শিরোনাম

নারী দিবস ও সফল নারীরা

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ১২:২৭, মার্চ ১০, ২০১৮

একটি আন্দোলন একটি ইতিহাস একটি দিবস যার পেছনে থাকে অনেক অজানা কথা। সেই কথা কেউ জানে কেউ জানে না। আবার কখনো একটি ইতিহাস তৈরি করতে হয় অনেক অনেক ত্যাগ স্বীকার। যেমন ত্যাগ স্বীকার করেছিল ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের রাস্তায় অনেক শ্রমিক নারী। আর এর বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আন্তর্জাতিক নারী দিবস এবার সেই নারী দিবস ও সফল নারীদের নিয়ে লিখেছেন জিয়া উল ইসলাম

নারী দিবস ইতিহাস:
নাম ছিল আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস এখন তা পরিবর্তন হয়ে নাম হয়েছে আন্তর্জাতিক নারী দিবস। এই নামই এখন সারাবিশ্বে পরিচিত। প্রতি বছর ৮ মার্চ তারিখে পালিত হয়। পৃথিবীর সব নারীরা একটি প্রধান উপলক্ষ হিসেবে এই দিবস উদযাপন করে থাকেন। বিশ্বের এক এক প্রান্তে নারীদিবস উদযাপনের প্রধান লক্ষ্য এক এক প্রকার হয়। কোথাও নারীর প্রতি সাধারণ সম্মান ও শ্রদ্ধা উদযাপনের মুখ্য বিষয় হয়, আবার কোথাও মহিলাদের আর্থিক, রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠাটি বেশি গুরুত্ব পায়। এই দিবসটি উদযাপনের পেছনে রয়েছে নারী শ্রমিকের অধিকার আদায়ের সংগ্রামের ইতিহাস। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মজুরিবৈষম্য, কর্মঘণ্টা নির্দিষ্ট করা, কাজের অমানবিক পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইর্য়কের রাস্তায় নেমেছিলেন সুতা কারখানার নারী শ্রমিকেরা। সেই মিছিলে চলে সরকার লেঠেল বাহিনীর দমন-পীড়ন। ১৯০৮ খ্রিস্টাব্দে নিউইয়র্কের সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট নারী সংগঠনের পক্ষ থেকে অয়োজিত নারী সমাবেশে জার্মান সমাজতান্ত্রিক নেত্রী ক্লারা জেটকিনের নেতৃত্বে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন হলো। ক্লারা ছিলেন জার্মান রাজনীতিবিদ; জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির স্থপতিদের একজন। এরপর ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। ১৭টি দেশ থেকে ১০০ জন নারী প্রতিনিধি এতে যোগ দিয়েছিলেন। এ সম্মেলনে ক্লারা প্রতি বৎসর ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। সিদ্ধান্ত হয়ঃ ১৯১১ খ্রিস্টাব্দ থেকে নারীদের সম-অধিকার দিবস হিসেবে দিনটি পালিত হবে। দিবসটি পালনে এগিয়ে আসে বিভিন্ন দেশের সমাজতন্ত্রীরা। ১৯১৪ খ্রিস্টাব্দ থেকে বেশ কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ পালিত হতে লাগল। বাংলাদেশেও ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতার লাভের পূর্ব থেকেই এই দিবসটি পালিত হতে শুরু করে। অতঃপর ১৯৭৫ সালে খ্রিস্টাব্দে ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি প্রদান করা হয়। দিবসটি পালনের জন্য বিভিন্ন রাষ্ট্রকে আহ্বান জানায় জাতিসংঘ। এরপর থেকে সারা পৃথিবী জুড়েই পালিত হচ্ছে দিনটি।

বাংলাদেশে সফল নারী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা:
শেখ হাসিনা ওয়াজেদ বাংলাদেশের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বাংলাদেশের ১০ম জাতীয় সংসদের সরকারদলীয় প্রধান এবং বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সভানেত্রী। বাংলাদেশের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রধান নেতা ও বাংলাদেশ সরকারের প্রথম রাষ্ট্রপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। শেখ হাসিনা ওয়াজেদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কন্যা। তাঁর মাতার নাম বেগম ফজিলাতুননেসা। তিনি টুঙ্গিপাড়া ২৮ সেপ্টেম্বর, ১৯৪৭ সালে জন্মগ্রহণ করেন এবং বাল্যশিক্ষা সেখানেই নেন। ১৯৫৪ সাল থেকে তিনি ঢাকায় পরিবারের সাথে মোগলটুলির রজনীবোস লেনের বাড়িতে বসবাস শুরু করেন। পরে মিন্টো রোডের সরকারি বাসভবনে উঠেন। ১৯৫৬ সালে তিনি টিকাটুলির নারীশিক্ষা মন্দির বালিকা বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। ১৯৬১ সালের ১ অক্টোবর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়িতে থাকা শুরু করেন। ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট এক সামরিক অভ্যুত্থানে তিনি ও তাঁর বোন শেখ রেহানা বাদে পরিবারের সকল সদস্যকে হত্যা করা হয়। বোনদ্বয় সেইসময় পড়াশোনার জন্য পশ্চিম জার্মানিতে অবস্থান করছিলেন। ১৯৬৫ সালে তিনি আজিমপুর বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিক পাশ করেন। শেখ হাসিনা ১৯৭৩ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকা অবস্থায ১৯৬৭ সালে এম এ ওয়াজেদ মিয়ার সাথে তাঁর বিয়ে হয় এবং ওয়াজেদ মিয়া ৯ মে, ২০০৯ তারিখে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁদের সংসারে সজীব ওয়াজেদ জয় (পুত্র) ও সায়মা ওয়াজেদ পুতুল (কন্যা) নামে দুই সন্তান রয়েছেন। আওয়ামী লীগ ১৯৮১ সালে সর্বসম্মতিক্রমে শেখ হাসিনাকে তাঁর অনুপস্থিতিতেই দলের সভাপতি নির্বাচিত করে। শেখ হাসিনা ২০১১ সালে বিশ্বের সেরা প্রভাবশালী নারী নেতাদের তালিকায় ৭ম স্থানে ছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক নিউইয়র্ক টাইমস সাময়িকীর জরীপে বিশ্বের সেরা প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর নারী নেতৃত্বের ১২ জনের নাম নির্বাচিত করে। উল্লেখ্য যে, ২০১০ সালে নিউ ইয়র্ক টাইমস সাময়িকীর অনলাইন জরিপে তিনি বিশ্বের সেরা দশ ক্ষমতাধর নারীদের মধ্যে ৬ষ্ঠ স্থানে ছিলেন। ২০১৫ সালে বিশ্বের ক্ষমতাধর নারীদের তালিকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ৫৯তম স্থানে ছিলেন। ২০১৪ সালে এই তালিকায় শেখ হাসিনার অবস্থান ছিল ৪৭তম ছিলেন। ২০১০ খ্রিষ্টাব্দের ৮ মার্চ বিশ্ব নারী দিবসের শতবর্ষে পদার্পণ উপলক্ষে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত সংবাদ সংস্থা সিএনএন ক্ষমতাধর ৮ এশীয় নারীর তালিকা প্রকাশ করেছিল। উক্ত তালিকায় ষষ্ঠ অবস্থানে ছিলেন শেখ হাসিনা। ৩০ ডিসেম্বর, ২০১১ সালে শেখ হাসিনাকে বাংলা ভাষার ধারক ও বাহক হিসেবে বাংলা একাডেমি তাদের বার্ষিক সাধারণ সভায় সম্মানসূচক ফেলোশিপ প্রদান করে। এছাড়াও, ১২ জানুয়ারি, ২০১২ইং তারিখে দক্ষিণ এশিয়ায় শান্তি এবং উন্নযনে অনন্য অবদানের জন্য ভারতের ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয কর্তৃপক্ষ তাঁকে ডক্টর অব লিটারেচার বা ডি-লিট ডিগ্রি প্রদান করে। ২০১৪ সালে সমুদ্রসীমা জয়ের জন্য তিনি সাউথ সাউথ পুরস্কার লাভ করেন। ২০১৫ সালের ২৮ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ ৭০তম অধিবেশনে পরিবেশ বিষয়ক সর্বোচ্চ পুরস্কার চ্যাম্পিয়নস অব দ্য আর্থ পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার ক্ষেত্রে অনন্য অবদানের জন্য আইসিটি টেকসই উন্নয়ন পুরস্কার লাভ করেন। সূত্র: উইকিপিডিয়া

সফল নারী ক্লারা জেটকিন:
ক্লারা জেটকিন ছিলেন জার্মান জার্মানীর কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, মার্কসবাদী তাত্ত্বিক এবং ‘নারী অধিকার’ আন্দোলনের বিশিষ্ট নেত্রী। ১৯১১ সালে তিনি প্রথম আন্তর্জাতিক নারী দিবস সংগঠিত করেন। ১৯১৭ সাল পর্যন্ত তিনি জার্মানির সমাজ গণতান্ত্রিক দলের কর্মী ছিলেন, পরে তিনি জার্মানির স্বাধীন সমাজ গণতান্ত্রিক দলে যোগদান করেন। সেই দলের দূর -বামপন্থী গ্রুপ স্পার্টাকাস লিগ থেকেই পরে জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি গঠিত হয়। তিনি সেই স্পার্টাকাস লিগের হয়ে ১৯২০ থেকে ১৯৩৩ পর্যন্ত রাইখস্ট্যাগে প্রতিনিধিত্ব করেন।শৈশবে জেটকিন শিক্ষক হওয়ার ইচ্ছা নিয়ে প্রশিক্ষণ শুরু করলেও, অচিরেই তিনি সমাজতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী হয়ে উঠেন। ১৮৭৪ সালের দিকে তার সাথে বিশেষ যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল জার্মানির নারী আন্দোলন এবং শ্রম-আন্দোলনের সাথে জড়িত সংগঠনগুলোর। নারীদের মাঝে ব্যাপকভাবে কাজ করার লক্ষ্যে ক্লারা ১৮৭৮ সালে জার্মানির সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক দলে যোগ দেন। এই দলটি গড়ে ওঠার এক ইতিহাস আছে। ১৮৭৫ সালে দুটি দল একত্রিত হয়ে এই দলটি গড়ে উঠে। দল দুটি ছিল ফের্দিনান্দ লাসালে কর্তৃক গঠিত সাধারণ জার্মান শ্রমিক সংগঠন যা সংক্ষেপে অউঅঠ এবং আগস্ট বেবেল ও ভিলহেল্ম লাইবনেখত কর্তৃক গঠিত জার্মানির সমাজগণতান্ত্রিক শ্রমিক দল যা সংক্ষেপে SDAP. পরে ১৮৯০ সালে এই দলটির আধুনিক সংস্করণ তৈরি হয়েছিল এবং নাম গ্রহণ করেছিল জার্মানির সমাজ গণতান্ত্রিক দল। ১৮৭৮ সালে বিসমার্ক জার্মানিতে সমাজতন্ত্র-বিরোধী জরুরি আইন এবং সমাজতান্ত্রিক কাজকর্মের উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করলে জেটকিন ১৮৮২ সালে জুরিখ চলে যান এবং সেখান থেকে প্যারিসে নির্বাসনে যান। প্যারিসে থাকাকালীন তিনি সমাজতান্ত্রিক আন্তর্জাতিক গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। এর কিছুদিন পর তিনি রাশিয়া থেকে পালিয়ে আসা মার্কসবাদী বিপ্লবী এবং তার অন্যতম বন্ধু ওসিপ জেটকিনকে বিবাহ করেন এবং তার নামের জেটকিন অংশটুকু গ্রহণ করেন। ১৮৮৯ সালের জানুয়ারি মাসে যক্ষ্মা রোগে তার স্বামী ওসিপ মৃত্যুবরণ করেন। পরে জেটকিন শিল্পী জর্জ ফ্রিডরিখ যুন্ডেলকে বিয়ে করেন। যুন্ডেল ছিলেন তার চেয়ে আঠার বছরের ছোট এবং এই বিবাহ ১৮৯৯ থেকে ১৯২৮ সাল পর্যন্ত ছিল। তিনি জার্মানিতে সমাজ-গণতান্ত্রিক নারী আন্দোলন বিকশিত করেন; ১৮৯১ সাল থেকে ১৯১৭ সাল পর্যন্ত জার্মানির সমাজ গণতান্ত্রিক দলের পত্রিকা সমতা বা উরব সম্পাদনা করেন। ১৯০৭ সালে দলের নারী বিষয়ক বিভাগ প্রতিষ্ঠিত হলে, ইনি এই বিভাগের নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। ১৯১০ সালে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক কর্মজীবী নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় কোপেনহেগেন শহরে। এই সভায় ১৭টি দেশের শতাধিক নারী-প্রতিনিধি যোগদান করেন। এই সম্মেলনে জার্মানির সমাজতান্ত্রিক দলের নারী-কার্যালয়ের নেত্রী হিসাবে তিনি যোগদান করেন এবং ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস করার প্রস্তাব পেশ করেন। কংগ্রেস ক্লারা জেটকিনের প্রস্তাব গ্রহণ করে। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের প্রস্তাবে তিনি বলেন, প্রতি বৎসরে একই দিনে প্রত্যেকটি দেশে আন্তর্জাতিক নারী দিবস উদযাপন করতে হবে। একই সাথে তিনি ৮ মার্চকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে নিজে পালন করেন। এরপর থেকেই পৃথিবীব্যাপী ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হয়ে আসছে। ১৯১৬ সালে স্পার্টাকাসপন্থী লিগের তিনি সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ১৯১৭ সালে জার্মানির সমাজ গণতান্ত্রিক দল ভেঙে USPD গঠিত হলে এটিরও তিনি সহ-প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ১৯১৯ সালের জানুয়ারি মাসে জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি কেপিডি প্রতিষ্ঠিত হলে তিনি এর সাথে সম্পৃক্ত হন এবং ১৯২০ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত রাইখস্ট্যগে এই দলের প্রতিনিধিত্ব করেন। ১৯২০ সালে তিনি লেনিনের একটি সাক্ষাৎকার নেন।
এই সাক্ষাৎকারটির শিরোনাম ছিলো -The Women’s Question. ১৯২৪ সাল পর্যন্ত তিনি জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় অফিসের সদস্য ছিলেন। ১৯২৭ থেকে ১৯২৯ সাল পর্যন্ত তিনি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। ১৯২১ থেকে ১৯৩৩ সাল পর্যন্ত কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল বা কমিন্টার্নের এক্সিকিউটিভ কমিটির সদস্য পদে ছিলেন। এসবের ভিতরেই ১৯২৫ সালে জার্মান বাম সংগঠন ‘লাল সাহায্য’-এর সভাপতি হিসাবে নির্বাচিত হন। ১৯৩২ সালে প্রবীণ সদস্য হিসাবে রাইখস্ট্যাগের চেয়ার-ওম্যান পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন। ১৯৩৩ সালের ২০ জুন ৭৫ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন। উল্লেখ্য তিনি ; ৫ জুলাই, ১৮৫৭ সালে জম্মগ্রহন করেন।

জার্মানির সফল নারী চ্যান্সেলর আঙ্গেলা মের্কেল:
আঙ্গেলা ডোরোটেয়া মের্কেল হচ্ছেন জার্মানির বর্তমান চ্যান্সেলর। তিনি ২০১০ সালের ১০ এপ্রিল জার্মানির মেকলেনবার্গ-ভোরপোমার্ন প্রদেশ থেকে জার্মান সংসদে সর্বাধিক সংখ্যক আসন জয়ের মাধ্যমে চ্যান্সেলর নির্বাচিত হন। মের্কেল ক্রিসচিয়ান ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান এবং ২০০২ হতে ২০০৫ পর্যন্ত ক্রিসচিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন)-এর সংসদীয় জোটের চেয়ারম্যান ছিলেন।২০০৫ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত জার্মানির দুই বৃহত্তম রাজনৈতিক দল ক্রিশ্চিয়ান সোশ্যাল ইউনিয়ন এবং সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি অফ জার্মানির সমন্বযে গঠিত জোটের নেতৃত্ব দেন। ২০০৯ এর ২৭ সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে তাঁর দল সর্বাধিক সংখ্যক ভোট পেযে জয়ী হয় এবং ঈঝট ও ফ্রি ডেমোক্রেটিক পার্টির সাথে জোট সরকার গঠন করে। তাঁর সরকার ২০০৯ এর ২৮ অক্টোবরে শপথ গ্রহণ করে। ২০০৭ সালে আঙ্গেলা মের্কেল ইউরোপিয়ান কাউন্সিলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। স্বাস্থ্য সেবা সংস্কার এবং ভবিষ্যৎ জ্বালানী উন্নয়ন সংক্রান্ত সমস্যা তাঁর মেয়াদকালের প্রধান চ্যালেঞ্জ। মের্কেল জার্মানির প্রথম নারী চ্যন্সেলর। ২০০৭ সালে তিনি মার্গারেট থ্যাচারের পর জি-৮ এর দ্বিতীয় নারী চেয়ারম্যান হিসেবে নির্বাচিত হন।১৯৫৪ সালের ১৭ জুলাই পশ্চিম জার্মানির হ্যামবুর্গে আঙ্গেলা মের্কেল জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম হোর্স্ট কাসনার এবং মাতার নাম হারলিন মের্কেলের মা ছিলেন ল্যাটিন এবং ইংরেজির শিক্ষক। তিনি একসময় সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির সদস্য ছিলেন। মের্কেলের মায়ের পূর্বপুরুষেরা পোল্যান্ডের অধিবাসী ছিলেন। তাঁর একজন ছোট ভাই এবং ছোট বোন আছে।আঙ্গেলা মের্কেলের পিতা হাইডেলবের্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে ধর্মতত্ত্ব বিষয়ে পড়ালেখা করেছিলেন। শৈশবে মের্কেল পল্লী অঞ্চলে বড় হয়েছিলেন। তখনকার সময়ে অধিকাংশ শিশুদের মত মের্কেলও জার্মানির সোশ্যালিস্ট ইউনিটি পার্টির নেতৃত্বাধীন জার্মান মুক্ত তরুণ নামক তরুণ-আন্দোলনের সদস্য ছিলেন। মের্কেল এই সংগঠনের সংস্কৃতি বিষয়ক সচিব ছিলেন। তবে মের্কেল বলেছেন আমার স্মৃতি বলে, আমি সেসময় সংস্কৃতি বিষয়ক সচিব ছিলাম। কিন্তু আমি কী জানতাম? আমি বিশ্বাস করতাম আমি যখন ৮০ বছর বয়সী হব, তখনও আমি এ বিষয়ে কিছু জানবো না।বাধ্যতামূলক মার্ক্সবাদ-লেনিনবাদ কোর্সে মের্কেল পাশ করলেও ফলাফল খুব একটা ভাল ছিল না। আঙ্গেলা মের্কেল টেম্পলিন শহরের একটি স্কুলে পড়ালেখা করেন। এরপর তিনি লাইপৎসিশ বিশ্ববিদ্যালয়ে ১৯৭৩ থেকে ১৯৭৮ সাল পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞান পড়েন। শিক্ষার্থী থাকাকালে মের্কেল বিশ্ববিদ্যালয়ে সহশিক্ষামূলক কার্যক্রম চালুর দাবিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন। পরবর্তীতে মের্কেল বার্লিনে অবস্থিত জার্মান বিজ্ঞান অ্যাকাডেমিতে ভৌত রসায়ন বিষয়ে উচ্চতর শিক্ষা নেন এবং এখানেই তাঁর কর্মজীবন শুরু করেন। সেসময় তিনি রুশ ভাষা স্বতঃস্ফূর্তভাবে বলতে শিখেছিলেন। কোয়ান্টাম রসায়নের উপর গবেষণার জন্য তাঁকে ডক্টরেট ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এরপর তিনি এখানে গবেষক হিসেবে কাজ করেন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্ববিখ্যাত টাইম ম্যাগাজিন ২০১১ সালে ৩২ জনের নাম ‘পার্সন অফ দ্য ইয়ার’ হিসেবে মনোনীত করে।
এ তালিকায় - স্টিভ জবস, বারাক ওবামা, সিলভিও ব্যার্লুস্কোনি, লিওনেল মেসি প্রমূখ বিশ্বখ্যাত ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি তিনিও স্থান পেয়েছেন।

ব্রিটেনের প্রথম সফল নারী প্রধানমন্ত্রী মারগারেট থ্যাচার:
মারগারেট হিলডা থ্যাচার একজন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এবং কন্সারভেটিভ পার্টির নেত্রী ছিলেন। তিনি বিংশ শতাব্দীর দীর্ঘ সময় শাসন করা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও এখন পর্যন্ত সেদেশের একমাত্র নারী প্রধানমন্ত্রী। তার আপসহীন রাজনীতি ও নেতৃত্বের ধরনের জন্য একজন সোভিয়েত সাংবাদিক তাকে লৌহমানবী বলে খেতাব দেন। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে তিনি যে নীতিগুলোর বাস্তবায়ন করেছিলেন আজ সেগুলো থ্যাচারিজম নামে পরিচিত। মারগারেট হিলডা রবার্টস জন্মে ছিলেন ১৯২৫ সালের ১৩ অক্টোবর লিংকনশায়ারের গ্রান্থামে। তার বাবার নাম ছিল আলফ্রেড রবার্টস ও মায়ের নাম ছিল বিয়েট্রিশ ইথেল। তিনিই গ্রান্থামে বড় হয়েছেন এবং সেখানে তার বাবার দুটো মুদির দোকান ছিল। তার বাবা স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং মেথডিস্ট চার্চে ধর্মযাজক হিসেবে কাজ করতেন। আলফ্রেড ১৯৪৫-১৯৪৬ সাল পর্যন্ত গ্রান্থামের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি হান্টিং টাওয়ার রোড প্রাইমারি স্কুলে অধ্যয়ন করেন এবং সেখান থেকে বৃত্তি পেয়ে কেস্টেভেন এন্ড গ্রান্থাম গার্লস স্কুলে যান। তার রিপোর্ট কার্ড থেকে জানা যায় তিনি খুবই পরিশ্রমী ছিলেন এবং পিয়ানো, ফিল্ড হকি, কবিতা আবৃত্তি, সাতার ও দৌড় প্রতিযোগিতায় উত্তরোত্তর উন্নতি করছিলেন। ১৯৪৭ সালে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে থেকে কেমিস্ট্রিতে দ্বিতীয় শ্রেণি নিয়ে গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করেন। কেমিস্ট্রি পড়ার সময়ও তিনি আইন বিষয়ে পড়ার ও রাজনীতি করা নিয়ে ভাব ছিলেন। ১৯৪৬ সালে তিনি অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের কন্সারভেটিভ এসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন। গ্রাজুয়েশন সম্পন্ন করার পর তিনি কলচেস্টারের বি এক্স প্লাস্টিকে রিসার্চ কেমিস্ট হিসেবে যোগ দেন। ১৯৪৮ সালে তিনি আই সি আই তে চাকরির জন্য আবেদন করেন কিন্তু প্রত্যাখ্যাত হন এই বলে যে তিনি খুবই উদ্ধত, একগুঁয়ে ও স্বমতে ভয়ংকরভাবে অটল থাকা একজন ব্যক্তি। ১৯৪৮ সালে মারগারেট পার্টি কনফারেন্সে যোগদান করেন এবং এসোসিয়েশনের কর্তাব্যক্তিরা তার প্রতি এতটাই মুগ্ধ ছিলেন যে তারা তাকে ডার্টফোর্ডের প্রার্থী হিসেবে আবেদনের জন্য প্রস্তাব করেন যদিও তিনি অনুমোদিত প্রার্থী তালিকার মধ্যে ছিলেন না। মাত্র ২৫ পঁচিশ বছর বয়সে তিনি ডার্টফোর্ডের কন্সারভেটিভ পার্টির প্রার্থী হিসেবে নির্বাচিত হন। কন্সারভেটিভ পার্টির প্রার্থী হিসেবে বিজয়ের পর দেয়া ডিনার পার্টিতে তার সাথে দেখা হয় একজন সম্পদশালি ও সফল ব্যবসায়ী ডেনিস থ্যাচারের সাথে। ১৯৫০ ও ১৯৫১ সালে লেবার পার্টির নিরাপদ আসন ডার্টফোর্ড থেকে তিনি সাধারণ নির্বাচনে অংশ নেন কিন্তু দুইবারই ব্যর্থ হন তবে পরাজয়ের ব্যবধান কমিয়ে আনেন। একই সাথে সবচেয়ে কম বয়সী এবং একমাত্র মহিলা প্রার্থী হিসেবে মিডিয়া আকর্ষণে সক্ষম হন। এসময়ই তিনি ডেনিস থ্যাচারকে বিয়ে করেন এবং একই বছর তাদের জমজ সন্তান ক্যারল ও মার্ক জন্মগ্রহণ করেন। ১৯৫৯ সালে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে তিনি মেম্বার অফ পার্লামেন্ট নির্বাচিত হন। তার কৈশোরকালীন সময়েই তার প্রতিভা এবং কাজের প্রতি অনুপ্রেরনার কারণে তার মধ্যে ভবিষ্যৎ প্রধানমন্ত্রীর হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছিল। যদিও তিনি এ ব্যপারে হতাশা প্রকাশ করে বলেছিলেন যে তার জীবদ্দশায় কেউ মহিলা প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না কারণ পুরুষ জনগোষ্ঠী কুসংস্কারাচ্ছন্ন। ১৯৬৪ সালে কন্সারভেটিভ পার্টির পরাজয়র পর তিনি তার দলের ভূমি ও গৃহায়ন দপ্তরের মুখপাত্র নির্বাচিত হন। সে সময় তিনি ভাড়াটিয়াদের কাউন্সিল হাউস কেনার পক্ষে অবস্থান নেন। লেবার পার্টির উচ্চ রাজস্ব নীতির কড়া সমালোচকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। এছাড়াও তিনি পুরুষ সমকামিতার বৈধতা ও গর্ভপাতের পক্ষে আনীত বিলের সমর্থক ছিলেন। এমনকি মৃত্যুদন্ডে শাস্তি বহাল রাখার পক্ষে তিনি কাজ করেন। ১৯৭০ সালে সাধারণ নির্বাচনে কন্সারভেটিভ পার্টির জয় লাভের পর তিনি ক্যাবিনেটে শিক্ষা মন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ লাভ করেন। মারগারেট থ্যাচার প্রধানমন্ত্রী হন ১৯৭৯ সালের ৪ মে, এ সময় তিনি ১০ ডাউনিং স্ট্রীটে এসে উঠেন। প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর থ্যাচার সাপ্তাহিকভাবে রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথের সাথে দেখা করতেন। ১৯৮৬ সালের দিকে দ্যা সানডে টাইমস এর একটি প্রতিবেদন রানী এবং প্রধানমন্ত্রীর সাথে মতানৈক্যের সংবাদ দেয়। পরবর্তীতে প্রাসাদ থেকে এ দাবি প্রত্যাখ্যান করা হয়। থ্যাচার নিজেও পরবর্তীতে লেখেন যে সরকারের কর্মকান্ডের ওপর রানীর সন্তোষজনক মনোভাব ছিল। তার শাসনামলে তিনি প্রত্যক্ষ ট্যাক্স কমিয়ে দিয়ে পরোক্ষ ট্যাক্স বাড়িয়ে দেন। অর্থের সরবারহ কমানোর জন্য সুদের হার বাড়িয়ে দেন যাতে করে মদ্রাস্ফীতি কম থাকে। সরকারি খরচের সীমা রেখা বেধে দেন এবং সামাজিক কার্যক্রম, শিক্ষা, আবাসন খাতে ব্যয় কমিয়ে দেন। শিক্ষা খাতে ব্যয় কমানোর জন্য তিনিই প্রথম অক্সফোর্ড গ্র্যাজুয়েট প্রধানমন্ত্রী যাকে দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের পর অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট ডিগ্রি দেয়া হয়নি। তিনি ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষমতা হ্রাস করেন কারণ তার মতে এটি সংসদীয় গণতন্ত্র ব্যাহত করে ও অর্থনৈতিক ক্ষতি সাধন করে। তার সময়ে তিনি ট্রেড ইউনিয়নের ক্ষমতা প্রায় ধ্বংস করে ফেলতে সক্ষম হন। ১৯৮৪ সালে ১২ অক্টোবর সকালে এক হত্যা চেষ্টায় তিনি অল্পের জন্য বেঁচে যান। এ হামলায় পাঁচ জন নিহত হয়। মারগারেট থ্যাচার ২০১৩ সালের ৮ এপ্রিল ৮৭ বছর বয়সে মারা যান। মৃত্যুর সময় তিনি লন্ডনের রিজ হোটেলে অবস্থান করছিলেন।
এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত