইঞ্জিনের সাহায্যে ইঞ্জিন শাটডাউন ঘটলেও এটি নিরাপদে তার মিশন সম্পূর্ণ করতে পারে। ফ্যালকন ৯ এ ২০১২ সালে ইতিহাস তৈরি করা হয়েছিল যখন এটি আন্তর্জাতিক মহাকাশ স্টেশনের সাথে মিলনস্থলের জন্য সঠিক কক্ষপথে পৌঁছেছিল, যা স্টেশনটি পরিদর্শন করার জন্য প্রথম বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স তৈরি করেছিল। যেহেতু ফ্যালকন ৯ মহাকাশে অসংখ্য ভ্রমণ করেছেন, সেক্ষেত্রে কক্ষপথে পৌঁছানোর পাশাপাশি ঘঅঝঅ- র মহাকাশ স্টেশন থেকে মালামাল বিতরণ এবং ফেরত পাঠানো। ফ্যালকন ৯, ড্রাগন মহাকাশযানের পাশাপাশি, মানুষকে মহাকাশে উদ্ধারের জন্য শুরু করে এবং NASA এর সাথে একটি চুক্তির অধীনে, SpaceX সক্রিয়ভাবে এই লক্ষ্যের দিকে কাজ করছে।

বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট: বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইট দিয়ে বিশ্বের স্যাটেলাইট ক্ষমতাধর ৫৭তম দেশ হিসেবে পরিচিতি বাংলাদেশের। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণ করেছে ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া নামের একটি প্রতিষ্ঠান। স্যাটেলাইটের কাঠামো তৈরি, উৎক্ষেপণ, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, ভূ-স্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনার দায়িত্ব এ প্রতিষ্ঠানের। এ প্রকল্পের ব্যয় প্রায় দুই হাজার ৯৬৭ কোটি টাকা। স্যাটেলাইটে থাকছে ৪০টি ট্রান্সপন্ডার। এগুলোর মধ্যে প্রাথমিকভাবে ২০টি ব্যবহার করবে বাংলাদেশ। অন্যগুলো ভাড়া দেয়া হবে। স্যাটেলাইট বঙ্গবন্ধু-১ এর গ্রাউন্ড স্টেশন তৈরি করা হয়েছে গাজীপুর ও রাঙ্গামাটিতে। ২০১৩ সালে রুশ কোম্পানি স্পুটনিকের কাছ থেকে ১১৯.১ পূর্ব দ্রাঘিমার বর্তমান স্লটি কেনে বিটিআরসি। ১৫ বছরের জন্য এ স্লট পাওয়ার জন্য গুণতে হয়েছে ২৮ মিলিয়ন ডলার। বাংলাদেশ বারবার আইটিইউর কাউন্সিল সদস্য নির্বাচিত হয়ে নীতিনির্ধারক পর্যায়ে থাকলেও নিজস্ব আরবিটাল স্লট আনতে পারেনি।‘বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১’ কৃত্রিম উপগ্রহটি একটি জিও-স্টেশনারি স্যাটেলাইট বা ভূস্থির উপগ্রহ। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটে ২৬ কু-ব্যান্ড এবং ১৪ সি-ব্যান্ড মিলিয়ে মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে। এর মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে। বাকি ২০টি ট্রান্সপন্ডার বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির জন্য রাখা হবে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণ চুক্তি : ২০১৫ সালের ১১ নভেম্বর ফ্রান্সের থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেসের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ নির্মাণের চুক্তি স্বাক্ষর করে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী, স্যাটেলাইটের কাঠামো, উৎক্ষেপণ-ব্যবস্থা, ভূমি ও মহাকাশের নিয়ন্ত্রণ-ব্যবস্থা, ভূ-স্তরে দুটি স্টেশন পরিচালনা সহায়তা ও ঋণের ব্যবস্থা করবে ফ্রান্সের নির্মাতা প্রতিষ্ঠানটি। ফ্রান্সের থুলুজে স্যাটেলাইটটির মূল কাঠামো তৈরির কথা দেয় থ্যালেস।

সরকারের অর্থায়ন : ২০১৫ সালের মার্চে একনেকে দুই হাজার ৯৬৭.৯৫ কোটি টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে। যার মধ্যে সরকারি অর্থ এক হাজার ৩১৫.৫১ কোটি টাকা এবং বিদেশি অর্থায়ন ধরা হয় এক হাজার ৬৫২.৪৪ কোটি টাকা। বিটিআরসি কৃতিত্বের দাবি আনতে পারে যে, শেষ পর্যন্ত প্রকল্পটি দুই হাজার কোটি টাকায় শেষ হচ্ছে।

ইতিহাসের অংশ থ্যালেস : দরপত্রে অংশ নিয়ে কাজ পায় ফ্রান্সের কোম্পানি থ্যালেস অ্যালেনিয়া স্পেস। ২০১৫ সালের নভেম্বরে তাদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধু-১ স্যাটেলাইটের ডিজাইন এবং নির্মাণের চুক্তি হয়। চুক্তিটি ছিল এক হাজার ৯৫১.৭৫ কোটি টাকার।

কক্ষপথ কেনা : স্যাটেলাইটটি উৎক্ষেপণ এবং তা কক্ষপথে রাখার জন্য রাশিয়ার ইন্টারস্পুটনিকের কাছ থেকে কক্ষপথ (অরবিটাল স্লট) কেনা হয়। মহাকাশে এ কক্ষপথের অবস্থান ১১৯ দশমিক ১ পূর্ব দ্রাঘিমাংশে। ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে সম্পাদিত চুক্তির ভিত্তিতে প্রায় ২১৯ কোটি টাকায় ১৫ বছরের জন্য এই কক্ষপথ কেনা হয়।

ব্যবসায়িক পরিকল্পনা : স্যাটেলাইটটির ক্ষমতার অর্ধেক দেশের বাজারে ব্যবহার হওয়ার পর বাকিটা আন্তর্জাতিক বাজারে বিক্রির পরিকল্পনা রয়েছে। এতে সাত বছরের মধ্যে খরচ উঠে আসবে। তবে এখনও সুনির্দিষ্ট ব্যবসায়িক পরিকল্পনার বিষয়টি জানা যায়নি।

কভারেজ : স্যাটেলাইটটির কভারেজ হবে ইন্দোনেশিয়া থেকে তাজাকিস্তান পর্যন্ত। বাংলাদেশের অবস্থান ৯০ ডিগ্রিতে হলেও বঙ্গবন্ধু-১ এর অবস্থান হচ্ছে আমাদের অবস্থান থেকে বেশ খানিকটা দূরে। দুটি ল্যান্ডিং স্টেশন নির্মিত হয়েছে গাজীপুর ও রাঙ্গামাটিতে।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ এর ফলে সুবিধাসমূহ: বর্তমানে দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলো সিঙ্গাপুরসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে স্যাটেলাইট ভাড়া নিয়ে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এজন্য বছরে ব্যয় হয় প্রায় ১২৫ কোটি টাকা। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট চালু হলে অনেকাংশেই কমে আসবে এ ব্যয়। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে দেশের টাকা থেকে যাবে দেশেই। স্যাটেলাইটের তরঙ্গ ভাড়া দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রা আয়েরও সম্ভাবনা রয়েছে। টেলিভিশন চ্যানেল ছাড়াও ইন্টারনেট সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান, ভি-স্যাট ও বেতারসহ ৪০ ধরনের সেবা পাওয়া যাবে এ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। যেকোনো ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগে টেরিস্ট্রিয়াল অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলেও বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট দেশে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পরিবেশ যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ই-সেবা নিশ্চিত করবে।স্যাটেলাইটের কার্যক্রম পুরোপুরিভাবে শুরু হলে আশপাশের কয়েকটি দেশে টেলিযোগাযোগ ও সম্প্রচার সেবা দেয়ার জন্য জিয়োসিক্রোনাস স্যাটেলাইট সিস্টেমের গ্রাউন্ড সিস্টেমসহ সব ধরনের সেবা পাওয়া যাবে।এছাড়া আবহাওয়ার পূর্বাভাস, টেলিমেডিসিন, ই-লার্নিং, ই-রিসার্চ, ভিডিও কনফারেন্স প্রতিরক্ষা ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ভালো তথ্য-উপাত্ত পাওয়া যাবে এ স্যাটেলাইটের মাধ্যমে। নতুন দিগন্ত খুলে যাবে অন্যান্য বিভিন্ন খাতেও।প্রতিবেশী দেশ ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার নিজস্ব স্যাটেলাইট রয়েছে। এ স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের ফলে নেপাল, মিয়ানমার, ভুটান ও অন্যান্য দেশের কাছে সেবা ভাড়া দিতে পারবে বাংলাদেশ। এর মাধ্যমে বছরে প্রায় ৫০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আয় করা যাবে।বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মোট ৪০টি ট্রান্সপন্ডার থাকবে। এর মধ্যে ২০টি ট্রান্সপন্ডার বাংলাদেশের ব্যবহারের জন্য রাখা হবে। বাকি ২০টি ট্রান্সপন্ডার বিদেশি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রির জন্য রাখা হবে।প্রাথমিক এসব সুবিধা শুধুমাত্র বাংলাদেশ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোকে দেয়া সম্ভব হলেও পরে এর পরিসর বিস্তৃতি ঘটবে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য, উত্তর ও পূর্ব আফ্রিকার দেশগুলোর কাছে স্যাটেলাইট সুবিধা ভাড়া অথবা বিক্রি করতে পারবে বাংলাদেশ।

বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১
মিশনের ধরণ : যোগাযোগ
অপারেটর: বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন
মিশনের সময়কাল : ১৫ বছর

মহাকাশযানের বৈশিষ্ট্য:
বাস: Spacebus 4000
প্রস্তুুতকারক : Thales Alenia Space
লঞ্চ ভর : ৩,৫০০ কেজি (৭,৭০০ পা)
ক্ষমতা : 6kW

মিশন শুরু:
উৎহ্মেপণ তারিখ: ১১ মে, ২০১৮
উৎহ্মেপণ রকেট: ফ্যালকন ৯ ফুল থ্রাস্ট
উৎহ্মেপণ স্থান : কেনেডি স্পেস সেন্টার লঞ্চ কমপ্লেক্স ৩৯
কন্ট্রাক্টর: স্পেস এক্স

কক্ষপথের পরামিতি:
আমল : জিও
দ্রাঘিমাংশ : ১১৯.১ক্ক পূর্ব

ট্রান্সপন্ডার: ব্যান্ড১৪ সি ব্যান্ড, ২৬ কু ব্যান্ড

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত