শিরোনাম
রং বেরং দেশে দেশে

রাতের আকাশে সোনালী আলো

জিয়া উল ইসলাম  |  ০২:৫১, জানুয়ারি ০৬, ২০১৮

বিভিন্ন দেশে ১ জানুয়ারি পালন করে ইংরেজি নববর্ষ। আর সাথে চলে পালন উৎসব। আগের দিন রাতে চলে ‘থার্টি ফার্স্ট নাইট’ পার্টি। সব শ্রেণির ও বয়সের নারী পুরুষরা জমায়েত হয় বিভিন্ন শহরের বড় ঘড়ির সামনে। আর এই ঘণ্টাধ্বনির মাধ্যমে নববর্ষকে স্বাগত জানায় অনেক দেশে রাস্তার নেমে আসে হাজার হাজার মানুষ। চারিদিকে চলে আতশবাজির খেলা। আতশবাজির ঝলমলে আলোয় রাতের আকাশ ছেয়ে যায়। রাতভর চলে নাচ ও গান। আর এভাবে চলে আসে আমাদের মাঝে একটি নতুন বছর। এবার সেই নববর্ষ নিয়ে লিখেছেন - জিয়া উল ইসলাম

ইংরেজি নববর্ষের ইতিহাস

১ জানুয়ারি ইংরেজি নববর্ষ। পৃথিবীর প্রায় সব দেশে উৎসবের মেজাজে সাড়ম্বরে পালিত হয়ে থাকে। যেসব দেশে গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার ব্যবহার করা হয়, তারা সাধারণত নববর্ষ ১ জানুয়ারিতে পালন করে থাকে। ঐতিহাসিকভাবে, রোমান ক্যালেন্ডারে নতুন বর্ষ শুরু হতো ১ মার্চ থেকে। এর প্রভাব বছরের কয়েকটা মাসের ওপর দেখা যায়। ল্যাটিন ভাষায় সেপ্টেম্বরের অর্থ হচ্ছে সাত, অক্টোবর আট, নভেম্বর নয় এবং ডিসেম্বর দশ। সেই সময় রোমান সরকারের নতুন অধিবেশন শুরু হতো জানুয়ারি মাস থেকে। জুলিয়াস সিজার খ্রিস্টপূর্ব ৪৭ সালে এ ক্যালেন্ডারে পরিবর্তন ঘটিয়ে জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সৃষ্টি করেন। এতে খ্রিস্টপূর্ব ৪৪ সালে মার্ক অ্যান্টোনির কনসুল এক দফা পরিবর্তন ঘটানোর পর খ্রিস্টপূর্ব ৮ সালে এম্পরর অপাসটাস সিজার আরেক দফা পরিবর্তন ঘটান। সর্বশেষ পোপ ১৩তম গ্রেগোরি ১৫৮২ সালে এই ক্যালেন্ডারে পরিবর্তন ঘটিয়ে এর বর্তমান কাঠামোতে নিয়ে আসেন। এ পরিবর্তিত ক্যালেন্ডারে নতুন বর্ষের শুরু হয় ১ জানুয়ারি।
১ জানুয়ারি ইংরেজি নববর্ষ, আজ যা সাড়ম্বরে পালিত হয়ে থাকে, দুই হাজার বছর আগেও কিন্তু এমনটি ছিল না। এমনকি দিন-তারিখ বছরও। ফিরে দেখা যায় সেসব ইতিহাস। মধ্য আমেরিকার মেক্সিকোতে এক সভ্যতার উদয় হয়েছিল। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দী থেকে এ সভ্যতার বিকাশ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যা বিস্ময়কর। অতীব বিস্ময়কর। এ সভ্যতার নাম ‘মায়া’ সভ্যতা। মায়া সভ্যতার বহু বিচিত্র কীর্তি-কাহিনীর মধ্যে হায়ারোগিফিক লিপি একটি। সম্প্রতি এ দুর্বোধ্য লিপির পাঠোদ্ধার করা হয়েছে। এর ফলে মায়াদের সম্বন্ধে অনেক নতুন তথ্য জানা গেছে। মায়াদের সংখ্যাতত্ত্বের সম্যক জ্ঞান, গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের অসাধারণ দক্ষতা, স্থাপত্য-শিল্পকলার বহুবিধ ব্যুৎপত্তি বিস্ময়ে আমাদের হতবাক করে দেয়। মায়ারা আবিষ্কার করেছিল সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে পৃথিবীর ৩৬৫ দিন লাগে। নির্ভুল বিচারে এই গণনা ছিল ৩৬৫-২৪২০ দিন। এ সময়কালকে ১৮ মাসে ভাগ করে নিয়েছিল তারা। যার প্রতিমাসের দিন-সংখ্যা ছিল ২০। বলা হয়ে থাকে, খ্রিস্টপূর্ব ৭৫০ সাল নাগাদ তিনি যে ক্যালেন্ডারের উদ্ভাবন করেছিলেন, সেখানে দিন-সংখ্যা ছিল ৩০০। এই ৩০০ দিনকে সমান ১০টি ভাগে ভাগ করে মাসের দিন-সংখ্যা ৩০ করা হয়েছিল। যা কিনা আজকের মাসের গড়দিন। একে রোমুলাস ক্যালেন্ডার বলা যেতে পারে।
এ রোমান ক্যালেন্ডারে প্রথম শুরুর মাস ছিল মারটিয়াস, অর্থাৎ আজকের মার্চ মাস। রোমানদের যুদ্ধদেবতার নামানুসারে এ মাস। ১ মার্চ ছিল বর্ষ আরম্ভের প্রথম দিন। খ্রিস্টপূর্ব প্রথম শতকে জুলিয়াস সিজার এই ক্যালেন্ডারের কিছু সংশোধন করিয়ে নিয়েছিলেন। তৎকালীন প্রখ্যাত জ্যোতির্বিজ্ঞানীরা এ বিষয়ে তাকে সাহায্য করেছিল।
এই ক্যালেন্ডারে পৃথিবীর সূর্য প্রদক্ষিণকাল ৩৬৫ দিন। কিন্তু বছর ৩৬৫ দিনে রেখে অতিরিক্ত দিন-সংখ্যা (১-৪ দিন) প্রতি চার বছর অন্তর ফেব্রুয়ারি মাসের সঙ্গে যোগ করা হয়। তখন ফেব্রুয়ারি মাসের দিন-সংখ্যা দাঁড়ায় ২৮ থেকে ২৯ দিন। এই একটি বাড়তি দিনকে বলা হয় ‘লিপ’-ডে। আর বছরটি হলো ‘লিপিয়ার’। এ ক্যালেন্ডারটি ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’ নামে খ্যাত ছিল। বহু বছর এ ক্যালেন্ডারটি চালু ছিল। অনেককাল পরে এই জুলিয়ান ক্যালেন্ডারটির পুনরায় সংশোধন করে নিয়ে নতুন একটা ক্যালেন্ডার বাজারে চালু হয়। তৎকালীন মহামান্য ত্রয়োদশ পোপ গ্রেগোরি ১৫৭৭ সালে দুজন জ্যোতির্বিজ্ঞানীর সাহায্য নিয়ে পুরনো ক্যালেন্ডারটি গ্রেগোরিয়ান ক্যালেন্ডার নামে পরিচিত।

যেভাবে এলো ইংরেজি ১২ মাসের নাম

আমরা যে ইংরেজি বর্ষ পালন করি তা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার অনুযায়ী। গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের আগে ছিল জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রচলন। জুলিয়ান ক্যালেন্ডারেরও আগে রোমানরা গ্রিক পঞ্জিকা অনুযায়ী বছর ধরতো ৩০৪ দিনে। যাকে ১০ মাসে ভাগ করা হয়েছিল। জানুয়ারি ও ফেব্রুারির জন্ম তখনো হয়নি। মার্চ ছিল বছরের প্রথম মাস। এক সময় রাজা নুমা পম্পিলিয়াস দেখলেন ৩০৪ দিন হিসেবে বছর করলে প্রকৃতির সঙ্গে মিলছে না। খ্রিস্টপূর্ব ৭৯৩ অব্দে তিনি বছরের সাথে যোগ করলেন আরো ৬০ দিন। বছরের দিন বৃদ্ধি পেল ঠিকই সঙ্গে সমস্যাও বৃদ্ধি পেল। ঋতুর চেয়ে সময় এগিয়ে আছে ৩ মাস। তখনই জুলিয়াস সিজার ঢেলে সাজালেন বছরকে। নতুন দুটি মাস জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিকে নিয়ে এলেন বছরের প্রথমদিকে।

জানুয়ারি: রোমে ‘জানুস’ নামক এক দেবতা ছিল। রোমবাসী তাকে সূচনার দেবতা বলে মানতো। কোনোকিছু করার আগে তারা এই দেবতার নাম স্মরণ করতো। তাই বছরের প্রথম নামটিও তার নামে রাখা হয়। আরেকটি তথ্য মতে, ‘জানুস’-এর ছিল দুটি মুখ। একটি সামনে, অন্যটি পেছনে। একটি মুখ তাকিয়ে আছে অনাগত ভবিষ্যতের দিকে, অন্যটি বিদায়ী অতীত পানে। আর তাই তার সাথে মিল রেখে জানুয়ারিকে বছরের প্রথম মাস করা হয়।

ফেব্রুয়ারি : যিশুখ্রিস্টের জন্মের ৪৫০ বছর আগে দ্বিতীয় মাস হিসেবে ফেব্রুয়ারির প্রচলন ছিল। সেকালে রোমানরা ‘ফেব্রুয়া’ নামে চিত্তশুদ্ধির উৎসব পালন করতো। ‘ফেব্রুয়া’ মানে পবিত্র। রোমানরা তাই এই মাসটিকে পবিত্র মনে করে।

মার্চ : রোমান যুদ্ধ দেবতা ‘মারস’-এর নামানুসারে তারা মার্চ মাসের নামকরণ করেন।

এপ্রিল : বসন্তের দ্বার খুলে দেওয়াই এপ্রিলের কাজ। তাই কেউ কেউ ধারণা করেন ল্যাটিন শব্দ ‘এপিরিবি’ (যার অর্থ খুলে দেওয়া) থেকে এপ্রিল এসেছে।

মে : রোমানদের আলোকে দেবী ‘মেইয়ার’-এর নামানুসারে মাসটির নাম রাখা হয় মে।

জুন : রোমানদের নারী, চাঁদ ও শিকারের দেবী ছিলেন ‘জুনো’। আর তার নামেই জুনের নামকরণ করেন তারা।

জুলাই: জুলিয়াস সিজারের নামানুসারে জুলাই মাসের নামকরণ। মজার ব্যাপার হচ্ছে, বছরের প্রথমে জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিকে স্থান দিয়ে তিনি নিজেই নিজেকে দূরে সরিয়ে দেন।

আগস্ট : জুলিয়াস সিজারের পর রোমের সম্রাট হন তারই ভাইয়ের ছেলে অগাস্টাস সিজার। তারই নামানুসারে এই মাসটির নামকরণ করা হয় ‘আগস্ট’।

সেপ্টেম্বর : সেপ্টেম্বর শব্দের শাব্দিক অর্থ সপ্তম। কিন্তু সিজারের বর্ষ পরিবর্তনের পর তা এসে দাঁড়ায় নবম মাসে। তারপর এটা কেউ পরিবর্তন করেনি।

অক্টোবর : ‘অক্টোবর’-এর শাব্দিক অর্থ অষ্টম। সেই মতে এটা অষ্টম মাস হওয়ার কথাঅ কিন্তু সেই অষ্টম মাস আমাদের ক্যালেন্ডারের এখন স্থান পেয়েছে দশম মাসে।

নভেম্বর : ‘নভেম’ শব্দের অর্থ নয়। সেই অর্থানুযায়ী তখন নভেম্বর ছিল নবম মাস। জুলিয়াস সিজারের কারণে আজ নভেম্বরের স্থান এগারোতে।

ডিসেম্বর : ল্যাটিন শব্দ ‘ডিসেম’ অর্থ দশম। সিজারের বর্ষ পরিবর্তনের আগে অর্থানুযায়ী এটি ছিল দশম মাস। কিন্তু আজ আমাদের কাছে এ মাসের অবস্থান ক্যালেন্ডারের শেষপ্রান্তে।

জুলাই ও আগস্ট : জুলাই ও আগস্ট এ মাস দুটোর নাম আগে ছিল ‘কুইন্টিলিস’ ও ‘সিক্সিলিস’। অর্থাৎ পঞ্চম ও ষষ্ঠ। জুলিয়াস সিজার যখন রোমের সম্রাট হন তখন তিনি নিজের নামটিকে বিশেষভাবে চিহ্নিত করার জন্যই কুইন্টিলিস-এর পরিবর্তে নাম দিলেন নিজের নাম জুলিয়াস। এতেও কিন্তু জুলিয়াস ক্ষান্ত হলেন না, আরো গৌরব বাড়ানোর জন্য ৩০ দিনের এ মাসকে করলেন ৩১ দিন। কিন্তু বছর তো আর ৩৬৫ দিন থেকে বেড়ে ৩৬৬ দিন হতে পারে না। তাই রোমান পন্ডিতরা ফেব্রুয়ারি মাসকে ৩০ দিন থেকে কমিয়ে ২৯ দিন করতে বাধ্য হলেন। সিজারের পর রোমের সম্রাট হন তারই ভাইয়ের ছেলে অগাস্টাস সিজার। আবার অপারেশন চালানো হলো ফেব্রুয়ারির ওপর। সেই থেকে ফেব্রুয়ারি ২৮ দিনে এসে দাঁড়ালো। অগাস্টাস সিজার এমন নির্দেশ দিয়েছিলেন যে, লিপইয়ার বছরে আগস্ট মাসটিকে ৩২ দিনে গোনা। রোমে এ ব্যবস্থা চালু ছিল অনেকদিন।

দেশে দেশে নববর্ষ

চীন : নতুন বছরের উৎসবের কথা বলতে গেলেই প্রথমে চীনের নতুন বছরের উৎসবের কথাই বলতে হয়। চীনের নববর্ষ উৎসব চলে ১ মাসব্যাপী। ফেব্রুয়ারিতে চীনের চান্দ্র নববর্ষ। এই উৎসবকে বলা হয় ‘চুন জি’ ইংরেজীতে ‘স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল’ বা স্প্রিং ফেস্ট। চীনের প্রাচীরের একটি অংশে এ দিন বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পর্যটকদের জন্য থাকে বিশেষ প্যাকেজ। লাল পোশাক, লাল সন্ধ্যা বাতিতে নতুন সাজে সেজে ওঠে চীনের জনজীবন ‘ওয়েইল’ নামক বিশেষ ভোজনের আয়োজন করা হয় এই দিনে। ১ মাসব্যাপী আলাদা আলাদা অনুষ্ঠানের মধ্যে সপ্তম দিনটি পালিত হয় ‘শস্য দিবস’ নামে।

ফিলিপিন্স : ফিলিপিন্সের বেশিরভাগ মানুষ খ্রীস্টান ধর্মাবলম্বী। তাই তারা সবাই জানুয়ারির ১ তারিখেই নববর্ষ উৎসব পালন করে থাকে। ফিলিপিন্সরা তাদের নববর্ষকে “Manigong bagong toown” বলে অর্থাৎ নতুন বছরে জীবন সফল হোক, আমরা সবাই যেন সুখী হই।

স্কটল্যান্ড : ব্রিটিশরা সবাই জানুয়ারির ১ তারিখে নিউইয়ার পালন করে। এর ব্যতিক্রম নয় স্কটিশরাও। বিভিন্ন হোটেল, ক্লাব, পার্টিতে তারা কেক কেটে, পানীয় পান করে, একে অন্যকে উপহার সামগ্রী দিয়ে নতুন বছরের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করে এবং একে অন্যের সঙ্গে ভাব বিনিময় করে।
নববর্ষে স্কটিশরা অনেক জাঁকজমকভাবে নববর্ষের আনন্দ উৎসব পালন করে থাকে।

আর্জেন্টিনা : আর্জেন্টিনায় নববর্ষের আগের দিন রাতে পরিবারের সব সদস্য একসঙ্গে খাবার টেবিলে বসে খাওয়া-দাওয়া ও আনন্দ উৎসব করে। নববর্ষের দিন তারা নদী বা লেকের পানিতে সাঁতার কেটে নববর্ষ উদযাপন করে থাকে।

স্পেন : স্পেনে রাত ১২ টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে সবাই ১২টা করে আঙ্গুর খেয়ে হ্যাপি নিউইয়ারকে স্বাগত জানায়। কারণ তারা সবাই মনে করে এই আঙ্গুর তাদের জীবনের সৌভাগ্যের প্রতীক।
নববর্ষের সন্ধ্যা স্পেনে পরিচিত ‌'visperade Ario nuevo’ হিসেবে।

জাপান : জাপানীরা ইংরেজি অনুসারে ১ জানুয়ারি নববর্ষ পালন করে থাকে। খারাপ আত্মাকে দূরে রাখার জন্য এ সময় বাড়ির বাইরে দড়ি দিয়ে খড়ের টুকরো ঝুলিয়ে রাখে জাপানীরা। এটাকে তারা সৌভাগ্যের প্রতীক হিসেবে মনে করে। প্রার্থনা, ঘণ্টা বাজানো ও বিশেষ খাওয়া-দাওয়ার মধ্য দিয়ে এই উৎসব পালন করে জাপানীরা। আগে চীন এবং জাপানে একই দিনে নববর্ষ পালন করা হতো। এখন জাপানীরা ইংরেজি নববর্ষ বা গ্রেগারিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসারে নববর্ষ পালন করে ১ জানুয়ারি।

অস্ট্রেলিয়া : অস্ট্রেলিয়ার সিডনিতে অত্যন্ত জাঁকজমকভাবে পালিত হয় নববর্ষ উৎসব। নববর্ষ উপলক্ষে প্রায় ২০ লাখ লোক উপভোগ করে এই অনুষ্ঠান। এরপর সিডনি শহরে অপেরা হাউসে স্থানীয় সময় ১২টা ১ মিনিটে বর্ণাঢ্য অনুষ্ঠান ও আতশবাজির মধ্য দিয়ে নতুন বছরকে বরণ করে নেয় অস্ট্রেলিয়ার অধিবাসীরা।

কোরিয়া : কোরিয়া নববর্ষ শুরুর সময় এদেশের অধিবাসীরা কেউ ঘুমায় না। তাদের বিশ্বাস এ সময় ঘুমালে নাকি চোখের ভ্রু সাদা হয়ে যায়। কোরিয়াতে প্রায় সবাই সূর্যোদয় দেখে। বর্ণাঢ্য ও জমকালো অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে নববর্ষের দিনটিকে সবাই পালন করে থাকে। ১ জানুয়ারি নববর্ষে কোরিয়া পরিচিত হয় ‘সিওনাল’ নামে।

নিউজিল্যান্ড : খ্রিস্টীয় নববর্ষ প্রথম উদযাপন শুরু হয় নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড দ্বীপে। এই দিনে আনন্দ, ভূরিভোজ ও আতশবাজি উৎসবের মধ্য দিয়ে দিনটিকে পালন করে নিউজিল্যান্ডের অধিবাসীরা।

মেক্সিকো : মেক্সিকো শহরে রাত ১২টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে ১২ বার ঘণ্টা বাজানো হয়। এই সময় প্রতি ঘণ্টা ধ্বনির সঙ্গে একটি করে আঙ্গুর খাওয়া হয়। মেক্সিকোবাসীরা বিশ্বাস করে এই সময় যা কামনা করা হয় তাই পূরণ হয়।

ফ্রান্স : নববর্ষের দিনটিকে ফ্রান্সে ‘জউর দে এটরেন্স’ বলে ডাকা হয়। এখানে নববর্ষ উৎসব শুরু হয় ১ জানুয়ারি থেকে। এখানে নববর্ষ উদযাপন চলে সপ্তাহব্যাপী। পরস্পর পরস্পরকে ‘বন্নে আনেস’ বলে অভিবাদন করে। এই সময় ফ্রান্সের আইফেল টাওয়ারের পাশে বর্ণাঢ্য আতশবাজি উৎসবের মাধ্যমে নতুন বছরকে বরণ করে নেয়া হয়। ফরাসীরা থার্টি ফার্স্ট নাইটকে ‘লা সেইন্ট সিলভেস্ট্রে’ বলে ডাকে। এদিন প্রতিটি গৃহে এক বিশেষ ভোজের আয়োজন করা হয় যার নাম ‘লে রেভেলিন ডি সেইন্ট সিল ভেস্ট্রে’। এ ছাড়াও এ দিনের উৎসবে ফরাসীরা ‘প্যালে ডে রইস’ নামক এক ধরনের কেক তৈরি করে। প্যারিসের প্রধান প্রধান শহরগুলো রাতভর জেগে ঘটা করে নববর্ষ উৎসব পালন করে।

যুক্তরাষ্ট : যুক্তরাষ্ট্রের নববর্ষ উৎসব জাঁকজমকের সঙ্গে উদযাপনের কেন্দ্রবিন্দু হয় টাইমস স্কোয়ারে। এখানে নতুন বছর শুরু হওয়ার ১০ সেকেন্ড আগে এক বিশালাকার ক্রিস্টাল বল নেমে নতুন বর্ষের আগমনের কাউন্ট ডাউন শুরু হয়। এটিই বিশ্বের সবচেয়ে বড় নিউইয়ার পার্টি যেখানে প্রায় ৩০ লাখ লোক অংশগ্রহণ করে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রে রাতভর জেগে ঘটা করে নববর্ষ উৎসব পালন করা হয়। নববর্ষে এখানকার প্রত্যেক মলসমূহ এবং রেস্তোরাঁসমূহ নাচ-গান-বাজনায় এই দিনে মাতোয়ারা হয়ে ওঠে।

ব্রাজিল : ব্রাজিলের রিও ডি জেনিরো সমুদ্র সৈকতে নববর্ষের সবচেয়ে বড় অনুষ্ঠানটি হয়। এর প্রধান আকর্ষণ জমকালো চোখ ধাঁধানো পোশাক পরিধান করা। সমুদ্রে সাতটি ডুব দিলে এবং সাতটি ফুল ছুড়ে দিলে বছরটি খুব ভাল যাবে বলে তাদের ধারণা।

থাইল্যান্ড : থাইল্যান্ডে নববর্ষে নাম ‘সংক্রান’। থাইল্যান্ডে এপ্রিলের ১৩ তারিখ থেকে ১৫ তারিখ পর্যন্ত বৌদ্ধ নববর্ষ উৎসব হিসেবে এটি উদযাপিত হয়। তারা রাস্তায় পানির পিচকারী বা বালতিতে বরফ নিয়ে সেই পানি দিয়ে সবকিছু ভিজিয়ে দেয়।

ভিয়েতনাম : ভিয়েতনামের হোচি মিন সিটিতে নববর্ষ উদযাপিত হয় ৩১ ডিসেম্বর। তাদের অনুষ্ঠানে রাস্তাঘাটকে পুষ্প ও আলোকসজ্জিত করা হয়। ভিয়েতনামের নববর্ষকে সংক্ষেপে ‘টেট’ নামে অভিহিত করা হয়। ভিয়েতনামিদের বিশ্বাস, ঈশ্বর ঘরে ঘরে বাস করেন। নববর্ষে বেড়াতে যান স্বর্গে। বলা হয় কার্প মাছের পিঠে চড়ে ঈশ্বর ভ্রমণে বের হন। এ বিশ্বাসে ভিয়েতনামের লোকেরা অনেকে এই দিনে নদী বা পুকুরে কার্প মাছ ছাড়েন।

ইরান : নওরোজ ইরানিয়ান ক্যালেন্ডারের নববর্ষ এবং একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব। ইরানে প্রাচীনকাল থেকেই নববর্ষে নওরোজ উৎসব পালিত হয়ে আসছে। এই দিনে কৃষকরা ক্ষেতে শস্যের বীজ বপন করেন। ঘর দোর সাজান, নতুন পোশাক পরিচ্ছেদ পরিধান করেন। ইরানীরা ‘ইফত-সিন’ নামক এই দিনে বিশেষ খাবারের আয়োজন করে। যা সাত রকমের উপকরণে তৈরি করা হয়। নওরোজ অর্থ নতুন দিন বা নতুন আলো। এই নওরোজ উৎসবটি ইরানীরা মহা সমারোহে পালন করে।
নওরোজ উপলক্ষে ইরানে স্কুল-কলেজে মোট ১৩দিন ছুটি দিয়ে থাকে। এই দিনে ইরানীরা সম্ভবত ঈদের দিনের থেকেও বেশি আনন্দ করে থাকে। ইরানের প্রতিটি ঘর আলোকচ্ছটা আর রকমারী সাজসজ্জায় সজ্জিত হয়ে থাকে। এক কথায় ইরানের ‘নওরোজ’ যতটা জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালন হয়ে থাকে আর কোন মুসলিম দেশে নববর্ষের উৎসব এতটা জাঁকজমকপূর্ণভাবে পালনের রীতি হয়তবা লক্ষ্য করা যায় না। কেননা নওরোজ উৎসব বেশ কিছু দিনব্যাপী পুরো ইরানে ব্যাপক সমারোহে পালিত হয়।

মিসর : প্রাচীন মিসরে প্রচলিত ছিল ‘কোপটিক’ বা আলেক জান্দ্রীয় বর্ষপঞ্জি। তাতে ছিল ৩০ দিনের মাসের ১২ মাস, সঙ্গে ৫ দিনের ছোট একমাস (সর্বমোট ৩৬৫ দিন) তৃতীয় সময় (খ্রীস্টপূর্ব ২৩৮) তার সংস্কার হয়। নববর্ষের দিন মিসরীয়রা পালন করত নদীর উৎসব এটা থেকেই এসেছে ইরানের নববর্ষের ‘নওরোজ’ উৎসব।
বর্তমানকালে মিসরে নববর্ষে চাঁদ দেখে নববর্ষ ঘোষণা করেন দেশের ধর্ম নেতা বা প্রধান মুফতি। বিশেষ ধরনের খাবারসহ ভোজ উৎসব এবং নতুন কাপড় পরার নিয়ম রয়েছে সেখানে।

জার্মানি : জার্মানিতে নববর্ষে মানুষ ঠান্ডা পানির মধ্যে তরল সিসার টুকরা ঠেলে দেয়। সিসার টুকরা যে রকম আকার বানায় তা দেখে এখানকার মানুষ তাদের ভবিষ্যত নির্ণয় করে। নববর্ষের আগে খাবারের কিছু অংশ মধ্য রাতের জন্য রেখে দেয়া হয়, যাতে করে নতুন বছর ঘরে পর্যাপ্ত খাবার থাকে।

হাঙ্গেরি : হাঙ্গেরিতে নববর্ষের দিন ‘জ্যাকস্ট্র’ নামক এক প্রকার কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়। আগের বছরে ঘটে যাওয়া সব দুর্ঘটনা এবং খারাপ কাজের প্রতীক হিসেবে ‘জ্যাকস্ট্র’কে গণ্য করা হয়। এই কুশপুত্তলিকা পুড়িয়ে দুর্ভাগ্যকে ছুড়ে ফেলা হয়। বছরের শেষ দিন হাঙ্গেরিবাসী হাঁস, মুরগি বা অন্য কোন ধরনের পাখির মাংস খান না। তাদের ধারণা উড়তে পারে এমন পাখির মাংস খেলে নতুন বছরে জীবন থেকে সকল সৌভাগ্য উড়ে যাবে।

সুইডেন : সুইডেনে নববর্ষে রাইস পুডিং তৈরি করা হয়। এর ভেতর একটি কাঠ বাদাম লুকানো থাকে। সুইডিসরা বিশ্বাস করে খাওয়ার সময় যে কাঠবাদামটি পাবে সে নতুন বছরে সৌভাগ্যের মুখ দেখবে।

ইতালি : ইতালিতে নববর্ষে বিশেষ ধরনের মসুর ডাল ও সসেজ খাওয়া হয়। এটিকে তারা ‘কোটে চিনো ইলেনটিচ্চি’ বলে। ইতালিরা নববের্ষের দিনটিকে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মাধ্যমে স্মরণ করে থাকে।

অস্ট্রিয়া : অস্ট্রিয়ায় নববর্ষ উদযাপনের বিশেষ খাদ্য শূকরের রোস্ট। এটিকে তারা ‘সিলভেস্টেরাবেন্ড’ বলে থাকে। অস্ট্র্রিয়ায় শূকরকে সৌভাগ্য ও সমৃদ্ধির প্রতীক হিসেবে গণ্য করা হয়। নববর্ষে সমৃদ্ধি বয়ে আনবে এই বিশ্বাসে অস্ট্রিয়ার লোকজন শূকরের রোস্ট খায়।

নরওয়ে ও ডেনমার্ক : নরওয়ে ও ডেনমার্কে নববর্ষ উদযাপনের অংশ হিসেবে ‘ক্রানসেকাগে’ নামক এক ধরনের মিস্টি জাতীয় খাবার খাওয়ার রেওয়াজ প্রচলিত আছে। এটি মূলত এক জাতীয় কেক। এই কেক সাজাতে ক্রিম ও অন্যন্য জিনিস ছাড়াও ছোট ছোট পতাকা ব্যবহৃত হয়।

বুলগেরিয়া : বুলগেরিয়া বর্ষবরণ রীতি বিচিত্র ধরনের। আমাদের দেশে হাঁচি নিয়ে নানা কুসংস্কার প্রচলিত আছে। কিন্তু বুলগেরিয়াবাসীর কাছে বর্ষবরণের দিন হাঁচি ফেলাটা বেশ সৌভাগ্য ও মঙ্গলের প্রতীক। বাড়িতে আসা কোন অতিথি যদি হাঁচি ফেলেন তাহলে বাড়ির কর্তা তাকে নিজস্ব খামারে নিয়ে যান।
এরপর হাঁচি ফেলা ব্যক্তির প্রথম নজর খামারের যে পশুটির ওপর পড়বে সেই পশুটি গৃহকর্তা ঐ ব্যক্তিকে উপহার দিয়ে দেন। বুলগেরিয়ানদের ধারণা হাঁচি ফেলা অতিথি নববর্ষে পুরো পরিবারের জন্য সুখ ও সমৃদ্ধি বয়ে নিয়ে আসেন।

নেপাল : নেপালের নববর্ষ বাঙালীদের মতোই এপ্রিলের দ্বিতীয় সপ্তাহে ১২-১৫ তারিখের মধ্যে পালন করা হয়। নেপালীরা বলে ‘নববর্ষ’। নেপালীদের বছরের প্রথম মাস বৈশাখ। ওদের নববর্ষের গানের নাম ‘নয়া বর্ষা গীত’। নেপালীদের ভাষার সঙ্গে বাংলা ভাষার অনেকটাই মিল লক্ষণীয়। তারা সকলে মিলে নববর্ষের গান গায়–
‘শুভ কামনা শুভ কামনা
উদয়ো সুরিয়া তেজলে
সজর সাগমা নালিমা
উগরি উগরি নববর্ষ কো
নেপালি লাই শুভ কামনা’।

পাকিস্তান : পাকিস্তানীদের নিজস্ব কোন নববর্ষ নেই কারণ উর্দু ভাষায় কোন ক্যালেন্ডার নেই। যেহেতু উদুভাষীরা সবাই মুসলমান তাই তারা আরবি ক্যালেন্ডারকে নিজেদের ক্যালেন্ডার হিসেবে ব্যবহার করে। আরবিদের ক্যালেন্ডার অনুযায়ী পাকিস্তানীরা সকল ধর্মীয় ও জাতীয় আচার অনুষ্ঠান পালন করে থাকে।

ভারত : ভারতের হিন্দী ভাষাভাষী মানুষের কাছে হিন্দী নববর্ষের গান একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। ভারতের বিভিন্ন প্রদেশের মানুষ বিভিন্ন ভাষীরা বিভিন্ন সময়ে তাদের নববর্ষ পালন করে থাকে। হিন্দী ভাষীরা বিভিন্ন গান দিয়ে তাদের নববর্ষকে স্বাগত জানায়। ভারতীয়দের একটি সাধারণ প্রথাই হয়ে গেছে নববর্ষের অনুষ্ঠান উদযাপন করা। নববর্ষের হিন্দী গানগুলো পরিবেশিত হয়। বিশেষ করে ক্লাব ও পাবগুলোতে। এই দিনে তারা মিষ্টিমুখ, আনন্দ করা ছাড়াও রং ছোড়াছুড়ি করে থাকে।

আরব : আরবরা মহররমের ১ তারিখে হিজরী নববর্ষ পালন করে থাকে। তারা এই নববর্ষকে সানা হিজরীরা জাদীদা বলে। তাদের গানে কোন বাজনা থাকে না। ঠিক হাম্দ ও নাতের মতোই। আরবিরা এই দিনে পাড়া প্রতিবেশী আত্মীয়স্বজনদের মাঝে মিষ্টি বিতরণ করেন।

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ
সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত