শিরোনাম

রক্তে কেনা আট ঘণ্টা

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ১৮:৫৯, এপ্রিল ২৮, ২০১৮

আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস যা সচরাচর মে দিবস নামে অভিহিত প্রতি বছর পহেলা মে বিশ্বব্যাপী উদযাপিত হয়। এটি আন্তর্জাতিক শ্রমিক আন্দোলনের উদযাপন দিবস। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে শ্রমজীবী মানুষ এবং শ্রমিক সংগঠন সমূহ রাজপথে সংগঠিতভাবে মিছিল ও শোভাযাত্রার মাধ্যমে দিবসটি পালন করে থাকে। বিশ্বের প্রায় ৮০টি দেশে পহেলা মে সরকারি ছুটির দিন। আরো অনেক দেশে এটি বেসরকারিভাবে পালিত হয়। এবার মে দিবস কে নিয়ে লিখেছেন -জিয়া উল ইসলাম

মে দিবসের যেভাবে জম্ম:
অষ্টাদশ শতকের মাঝামাঝি থেকে ইউরোপে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির কল্যাণে শিল্প বিপ্লবের সূচনা হয়। সেটি ছিল পুঁজিবাদী বিকাশের প্রাথমিক যুগ। তখন শ্রমিকদের কাজের কোনো শ্রমঘণ্টা নির্ধারিত ছিল না। ছিল না ন্যূনতম মজুরির নিশ্চয়তা। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর শ্রমিকদের অবস্থা আরও খারাপ হয়। শ্রমিকরা তখন দিনে ১২-১৪ ঘণ্টা কাজ করলেও তার বিনিময়ে সামান্য মজুরিও পেতেন না। উপরন্তু ছিল মালিকপক্ষের অনবরত অকথ্য নির্যাতন। ১৮৬০ সালে শ্রমিকরা তাঁদের মজুরি না কমিয়ে সারা দিনে আট ঘণ্টা কাজের সময় নির্ধারণের জন্য দাবি জানান। এ জন্য তাঁরা একটি সংগঠনও তৈরি করেন পরবর্তীকালে, যার নাম হয় আমেরিকান ফেডারেশন অব লেবার। এই সংগঠন শ্রমিকদের প্রাপ্য মজুরি ও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে অবিরত আন্দোলন চালিয়ে যেতে থাকে।
১৮৮৪ সালে সংগঠনটি দিনে কাজের সময় ‘আট ঘণ্টা’ নির্ধারণের জন্য মালিকপক্ষের কাছে সময় বেঁধে দেয়। সময় দেওয়া হয় ১৮৮৬ সালের ১ মে পর্যন্ত। বারবার মালিকপক্ষের কাছে দাবি জানানো হলেও একটুও সাড়া মেলে না তাঁদের কাছে। একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হয় এ বিষয়ে এক আলোড়ন তোলা আর্টিকেল। ব্যস, বিদ্রোহ ওঠে চরমে। আর শিকাগো হয়ে ওঠে প্রতিবাদ-বিদ্রোহের মূলমঞ্চ। পহেলা মে যতই এগিয়ে আসছিল, দুই পক্ষের সংঘর্ষ অবধারিত হয়ে উঠছিল। মালিক-বণিক শ্রেণি ওই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেছিল। এরই মধ্যে পুলিশ আগে তাঁদের এপর নির্মম নির্যাতন চালিয়েছিল, আবারও চলল তেমনই প্রস্তুতি। শ্রমিকদের ওপর গুলি চালাতে পুলিশদের বিশেষ অস্ত্র কিনে দেন ব্যবসায়ীরা। পহেলা মে তে যুক্তরাষ্ট্রের প্রায় তিন লাখ শ্রমিক কাজ ফেলে নেমে আসেন রাস্তায়। আন্দোলন চরমে ওঠে। ৩ মে, ১৮৮৬ সালে সন্ধ্যাবেলা শিকাগোর হে মার্কেট বাণিজ্যিক এলাকায় জড়ো হওয়া শ্রমিকদের দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন কিছু পুলিশ সদস্য। এমন সময় হঠাৎ বোমা বিস্ফোরণে কিছু পুলিশ আহত হন, পরে মারা যান ছয়জন। পরে পুলিশও শ্রমিকদের ওপর আক্রমণ চালালে নিহত হন ১১ জন শ্রমিক। পুলিশের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের হত্যামামলায় অভিযুক্ত করে ছয়জনকে প্রহসনমূলকভাবে দোষী সাব্যস্ত করে প্রকাশ্যে ফাঁসি দেওয়া হয়। কিন্তু এই মিথ্যা বিচারের অপরাধ শেষ পর্যন্ত ধরা পড়ে। ২৬ জুন ১৮৯৩ ইলিনয় সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মিথ্যে ছিল ওই বিচার। পুলিশের কমান্ডারকে দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত করা হয়।
শেষ পর্যন্ত ১৮৮৯ সালে ফরাসী বিপ্লবের শতবার্ষিকীতে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক-এর প্রথম কংগ্রেস অনুষ্ঠিত হয। সেখানে ১৮৯০ সাল থেকে শিকাগো প্রতিবাদের বার্ষিকী আন্তর্জাতিকভাবে বিভিন্ন দেশে পালনের প্রস্তাব করেন রেমন্ড লাভিনে। ১৮৯১ সালের আন্তর্জাতিকের দ্বিতীয় কংগ্রেসে এই প্রস্তাব আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়। এরপরপরই ১৮৯৪ সালের মে দিবসের দাঙ্গার ঘটনা ঘটে। পরে, ১৯০৪ সালে আমস্টারডাম শহরে অনুষ্ঠিত সমাজতন্ত্রীদের আন্তর্জাতিক সম্মেলনে এই উপলক্ষে একটি প্রস্তাব গৃহীত হয়। প্রস্তাবে দৈনিক আটঘন্টা কাজের সময় নির্ধারণের দাবী আদায়ের জন্য এবং শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য বিশ্বজুড়ে পয়লা মে তারিখে মিছিল ও শোভাযাত্রা আয়োজনের সকল সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল এবং শ্রমিক সংঘের (ট্রেড ইউনিয়ন) প্রতি আহবান জানানো হয়। সেই সম্মেলনে “শ্রমিকদের হতাহতের সম্ভাবনা না খাকলে বিশ্বজুড়ে সকল শ্রমিক সংগঠন মে’র ১ তারিখে “বাধ্যতামূলকভাবে কাজ না করার” সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। অনেক দেশে শ্রমজীবী জনতা মে মাসের ১ তারিখকে সরকারি ছুটির দিন হিসাবে পালনের দাবী জানায় এবং অনেক দেশেই এটা কার্যকরী হয়। দীর্ঘদিন ধরে সমাজতান্ত্রিক, কমিউনিস্ট এবং কিছু কট্টর সংগঠন তাদের দাবী জানানোর জন্য মে দিবসকে মুখ্য দিন হিসাবে বেছে নেয়।
ফলে শ্রমিকদের ‘দৈনিক আট ঘণ্টা কাজ’-এর দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি পায়। সেই থেকে পহেলা মে পালিত হয় শ্রমিকদের আত্মদান আর দাবি আদায়ের দিন হিসেবে।

জেনে নিন শ্রম অধিকার

শ্রম অধিকার বা শ্রমিকদের অধিকার হচ্ছে শ্রম ও নিয়োগ আইনের অধীনস্থ একটি আইন, যেখানে শ্রমিকদের অধিকার এবং শ্রমিক ও তাদের নিয়োগকারীদের মধ্যকার সম্পর্ক প্রকাশ করে। সাধারণত এই আইন শ্রমিকদের বেতন-ভাতা , বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা এবং নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাওয়ার নিশ্চয়তা প্রধান করে। মূলত সকল শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ রাখাই হচ্ছে এই আইনগুলোর অন্যতম উদ্দেশ্য। শ্রমিক ইউনিয়ন তাদের সদস্যদের বেতন বাড়ানোর জন্য নিয়োগকারীদের সাথে আলাপ আলোচনা করে থাকে। অন্যথায় যদি বেতন বাড়ানো না হয, তাহলে তারা তাদের কাজের ধরন পরিবর্তন করে ফেলে। এই শ্রম অধিকার দ্বারা শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ ও শ্রমিকদের নিজস্ব ব্যাপারেও সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। অবশ্য সেখানে শ্রমিকদের মতামতকেও সর্বোচ্চ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হয়। প্রাথমিকভাবে সকল শ্রমিকদের একীভূত করার উদ্দেশ্যে শ্রমিক আন্দোলন শুরু হলেও বর্তমানে এর নীতি পরিবর্তিত হয়ে পড়েছে। শ্রম অধিকার আন্দোলনের সমালোচকেরা দাবী করেন যে, শ্রম আইন ব্যবস্থার উন্নতির ফলে শ্রমিকদের কাজের সুযোগ বাড়াবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সমালোচকেরা শ্রমিক ইউনিয়নকে বন্ধ হযে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন করে চালু করার ব্যাপারে আপত্তি জানায। কেননা এর ফলে প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকর্তারা শ্রমিক ইউনিয়নের বাইরের কোন শ্রমিকদের নিয়োগ দিতে পারেনা। অতঃপর “ট্যাফট-হার্টলি আইন” বন্ধ হয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে সম্পূণরুপে নিষিদ্ধ করে, কিন্তু যেসকল প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক ইউনিয়নের তৎপরতা কম, সেগুলোকে অনুমতি দেয়। এছাড়াও ট্যাফট-হার্টলি শ্রমিকদের কাজ করার অধিকার বিষয়ক নতুন একটি আইন পাস করেন, যার ফলে শ্রমিকরা কোন প্রকার ইউনিয়নের প্রভাব ছাড়াই যেকোনো প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অধিকার পায়। ইতিহাস থেকে বলা যায়, শ্রমিকরা মনে করেছিল এই আইনটি তাদের পক্ষে যাবে। মধ্যযুগে ইংল্যান্ডে কৃষকরা তাদের মজুরি বৃদ্ধি এবং কাজের উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়ার জন্য বিদ্রোহ ঘোষণা করে। এই বিদ্রোহের অন্যতম নেতা জন বল তার এক বিখ্যাত বক্তৃতায় বলেন, জন্মের সময় সব মানুষই সমান। শ্রমিকরা প্রায়ই তাদের পূর্বতন অধিকারের জন্য আপিল করতো। উদাহরণস্বরূপ, ইংরেজ কৃষকরা যখন আন্দোলন শুরু করে, তখন তাদের বেশিরভাগ আন্দোলনই ছিল ঐতিহ্যগতভাবে পাওয়া সাম্প্রদায়িক জমিগুলো নিয়ে।
ইংল্যান্ডে ১৮৩৩ সালে একটি আইন পাস করেছিল। যেখানে বলা ছিল যে, ৯ বছরের কম বয়সী কোনো শিশু কাজ করতে পারবে না, শিশুদের বয়স ৯-১৩ এর মধ্যে হলে দৈনিক মাত্র ৮ ঘন্টা এবং বয়স ১৪-১৮ এর মধ্যে হলে দৈনিক মাত্র ১২ ঘন্টা কাজ করতে পারবে।
আধুনিক মানবাধিকার আইনের অপেক্ষাকৃত একটি নতুন সংযোজন হচ্ছে শ্রম অধিকার। শিল্পায়ন প্রক্রিয়ায় শ্রমিক ইউনিয়ন তৈরী হওয়ার পর ১৯ শতাব্দী থেকে শ্রম অধিকার বিষযক আধুনিক ধারণা সৃষ্টি হয়। শ্রমিকদের অধিকারের জন্য সর্বপ্রথম এবং সবচেয়ে বিশিষ্ট সমর্থনকারী ছিলেন কার্ল মার্কস। তাঁর দর্শন এবং অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলো ছিল মূলত শ্রমিকদের নিয়ে। তিনি সমাজতন্ত্রে এমন একটি অর্থনৈতিক সিস্টেমের ধারনা তুলে ধরেছেন, যেটি হচ্ছে সম্পুনরুপে শ্রমিকদের দ্বারা শাসিত। শ্রমিকদের অধিকারের জন্য যেসকল সামাজিক আন্দোলন হয়েছে, তাদের বেশিরভাগই মার্কসের তত্ত্ব দ্বারা প্রভাবিত। বিশেষ করে সমাজতন্ত্রী ও কমিউনিস্টরা মার্কসের তত্ত্ব দ্বারা সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত। আরো অনেক মধ্যপন্থী গণতান্ত্রিক সমাজতন্ত্রের অনুসারী ও সামাজিক গণতন্ত্র বিশ্বাসী শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের জন্য মার্কসবাদকে সমর্থন করেছিল। সাম্প্রতিক সময়ে শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে যেসকল আইন তৈরি হয়েছে, সেগুলো মূলত শ্রমিকদের উপর শোষণের পরিমাণ কমানো, দেশের উন্নয়নে শ্রমিকদের ভূমিকা এবং নারী শ্রমিকদের চাহিদার উপর বিশেষ করে দৃষ্টিপাত করা হয়েছে। ১৯১৯ সালে শ্রমিক অধিকার রক্ষার জন্য সম্মিলিত জাতিপুঞ্জের অংশ হিসেবে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা গঠন করা হয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা পরবর্তীতে জাতিসংঘের অন্তর্ভুক্ত হয়ে ওঠে। জাতিসংঘ নিজেই তাদের মানবাধিকার সনদের ২টি আর্টিকেলে শ্রমিকদের অধিকারের ব্যাপারে সমর্থন দিয়েছে। আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার (নিবন্ধ ৬-৮) চুক্তিতে বলা হয়েছে-
(নিবন্ধ ২৩) ১। প্রত্যেকেরই কাজ করার, স্বাধীনভাবে কর্মসংস্থান পদ্ধতি বাছাই করে নেয়ার, পছন্দের কাজের ক্ষেত্রে ন্যায্য ও অনুকূল শর্ত এবং বেকারত্ব থেকে নিজেদেরকে রক্ষা করার অধিকার রয়েছে।
২। প্রত্যেকেরই কোনরূপ বৈষম্য ছাড়া সমান কাজের জন্য সমান বেতন পাবার অধিকার রয়েছে।
৩। যারা কাজ করে তাদের প্রত্যেকেরই ন্যায্য ও অনুকূল পারিশ্রমিক পাবার এবং তাদের পরিবারের সকল সদস্যদের সম্মানের সাথে বেঁচে থাকার এবং অন্যান্য সামাজিক সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে।
৪। সবারই তাদের নিজস্ব স্বার্থ রক্ষার জন্য ট্রেড ইউনিয়নে যোগদানের অধিকার রয়েছে।
(নিবন্ধ ২৪) প্রত্যেকেই একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কাজ করা এবং নিয়মিত সময়ের ব্যবধানে বিশ্রাম নেয়ার অধিকার রয়েছে। এ ছুটির সময় সবাই তাদের ন্যায্য বেতন-ভাতা পাবে। আইএলও এবং আরও অন্যান্য গ্রুপ বিশ্ব জুড়ে শ্রমিকদের আইনগত অধিকার তৈরি করতে আন্তর্জাতিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে। বর্তমানে বিভিন্ন দেশকে ন্যায্য বাণিজ্যের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শ্রম অধিকার নিশ্চিত করার জন্য উৎসাহ দেয়া হচ্ছে।
আইএলও এর মতে “স্বাধীনভাবে কাজ করার মূলনীতি, কাজ করার অধিকার এবং শ্রমমানকে গুরুত্তের সাথে দেখা উচিৎ।” এই আইনটি সকল ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। একটি দেশ বা সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ নির্বিশেষে সকলেরই এই নিয়মাবলীগুলোতে সমর্থন রয়েছে। এই শ্রমমান গুণগত দিক থেকে বিচার করা হয়, পরিমাণগত দিক থেকে নয়। এছাড়াও এতে কর্মপরিবেশ, মজুরি, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার মান নির্দিষ্ট করা থাকে। এই আইনগুলো এমনভাবে করা হয়নি যাতে করে উন্নয়নশীল দেশগুলো যেসকল সুবিধা ভোগ করে আসছে, তাতে কোন ক্ষতি হয়। এই শ্রমমান হচ্ছে একটি গুরুত্বপূর্ণ মানবাধিকার এবং এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দলিল দ্বারা স্বীকৃত। এছাড়াও দ্যা কনভেনশন অন দ্যা রাইটস অফ দ্যা চাইল্ড (সিআরওসি) এর ১৯৩ টি সদস্য এবং আইসিসিপিআর এর ১৬০ টি সদস্য দল এই শ্রমমানকে সমর্থন করে।
মূল শ্রমমানগুলো নিম্নরূপঃ
সমিতির স্বাধীনতা : শ্রমিকরা স্বাধীনভাবে ট্রেড ইউনিয়নে যোগদান করতে পারবে এবং এই ট্রেড ইউনিয়নগুলো হবে সম্পুন্নরুপে সরকার এবং তাদের নিয়োগকর্তাদের প্রভাবমুক্ত;
যৌথ দরকষাকষি করার অধিকার: শ্রমিকরা সম্মিলিতভাবে বা পৃথকভাবে নিযোগকারীদের সঙ্গে দরাদরি করতে পারবে;
সব ধরনের জোরপূর্বক শ্রমের উপর নিষেধাজ্ঞা: সকল প্রকার দাসত্ব থেকে শ্রমিকদের নিরাপত্তা রয়েছে এবং এমনকি জেলখানাতেও শ্রমিকদের দ্বারা জোরপূর্বক কোন কাজ করানো যাবে না;
শিশুশ্রম দূরীকরণ : শিশুদের জন্য কাজ করার একটি ন্যূনতম বয়স এবং নির্দিষ্ট শর্তের প্রয়োজনীয়তা বাস্তবায়ন;
কর্মক্ষেত্রে বৈষম্যহীনতা : সমান কাজের জন্য সবাই সমান বেতন পাবে।
বেশ কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে খুব কম সংখ্যক আইএলও সদস্য দেশই সবগুলো নিয়মাবলী অনুমোদন দিয়েছে। এখনও এই অধিকারগুলো ইউডিএইচআর দ্বারা স্বীকৃত এবং এগুলো একটি আন্তর্জাতিক আইনের অংশ।
এই আইনগুলো ছাড়াও শ্রমিকদের অধিকার নিয়ে আরো ইস্যু রয়েছে। যুক্তরাজ্যে শ্রমিকদের অধিকারে আরও আনেকগুলো বিষয় অন্তর্ভুক্ত আছে। যেমন, শ্রমিকদের কর্মসংস্থানের অধিকার, একটি নির্দিষ্ট স্কেল অনুযায়ী বেতন-ভাতা প্রদান, দৈনন্দিন কিছু সময়ের জন্য বিরতি, বৈতনিক ছুটি এবং আরও অনেক সুবিধা।

দেশে দেশে মে দিবস:
১ মে আন্তর্জাতিক মে দিবস হিসেবে পালিত হয়। এ উপলক্ষে ১ মে ৮০টি দেশে সরকারি ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
সোভিয়েত ইউনিয়নে জাঁকজমকপূর্ণভাবে মে দিবস পালিত হয়। তারা সেদিন আগুন জ্বালিয়ে শিকাগো শহরে নিহতদের স্মরণ করে।
চিন ও কিউবা রাষ্ট্রীয়ভাবে দিনটি উদযাপন করে। এদিন তারা সামরিক কুজকাওয়াজের আয়োজন করে। বের করে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা। আয়োজন করা হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের।
আর্জেন্টিনায় মে দিবসে সাধারণ ছুটি থাকে। সরকারিভাবে দিবসটি উদযাপন করা হয়। এদিন তাদের বড় বড় শহরের প্রধান সড়কে শ্রমিক শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। ১৮৯০ সালে আর্জেন্টিনায় প্রথম শ্রমিক দিবস পালন করা হয়। ১৯৩০ সালে সরকারিভাবে ছুটি ঘোষণা করা হয়।
বলিভিয়ায় ১ মে শ্রমিক দিবস হিসেবে সাধারণ ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে। এদিন শ্রমিকদের সম্মানে সরকারি-বেসরকারিভাবে নানা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
ব্রাজিলে শ্রমিক দিবস হিসেবে দিনটিতে ছুটি থাকে। এদিন ঐতিহ্যগতভাবে অধিকাংশ পেশাদার বিভাগের ন্যূনতম বেতনকাঠামো পুনর্নিধারণ করা হয়। ফলে শ্রমিকদের দিনটি আনন্দের।
ভারতে সরকারি ছুটি থাকে। মাদ্রাজে প্রথম মে দিবস পালিত হয় ১৯২৩ সালে। এ ছাড়া মহারাষ্ট্র ও গুজরাটে বিশেষ মর্যাদায় দিনটি পালিত হয়। আসামে এই দিনের জন্য বিশেষ সংগীত রয়েছে। তারা সেটি গেয়ে গেয়ে দিনটি পালন করেন।
নেপালে সরকারি ছুটি থাকে। এদিন নেপালের রাজধানী কাঠমান্ডুতে বড় শ্রমিক সমাবেশ ও বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পর্যটক ছাড়া অন্যান্য যানবাহনও বন্ধ থাকে।
জাপানে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে দিনটি পালিত হয়। এদিন জাপানের রাজধানী টোকিওতে শ্রমিকরা পদযাত্রা ও বিক্ষোভ কর্মসূচির আয়োজন করেন।
জার্মানিতে জাতীয় ছুটি হিসেবে দিনটি পালিত হয়। এদিন বার্লিনে শ্রমিকদের বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। এ উপলক্ষে তারা বিভিন্ন মেলার আয়োজন করে থাকে।
হাঙ্গেরিতে সরকারিভাবে দিবসটি পালন করা হয়। এদিন তারা বিশেষ নাচ পরিবেশন করে দিনটিকে আলাদা মর্যাদায় অভিষিক্ত করেছে।
ইউরোপজুড়েই মে দিবসে থাকে সরকারি ছুটি। তারা বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে দিনটি পালন করে। এ জন্য বিশেষ নাচ-গানের ব্যবস্থাও রয়েছে। বড় বড় শহরে অনুষ্ঠিত হয় শ্রমিক সমাবেশ। শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোয় এ দিনটি উপলক্ষে বিশেষ বোনাস দেওয়ার রীতিও চালু রয়েছে।
আমেরিকা ও কানাডায় সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সোমবার শ্রম দিবস হিসেবে পালিত হয়। তারা ১ মে মে দিবস পালন করে না। আমেরিকা ও কানাডাতে অবশ্য সেপ্টেম্বর মাসে শ্রম দিবস পালিত হয়। সেখানকার কেন্দ্রীয় শ্রমিক ইউনিয়ন এবং শ্রমের নাইট এই দিন পালনের উদ্যোগতা। হে মার্কেটের হত্যাকান্ডের পর আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্রোভার ক্লিভল্যান্ড মনে করেছিলেন পয়লা মে তারিখে যে-কোন আয়োজন হানাহানিতে পর্যবসিত হতে পারে। সে জন্য ১৮৮৭ সালেই তিনি নাইটের সমর্থিত শ্রম দিবস পালনের প্রতি ঝুঁকে পড়েন।
অস্ট্রেলিয়ায় মে দিবস উপলক্ষে বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হচ্ছে মে ট্রি বা গাছ। একটি বৃক্ষ আকৃতির উঁচু বস্তুকে ঘিরে তারা নাচ-গানের আয়োজন করে।

মে-দিনের কবিতা
সুভাষ মুখোপাধ্যায়

প্রিয়,ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
ধ্বংসের মুখোমুখি আমরা,
চোখে আর স্বপ্নের নেই নীল মদ্য
কাঠফাটা রোদ সেঁকে চামড়া।

চিমনীর মুখে শোনো সাইরেন-শঙ্খ,
গান গায় হাতুড়ী ও কাস্তে,
তিল তিল মরণেও জীবন অসংখ্য
জীবনকে চায় ভালবাসতে।

প্রণয়ের যৌতুক দাও প্রতিবন্ধে,
মারণের পণ নখদন্ডে;
বন্ধন ঘুচে যাবে জাগবার ছন্দে,
উজ্জ্বল দিন দিক্-অন্তে।

শতাব্দী-লাঞ্ছিত আর্তের কান্না
প্রতি নিঃশ্বাসে আনে লজ্জা;
মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা, আর না
পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা।

প্রিয়, ফুল খেলবার দিন নয় অদ্য
এসে গেছে ধ্বংসের বার্তা,
দুর্যোগে পথ হয় হোক দুর্বোধ্য
চিনে নেবে যৌবন-আত্মা।।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত