ফুটবল মানব মাসুদ রানা

অনলাইন ডেস্ক | ০৬:৫৯, জানুয়ারি ০৮, ২০১৭

মাথার ওপর একটা বড়সড় ফুটবল। স্থির। যাঁর মাথার ওপর, তাঁর দুই হাত মোটরসাইকেলের হাতলে। মোটামুটি গতিতে মোটরসাইকেলটি চালাচ্ছেন তিনি। মোটরসাইকেলে হুট করে ব্রেক কষলেন। মাথা থেকে ফুটবল একচুলও নড়ল না। আশপাশের কেউ একজন বলে উঠল, বলের সঙ্গে ‘চুম্বক’ আছে। এই চুম্বক-রহস্য জানতে চাওয়া হলো তাঁর কাছে।

ফুটবল নামিয়ে হাতে দিয়ে বললেন, ‘দেখেন তো চুম্বক আছে নাকি? আমার মাথাটাও দেখেন। চেক করেন।’
তাঁর দেওয়া ফুটবল হাতে নিয়ে কথা হলো। ভদ্রলোকের নাম মাসুদ রানা। এলাকায় মানুষ তাঁকে নাম দিয়েছে ‘ফুটবল-মানব’। এলাকা মানে খুলনার ডুমুরিয়া থানার বরুনা গ্রাম। কিন্তু তাঁর ফুটবল–কীর্তি নাকি পৌঁছে গেছে এলাকার সীমানা ছাড়িয়ে। এখন ঢাকায় থাকেন এই ফুটবল মাথায় নিয়ে থাকার জোরেই।

গাছেও ওঠেন ফুটবল মাথায়কথা এগোতে থাকে—‘আমার ১৯ বছরের সাধনা। ফুটবল নিয়ে নানা কসরত করতে করতে রপ্ত করেছি, কীভাবে ফুটবল মাথায় নিয়ে থাকা যায়। আমি চাইলে মাথায় ফুটবল নিয়ে যেকোনো কাজই করতে পারি। শুধু ঘুমানোর সময় নামিয়ে রাখতে হয়।’

একনাগাড়ে কথা বলে থামেন মাসুদ। জানতে চাই আপনার পেশা কী? এবার হাসেন তিনি। বিকেলে সূর্যের ম্লান আলোতে সেই হাসি বাড়তি ঝিলিক দেয়। ‘ফুটবলের প্রেমে পড়লে কি আর কিছু করা যায়!’ প্রশ্ন করলেন না উত্তর দিলেন, তা বোঝা গেল পরের কথায়। ‘আমি মানুষকে আনন্দ দিতে পছন্দ করি। সবাই দেখে। বাহবা দেয়, উৎসাহ দেয়—এটাই বা কম কী?’

একটা ফুটবল মাথায় রাখলেই সবাই বাহবা দেয়? এবার খানিকটা রহস্য খুলে দেওয়ার ভঙ্গি করেন মাসুদ রানা। ‘এই যে আমার মোটরসাইকেলের পেছনে ব্যাগে সাতটা ফুটবল আছে। সবগুলো নিয়েই খেলা দেখাতে পারি।’
খেলা? ফুটবল তো খেলার জিনিসই।

এই খেলা সেই খেলা না। দেখবেন? ততক্ষণে ভিড় বেড়ে গেছে। ফুটবল-মানব মাসুদ রানা তাঁর খেলার সরঞ্জাম মানে ‘ফুটবল’ বের করেন। মোটরসাইকেলে চেপে একের পর এক খেলা দেখান। একবার মোটরসাইকেলের হাতল ছেড়ে দিয়ে চালান, উল্টো হয়ে চালান, আবার একসঙ্গে ছয়জন বাচ্চাকে ফুটবল ধরিয়ে দিয়ে মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে চক্কর দেন। ফুটবল-মানবের কসরত দেখার জন্য শুধু ভিড় নয়, ধারণ করে রাখতে মোবাইল ফোনের ভিডিও ক্যামেরা চালু করেন অনেকেই।

এবার মোটরসাইকেল দাঁড় করিয়ে রেখে দর্শককে গোল হয়ে দাঁড়াতে বলেন। মাঝখানে দাঁড়ান তিনি। ফুটবল মাথায় নিয়ে পরনের গেঞ্জি খুলে আবার পরে নিতে পারেন মাসুদ। এই খেলা দেখানো শেষ হতেই মুহুর্মুহু হাততালি পড়ে যায়। একফাঁকে ফুটবল মাথায় নিয়েই উঠে যান কারওয়ান বাজার মসজিদের দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা একটি গাছে। কিন্তু ফুটবল মাথা থেকে একবিন্দু সরে না। নেমে আসেন একইভাবে।

এবার হাততালির মাত্রা বেড়ে যায়। গাছ থেকে নেমে এসে একটু বিশ্রাম নেন। এই ফাঁকে জানতে চাই, ফুটবল নিয়ে কেন এত কসরত?

এমনই অনেক কসরত রপ্ত করেছেন মাসুদ রানাঅকপটে মাসুদ যা বলেন তা হলো, ‘ফুটবলে তো বাংলাদেশ বেশি দূর এগোয়নি। কবে নাগাদ এগোবে, তা-ও বলা যাচ্ছে না। তাই আমার চিন্তা ছিল ফুটবল নিয়ে যদি অন্য কিছু করা যায়, তাহলে হয়তো বাংলাদেশের নাম হবে। আমার আসলে অন্য কোনো উদ্দেশ্য না, বিশ্বের দরবারে বাংলাদেশের নামটা উজ্জ্বল করার ইচ্ছা।’

সেই ইচ্ছা বুকে নিয়ে এসেছেন ঢাকায়। ইলেকট্রনিক পণ্য নির্মাতা ওয়ালটনের সহযোগিতায় পোশাক পেয়েছেন, কিছু অর্থও পেয়েছেন। গ্রামে মা আছেন, দুই সন্তান আছে। কিন্তু তাদের জন্য কিছুই করতে পারেন না, এটা একটা আক্ষেপ। উল্টো শুধু খেলা দেখানোর জন্য বাড়ির জমি বিক্রি করে মোটরসাইকেলটা কিনেছেন।

স্বপ্ন দেখেন গিনেস বুক অব রেকর্ডসে নিজের নামটা লেখানোর। তিনি দাবি করলেন, ফুটবল মাথায় নিয়ে ৬৯ কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে পারেন, যা এর আগে নাকি কেউ করেনি।

কথা শেষ করার আগে বলেন, ‘এত কিছু শিখতে পেরেছি খুলনার দীন মোহাম্মদ স্যারের চেষ্টায়। উনি আমাকে সারাক্ষণ উৎসাহ দিয়েছেন। কিছু লিখলে তাঁর নামটা দিয়েন। আর ওয়ালটনের ডন স্যারের নামটা দিয়েন। তাঁর জন্যই আমি ঢাকা শহরে থাকতে পারি।’

কথা শেষ করে ফুটবল মাথায় নিয়ে মোটরসাইকেল চালু করেন।
মাসুদ রানার ফুটবল কসরত দেখুন

 

 

এ বিভাগের অন্যান্য সংবাদ

সর্বশেষ
সর্বাধিক পঠিত
close-icon