শিরোনাম

চলো না ঘুরে আসি

প্রিন্ট সংস্করণ  |  ১২:৪২, ফেব্রুয়ারি ১০, ২০১৮

মানুষ পরিবার পরিজন কিংবা প্রিয়জনকে নিয়ে কাছে অথবা ঢাকায় একটু দূরের কোথাও যেতে চায় বিনোদনের জন্য কারণ মানুষ ঢাকায় কর্মব্যস্ত, অফিস থেকে বাসা বা বাসা থেকে তার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে যেতে যানজটে যে সময় যায় তাতে আর সময় থাকে না কোথাও থেকে ঘুরে আসতে। তাই সপ্তাহে একটি দিন মানুষ একটু যেতে চায় সেই খোলা আকাশ, নদী-প্রকৃতি বা পুরানো ঐতিহাসিক স্থাপনার কাছে এবার সেই পার্ক বা দর্শনীয় স্থান নিয়ে লিখেছেন-জিয়া উল ইসলাম

প্রাসাদের ইতিহাস:
সোয়ারীঘাট সংলগ্ন বড় কাটরা প্রাসাদ বরাবর বুড়িগঙ্গন, ওপারে জিনজিরা। জিনজিরা-জাজিরার অপভ্রংশ, যার অর্থ আইল্যান্ড বা দ্বীপ। এ দ্বীপে ১৬২০-২১ খ্রিস্টাব্দে জিনজিরা প্রাসাদ ‘নওঘরা’ নির্মাণ করেছিলেন তৎকালীন সুবেদার নওয়াব ইব্রাহিম খাঁ। আজ থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগে শহর থেকে জিনজিরার মধ্যে চলাচলের জন্য একটি কাঠের পুল ছিল। পলাশীর যুদ্ধে সর্বস্বান্ত সিরাজদ্দৌলার পরিবার পরিজনকে জরাজীর্ণ জিনজিরা প্রাসাদে প্রেরণ করা হয়েছিল। আর সেই সাথে নবাব আলিবর্দী খাঁর দুই কন্যা ঘসেটি বেগম ও আমেনা বেগমকেও আনা হয়। তারা দু’জনই পিতার রাজত্বকালে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। অবশেষে এক দিন পরিচারিকাদের সাথে একই নৌকায় তাকে ঢাকায় পাঠানো হয়। সে দিন বুড়িগঙ্গার তীরের জিনজিরা প্রাসাদে বন্দীদের নিয়ে রক্ষীদল উপস্খিত হয়েছিল। উল্লেখ্য, নবাব আলিবর্দী খাঁ ও তার পরিবার আগেই এখানে স্থান লাভ করেছিল। এভাবে পরাজিত নবাবের পরিবার-পরিজন জিনজিরা প্রাসাদে আশ্রয় গ্রহণ করেন। তার পর মীরজাফরের পুত্র মীরনের চক্রান্তে ১৭৬০ খ্রিস্টাব্দের গ্রীষ্মের কোনো এক সন্ধ্যায় সিরাজ পরিবার জিনজিরা প্রাসাদ থেকে নেমে বুড়িগঙ্গা নদীর বুকে এক নৌকায় আরোহণ করে। নৌকা যখন বুড়িগঙ্গা ও ধলেশ্বরীর সঙ্গমমূলে ঢাকাকে পেছনে রেখে এগিয়ে যাচ্ছিল তখন মীরননিযুক্ত ঘাতক বাকির খান নৌকার ছিদ্রস্থান খুলে দিয়ে নৌকাটি ডুবিয়ি দেয়। কিছু বুঝে ওঠার আগেই সবাই তলিয়ে যান বুড়িগঙ্গায়।
সর্বশেষ মালিকানা: পুরো প্রাসাদ ও এর আশপাশ মালিকি ও তত্ত্বাবধায়ক পরিবারের পূর্বপুরুষ হাজী অজিউল্যাহ ব্রিটিশ আমলে ১৪ শতক জমি সাফ কবলা মূলে খরিদসূত্রে মালিক। ওয়ারিশসূত্রে বর্তমান মালিক ও পরিবার প্রধান হলেন জাহানারা বেগম এবং হাজী অজিউল্যাহ তার শ্বশুর।
প্রাসাদের বর্তমান অবস্থাঃ একদা এটা ছিল নির্জন গ্রাম যার নাম হাওলি বা হাবেলী। বর্তমানে ঘিঞ্জি বসতি। ছোট গলিপথে একটু এগোতে একট প্রবেশ তোরণ। তোরণের দুই পাশে স্থায়ী ভবন নির্মাণ করে আবাস গড়ে তোলা হয়েছে। চার দিকে দোকানপাট, ঘরবাড়ি, অট্টালিকা প্রবেশ অনেক কষ্টসাধ্য। প্রাসাদটির পূর্বাংশ তিনতলা সমান, দেখতে অনেকটা ফাঁসির মঞ্চ বা সিঁঘির বলে মনে হয়। মাঝ বরাবর প্রকা- প্রাসাদ তোরণ। মোগল স্থাপত্যের অপূর্ব কারুকার্যখচিত তোরণ প্রাসাদকে দুই ভাগ করে অপর প্রান্তে খোলা চত্বরে মিশেছে। প্রাসাদ তোরণের পূর্বাংশেই ছিল সুড়ঙ্গপথ। ব্রিটিশ-পাকিস্তান আমল থেকে দেখে এলেও অল্ডধকার প্রকোষ্ঠে কেউ ঢুকতে সাহস করত না এই সুড়ক পথে। পশ্চিমাংশের অল্ডধকার কুঠরি ময়লা আবর্জনায় পূর্ণ অব্যবহৃত। এ প্রাসাদটির নির্মাণশৈলী বড়কাটরার আদলে হলেও কক্ষ ও আয়তন অনেক কম।
বড় কাটরা প্রায় ৩৭৫ বছর পূর্বে শায়েস্তা খাঁ এর আমলে তারই জামাতা বড় কাটরা নির্মাণ করেন। মূলত এটি নদী তীরবর্তী একটি দূর্গ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। আজ থেকে প্রায় ১০০ বছর পূর্বে বড় কাটরা ভবনে হোসাইনিয়া আশরাফুল উলুম মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকার চকবাজার থানা থেকে দক্ষিণ দিকে ১৬, বড় কাটারায় এটি অবস্থিত।
বর্তমান অবস্থা : অতীতের অবকাঠামোর সাথে সংযুক্ত করে বর্তমানে আরও নতুন ভবন সংযোজন করে মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা ব্যবহার করছে। মাদ্রাসার তত্ত্বাবধানে শুধুমাত্র বড় কাটারার মূল গেইটসহ কিছু ভবন রয়েছে। অন্যগুলো বেদখল হয়ে গেছে। স্থাপনা ভবনটি সময়ের পরিবর্তনে সংস্কারের অভাবে অতীত সৌন্দর্য হারাচ্ছে। স্থাপনা প্রাঙ্গনে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীদের জন্য একটি লাইব্রেরি রয়ছে। এখানে কোন জাদুঘর নেই। মাদ্রাসার প্রবেশ দরজা দিয়ে বিনা পয়সায় এক সময়ের বড় কাটরাতে প্রবেশ করা যায়। দর্শনার্থীরা স্বাচ্ছন্দে এই ঐতিহাসিক স্থান দেখতে পারে। এটি প্রতিদিনই সকাল ৮.০০ টা থেকে বিকাল ৫.০০ টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। বর্তমানে বড় কাটরা হোসাইনিয়া আশরাফুল উলুম মাদ্রাসার তত্ত্বাবধানে রয়েছে। বিশেষ দিনগুলোতে বিদেশী ও দেশী দর্শনার্থীরা এই স্থাপনা ঘুরে দেখেন। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মাদ্রাসার কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে ঘুরে দেখতে পারে বড় কাটরা।

ওসমানী উদ্যান:
ঢাকার ঐতিহ্যবাহী উদ্যানগুলোর একটি ওসমানী উদ্যান।এটি প্রায় ২৩.৩৭ একর জুড়ে বিস্তৃত। ঢাকার গুলিস্তানে ঢাকা সিটি কর্পোরেশনের (নগর ভবন) বিপরীত পাশে এবং সচিবালয়ের পিছনে এটি অবস্থিত। উদ্যানটির সাথেই রয়েছে গোলাপ শাহ মসজিদ, এর পাশেই রয়েছে গোলাপ শাহ এর মাজার, রমনা ভবন, জিপিও, বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ এর প্রধান অফিস এবং ঢাকা ষ্টেডিয়াম।১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের কমান্ডার লেঃ জেঃ এম এ জি ওসমানির নামকরনে ওসমানি উদ্যান নামকরন করা হয় এবং তারই স্মরনে উদ্যানটির পাশে ওসমানি অডিটোরিয়াম নির্মাণ করা হয়। এটি খোলা থাকে প্রতিদিন। গ্রীস্মকালে এটি সকাল ৫.০০ টা থেকে রাত ৯.০০ টা পর্যন্ত এবং শীতকালে সকাল ৬.০০ টা থেকে রাত ৮.০০ টা পর্যন্ত। সাপ্তাহিক বন্ধ নেই। উদ্যানটিতে প্রবেশ এবং বাহির হওয়ার জন্য মোট ৩টি সদর দরজা রয়েছে। মূল দরজাটি সিটি কর্পোরেশনের ঠিক বিপরিত পাশে, দ্বিতীয় দরজাটি রয়েছে গোলাপ শাহ মসজিদের পাশ ঘেষে এবং তৃতীয় দরজাটি ওসমানি অডিটোরিয়ামের পাশ ঘেষে। সর্মাট আওরঙ্গজেবের প্রধান সেনাপতি মীর জুমলার কামানটি বর্তমানে ওসমানী উদ্যানের শোভা বর্ধন করে রয়েছে। কামানটি মীর জুমলা আসাম যুদ্ধে ব্যবহার করেছিলেন। মোট ৫.৩৪ একর জুড়ে বিস্তৃত লেকদুটি উদ্যানটির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। লেকটিতে পর্যাপ্ত পরিমান পানি প্রবাহমান থাকায় এতে ছোট বড় প্রচুর মাছ পাওয়া যায়। প্রাতঃভ্রমণকারীদের জন্য রয়েছে ৩.৭৪ কিলোমিটার দৈর্ঘ্য বিশিষ্ট ওয়াক ওয়ে। উদ্যানটির ভিতরে পশ্চিম দিকে মহিলা প্রাতঃভ্রমনকারীদের জন্য তৈরি করা হয়েছে ২৫ বর্গকিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট মহিলা অঙ্গন। এর চারপাশ গাছ দিয়ে ঘেরা। এখানে মহিলাগন যোগব্যায়াম সহ নান রকমের শারিরীক কসরত করতে পারেন। উদ্যানটির প্রবেশ পথের সামনেই রয়েছে দেশি বিদেশি নান জাতের ফুল গাছের সমাহরোহ। এছাড়া রয়েছে নানা জাতের পাতা বাহারের গাছ।

পানাম নগর:
পানাম নগর নারায়ণগঞ্জ জেলার, সোনারগাঁতে অবস্থিত একটি ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন শহর। বড় নগর, খাস নগর, পানাম নগর-প্রাচীন সোনারগাঁর এই তিন নগরের মধ্যে পানাম ছিলো সবচেয়ে আকর্ষণীয়। এখানে কয়েক শতাব্দী পুরনো অনেক ভবন রয়েছে, যা বাংলার বার ভূইয়াঁদের ইতিহাসের সাথে সম্পর্কিত। সোনারগাঁর ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে এই নগরী গড়ে ওঠে।সোনারগাঁ লোক ও কারুশিল্প জাদুঘর থেকে উত্তর দিকে হাঁটাপথেই পৌঁছানো যায় অর্ধ্বচন্দ্রাকৃতি পানাম পুলে। পুলটির দৈর্ঘ্য ছিলো ৭২ ফুট আর প্রস্থ ছিলো ১৫.৫ ফুট মাঝখানটা ছিলো উঁচু। এই পুল পেরিয়েই পানাম নগর এবং নগরী চিরে চলে যাওয়া পানাম সড়ক। আর সড়কের দুপাশে সারি সারি আবাসিক একতলা ও দ্বিতল বাড়িতে ভরপুর পানাম নগর।
ইতিহাস : ১৫ শতকে ঈসা খাঁ বাংলার প্রথম রাজধানী স্থাপন করেছিলেন সোনাগাঁওযে। পূর্বে মেঘনা আর পশ্চিমে শীতলক্ষ্যা নদীপথে বিলেত থেকে আসতো বিলাতি থানকাপড়, দেশ থেকে যেতো মসলিন। শীতলক্ষ্যা আর মেঘনার ঘাটে প্রতিদিনই ভিড়তো পালতোলা নৌকা। প্রায় ঐসময়ই ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানীর বাণিজ্যিক কার্যক্রম ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে ইউরোপীয় অনুপ্রেরণায় নতুন ঔপনিবেশিক স্থাপত্যরীতিতে গড়ে উঠে পানাম নগরী। পরবর্তিতে এই পোশাক বাণিজ্যের স্থান দখল করে নেয় নীল বাণিজ্য। ইংরেজরা এখানে বসিয়েছিলেন নীলের বাণিজ্যকেন্দ্র। ডব্লিউ. ডব্লিউ. হান্টার-এর অভিমত হলো, সুলতানী আমলে পানাম ছিলো সোনারগাঁর রাজধানী। কিন্তু পানামে, সুলতানী আমলের তেমন কোনো স্থাপত্য নজরে পড়ে না, তাই এই দাবিটির সত্যতা ঠিক প্রমাণিত নয। এক্ষেত্রে জেম্?স টেলর বলেছেন, সোনারগাঁর প্রাচীন শহর ছিলো পানাম। এই তত্ত্বটির সাথে বাস্তবের কোনো বিরোধ নেই। শহরটিতে ঔপনিবেশিক ধাঁচের দোতলা এবং একতলা বাড়ি রয়েছে প্রচুর। যার বেশিরভাগ বাড়িই ঊনবিংশ শতাব্দির (১৮১৩ খ্রিস্টাব্দের নামফলক রয়েছে)। মূলত পানাম ছিলো হিন্দু ধনী ব্যবসায়ীদের বসতক্ষেত্র। ব্যবসায়ীদের ব্যবসা ছিলো ঢাকা-কলকাতা জুড়ি। তারাই গড়ে তোলেন এই নগর। ১৬১১ খ্রিস্টাব্দে মোঘলদের সোনারগাঁ অধিকারের পর সড়ক ও সেতু নির্মাণের ফলে রাজধানী শহরের সাথে পানাম এলাকার সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হয়। পানাম পুল (বিলুপ্ত), দুলালপুর পুল ও পানামনগর সেতুর অবস্থান ও তিনদিকের খাল-বেষ্টনী থেকে বোঝা যায় পানাম, সোনারগাঁর একটা উপশহর ছিলো। বাংলার স্বাধীন রাজা ঈসা খাঁর পদচারণা ছিলো এই নগরীতে। সুলতানী আমল থেকে এখানে বিকশিত ছিলো বাংলার সংস্কৃতি। পানামের টিকে থাকা বাড়িগুলোর মধ্যে ৫২টি বাড়ি উল্লেখযোগ্য। পানাম সড়কের উত্তর পাশে ৩১টি আর দক্ষিণ পাশে ২১টি বাড়ি রযেছে। বাড়িগুলোর অধিকাংশই আয়তাকার, উত্তর-দক্ষিণে বিস্তৃত, উচ্চতা একতলা থেকে তিনতলা। বাড়িগুলোর স্থাপত্যে ঔপনিবেশিকতা ছাড়াও মোঘল, গ্রিক এবং গান্ধারা স্থাপত্যশৈলীর সাথে স্থানীয় কারিগরদের শিল্পকুশলতার অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখা যায়। প্রতিটি বাড়িই ব্যবহারোপযোগিতা, কারুকাজ, রঙের ব্যবহার, এবং নির্মাণকৌশলের দিক দিয়ে উদ্ভাবনী কুশলতায় ভরপুর। ইটের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে ঢালাই-লোহার তৈরি ব্র্যাকেট, ভেন্টিলেটর আর জানালার গ্রিল। মেঝেতে রয়েছে লাল, সাদা, কালো মোজাইকের কারুকাজ। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই খিলান ও ছাদের মধ্যবর্তী স্থানে নীল ও সাদা ছাপ দেখা যায়। এছাড়া বাড়িগুলোতে নকশা ও কাস্ট আয়রনের কাজ নিখুঁত। কাস্ট আয়রনের এই কাজগুলো ইউরোপের কাজের সমতূল্য বলে বিশেষজ্ঞদের অভিমত। এর সাথে আছে সিরামিক টাইল?সের রূপায়ণ। প্রতিটি বাড়িই অন্দরবাটি এবং বহির্বাটি -এই দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। বেশিরভাগ বাড়ির চারদিকের ঘেরাটোপের ভিতর আছে উন্মুক্ত উঠান। পানাম নগরীর পরিকল্পনাও নিখুঁত। নগরীর পানি সরবাহের জন্য দুপাশে ২টি খাল ও ৫টি পুকুর আছে। প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই আছে কুয়া বা কূপ। নগরীকে জলাবদ্ধতামুক্ত রাখতে করা হয়েছে খালের দিকে ঢালু। প্রতিটি বাড়ি পরস্পর থেকে সম্মানজনক দূরত্বে রয়েছে। নগরীর যাতায়াতের জন্য রয়েছে এর একমাত্র রাস্তা, যা এই নগরীর মাঝখান দিয়ে বয়ে গেছে এপাশ-ওপাশ। নগরীর ভিতরে আবাসিক ভবন ছাড়াও আছে মসজিদ, মন্দির, গীর্জা, মঠ, গোসলখানা, নাচঘর, পান্থশালা, চিত্রশালা, খাজাঞ্চিখানা, দরবার কক্ষ, গুপ্ত পথ, বিচারালয়, পুরনো জাদুঘর। এছাড়া আছে ৪০০ বছরের পুরোন টাকশাল বাড়ি। সোনারগাঁ লোকশিল্প জাদুঘর থেকে পশ্চিম দিকে রয়েছে গোয়লদী হোসেন শাহী মসজিদ। এ মসজিদটি সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহীর শাসনামলে নির্মিত হয়। মোগড়াপাড়া চৌরাস্তা দিয়ে একটু দক্ষিণ দিকে গেলে রয়েছে আরো কিছু ইমারত, বারো আউলিয়ার মাজার, হযরত শাহ ইব্রাহিম দানিশ মন্দা ও তাঁর বংশধরদের মাজার, দমদম গ্রামে অবস্থিত দমদমদুর্গ ইত্যাদি। এছাড়াও নগরীর আশেপাশে ছড়িয়ে আছে ঈসা খাঁ ও তাঁর ছেলে মুসা খাঁর প্রমোদ ভবন, ফতেহ শাহের মসজিদ, সোনাকান্দা দুর্গ, পঞ্চপীরের মাজার, কদম রসুল, চিলেকোঠাসহ বহু পুরাতাত্ত্বিক গুরুত্ববহ স্থাপনা। সব সময় সকলের জন্যই উন্মিক্ত থাকে পানাম নগরী।

বোটানিক্যাল গার্ডেন:
বাংলাদেশের জাতীয় উদ্যান পরিচিত বোটানিক্যাল গার্ডেন হিসেবে। জাতীয় চিরিয়াখানার পাশেই বোটানিক্যাল গার্ডেন অবস্থিত। এই গার্ডেনে রয়েছে চেনা-অচেনা নানান ধরনের গাছ-গাছালি। ২০৮ একর জায়গার উপর প্রতিষ্ঠিত এই জাতীয় উদ্যানটি। প্রতিদিন শত শত সাধারণ মানুষ, দর্শনার্থী জাতীয় উদ্যান প্রদর্শন করতে আসে। ঢাকার ওয়ারি এলাকায় এই উদ্যানের আরও একটি অংশ আছে, যা বলধা গার্ডেন নামে পরিচিত।
গার্ডেনটির অবস্থান : মিরপুর-১, জাতীয় চিরিয়াখানার পাশেই অবস্থিত।
কিভাবে যাবেন : গাবতলী বাসষ্ট্যান্ড থেকে ছোট লেগুনায় করে ১০ টাকা ভাড়া দিয়ে সরাসরি বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাওয়া যায়। সদরঘাট বাসষ্ট্যান্ড থেকে মিরপুর-১ এ যে সব গাড়ী গুলো যায় তাতে উঠলে ২৫ টাকা ভাড়া দিয়ে বোটানিক্যাল গার্ডেনে যাওয়া যায়।
উপভোগ করা যাবে : এই উদ্যানটিতে রয়েছে প্রায় ৮০০ জাতের বৃক্ষরাজি। এই সব বৃক্ষরাজির মধ্যে রয়েছে নানান ধরনের ফল ও ফুলের বাগান। উদ্যানটি প্রায় ২.৫ কিলোমিটার আয়তন বিশিষ্ট হওয়ায় ফল ও ফুলের বাগান ছাড়াও রয়েছে পুকুর, দীঘি, ঝোপঝাড় ও নানান প্রজাতির ঔষধির গাছ।
প্রধান আকর্ষণ : এই উদ্যানটির প্রধান আকর্ষন নানান প্রজাতির বৃক্ষরাজি ও সুশীতল শান্ত পরিবেশ।
বিশেষ দিক : উদ্যানটিতে নিরাপত্তার জন্য নিয়োজিত রয়েছে প্রায় ৬০ জন নিরাপত্তা কর্মী। এই সব নিরাপত্তা কর্মীরা দর্শনার্থীদের বিশেষ নিরাপত্তা দিয়ে থাকে।
অভিযোগ করবেন যেখানে : দর্শনার্থী যে কোন ধরনের বিপদে গার্ডেনের ভিতরে অবস্থিত বন-বিভাগের কর্মকর্তার কার্যালয়ে গিয়ে অভিযোগ করতে পারেন।
বিবিধ : জাতীয় উদ্যানের সামনের ছোট ছোট ফাস্টফুড থেকে কিছু না কিনে খাওয়ায় ভালো। কেননা এখানে প্রত্যেকটি দ্রব্যের দাম অনেক বেশি। মানসম্মত খাবারের জন্য মিরপুর-১ গোল চত্বরের যে কোন রেষ্টুরেন্ট ভালো।

লালবাগ কেল্লা:
লা লবাগ কেল্লা পুরাতন ঢাকার লালবাগে অবস্থিত। সম্রাট আওরঙ্গজেব তার শাসনামলে লালবাগ কেল্লা নির্মাণের ব্যবস্থা করেন। সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র যুবরাজ শাহজাদা আজম ১৬৭৮ খ্রিষ্টাব্দে এই প্রাসাদ দূর্গের নির্মাণ কাজ শুরু করেন। তৎকালীন লালবাগ কেল্লার নামকরণ করা হয় আওরঙ্গবাদ কেল্লা বা আওরঙ্গবাদ দূর্গ। পরবর্তীতে সুবাদার শায়েস্তা খাঁনের শাসনামলে ১৬৮৪ খিষ্টাব্দে নির্মাণ কাজ অসমাপ্ত রেখে দূর্গটি পরিত্যাক্ত হয়। সে সময়ে নতুন ভাবে আওরঙ্গবাদ কেল্লা বাদ দিয়ে লালবাগ কেল্লা নামকরণ করা হয়। যা বর্তমানে প্রচলিত। বর্গাকৃতির সুউচ্চ প্রাচীর ঘেরা লালবাগ কেল্লার প্রথমেই নজরে আসে বিশাল তোরন/ফটক। লালবাগ কেল্লায় মোট তিনটি ফটক আছে যার মধ্যে দুইটি বর্তমানে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। ভেতরে প্রবেশ করলেই বাগান ঘেরা পরিবেশ দর্শনার্থীদের মনে আনন্দ দেয়। সোজা একটু ভেতরেই শায়েস্তা খাঁনের প্রিয় কন্যা পরীবিবির সমাধি সৌধ। ১৬৮৭-৮৮ খ্রিষ্টাব্দের কোন এক সময় পরিবিবি মৃত্যুবরণ করেন। তার স্মৃতি ধরে রাখার জন্য শায়েস্তা খাঁন ব্যায়বহুল একটি সমাধি সৌধ তৈরি করেন। এই একটি মাত্র ইমারত মার্বেল পাথর, কষ্টি পাথর ও বিভিন্ন রংয়ের ফুল, পাতা সুশোভিত চাকচিক্যময় টালির সাহায্যে অভ্যন্তরীণ নয়টি কক্ষ অলংকৃত করা হয়েছে। কক্ষগুলির ছাদ করবেল পদ্ধতিতে কষ্টি পাথরের তৈরি। মূল সমাধি সৌধের কেন্দ্রীয় কক্ষের উপরের কৃত্রিম গম্বুজটি তামার পাত দিয়ে আচ্ছাদিত। উল্ল্যেখ্য সমাধিটির সৌধ ২০.২ মিটার বর্গাকৃতির। এছাড়া নাম না জানা আরো দুইটি সমাধি এবং কয়েকটি ফোয়ারা, পাহাড়ি উচু টিলা, সুরঙ্গ পথ এবং কেল্লার দক্ষিণ এবং পশ্চিম দূর্গ প্রাচীরের নির্দিষ্ট দূরত্ব পর পর একটি করে পলকাটা তোপমঞ্চ। কেল্লার একমাত্র পুকুর। চারিদিক ঘাট বাঁধানো সিড়ির মত এবং পুকুরটি বর্গাকৃতির। পেছনে সৈনিকদের ব্যারাক যা বর্তমানে আনসার ক্যাম্প। পাহাড়ি উচু টিলার নিচে যে কক্ষগুলো পরিত্যাক্ত ছিল সেগুলোকে এখন একটি কনফারেন্স রুম বানানো হয়েছে যা কর্তৃপক্ষ ব্যবহার করেন। কয়েকটি সুরঙ্গ পথ দেখা যাবে বাইরে থেকে, এগুলোতে দর্শনার্থীদের প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। এছাড়াও দর্শনীয় জিনিসগুলোর মধ্যে লালবাগ কেল্লা মসজিদ, সম্রাট আওরঙ্গজেবের ৩য় পুত্র শাহজাদা আজম বাংলার সুবাদার থাকাকালীন এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন ১৬৭৮-৭৯ খ্রিষ্টাব্দে। আয়তাকারে (১৯.১৯ মি: ৯.৮৪ মি) নির্মিত তিন গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদটি এদেশের প্রচলিত মুঘল মসজিদের একটি আদর্শ উদাহরণ। বর্তমানেও মসজিদটি মুসল্লিদের নামাজের জন্য ব্যবহার হয়ে আসছে। এছাড়া শায়েস্তা খাঁনের বাসভবনের পাশে একটি কামান/তোপ রাখা আছে যা সেই সময়ে বিভিন্ন যুদ্ধে ব্যবহার হত। এছাড়া লালবাগ কেল্লায় সবচাইতে আকর্ষণীয় এবং দর্শনীয় যে জিনিসটি আছে তা হল সুবেদার শায়েস্তা খাঁনের বাসভবন ও দরবার হল। বর্তমানে যা লালবাগ কেল্লা জাদুঘর হিসেবে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত রাখা হয়েছে।
গ্রীষ্মকালীন: ১লা এপ্রিল থেকে ৩০শে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সকাল ১০.০০ টা থেকে বিকেল ৬.০০ টা পর্যন্ত। দুপুর ১.০০ টা থেকে ১.৩০ মিনিট পর্যন্ত বিরতি। শুক্রবার : সকাল ১০.০০ টা থেকে ৩.০০ টা পর্যন্ত। ১২.৩০ মিনিট থেকে ২.৩০ মিনিট পর্যন্ত বিরতি। শীতকালীন : ১লা অক্টোবর থেকে ৩০শে মার্চ পর্যন্ত সকাল ৯.০০ টা থেকে বিকেল ৫.০০ টা পর্যন্ত। দুপুর ১.০০ টা থেকে ১.৩০ পর্যন্ত বিরতি। শুক্রবার সকাল ৯.০০ থেকে বিকেল পর্যন্ত। দুপুর ১২.৩০ মিনিট থেকে ২.০০ টা পর্যন্ত বিরতি। রোববার পূর্ণ দিবস বন্ধ থাকে ও সোমবার অর্ধ দিবস পর্যন্ত বন্ধ থাকে। এছাড়া সরকারী ছুটির দিনগুলোতে লালবাগ কেল্লা পূর্নদিবস বন্ধ থাকে।

রোজ গার্ডেন:
১৯৩৬ সালে ঢাকার নবাবী আমলে প্রায় ১.৪৯ হেক্টর আয়তনের এলাকার উপর ঐতিহাসিক রোজ গার্ডেন প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা শহরস্থ সূত্রাপুর থানা এলাকাধীন ১৩ নং কে.এ. দাস লেন এই ঠিকানায় রোজ গার্ডেন অবস্থিত। বর্তমানে এটি রশিদ মঞ্জিল নামেই পরিচিত। প্রতিদিন সকাল ৯ টা থেকে সন্ধ্যা ৬ টা পর্যন্ত রোজ গার্ডেন দর্শনার্থীদের জন্য খোলা থাকে। রোজ গার্ডেনের কোন সাপ্তাহিক বন্ধ নেই। তবে শুটিং চলাকালীন সময়ে দর্শনার্থীদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয় না। রোজ গার্ডেনের পশ্চিম বাহু এবং উত্তর বাহুর মধ্যবর্তী অংশে দুটি মূল ফটক আছে। প্রবেশ ও বাহির হওয়ার জন্য পশ্চিম দিকের ফটক দিয়ে প্রবেশ করলে প্রথমেই আছে একটি বিস্তীর্ন খোলা প্রাঙ্গন। এখানে মঞ্চের উপর দন্ডায়মান আছে কয়েকটি সুদৃশ্য নারী মূর্তি। পূর্বাংশের মধ্যবর্তী স্থানে রয়েছে একটি আয়তাকার পুকুর। পুকুরের পূর্ব ও পশ্চিম পাশের মাঝামাঝি একটি করে বাধানো পাকা ঘাট আছে। এর পূর্বাংশে আছে পশ্চিমমূখী একটি দোতলা ইমারত। এ ইমারতটির নাম হলো “রশিদ মঞ্জিল”। রশিদ মঞ্জিলের প্রবেশপথের অনতিদূরের সম্মুখের চত্বরে ইটও সিমেন্ট নির্মিত একটি সুন্দর ফোয়ারা দেখা যায়। একটি সাত ধাপ বিশিষ্ট সিঁড়ি দিয়ে রশিদ মঞ্জিলের প্রথম তলায় আরোহন করা যায়। এর সামনের দিকের মাঝামাঝি অংশের প্রতি কোঠার পাশাপাশি তিনটি খিলান দরজা আছে। উপরের তলায় প্রতিটি খিলানের উপর একটি করে পডিয়াম আছে। টিমপেনামগুলো লতাপাতার নকশা এবং রঙ্গিন কাঁচ দিয়ে শোভিত। এর সামনে আছে বাইরের দিকে উপবৃত্তাকার উদগত অপ্রশস্ত বেলকনি। এর দুপাশে একটি করে করিনথীয় পিলার আছে। পিলারগুলোর দুই পাশের অংশে প্রতি তলায় আছে একটি করে খিলাল দরজা। এদের প্রতিটির কাঠের পাল্লার ভনিসীর ব্লাইন্ড ও টিমপেনামে লতাপাতার নকশা দেখা যায়। এবং সামনেই অপ্রশস্ত খোলা বেলকনি আছে। এর উপরাংশের কার্ণিস বক্রাকার যা বেলস্ট্রেড নকশা শোভিত। অপরাপর অংশের কার্ণিসগুলোও একই রকম। মধ্যবর্তী অংশ ছাদের সামনের ভাগে আছে আট কোনাকার এবং খিলান সম্বলিত বড় আকারের ছত্রী। এর ছাদ একটি আধাগোলাকার গম্ভুজ ঢাকা। ইমারতটির দু-কোনে দুটি করিনথীয় পিলার দেখা যায়। এদের শীর্ষেও ছত্রী নকশা আছে। এলাকার ভূমি পরিকল্পনায় নির্মিত রশিদ মঞ্জিলের প্রতি তলায় মোট ১৩ টি ছোট ও বড় আকারের কোঠা আছে। প্রথম তলায় প্রবেশের পর পশ্চিমাংশের বাঁ দিকে আছে উপরের তলায় যাওয়রা জন্য ঘুর্ণায়মান সিঁড়ি। এ ইমারতের পূর্ব বাহুর বাম পাশে আছে দুই বাহু বিশিষ্ট আর একটি দোতালা ইমারত। ডান পাশে পরবর্তীকালে আরও কিছু ইমারত নির্মিত হয়েছে। বাইরে ও ভেতরের দিকে পুরোপুরি চুনকামসহ গতরলেপনে আবৃত এ ইমারতের খিলানের টিমপেনামের রঙ্গিন কাঁচের অলঙ্করণ বেশ আকর্ষণীয়।

বাহাদুর শাহ পার্ক:
১৮৮৫ ইং সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারী খাজা নবাব স্যার সলিমুল্লাহর জৈষ্ঠ পুত্র নবাবজাদা খাজা হাফিজুল্লাহ স্মরণে বর্তমান জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের দিকে যে পার্কটি আছে সেখানে একটি স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন করা হয়েছিল এবং তৎকালীন স্মৃতিস্তম্ভের পার্কটির নামকরণ করা হয়েছিল ভিক্টোরিয়া পার্ক। ১৯৫৬ ইং সনের তৎকালীন নবাব খান বাহাদুর এই ভিক্টোরিয়া পার্কের নাম পরিবর্তন করেন এবং ১৯৫৭ ইং সন থেকে পার্কটির নামকরণ করা হয় বাহাদুর শাহ পার্ক। বাহাদুর শাহ পার্কে দর্শনীয় জিনিসগুলোর মধ্যে রয়েছে নবাবজাদা খাজা হাফিজুল্লাহ স্মরণে তৈরী স্মৃতিস্তম্ভটি। খাজা হাফিজুল্লাহ স্মরণে নির্মিত স্মৃতিফলক। ঢাকা সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক নির্মিত ফোয়ারা। বাহাদুর শাহ পার্কের গাছপালা বেষ্টিত ছায়াঘেরা মনোরম পরিবেশ। নবাবজাদা খাজা হাফিজুল্লাহ স্মরণে নির্মিত স্মৃতিস্তম্ভটি ঠিক পূর্বের ন্যায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে কালের সাক্ষ্যি হয়ে। স্থানীয়ভাবে প্রাত:ভ্রমনকারী সংঘ গড়ে তোলা হয়েছে। প্রতিদিন ভোর ৫.০০ টা থেকে সকাল ৯.০০ টা পর্যন্ত। সকাল ১০.০০ টা থেকে দুপুর ২.০০ টা পর্যন্ত বিরতি। বিকাল ৩.০০ টা থেকে রাত ১০.৩০ মিনিট পর্যন্ত খোলা থাকে। কোন প্রকার সাপ্তাহিক বন্ধ নাই।


লালকুঠি :
১৮৭২- ১৮৭৬ সালে নগর মিলনায়তন হিসেবে লালকুঠি/নর্থব্রুক হল প্রতিষ্ঠিত হয়। বাংলাবাজার থেকে ১০০ গজ এগিয়ে বুড়িগঙ্গার পাড় ঘেশে ফরাশগঞ্জ মহল্লায় ১ নং ফরাশগঞ্জ ঢাকা এই ঠিকানায় লালকুটি/নর্থব্রুক হলটির অবস্থান। নর্থব্রুক হলটি শুধু অনুষ্ঠান, সম্মেলন, সভা ও অন্যান্য কাজে খোলা হয়। এছাড়া প্রতিদিনই সকাল থেকে রাত পর্যন্তই খোলা থাকে এই হল প্রাঙ্গণ। এছাড়া গ্রস্থাগার ও ব্যায়ামাগার প্রতিদিনই খোলা থাকে।
সংক্ষিপ্ত ইতিহাস : পূর্ব দিক থেকে একটি গাড়ি বারান্দা দিয়ে প্রবেশযোগ্য। এ ইমারতে প্রবেশ করলেই প্রথমে একটি চতুরস্ত্র হলঘর পড়বে। এর দক্ষিণে কয়েকটি ছোট আকারের কোঠা এবং আধানলাকার ছাদে ঢাকা বারান্দা রয়েছে। হলঘরটির উত্তরের গাড়ি বারান্দা। দক্ষিণের ছোট ছোট কোঠা এবং আধানলাকার ছাদ ধাপে ধাপে উঁচু হয়ে উঠায় ইমারতটিকে বাইরের দিক থেকে দেখতে পিরামিড আদলের মনে হয়। আর সার্বোপরি লালকুঠির মাঝের হলঘরটির উপর রয়েছে মোঘল ধাঁচে তৈরী একটি আদর্শ গম্বুজ। এবং স্থাপনাটির ছাদের প্রতিটি কোনায়ও একটি করে অনুরুপ গম্বুজ রয়েছে। অনুভূমিক কার্নিস ছাদ বড় দিয়ে সজ্জিত। সবকটি গম্বুজের চূড়ায় একটি করে সুচ্যগ্র চূড়াদন্ড রয়েছে। দরজা ও জানালাগুলোর উপরের অংশ ঘোড়ার পদতল আকৃতির খিলান ধারন করছে। এই খিলানগুলোর কাঠের পাল্লায় ভেনেসীয় ব্লাইন্ড ব্যবহৃত হয়েছে। নর্থব্রুক স্থাপত্যশৈলীতে মোঘল ও ইউরোপীয় প্রথাসিদ্ধতার অপূর্ব সংমিশ্রন ঘটেছে।
লালকুঠি নামকরণ: ১৮৭২ সালে নির্মিত এই নর্থব্রুক হলটির ইমারতটি লালরঙ্গে রাঙ্গানো ছিল। এবং পরবর্তীতে এই নর্থব্রুক হলটিকে লালকুঠি নামে ডাকা হতো। তাই এর নাম হল নর্থব্রুক হল বা লালকুটি। লালকুঠির মূল ফটকের সামনে একটি রবীন্দ্র স্মৃতিফলক স্থাপন করা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও স্থানীয় একাধিক সংগঠনের আমন্ত্রনে ঢাকা শহরে লালকুঠিতে ঢাকা মিউনিসিপলিটি ও পিপলস এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে তাকে সম্বর্ধনা জানিয়ে মানপত্র পাঠ করা হয়। জবাবে কবি দেশপ্রেম সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিশ্ব শান্তির পক্ষে মতামত ব্যক্ত করেন।

জিনজিরা প্রাসাদ:
জি নজিরা প্রাসাদ একটি ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি, যার অবস্থান ঢাকা শহরের বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কয়েক’শ গজ দূরে। সিরাজদ্দৌলার স্ত্রী লুৎফুন্নেছা এবং তাঁর শিশুকন্যাকে মীরজাফর পুত্র মীরনের নির্দেশে ঢাকায় বন্দী করে রাখা হয়েছিল। সিরাজের পতনের পূর্ব পর্যন্ত ষড়যন্ত্রকারীরা ঘষেটি বেগমকে ব্যবহার করলেও সিরাজের পতনের পর আর তাকে কোনো সুযোগই দেয়া হয়নি। এ সময় তারা তাদের মা শরফুন্নেছা, সিরাজের মা আমেনা, খালা ঘষেটি বেগম, সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নেছা ও তার শিশুকন্যা সবাইকে ঢাকার জিঞ্জিরা প্রাসাদে বন্দী করে রাখা হয়। ঢাকার বর্তমান কেরানীগঞ্জের জিঞ্জিরা প্রাসাদে তারা বেশ কিছুদিন বন্দী জীবন যাপন করার পর মীরনের নির্দেশে ঘষেটি বেগম ও আমেনা বেগমকে নৌকায় করে নদীতে ডুবিয়ে মারা হয়। ক্লাইভের হস্তক্ষেপের ফলে শরফুন্নেছা, সিরাজের স্ত্রী লুৎফুন্নেছা এবং তাঁর শিশুকন্যা রক্ষা পান এবং পরবর্তীতে তাদেরকে মুর্শিদাবাদে আনা হয়। ইংরেজ কোম্পানি সরকার কর্তৃক প্রদত্ত সামান্য বৃত্তির ওপর নির্ভর করে তাদেরকে জীবন ধারণ করতে হয়। সিরাজের মৃত্যুর দীর্ঘ ৩৪ বছর পর লুৎফুন্নেছা ১৭৯০ সালে ইন্তেকাল করেন।

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত